গত আমন মৌসুমে উৎপাদন কম হওয়া ও সরকারি খাদ্যশস্যের মুজদ কমে আসায় বেশ অনেক দিন ধরে দেশে চালের বাজার অস্থির। দাম নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয়ভাবে চাল আমদানির উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। কিন্তু খুচরা বাজারে এর প্রভাব দৃশ্যমান নয়। বলা চলে, আমদানি সত্ত্বেও এখনো চালের দামে স্থিতিশীলতা ফেরেনি। এমন এক অবস্থার মধ্যে কিছুটা স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে হাওরাঞ্চলে আগাম বোরো ধান কাটার খবর। তথ্য বলছে, চলতি বোরো মৌসুমে প্রায় ৪৮ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। বিপরীতে এ মৌসুমে সারা দেশে ধানের আবাদ হয়েছে লক্ষ্যের চেয়ে ৮৩ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে। এ বছর ২ কোটি ৫ লাখ টন চাল উৎপাদনের আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত বছরের তুলনায় যা চার লাখ টন বেশি। আলোচ্য লক্ষ্য পূরণ ও বাজারে তার প্রভাব ছড়িয়ে দিতে ধান কাটা থেকে শুরু করে অন্য প্রক্রিয়াগুলো সুচারুভাবে সম্পন্ন করা জরুরি।

আগের অনিশ্চয়তা বিবেচনায় রেখে এবার বোরো উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছিল কৃষি মন্ত্রণালয়। এ পরিকল্পনা অনুযায়ী বছরের শুরুতেই কৃষকদের মধ্যে বীজসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ জোগানো হয়েছিল। বিশেষ করে প্রণোদনার মাধ্যমে দুই লাখ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড ধানের জাত চাষ করা হয়েছিল। হাইব্রিড জাতের আবাদ বাড়ায় একদিকে ফসল কাটার সময়সীমা কমে এসেছে, অন্যদিকে উৎপাদনশীলতাও বেড়েছে। এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো ধান কাটা সম্পন্ন করে যথাসময়ে ফসল ঘরে তোলা। সাধারণত ১৫ এপ্রিলের পর থেকে বোরো ধান কাটা শুরু হয়। কিন্তু হাইব্রিড জাতের কারণে এবার কিছুটা আগে ধান কাটা শুরু হয়েছে। এটা নিশ্চয়ই একটা ইতিবাচক বিষয়। এটাকে কাজে লাগাতে হবে। বেশ কয়েক বছর ধরে অতিবৃষ্টিজনিত আকস্মিক বন্যায় হাওরে পাকা ফসল তলিয়ে যাওয়া একটি বড় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক অতীতে শুধু গত বছরই হাওরে সম্পূর্ণ ধান কাটা সম্ভব হয়েছিল। মেঘালয় ও তত্সংলগ্ন এলাকায় প্রবল বৃষ্টিজনিত কারণে সুনামগঞ্জসহ হাওরের সাত জেলায় যেকোনো সময় চৈতালি ঢলের আশঙ্কা বিদ্যমান। এ অবস্থায় ধান কাটা কার্যক্রম বেগবান করতে হবে। প্রয়োজনে গত বছরের মতো বিশেষ ব্যবস্থায় কৃষি শ্রমিক পাঠিয়ে বা প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কীভাবে দ্রুত ধান কাটার ব্যবস্থা করা যায়, স্থানীয় তরুণ-যুবক-শিক্ষার্থীদের কাজে লাগানো যায়, সে চেষ্টা করতে হবে। হাওর বাদে অন্য জেলাগুলোয় মে-জুনের প্রথম ভাগে ধান কাটা শেষ হওয়ার কথা। ধান কাটার ক্ষেত্রে কৃষকরা যেন সেখানে কোনো ধরনের সমস্যায় না পড়েন, সেজন্য প্রয়োজনীয় সমর্থনমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। কভিডের সংক্রমণ বেড়ে উঠার প্রভাব ধান কাটায় না পড়ে, সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।

বোরো আমাদের চালের সবচেয়ে বড় মৌসুম। চালের মোট চাহিদার প্রায় ৬০ ভাগ এ মৌসুম থেকে আসে। চালের দাম ওঠানামায় বোরো ধান প্রভাবক ভূমিকা রাখে। খাদ্যনিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকেও বোরো গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই সুষ্ঠুভাবে ধান কাটা সম্পন্নের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানেও সুপরিকল্পনার ছাপ প্রয়োজন। ধারদেনা করে চাষাবাদ করায় ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষী পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে শুরুতেই ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়। ফলে অনেক সময় ধানের ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হয় কৃষক। বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ধান সংগ্রহ অভিযানের ক্ষেত্রে আগে থেকেই প্রস্তুতি নেয়া দরকার। তাছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যশস্যের দাম উর্ধ্বমুখী। বিশ্ব খাদ্য সংস্থাও আশঙ্কা প্রকাশ করছে, চলতি বছর বৈশ্বিক খাদ্যপণ্যের বাজার অস্থির হয়ে উঠবে। সরকারি মজুদ তলানিতে নেমে এসেছে। তাই সরকারি মজুদ বাড়াতে বোরো মৌসুমের সদ্ব্যবহার করতে হবে। প্রতিবারই সরকারি ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান ব্যর্থ হয়। এবার যেন সফল হয়, তা নিশ্চিতে এখন থেকেই পরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। প্রচলিত অভ্যন্তরীণ ধান-চাল সংগ্রহ নীতিমালায় সরকার চাল সংগ্রহের জন্য চালকল মালিকদের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ২০০৬ সালের জাতীয় খাদ্যনীতিতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে খাদ্যশস্য কেনার বিধান থাকলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। চালকল মালিকরাা অভ্যন্তরীণ ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানে সরকারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন। গত বছর চাল সংগ্রহ অভিযানে সরকার লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী চাল দেয়ার কথা থাকলেও পরবর্তী সময়ে চাল সরবরাহ করেননি মিলাররা। সরকারি মজুদে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। খাদ্য মজুদ নজিরবিহীনভাবে কমেছে, বেড়েছে চালের দাম। কাজেই এবার সংগ্রহ অভিযানে প্রাধান্য দিতে হবে মিলার নয়, প্রকৃত চাষীদের। এতে চালের দাম যেমন স্থিতিশীল থাকবে, তেমনি কৃষকও ফসলের দাম পাবেন। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত ও রাষ্ট্রীয় সংগ্রহ পরিকল্পনা সফল করতে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিতে হবে কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়কে।

দেশে করোনা সংক্রমণ ফের বাড়ছে। সামনে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়সহ অনেক প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা আছে। সুতরাং মজুদ না বাড়ালে আপত্কালীন পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন। এমনটি হলে খাদ্য সংকটের শঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। এক্ষেত্রে খাদ্যশস্যের মজুদ বাড়ানোর বিকল্প নেই। মজুদ বাড়াতে সরকার চাল আমদানিতে শুল্ক কমিয়েছে। বোরো ধান ওঠার সময় চাল আমদানিতে শুল্ক হ্রাসের বিষয়টি পর্যালোচনার দাবি রাখে। এতে বাজারে ধানের দাম কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। সরকারি-বেসরকারিভাবে চাল আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি আমদানি হলে তাতে ধানের দাম কমে গিয়ে কৃষক লোকসানে পড়বেন। বোরো ধান যেহেতু কাটা শুরু হয়েছে, সেহেতু অতীতের অভিজ্ঞতা আমলে নিয়ে আমদানিতে লাগাম টানতে এখনই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাড়াতে হবে অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ।