কমিউনিস্ট পার্টি অব চায়নার (সিপিসি) শততম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীনের জনগণ, দেশটির প্রেসিডেন্ট ও সিপিসির মহাসচিব শি জিনপিংকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। শুভেচ্ছাবার্তায় টিকা ও চিকিৎসা সরঞ্জামসহ করোনাকালে চীনের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে চীনকে বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী দেশটির সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরো বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। পাশাপাশি শান্তি, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে পারস্পরিক সহযোগিতা গভীর করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। অস্বীকারের উপায় নেই চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ছে। চীনের অর্থায়নে দেশে বেশকিছু উন্নয়ন প্রকল্প চলমান। তাছাড়া দেশের বড় কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নেও চীনা প্রতিষ্ঠান সক্রিয়। সার্বিক অবস্থাদৃষ্টে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখাই প্রত্যাশিত।

বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে চীন এখন বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দেশটি তার প্রভাব আরো বিস্তৃত করতে বাংলাদেশসহ কিছু দেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের লক্ষ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলো ভালোভাবে দেখছে না। এশিয়ায় চীনের প্রভাব হ্রাসে তারা বিভিন্ন উদ্যোগও নিয়েছে, গঠন করেছে নতুন জোট। বাংলাদেশ যেন এতে যোগ না দেয় সেটিও চীন জোর দিয়ে বলছে। বাংলাদেশের জন্য চীন আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস। কিন্তু রফতানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো বাংলাদেশী পণ্যের প্রধান গন্তব্য। এসব নানা সমীকরণ বিবেচনায় রেখে সম্পর্কোন্নয়নের পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগী দেশ হিসেবে এখনো জাপান এগিয়ে থাকলেও দ্রুতই এ ফারাক কমিয়ে আনছে চীন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে অংশীদারিত্ব বাড়াতে চীনের আগ্রহ রয়েছে। এটাকে কাজে লাগাতে হবে। সাম্প্রতিক পাঠানো শুভেচ্ছাবার্তায় আমাদের প্রধানমন্ত্রীও চীনের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব নতুন উচ্চতায় উন্নীত করার কথা বলেছেন। তিনি এজন্য নতুন উপায় ও পথ সন্ধানের আহ্বান জানিয়েছেন। বিষয়টি আমলে নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সক্রিয়তা দরকার। অব্যাহত কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আরো নিবিড় ও সৌহার্দপূর্ণ হবে, এটাই প্রত্যাশা।

বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে চীন অনেক দিন থেকেই আমাদের বড় অংশীদার। দেশটি থেকে বছরে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য আমদানি করে বাংলাদেশ। কিছুদিন আগে বাংলাদেশের কিছু রফতানি পণ্যের জন্য চীন শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা ঘোষণা করেছে, এটা ইতিবাচক। ঘোষিত শুল্কমুক্ত সুবিধা ব্যবহার করে দেশটিতে রফতানি বাড়ানো গেলে তা বাংলাদেশের জন্য সুফল বয়ে আনবে। বিশেষ করে চীনে বাংলাদেশের তৈরি ওষুধ, তৈরি পোশাক, কাঁচা চামড়া, প্রক্রিয়াজাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, কাঠের আসবাব, হিমায়িত খাদ্য, মাছ ও শাকসবজির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সম্ভাবনাময় এ বাজার কাজে লাগানো গেলে সংশ্লিষ্ট পণ্যগুলোর রফতানি যেমন বাড়বে, তেমনি বিরাজমান বাণিজ্যবৈষম্যও অনেকটা কমে আসবে। চীনে শ্রমের মজুরি বাড়তে থাকায় তার শিল্পকে নতুন জায়গা খুঁজতে হবে। এ কারণে চীন এখন শ্রমঘন নিম্ন প্রযুক্তির শিল্প থেকে সরে আসতে চাইছে। তারা এখন উচ্চ মূল্য সংযোজিত ও প্রযুক্তি পণ্য যেমন- আইটি, অ্যারোস্পেস ও টেলিযোগাযোগ খাতে নজর দিচ্ছে। বাংলাদেশে তরুণের সংখ্যা বিপুল। অর্থাৎ এখানে এখন বিপুলসংখ্যক শ্রমিক পাওয়া যাবে। চীনের শ্রমঘন শিল্পের মালিকরা, যারা উৎপাদন চালিয়ে যেতে চান, তাদের জন্য বাংলাদেশে শিল্প স্থানান্তরের ভালো জায়গা হতে পারে।

চীন আমাদের অবকাঠামো খাতে বড় রকমের ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে চীনের বিনিয়োগ ক্রমে বাড়ছে। তবে সেটি ভালো না মন্দ, তা নিয়ে কোনো কোনো মহলের সন্দেহ রয়েছে। সেতু, মহাসড়ক, টানেল ইত্যাদি নির্মাণ বাবদ চীন এরই মধ্যে বাংলাদেশের বড় ঋণ প্রদানকারী দেশ হয়ে উঠেছে। অনেকে অভিযোগ করেন, চীনা কোম্পানিগুলো দরপত্রে অংশ নেয় অল্প দর প্রস্তাব করে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের খরচ বাড়িয়ে বা ঋণের শর্ত পরিবর্তন করে ফেলে। একটি জরিপে দেখা গেছে, চীনের বহির্বিনিয়োগের এক-চতুর্থাংশই ব্যর্থ হয় এসব কারণে। বাংলাদেশকে এদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

বিনিয়োগ সহযোগিতা ছাড়াও বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ বিভিন্ন সহযোগীর কাছ থেকে অনুদান ও ঋণ গ্রহণ করেছে। উল্লেখযোগ্য যে, গত এক দশকে বাংলাদেশের নেয়া সিংহভাগ অনুদান ও ঋণের উৎসই ছিল ভারত এবং পরের দুটি অবস্থান যথাক্রমে রাশিয়া ও চীনের দখলে। এ কথাও অনস্বীকার্য যে, এর আগে বাংলাদেশ আর্থিক অনুদান থেকে যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা লাভ করে এসেছে, ভবিষ্যতে তা আর পাবে না। এর কারণ প্রথমত, ২০১৫ সালে দেশটি বিশ্বব্যাংকের চোখে নিম্ন আয়ের থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় উত্তরণ ঘটেছে। দ্বিতীয়ত, জাতিসংঘের চাহিদা অনুযায়ী ২০২৪ সালের মধ্যে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উঠে আসার যোগ্যতাও অর্জন করেছে। যদিও এ বিষয়গুলো নিশ্চিতভাবেই বেশ ইতিবাচক, কিন্তু তার পরও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাকা যতই সামনের দিকে এগিয়ে যাক না কেন, অনাগত ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক পরিবেশ বাংলাদেশের জন্য ক্রমে প্রতিকূল হয়ে উঠতে থাকবে। বাংলাদেশের অবস্থা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে অনেকটা মালদ্বীপ ও শ্রীলংকার মতো, যাদেরও অর্থনৈতিক অগ্রসরতা ও মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে উত্তরণের পর বৈদেশিক সাহায্যের উৎস সীমিত হয়ে এসেছিল। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে যখন অর্থপ্রাপ্তির সম্ভাবনা কমে যায়, তখন এ ধরনের সরকারগুলো আর্থিক অনুদান ও ঋণের জন্য অন্য কোথাও হাত বাড়ায়। সে রকম একটি ‘বিপদের বন্ধু’ হলো চীন, যারা প্রায়ই চড়া সুদে ঋণ দিয়ে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এ রকম অবস্থা হতে পারে। বাংলাদেশের ঋণ জিডিপির অংশ হিসেবে ২০০৯ সালের পর থেকে বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে এবং এখন আমাদের সজাগ হতে হবে ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরাও শ্রীলংকার অভিজ্ঞতার পর থেকে সচেতন হবেন এবং তারা ক্রমাগত চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অধীন বিনিয়োগগুলোর সম্ভাব্য প্রভাবের ব্যাপারে আরো চিন্তাভাবনা করবেন বলে প্রত্যাশা।

ভারসাম্যমূলক নীতি রক্ষা করে চলার কারণেই এ পর্যন্ত সব বড় শক্তির সঙ্গে বাংলাদেশ সম্পর্ক বজায় রাখতে পেরেছে। এ ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীনকে আরো চাপ প্রয়োগ করা প্রয়োজন। কারণ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে চীনের ভূমিকা এখন পর্যন্ত সন্তোষজনক নয়। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে অনেক ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক, ভারত ও চীনের বৈরিতা নতুন মাত্রা লাভ করেছে। এসবের মধ্যে থেকেই চীনের কাছ থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করে নেয়াই বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক হতে হবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে।