[গতকালের পর]

ড. আদনান মোর্শেদ: চমৎকার। একটি বিষয় আমরা দেখলাম যে প্যাশনেট একটি গ্রুপকে উসকে দেয়ার উৎসই-বা কোথায়? এটি অর্গানিক্যালি নিজ থেকে উঠে আসবে প্যাশনেট গ্রুপগুলো কিংবা তাদের উসকে দেয়ার ঘটনাটি কোথায় ঘটছে আসলে, তারও একটা আলাপ হওয়া দরকার। একটি উদাহরণ দিই। যেটি আমি নিশ্চিত যে রওনক আপা দেখেছেন। অন্যরাও হয়তো দেখেছেন। নিউইয়র্কে ম্যানহাটনে একটি ট্রেন লাইন ছিল, যেটি ফ্রেইট ট্রেনের একটা এলিভেটেড ট্রাক ছিল মাইল দুয়েক লম্বা। যখন আর নিউইয়র্ক সিটিতে ফ্রেইট ট্রেন নেই, একসময় সেটি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। তখন প্যাশনেট, কমিটেড গ্রুপটি দাঁড়িয়ে গেল। দুজন আইনজীবী (তারা স্থপতিও নন) দাঁড়িয়ে গেলেন এবং তারা জনমত সংগঠিত করলেন যে এটা ভাঙা যাবে না। এটি আমাদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল হেরিটেজের চিহ্ন। এটি রাখতে হবে। পরবর্তী প্রশ্নে এবার আমরা যাব রিজওয়ানার কাছে। আপনি অনেক দিন ধরে পরিবেশ অধিকার সংরক্ষণের আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এজন্য অনেক পুরস্কারও পেয়েছেন। বৃহত্তর পরিবেশের অংশ হিসেবে কোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের বিষয়ে কোনো মামলার অভিজ্ঞতা থাকলে শেয়ার করবেন কি? তখন আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমরা একটু অন্তর্দৃষ্টি পেতে পারি। আইনজীবী মহলে ঐতিহাসিক স্থাপনা সুরক্ষার বিষয়টি মূলধারায় আছে, নাকি কিছুটা প্রান্তিক? ইতিহাস সংরক্ষণের বিষয়টিকে আইনি পেশিশক্তি দেয়া যায় কিনা।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান: ইতিহাস সংরক্ষণের বিষয়টি আইনজীবী মহলে কেমন? এটা আসলে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বেশ জটিল। বাংলাদেশে ইতিহাসটা যে যেভাবে লেখেন, সেভাবে দেখেন। একজন একভাবে লেখেন, আরেকজন আরেকভাবে লেখেন। আসলে আমাদের এখানে কতগুলো বিষয়ে দলীয় সংকীর্ণতার/বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে সঠিক তথ্য দেবে, দুঃখজনকভাবে সেটি হয়ে ওঠেনি। কতগুলো স্থাপনা আছে, যেগুলোর ব্যাপারে আইনজীবীরা হয়তো একমত হবেন, কিন্তু ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণ খুব একটা পপুলার ইস্যু এখনো তাদের মধ্যে হয়ে ওঠেনি। আমাদের এখানে কিন্তু আমি না করলেও মামলা হয়েছে। যেমন লালবাগ কেল্লার আশপাশে নির্মাণকাজ বন্ধ করার জন্য মামলা হয়েছে। মহাস্থানগড়ের আশপাশে ইমারত নির্মাণ বিধিমালার অধীনে নির্মাণকাজ করার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। কিন্তু এ মামলাগুলোর মানদণ্ড সেট করে দেয়া হয়নি। সরকার রুল দিয়ে মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিতে পারত যে কোন কোন বিবেচনায় পড়লে আমরা একটি স্থাপনাকে হেরিটেজ হিসেবে সুরক্ষিত করব। এটি এখনো সরকারের স্বেচ্ছাধীন বিবেচনার ওপর নির্ভর করে। অনেক ক্ষেত্রে আদালত কিছু সাধারণ ডিরেকশন দেয়, সেটি আবার সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ২০১৯ সালে যে রায়টা হয়েছে যে ২ হাজার ২০০ স্থাপনাকে প্রটেক্ট করতে হবে, আমরা আশা করছি সেই রায়ে এ ধরনের কিছু নির্দেশনা আসবে, কিন্তু এ রায়ের কপি আমরা এখনো পাইনি। ফলে যেসব বিবেচনায় একটি পার্টিকুলার জিনিস প্রটেক্টেড অ্যান্টিকুইটি হচ্ছে, একই বিবেচনায় থাকলেও দেখা যাচ্ছে অন্য একটি জিনিস প্রটেক্টেড অ্যান্টিকুইটি হচ্ছে না। ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে যে উন্নয়ন, তাকে তো টেকসই উন্নয়ন বলা যায় না।

আপনি হয়তো বিদেশ থাকেন বলে গণ আলাপ বলেন, আমরা হয়তো বাংলাদেশে থাকি বলে গণ আন্দোলন বলে ফেলি। টিএসসি নিয়ে ছাত্রসমাজের প্রতিক্রিয়া বিষয়ে আমাদের আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। আর কমলাপুরের ক্ষেত্রেও আমি মনে করি না যে এটি লস্ট কেইস। আমার মনে হয় এটার ব্যাপারেও সামনের দিনগুলোয় পাবলিক ডায়ালগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। হঠাৎ করেই তো অ্যাক্টিভিজম হয়ে যাবে না, আমরা যারা ব্যাপারটি বুঝি আর ব্যাপারটি বুঝি না, একটা পাবলিক এজেন্ডা তৈরি করতে হলেও তো একটা প্রসেস অনুসরণ করতে হয়। আমাদের এখানে ধরেই নেয়া হয় যে কয়েকটি গ্রুপ বা লোক আছে, যারা প্রতিটি অন্যায়-অবিচার হলে প্রতিবাদ করবে, পত্রপত্রিকায় লিখবে, স্বাক্ষর দেবে, এর বাইরে কেউ এগিয়ে আসবে না। কিন্তু আমি মনে করি, ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর যে রকম করুণ অবস্থা হচ্ছে এবং সরকার যদি মাত্র ৫০০টিও চিহ্নিত করে থাকে, তার মানে আসলে কত কম চিহ্নিত করেছে। কতগুলো এখনো তালিকার বাইরে রয়ে গেছে, সুরক্ষা দূরে থাক। কাজেই এটিকে এখন পাবলিক এজেন্ডার বিষয় করার সময় এসেছে। যদি করতে না পারি, আজকে কমলাপুর, তারপর টিএসসি বা সামনের দিনে আরো কিছু চেনা জিনিস হারিয়ে যাবে

ড. আদনান মোর্শেদ: এবার ড. সাজ্জাদ জহিরের কাছে যাবে। আপনার কাছে আমার প্রশ্ন—আর্থিকভাবে উন্নত পশ্চিমা দেশগুলো যখন নিজেদের ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন সংরক্ষণের দিকে ঝুঁকছে, তখন কেন আমরা প্রবৃদ্ধির জোয়ারে ঐতিহ্যকে তুচ্ছজ্ঞান করে এগিয়ে যেতেই শুধু সচেষ্ট। উন্নয়নের সঙ্গে এক ধরনের ইতিহাস সচেতনতার বহুমাত্রিক বন্ধন তৈরি করা জরুরি। সেটি তৈরি হতে পারে কীভাবে?

ড. সাজ্জাদ জহির: ধন্যবাদ। শুরুতেই এটা নিয়ে আমি বেশ কিছুটা আলাপ করেছিলাম। আমাদের এখানে যদি যেকোনো বিষয়ে ঐকমত্য থাকত, ঐতিহ্যকে নিয়ে ঐকমত্য থাকত, তাহলে চাহিদাটা আকারের দিক থেকে বড় হতো। এটি একটা দিক তুলে ধরেছিলাম এবং চাহিদা যেখানে ফ্রেগমেন্টেড, অনেক বেশি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র, কেউ এটাতে যেতে চায়, কেউ অন্যটায় যাবে, অর্থাৎ কোনো একটা নির্দিষ্ট নিদর্শনের ব্যাপারে অনেক বেশিসংখ্যক লোক জড়ো হওয়ার চেয়ে কম হচ্ছে। যেমন বৌদ্ধ বিহারে অন্য সংস্কৃতি বিষয়ে শিক্ষাদীক্ষার ব্যাপারটি যেহেতু খুব একটা নেই, সেহেতু সেখানে পিকনিক করতে যাচ্ছে।

মহাস্থানগড়ে কিন্তু স্কুলের ট্যুর যায়, ময়নামতীতেও যায়। কিন্তু মূলত যায় পিকনিক করতে। সেই সঙ্গে একটি তথ্য দিয়ে রাখা ভালো যে প্রকল্পকেন্দ্রিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের অর্থায়নটা কীভাবে হয়, সেটি দেখা উচিত। জিল্লুর ভাই বলেছিলেন, কোন অংশটা প্রটেক্টেড আর কোন অংশটা প্রটেক্টেড নয়, তার মধ্যেই অনেক কিছু নির্ভর করে। আসলে আমার আলোচনায় শুরুতে বলেছিলাম, যাদের অতীতের দীর্ঘ ইতিহাস নেই, তারা কিন্তু নিকট অতীতের ইতিহাস নিয়ে ঐতিহ্য গড়ে তোলার চেষ্টা করে। আমি জানি না, রেলস্টেশনের ঘটনার সঙ্গে জমিকেন্দ্রিক বা অন্য স্বার্থকেন্দ্রিক বিষয় ছিল কিনা। আমার জানামতে, কমলাপুরের কেসটা কিন্তু এমআরটিএ, যেটি রিজওয়ানা তুললেন। আমি একটু সাইডট্র্যাক হলেও বলব যে ছোট একটা গ্রুপ শুধু প্রিজার্ভেশনের জন্য চিন্তা করা, এর বাইরেও কিন্তু একটা বিকল্প পথ আছে, স্থপতি হিসেবে আদনান আপনারা ভেবে দেখতে পারেন। সেটি হলো, কীভাবে মডার্নিজমের ভেতরে এটাকে ধারণ করে রাখা যায়। অর্থাৎ এমআরটিএ যদি ওখানে হয়, তাহলে কমলাপুর রেলস্টেশন কীভাবে থাকতে পারে, এর ডিজাইন সাইডটা নিয়েও ভাবা দরকার। আমি জিল্লুর ভাইয়ের শর্ট অ্যান্ড ভেরি ফোকাসড ইন্টারভেনশনটাকে ওইভাবে দেখছি। সেখানে একটা সম্ভাবনা আছে, অন্য লোকজনের কথাবার্তার চেয়ে।

কেন পশ্চিমা দেশগুলোয় হচ্ছে, এ ব্যাপারে আমি কিন্তু তুলেছিলাম তারা রক্ষণাবেক্ষণের দিকে যেতে পারছে, কারণ এক ধরনের ঐশ্বর্য গড়ে ওঠার পরে অর্থ উপার্জনের একটা উপায় হিসেবে এসেছে। যে কারণে বিজনেস মডেলগুলো ডেভেলপ করতে পেরেছে। আমাদের মতো অনেক দেশে অনেক বেশি ফ্রেগমেন্টেড থাকার কারণে জিনিসটিকে অর্থকরী করার দিকে একটা বাধা আছে। যেটি আসলে বলছিলাম যে চাহিদার ক্ষেত্রে ফ্রেগমেন্টেশন। দ্বিতীয় আরেকটি বিষয় যে বাই ডিফল্ট কথাটা বলেছিলাম। অর্থাৎ একটি রাজনৈতিক দল যদি মনে করে সব সমস্যার সমাধান করবে, তা পারবে না। আসলে আজকে আমাদের দেশের যে অবস্থা, মেধাগুলো দেশের বাইরে, আবার যারা মেধা হিসেবে গড়ে উঠছে, তারাও বাইরের দিকে মুখ করে আছে। আমরা আলোচনা করছি, যারা পঞ্চাশোর্ধ্ব তারা, কিন্তু নতুন প্রজন্ম সেখানে ঢুকছে না, তারা বহির্মুখী। এটা বাস্তবতা। এটা মানতে হবে। এ অবস্থায় ফেলে আজকে বাংলাদেশে অবস্থিত কোনো নিদর্শন হোক, ঐতিহ্যের কথা বলি, বাংলা ভাষাভাষীরা যা-ই চেষ্টা করুক না কেন খুব সহজে তা অর্জন করাটা সম্ভব নয়। লাভালাভের জায়গা থেকে রাজনৈতিক দলগুলো খুব স্বল্পমেয়াদি দেখে। এ ধরনের ক্ষণস্থায়ী প্রচেষ্টা সহজেই বড় স্বার্থের কাছে বিলীন হয়ে যায়। কমলাপুর আর টিএসসি অনেক নগণ্য। কিন্তু আমরা এ জায়গার অনেক কিছুই ধরে রাখতে পারিনি।

ড. আদনান মোর্শেদ : দীর্ঘ ইতিহাস বা ঐতিহ্য সংরক্ষণের ন্যারো স্পেসে জ্ঞানকে কীভাবে অপারেটিভ করা যাবে বলে মনে করেন?

ড. সাজ্জাদ জহির: আমি দুটো বিষয় দেখছি। একটি হলো, রাষ্ট্র বা সরকারের হাত দিয়ে এ সংরক্ষণের কাজটি হয় না। প্রথম ধাক্কায় একটা বড় কাজ করে দেয়া যায়। কিন্তু বাজেটারি অ্যালোকেশনের ভেতর দিয়ে একজন ব্যুরোক্র্যাট চালাতে থাকে, সেটি কখনই টেকসই হবে না। তার মানে একটি বিজনেস মডেল হিসেবে দাঁড় করানোর চিন্তা করতে হবে। ধাপে ধাপে ভাবা যায়, অতীত ঐতিহ্যবাহী কোনো জিনিস হয়তো আপনার-আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলেও লোকসাধারণের কাছে না-ও হতে পারে। আবার কোনো কোনো বিষয় শুধু ঐতিহ্যের কারণে নয়, চারপাশের পরিবেশের কারণে একটি ভায়াবেল বিজনেস মডেল হতে পারে। সেখানে প্রাইভেট বিজনেসকে চিন্তা করে কী করা যায়, তা চিন্তা করতে হবে। আরেকটি বিষয়, ঐতিহ্য বা পুরাকীর্তির ক্ষেত্রে মোটাদাগে কিছু বিষয় চিহ্নিত করা দরকার। যদি আমরা সত্যিই ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো ধরে রাখতে চাই। এর বাইরে যেটা বললাম, সেটি বিজনেস মডেল।

ড. আদনান মোর্শেদ : শেষে সবার কাছ থেকে একটা পজিশনিং বক্তব্য শুনতে চাই। রওনক আপাকে দিয়ে শুরু করা যাক।

ড. রওনক জাহান: পজিশনিং স্টেটমেন্ট বলতে কী বোঝাচ্ছ, সেটি আমি বলতে পারব না। কিন্তু আমি একটা সাজেশন দিতে পারি। যেমন আমাদের এশিয়াটিক সোসাইটি আছে। তারা অনেক ভালো গবেষণা করে বই প্রকাশ করে। বড় বড় বই প্রকাশ করে। কিন্তু কত লোক পড়ছে, সেটি আমি জানি না। এখন যদি ছোট ক্যাপশন দিয়ে অনেক দৃষ্টিনন্দন ফটোগ্রাফিসমেত আকর্ষণীয় ও প্রফিটেবল করা যায়, তাহলে সেটি অনেক বেশি ভায়াবল হবে। এখনকার যুগে আমাদের যদি কিছু করতে হয়, উদযাপন করতে হয়, তাহলে মনোলিথিকের বিপরীতে ডাইভারসিটিকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রত্নতাত্ত্বিক কাজ, গবেষণা হচ্ছে, সেগুলোকে আধুনিক যুগের প্রেক্ষিতে ইলেকট্রনিক্যালি যদি আরো ভালোভাবে উপস্থাপন করা যায়, তাহলে তা ব্যবসায়িকভাবেও আকর্ষণীয় হবে। আরো জনপ্রিয় হবে। আরেকটি বিষয় বলতে চাই। নিশ্চয়ই ব্যবসায়ীগোষ্ঠীর সংযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার সঙ্গে বিশেষজ্ঞরাও আছেন। বড় কথা, ওইসব বিষয়ে তাদের প্রচুর সেনসিটিভিটিও আছে। আমাদের দেশে সেই কালচার গড়ে ওঠেনি। সেটি গড়ে তুলতে হবে। এনলাইটেন্ড ধনবানদের এ ধরনের কাজের পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসতে হবে। কাজগুলোকে সুন্দরভাবে ডিসপ্লে করতে হবে।

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান: সাজ্জাদ জহির বিজনেস মডেলের কথা বলেছেন। এটা জরুরি। আমি যে কার্যকর সংরক্ষণের কথা বলেছি, এটা অর্থনৈতিক স্থায়িত্বের সঙ্গেই যুক্ত। বিজনেস মডেলের ব্যাপারে সতর্ক থাকাও জরুরি। বিজনেস মডেল বলতে যদি জমিটাই মূল আকর্ষণ হয়ে যায়, তাহলে উদ্দেশ্যটাই ব্যাহত হবে। অন্যদিকে চলে যাবে। আমি কনক্লুসিভ স্টেটমেন্ট দিতে খুব একটা আগ্রহী হচ্ছি না এ কারণে, আলোচনা যে শুরু হলো এটিই এর শক্তি। এখানে কনভারসেশনটাই সবচেয়ে বড় গেইন। আমার একটা পরামর্শ হলো, এগুলো নিয়ে স্কুলশিশুদের মধ্যে একটা অংকন প্রতিযোগিতামূলক কর্মসূচি করা যায় কিনা। প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে লোকেশনভিত্তিক ম্যাপ তৈরি করা যায়, যেটি দিয়ে খুব সবিস্তারে দেখানো যাবে।

ড. সাজ্জাদ জহির: আমি তিনটি পয়েন্ট তুলব। এক. তরুণ প্রজন্মকে টার্গেট করে কর্মসূচি নিতে হবে। দুই. ইউটিউবে একটি ছেলে ঐতিহ্যগুলো তুলে ধরছে। এটি বেশ সাড়া জাগিয়েছে। তিন. দুষ্প্রাপ্য ছবির নামে ফেসবুকে যে গ্রুপ আছে, সেখানে শুধু ছবি নয়, অনেক কিছু উঠে আসছে। ন্যারেটিভগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি হাতিরপুল বিষয়ে দেখলাম। সেখানে ব্যাখ্যাসহ অনেক কিছুই উঠে এসেছে। প্রথম সাজেশন হলো, আসলে কিছুই হচ্ছে না ভাবা উচিত নয়। হচ্ছে, সেটিকে খুঁজে এবং সেখানে ফ্যাসিলেটেট করার কোনো স্কোপ আছে কিনা, সেটি দেখতে হবে। দ্বিতীয় প্রস্তাব, ক্রিয়েটিভ প্রোগ্রাম শুধু শহরকেন্দ্রিক না করে সবখানের স্কুলকে কেন্দ্র করে হওয়া উচিত। সামাজিক কিছু উদ্যোগ নিতে হবে।

ড. আদনান মোর্শেদ: চমৎকার। একটি বিষয় আমরা দেখলাম যে প্যাশনেট একটি গ্রুপকে উসকে দেয়ার উৎসই-বা কোথায়? এটি অর্গানিক্যালি নিজ থেকে উঠে আসবে প্যাশনেট গ্রুপগুলো কিংবা তাদের উসকে দেয়ার ঘটনাটি কোথায় ঘটছে আসলে, তারও একটা আলাপ হওয়া দরকার। একটি উদাহরণ দিই। যেটি আমি নিশ্চিত যে রওনক আপা দেখেছেন। অন্যরাও হয়তো দেখেছেন। নিউইয়র্কে ম্যানহাটনে একটি ট্রেন লাইন ছিল, যেটি ফ্রেইট ট্রেনের একটা এলিভেটেড ট্রাক ছিল মাইল দুয়েক লম্বা। যখন আর নিউইয়র্ক সিটিতে ফ্রেইট ট্রেন নেই, একসময় সেটি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। তখন প্যাশনেট, কমিটেড গ্রুপটি দাঁড়িয়ে গেল। দুজন আইনজীবী (তারা স্থপতিও নন) দাঁড়িয়ে গেলেন এবং তারা জনমত সংগঠিত করলেন যে এটা ভাঙা যাবে না। এটি আমাদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল হেরিটেজের চিহ্ন। এটি রাখতে হবে। পরবর্তী প্রশ্নে এবার আমরা যাব রিজওয়ানার কাছে। আপনি অনেক দিন ধরে পরিবেশ অধিকার সংরক্ষণের আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এজন্য অনেক পুরস্কারও পেয়েছেন। বৃহত্তর পরিবেশের অংশ হিসেবে কোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের বিষয়ে কোনো মামলার অভিজ্ঞতা থাকলে শেয়ার করবেন কি? তখন আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমরা একটু অন্তর্দৃষ্টি পেতে পারি। আইনজীবী মহলে ঐতিহাসিক স্থাপনা সুরক্ষার বিষয়টি মূলধারায় আছে, নাকি কিছুটা প্রান্তিক? ইতিহাস সংরক্ষণের বিষয়টিকে আইনি পেশিশক্তি দেয়া যায় কিনা।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান: ইতিহাস সংরক্ষণের বিষয়টি আইনজীবী মহলে কেমন? এটা আসলে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বেশ জটিল। বাংলাদেশে ইতিহাসটা যে যেভাবে লেখেন, সেভাবে দেখেন। একজন একভাবে লেখেন, আরেকজন আরেকভাবে লেখেন। আসলে আমাদের এখানে কতগুলো বিষয়ে দলীয় সংকীর্ণতার/বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে সঠিক তথ্য দেবে, দুঃখজনকভাবে সেটি হয়ে ওঠেনি। কতগুলো স্থাপনা আছে, যেগুলোর ব্যাপারে আইনজীবীরা হয়তো একমত হবেন, কিন্তু ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণ খুব একটা পপুলার ইস্যু এখনো তাদের মধ্যে হয়ে ওঠেনি। আমাদের এখানে কিন্তু আমি না করলেও মামলা হয়েছে। যেমন লালবাগ কেল্লার আশপাশে নির্মাণকাজ বন্ধ করার জন্য মামলা হয়েছে। মহাস্থানগড়ের আশপাশে ইমারত নির্মাণ বিধিমালার অধীনে নির্মাণকাজ করার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। কিন্তু এ মামলাগুলোর মানদণ্ড সেট করে দেয়া হয়নি। সরকার রুল দিয়ে মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিতে পারত যে কোন কোন বিবেচনায় পড়লে আমরা একটি স্থাপনাকে হেরিটেজ হিসেবে সুরক্ষিত করব। এটি এখনো সরকারের স্বেচ্ছাধীন বিবেচনার ওপর নির্ভর করে। অনেক ক্ষেত্রে আদালত কিছু সাধারণ ডিরেকশন দেয়, সেটি আবার সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ২০১৯ সালে যে রায়টা হয়েছে যে ২ হাজার ২০০ স্থাপনাকে প্রটেক্ট করতে হবে, আমরা আশা করছি সেই রায়ে এ ধরনের কিছু নির্দেশনা আসবে, কিন্তু এ রায়ের কপি আমরা এখনো পাইনি। ফলে যেসব বিবেচনায় একটি পার্টিকুলার জিনিস প্রটেক্টেড অ্যান্টিকুইটি হচ্ছে, একই বিবেচনায় থাকলেও দেখা যাচ্ছে অন্য একটি জিনিস প্রটেক্টেড অ্যান্টিকুইটি হচ্ছে না। ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে যে উন্নয়ন, তাকে তো টেকসই উন্নয়ন বলা যায় না।

আপনি হয়তো বিদেশ থাকেন বলে গণ আলাপ বলেন, আমরা হয়তো বাংলাদেশে থাকি বলে গণ আন্দোলন বলে ফেলি। টিএসসি নিয়ে ছাত্রসমাজের প্রতিক্রিয়া বিষয়ে আমাদের আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। আর কমলাপুরের ক্ষেত্রেও আমি মনে করি না যে এটি লস্ট কেইস। আমার মনে হয় এটার ব্যাপারেও সামনের দিনগুলোয় পাবলিক ডায়ালগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। হঠাৎ করেই তো অ্যাক্টিভিজম হয়ে যাবে না, আমরা যারা ব্যাপারটি বুঝি আর ব্যাপারটি বুঝি না, একটা পাবলিক এজেন্ডা তৈরি করতে হলেও তো একটা প্রসেস অনুসরণ করতে হয়। আমাদের এখানে ধরেই নেয়া হয় যে কয়েকটি গ্রুপ বা লোক আছে, যারা প্রতিটি অন্যায়-অবিচার হলে প্রতিবাদ করবে, পত্রপত্রিকায় লিখবে, স্বাক্ষর দেবে, এর বাইরে কেউ এগিয়ে আসবে না। কিন্তু আমি মনে করি, ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর যে রকম করুণ অবস্থা হচ্ছে এবং সরকার যদি মাত্র ৫০০টিও চিহ্নিত করে থাকে, তার মানে আসলে কত কম চিহ্নিত করেছে। কতগুলো এখনো তালিকার বাইরে রয়ে গেছে, সুরক্ষা দূরে থাক। কাজেই এটিকে এখন পাবলিক এজেন্ডার বিষয় করার সময় এসেছে। যদি করতে না পারি, আজকে কমলাপুর, তারপর টিএসসি বা সামনের দিনে আরো কিছু চেনা জিনিস হারিয়ে যাবে

ড. আদনান মোর্শেদ: এবার ড. সাজ্জাদ জহিরের কাছে যাবে। আপনার কাছে আমার প্রশ্ন—আর্থিকভাবে উন্নত পশ্চিমা দেশগুলো যখন নিজেদের ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন সংরক্ষণের দিকে ঝুঁকছে, তখন কেন আমরা প্রবৃদ্ধির জোয়ারে ঐতিহ্যকে তুচ্ছজ্ঞান করে এগিয়ে যেতেই শুধু সচেষ্ট। উন্নয়নের সঙ্গে এক ধরনের ইতিহাস সচেতনতার বহুমাত্রিক বন্ধন তৈরি করা জরুরি। সেটি তৈরি হতে পারে কীভাবে?

ড. সাজ্জাদ জহির: ধন্যবাদ। শুরুতেই এটা নিয়ে আমি বেশ কিছুটা আলাপ করেছিলাম। আমাদের এখানে যদি যেকোনো বিষয়ে ঐকমত্য থাকত, ঐতিহ্যকে নিয়ে ঐকমত্য থাকত, তাহলে চাহিদাটা আকারের দিক থেকে বড় হতো। এটি একটা দিক তুলে ধরেছিলাম এবং চাহিদা যেখানে ফ্রেগমেন্টেড, অনেক বেশি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র, কেউ এটাতে যেতে চায়, কেউ অন্যটায় যাবে, অর্থাৎ কোনো একটা নির্দিষ্ট নিদর্শনের ব্যাপারে অনেক বেশিসংখ্যক লোক জড়ো হওয়ার চেয়ে কম হচ্ছে। যেমন বৌদ্ধ বিহারে অন্য সংস্কৃতি বিষয়ে শিক্ষাদীক্ষার ব্যাপারটি যেহেতু খুব একটা নেই, সেহেতু সেখানে পিকনিক করতে যাচ্ছে।

মহাস্থানগড়ে কিন্তু স্কুলের ট্যুর যায়, ময়নামতীতেও যায়। কিন্তু মূলত যায় পিকনিক করতে। সেই সঙ্গে একটি তথ্য দিয়ে রাখা ভালো যে প্রকল্পকেন্দ্রিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের অর্থায়নটা কীভাবে হয়, সেটি দেখা উচিত। জিল্লুর ভাই বলেছিলেন, কোন অংশটা প্রটেক্টেড আর কোন অংশটা প্রটেক্টেড নয়, তার মধ্যেই অনেক কিছু নির্ভর করে। আসলে আমার আলোচনায় শুরুতে বলেছিলাম, যাদের অতীতের দীর্ঘ ইতিহাস নেই, তারা কিন্তু নিকট অতীতের ইতিহাস নিয়ে ঐতিহ্য গড়ে তোলার চেষ্টা করে। আমি জানি না, রেলস্টেশনের ঘটনার সঙ্গে জমিকেন্দ্রিক বা অন্য স্বার্থকেন্দ্রিক বিষয় ছিল কিনা। আমার জানামতে, কমলাপুরের কেসটা কিন্তু এমআরটিএ, যেটি রিজওয়ানা তুললেন। আমি একটু সাইডট্র্যাক হলেও বলব যে ছোট একটা গ্রুপ শুধু প্রিজার্ভেশনের জন্য চিন্তা করা, এর বাইরেও কিন্তু একটা বিকল্প পথ আছে, স্থপতি হিসেবে আদনান আপনারা ভেবে দেখতে পারেন। সেটি হলো, কীভাবে মডার্নিজমের ভেতরে এটাকে ধারণ করে রাখা যায়। অর্থাৎ এমআরটিএ যদি ওখানে হয়, তাহলে কমলাপুর রেলস্টেশন কীভাবে থাকতে পারে, এর ডিজাইন সাইডটা নিয়েও ভাবা দরকার। আমি জিল্লুর ভাইয়ের শর্ট অ্যান্ড ভেরি ফোকাসড ইন্টারভেনশনটাকে ওইভাবে দেখছি। সেখানে একটা সম্ভাবনা আছে, অন্য লোকজনের কথাবার্তার চেয়ে।

কেন পশ্চিমা দেশগুলোয় হচ্ছে, এ ব্যাপারে আমি কিন্তু তুলেছিলাম তারা রক্ষণাবেক্ষণের দিকে যেতে পারছে, কারণ এক ধরনের ঐশ্বর্য গড়ে ওঠার পরে অর্থ উপার্জনের একটা উপায় হিসেবে এসেছে। যে কারণে বিজনেস মডেলগুলো ডেভেলপ করতে পেরেছে। আমাদের মতো অনেক দেশে অনেক বেশি ফ্রেগমেন্টেড থাকার কারণে জিনিসটিকে অর্থকরী করার দিকে একটা বাধা আছে। যেটি আসলে বলছিলাম যে চাহিদার ক্ষেত্রে ফ্রেগমেন্টেশন। দ্বিতীয় আরেকটি বিষয় যে বাই ডিফল্ট কথাটা বলেছিলাম। অর্থাৎ একটি রাজনৈতিক দল যদি মনে করে সব সমস্যার সমাধান করবে, তা পারবে না। আসলে আজকে আমাদের দেশের যে অবস্থা, মেধাগুলো দেশের বাইরে, আবার যারা মেধা হিসেবে গড়ে উঠছে, তারাও বাইরের দিকে মুখ করে আছে। আমরা আলোচনা করছি, যারা পঞ্চাশোর্ধ্ব তারা, কিন্তু নতুন প্রজন্ম সেখানে ঢুকছে না, তারা বহির্মুখী। এটা বাস্তবতা। এটা মানতে হবে। এ অবস্থায় ফেলে আজকে বাংলাদেশে অবস্থিত কোনো নিদর্শন হোক, ঐতিহ্যের কথা বলি, বাংলা ভাষাভাষীরা যা-ই চেষ্টা করুক না কেন খুব সহজে তা অর্জন করাটা সম্ভব নয়। লাভালাভের জায়গা থেকে রাজনৈতিক দলগুলো খুব স্বল্পমেয়াদি দেখে। এ ধরনের ক্ষণস্থায়ী প্রচেষ্টা সহজেই বড় স্বার্থের কাছে বিলীন হয়ে যায়। কমলাপুর আর টিএসসি অনেক নগণ্য। কিন্তু আমরা এ জায়গার অনেক কিছুই ধরে রাখতে পারিনি।

ড. আদনান মোর্শেদ : দীর্ঘ ইতিহাস বা ঐতিহ্য সংরক্ষণের ন্যারো স্পেসে জ্ঞানকে কীভাবে অপারেটিভ করা যাবে বলে মনে করেন?

ড. সাজ্জাদ জহির: আমি দুটো বিষয় দেখছি। একটি হলো, রাষ্ট্র বা সরকারের হাত দিয়ে এ সংরক্ষণের কাজটি হয় না। প্রথম ধাক্কায় একটা বড় কাজ করে দেয়া যায়। কিন্তু বাজেটারি অ্যালোকেশনের ভেতর দিয়ে একজন ব্যুরোক্র্যাট চালাতে থাকে, সেটি কখনই টেকসই হবে না। তার মানে একটি বিজনেস মডেল হিসেবে দাঁড় করানোর চিন্তা করতে হবে। ধাপে ধাপে ভাবা যায়, অতীত ঐতিহ্যবাহী কোনো জিনিস হয়তো আপনার-আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলেও লোকসাধারণের কাছে না-ও হতে পারে। আবার কোনো কোনো বিষয় শুধু ঐতিহ্যের কারণে নয়, চারপাশের পরিবেশের কারণে একটি ভায়াবেল বিজনেস মডেল হতে পারে। সেখানে প্রাইভেট বিজনেসকে চিন্তা করে কী করা যায়, তা চিন্তা করতে হবে। আরেকটি বিষয়, ঐতিহ্য বা পুরাকীর্তির ক্ষেত্রে মোটাদাগে কিছু বিষয় চিহ্নিত করা দরকার। যদি আমরা সত্যিই ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো ধরে রাখতে চাই। এর বাইরে যেটা বললাম, সেটি বিজনেস মডেল।

ড. আদনান মোর্শেদ : শেষে সবার কাছ থেকে একটা পজিশনিং বক্তব্য শুনতে চাই। রওনক আপাকে দিয়ে শুরু করা যাক।

ড. রওনক জাহান: পজিশনিং স্টেটমেন্ট বলতে কী বোঝাচ্ছ, সেটি আমি বলতে পারব না। কিন্তু আমি একটা সাজেশন দিতে পারি। যেমন আমাদের এশিয়াটিক সোসাইটি আছে। তারা অনেক ভালো গবেষণা করে বই প্রকাশ করে। বড় বড় বই প্রকাশ করে। কিন্তু কত লোক পড়ছে, সেটি আমি জানি না। এখন যদি ছোট ক্যাপশন দিয়ে অনেক দৃষ্টিনন্দন ফটোগ্রাফিসমেত আকর্ষণীয় ও প্রফিটেবল করা যায়, তাহলে সেটি অনেক বেশি ভায়াবল হবে। এখনকার যুগে আমাদের যদি কিছু করতে হয়, উদযাপন করতে হয়, তাহলে মনোলিথিকের বিপরীতে ডাইভারসিটিকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রত্নতাত্ত্বিক কাজ, গবেষণা হচ্ছে, সেগুলোকে আধুনিক যুগের প্রেক্ষিতে ইলেকট্রনিক্যালি যদি আরো ভালোভাবে উপস্থাপন করা যায়, তাহলে তা ব্যবসায়িকভাবেও আকর্ষণীয় হবে। আরো জনপ্রিয় হবে। আরেকটি বিষয় বলতে চাই। নিশ্চয়ই ব্যবসায়ীগোষ্ঠীর সংযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার সঙ্গে বিশেষজ্ঞরাও আছেন। বড় কথা, ওইসব বিষয়ে তাদের প্রচুর সেনসিটিভিটিও আছে। আমাদের দেশে সেই কালচার গড়ে ওঠেনি। সেটি গড়ে তুলতে হবে। এনলাইটেন্ড ধনবানদের এ ধরনের কাজের পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসতে হবে। কাজগুলোকে সুন্দরভাবে ডিসপ্লে করতে হবে।

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান: সাজ্জাদ জহির বিজনেস মডেলের কথা বলেছেন। এটা জরুরি। আমি যে কার্যকর সংরক্ষণের কথা বলেছি, এটা অর্থনৈতিক স্থায়িত্বের সঙ্গেই যুক্ত। বিজনেস মডেলের ব্যাপারে সতর্ক থাকাও জরুরি। বিজনেস মডেল বলতে যদি জমিটাই মূল আকর্ষণ হয়ে যায়, তাহলে উদ্দেশ্যটাই ব্যাহত হবে। অন্যদিকে চলে যাবে। আমি কনক্লুসিভ স্টেটমেন্ট দিতে খুব একটা আগ্রহী হচ্ছি না এ কারণে, আলোচনা যে শুরু হলো এটিই এর শক্তি। এখানে কনভারসেশনটাই সবচেয়ে বড় গেইন। আমার একটা পরামর্শ হলো, এগুলো নিয়ে স্কুলশিশুদের মধ্যে একটা অংকন প্রতিযোগিতামূলক কর্মসূচি করা যায় কিনা। প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে লোকেশনভিত্তিক ম্যাপ তৈরি করা যায়, যেটি দিয়ে খুব সবিস্তারে দেখানো যাবে।

ড. সাজ্জাদ জহির: আমি তিনটি পয়েন্ট তুলব। এক. তরুণ প্রজন্মকে টার্গেট করে কর্মসূচি নিতে হবে। দুই. ইউটিউবে একটি ছেলে ঐতিহ্যগুলো তুলে ধরছে। এটি বেশ সাড়া জাগিয়েছে। তিন. দুষ্প্রাপ্য ছবির নামে ফেসবুকে যে গ্রুপ আছে, সেখানে শুধু ছবি নয়, অনেক কিছু উঠে আসছে। ন্যারেটিভগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি হাতিরপুল বিষয়ে দেখলাম। সেখানে ব্যাখ্যাসহ অনেক কিছুই উঠে এসেছে। প্রথম সাজেশন হলো, আসলে কিছুই হচ্ছে না ভাবা উচিত নয়। হচ্ছে, সেটিকে খুঁজে এবং সেখানে ফ্যাসিলেটেট করার কোনো স্কোপ আছে কিনা, সেটি দেখতে হবে। দ্বিতীয় প্রস্তাব, ক্রিয়েটিভ প্রোগ্রাম শুধু শহরকেন্দ্রিক না করে সবখানের স্কুলকে কেন্দ্র করে হওয়া উচিত। সামাজিক কিছু উদ্যোগ নিতে হবে।

ড. আদনান  মোর্শেদ : খুব বৈচিত্র্যময় আলাপ হয়েছে। অনেক বিষয় উঠে এসেছে। কিন্তু সময়-সীমাবদ্ধতায় শেষ করতে হচ্ছে। সবাইকে ধন্যবাদ।