করোনার অভিঘাতে সাধারণ মানুষের আয় কমলেও বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামের কারণে দিশেহারা হয়ে পড়েছে হতদরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ। অতীতে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) পণ্য কিনতে দরিদ্ররা এলেও এখন সে ভিড়ে শামিল মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষও। বিষয়টি নিয়ে গতকাল দৈনিক বণিক বার্তায় ‘মধ্যবিত্তরাই এখন টিসিবির পণ্যের প্রধান ক্রেতা’ শিরোনামে একটি সরেজমিন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে টিসিবির ট্রাক সেখানেই নারী-পুরুষের উপচে পড়া ভিড় সাধারণ মানুষের অসহায় অবস্থারই প্রতিফলন। এমন অবস্থায় প্রয়োজনীয় সমর্থনসহ টিসিবির কার্যক্রম বাড়ানোর দিকে জোর দিতে হবে।

সরকারি এ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে বারবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পণ্য ক্রয়ে যথেষ্ট তহবিল ও জনবল সংকট। এর অভাবে সংস্থাটি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যর্থ হচ্ছে। তাছাড়া ভৌত অবকাঠামোগত বেশকিছু অসুবিধার জন্য একদিকে তারা যেমন ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতে পারছে না, তেমনি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যবাজারে প্রতিযোগিতা তৈরিতে ব্যর্থ হচ্ছে। সংস্কারের অভাবে ক্রমে জীর্ণ হয়ে পড়ছে টিসিবির নিজস্ব ও ভাড়া করা গুদামগুলো। এসব গুদাম তেল, চিনি, ডাল ইত্যাদি ভোগ্যপণ্য রাখার জন্য উপযুক্ত নয়। এভাবে মজুদের ফলে পণ্যের গুণগত মান নষ্টের পাশাপাশি মজুদ পণ্যও নষ্ট হচ্ছে। এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। এক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সক্রিয় ভূমিকা পালন করা চাই। টিসিবিকে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত করে কার্যক্রম বৃদ্ধির জন্য সমর্থন নিশ্চিত করা চাই।

এদিকে সরাসরি পণ্য আমদানি ও ক্রয়ের আইনি বাধা টিসিবির সক্ষমতাকে নাজুক করেছে। অথচ পাশের দেশ ভারতে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। ভারতের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে দ্য স্টেট ট্রেডিং করপোরেশন অব ইন্ডিয়া লিমিটেড (এসটিসি)। তারা পণ্যের মূল্য নির্ধারণসহ পণ্য বিক্রির মাধ্যমে বছরে হাজার কোটি রুপি মুনাফা করছে। শ্রীলংকা স্টেট ট্রেন্ডি করপোরেশন (এসটিসি) কিংবা ট্রেডিং করপোরেশন অব পাকিস্তানের (টিসিপি) কথাও যদি উল্লেখ করা হয়, সেক্ষেত্রে সেবা নিশ্চিত এবং পণ্যের বাজারমূল্য স্থিতিশীল ও নিয়ন্ত্রণ রাখার পাশাপাশি তারাও মুনাফা তুলে নিতে সমর্থ। অন্যান্য দেশের সংস্থাগুলোর অবস্থা বিবেচনায় টিসিবিকে শক্তিশালী করতে একদিকে যেমন প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে আইনি বাধা দূরের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে।

অতীতে বিভিন্ন সময়ে টিসিবিকে শক্তিশালী করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হলেও বাস্তবে কার্যকর হয়েছে সামান্যই। যেমন বছর দুই বছর আগে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ, বিপণন ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নিজস্ব স্থাপনা নির্মাণ ও সংস্কারের সুপারিশ করা হলেও বেশির ভাগই বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে বাজার নিয়ন্ত্রণে টিসিবির গুরুত্ব ক্রমেই দুর্বল হয়েছে। বিদ্যমান বাজার ব্যবস্থা এখন অনেক বড়। করোনা পরিস্থিতিতে তৈরি হয়েছে নতুন ধরনের সংকট ও চ্যালেঞ্জ। তাছাড়া কতদিনে করোনা পরিস্থিতির লাগাম টানা সম্ভব হবে, তা নিশ্চিত করে বলাও কঠিন। করোনা পরিস্থিতির ব্যাপকতা সামলাতে দেশব্যাপী লকডাউন চলছে। কিছুু অর্থনৈতিক কার্যক্রম সীমিত পরিসরে চালু থাকলেও তাতে অসহায় মানুষের উপায় হচ্ছে না। নতুন দরিদ্রের সংখ্যা বাড়ছে। নতুন করে কর্মসংস্থানহীন হয়ে পড়েছে অনেকে। ক্রমেই বর্ধমান চাহিদা মোকাবেলা করতে সীমিত মজুদ দিয়ে কিছুই হবে না।

এদিকে করোনা পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে আমদানিকারকরা দফায় দফায় ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে চলেছেন। বাজার নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতিশীল রাখতে গঠিত টিসিবির অতীত ভূমিকা নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার উপায় নেই। এ সময় পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে কোনো মহলের কারসাজি আছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সরকার যে দাম বেঁধে দিচ্ছে, ব্যবসায়ীরা তা মানছেন না। সাধারণ ভোক্তাদের ভোগান্তি বাড়ছে। তাই  টিসিবিকে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা জরুরি। অধিকসংখ্যক ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিম্ন আয়ের মানুষের কষ্ট লাঘবে টিসিবির মাধ্যমে আরো বেশি পণ্য বিক্রি করতে হবে।

করোনাকালে পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় খাদ্যপণ্যের জন্য বরাদ্দও কমে গেছে। দ্রুত করোনা সংক্রমণ কমার সম্ভাবনা ক্ষীণ। সীমান্তবর্তী এলাকায় করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় পণ্য সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা আছে। এ অবস্থায় শুধু শহরে নয়, দেশজুড়ে টিসিবির ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে পণ্য বিক্রির পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে। ক্রেতার চাহিদার তুলনায় টিসিবির ট্রাক ও পণ্যের পরিমাণ কম। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে ট্রাকের পাশাপাশি টিসিবি ডিলারদের পণ্যের সরবরাহের পরিমাণ বাড়াতে হবে। কোনো এলাকায় ডিলার সংকট হলে সেখানে দ্রুত নতুন ডিলার নিয়োগ দিতে হবে। পাশাপাশি দুর্নীতি রোধে জোরদার করতে হবে তদারকির বিষয়গুলোও। তাছাড়া যেসব পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে, সেসব পণ্যের মান যাতে ভালো হয়, সেদিকটায়ও নজর দেয়া দরকার।