চলাচলে সরকারের কঠোর বিধিনিষেধের কারণে বাংলাদেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সংক্রমণের হার বেশ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে এসেছে। সংক্রমণের হার আগের তুলনায় অনেক কমেছে এবং মৃত্যুর হারও পাশাপাশি কমেছে। তবুও এখন পর্যন্ত প্রত্যেক দিনের মৃত্যুর সংখ্যা ৩০-এর ওপরে রয়েছে, যা কখনই কাম্য নয়। আমরা চাই না করোনাজনিত কারণে একজন মানুষেরও প্রাণ যাক।  বিধিনিষেধ দীর্ঘমেয়াদি হওয়ার ফলে সরকার জীবিকার তাগিদের কথা ভেবে কিছু ক্ষেত্রে  এটি শিথিল করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এরই একটি হচ্ছে করোনা সুরক্ষা বিধি মানার শর্তে দোকানপাট খুলে দেয়া। ১৪ তারিখে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান ঈদ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। ঈদকেন্দ্রিক কেনাকাটা বাংলাদেশের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। ফলে বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল হওয়ার কারণে জনসাধারণ বাজারে উপচে পড়েছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে আমরা যদি করোনা সুরক্ষা বিধি সঠিকভাবে না মানি, তাহলে করোনার তৃতীয় ঢেউ অতিসত্বর বাংলাদেশে আঘাত হানবে।

এরই মধ্যে আমরা লক্ষ করেছি গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির মতো জনসাধারণের মধ্যে বাড়ির বাইরে ঘোরাফেরা এবং সুরক্ষা বিধি মানার প্রতি অনীহা প্রদর্শন করার হার অনেকটাই বেড়েছে। ঈদের কেনাকাটার নামে অনেকেই শখের বশে বাড়ির বাইরে এসে ঘোরাফেরা করেছে। বাড়ি যাওয়ার ক্ষেত্রে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয় সেটি হচ্ছে, সরকার নির্ধারিত করোনা সুরক্ষা বিধি (যেমন মাস্ক পরিধান করা, ঘন ঘন হাত ধোয়া, জনাকীর্ণ স্থান এড়িয়ে চলা কিংবা সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা) মানার ক্ষেত্রে বেশির ভাগ মানুষের মধ্যে এক ধরনের অনীহা কাজ করছে। আমরা খুব সহজেই ভুলে যাচ্ছি যে আমাদের এ ধরনের বেপরোয়া আচরণের কারণে দুই মাস আগে বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল।

আমরা জানি জনসংখ্যার একটি বড় অংশ দোকানপাট ও বাজার অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত। এই মানুষদের জীবিকা নির্ভর করে দোকানপাট ও শপিংমলগুলোয় ব্যবসার ওপরে। ফলে ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের জীবিকার কথা চিন্তা করেই সরকার দোকানপাট খোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছিল, যে সব দোকান মালিক তাদের দোকানপাটে করোনা সুরক্ষা বিধি পুরোপুরি মেনে চলবেন। কিন্তু বাস্তবে যেটি দেখা যাচ্ছে সেটি অত্যন্ত হতাশাজনক।

কিছু প্রসিদ্ধ শপিংমল বা বিপণিবিতান ছাড়া দেশের বেশির ভাগ মার্কেটে করোনা সুরক্ষা বিধি মানার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে না। সরকারের তরফ থেকে বারবার বলা হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন বিষয়টি তদারক করবে। তবে বাস্তবতা হলো, যার যার অবস্থান থেকে আমরা যদি সচেতন না হই, তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রশাসনের পক্ষে বাংলাদেশের শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ফলে এ মুহূর্তে জনগণ স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে সুরক্ষা বিধি না মানলে জোর করে তাদের সুরক্ষা বিধি মানানো খুব কঠিন একটি কাজ।

 দোকান বা বাজার মালিক সমিতির সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতাদেরও দায়িত্ব আছে করোনা সুরক্ষা বিধি মেনে চলা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দোকান মালিকদের মতো ক্রেতাদের মধ্যেও সুরক্ষা বিধি মানার ক্ষেত্রে অনীহা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে ছোট ছোট সন্তানকে নিয়ে মাস্ক না পরে মা-বাবা বিভিন্ন দোকানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ফলে তিনি নিজে যেমন সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছেন, পাশাপাশি তার সন্তানদের এবং পরিবারের অন্যদের সংক্রমণ ঝুঁকিতে ফেলছেন। এ ধরনের মানুষ একটা বিষয় বোঝার চেষ্টা করে না যে এই করোনা সংক্রমণে সংক্রমিত হলে সেটি পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সমাজের অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। জনগণ যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে করোনা সুরক্ষা বিধি না মানে, তবে করোনা সংক্রমণের হার কমলেও আমাদের আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোনো সুযোগ নেই।

করোনা আক্রান্ত হয়ে কোনো পরিবারের একজন সদস্য কিংবা উপার্জনক্ষম ব্যক্তি যদি মৃত্যুবরণ করেন, তাহলে সেই মৃত্যু যে কতটা ভয়াবহ, সেটি শুধু সেই পরিবারের সদস্যরাই বোঝেন। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় হলো যে আমরা আমাদের নিজেদের কিংবা অন্যদের পরিবারের করোনার মৃত্যুর আহাজারি থেকে কোনো রকম শিক্ষা নিচ্ছি না। আর শিক্ষা নিচ্ছি না বলেই আমরা বেপরোয়া আচরণ করছি। সরকারকে সুরক্ষা বিধি মেনে সাহায্য করছি না; বরং সবকিছুর জন্য সরকারকে দোষারোপ করার এক ধরনের মানসিকতা পোষণ করছি। আমরা যদি ভারতের করোনা পরিস্থিতির দিকে তাকাই, তাহলে দেখব যে সরকারের কিছু ঢিলেঢালা সিদ্ধান্তের ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। মুম্বাই, দিল্লিসহ কয়েকটি প্রদেশের হাসপাতালে সাধারণ শয্যা কিংবা আইসিইউর কোনোটিতেই শয্যা নেই, নেই অক্সিজেন সরবরাহ। অক্সিজেনের অভাবে অনেক রোগী এরই মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে, যা আমরা বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করেছি। সুতরাং করোনা পরিস্থিতি আবার খারাপ হলে সেটা কি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে, সেই শিক্ষা আমাদের ভারত থেকে গ্রহণ করা উচিত।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে মানুষের জীবনের মূল্য অনেক বেশি। প্রত্যেক বছর আমাদের জীবনে বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান আসবে এবং আমরা সেগুলো উদযাপন করব। তবে সেই প্রক্রিয়াটি হতে হবে একটু ভিন্ন। বেপরোয়াভাবে বাজারে ঘুরে করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা বাড়ানোর চেয়ে বাসায় বসে সংসারের অন্যদের সঙ্গে সময় কাটানো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ পরিস্থিতিতে সবার প্রতি আবেদন জানাতে চাই, আসুন করোনা সংক্রমণের হার কিছুটা কমায় আমরা যেন আত্মতুষ্টিতে না ভুগি। বাজারে যেভাবে মানুষের চলাচলের ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে, সেটা নিয়ন্ত্রণ করি। আমরা যদি সেটি অল্প সময়ের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ না করতে পারি তাহলে আবারো পরিস্থিতি যেকোনো সময় খারাপ হয়ে যেতে পারে। এমনকি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে, যা আমরা গত এক মাস আগে প্রত্যক্ষ করেছি।

এখানে আরেকটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ আর তা হলো, আমাদের মনে রাখতে হবে যে করোনার মতো মহামারী মোকাবেলা করা কোনো দেশের সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এ মহামারী থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সবার সহযোগিতা। আমরা একদিকে যেমন করোনা সুরক্ষা বিধি মেনে সংক্রমণ দমন করতে পারি আবার অন্যদিকে যে যার অবস্থানে আছি, সেখান থেকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করে তাদের দুর্বিষহ কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করতে পারি। সবাই মিলে একসঙ্গে যুদ্ধ করলেই কেবল করোনা মহামারী থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, এ যুদ্ধের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই, কারণ এখন পর্যন্ত বৈজ্ঞানিকভাবে কেউই বলতে পারছে না যে কবে আমরা এ অবস্থা থেকে মুক্তি পাব? করোনা থেকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য যেসব ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়েছে, সেগুলোর কোনোটিই সম্পূর্ণ সুরক্ষা দিতে সক্ষম নয়। তাছাড়া এ ভাইরাস এত দ্রুততম সময়ের মধ্যে তার রূপ বদলিয়ে আরো শক্তিশালী হচ্ছে যে ভ্যাকসিন কতটা কার্যকরী হবে, সেটিও একটি প্রশ্নের সম্মুখীন? সার্বিকভাবে করোনা মহামারীর গুরুত্ব বিবেচনা করে আমাদের সবার উচিত দায়িত্বের সঙ্গে নিজেদের আচরণ সংযত করা, বেপরোয়া আচরণ পরিহার করা এবং একসঙ্গে করোনার বিরুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য কাজ করা। তবেই আমাদের সামনে ভালো দিন আসবে।

 

ড. প্রণব কুমার পান্ডে: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক