প্রায় প্রতি বছরই বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য বরাদ্দ বেড়েছে। আগামী অর্থবছরের জন্যও এ খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৭১ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। মূল্যস্ফীতি, নতুন কর্মী নিয়োগসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নিলে বরাদ্দ বৃদ্ধি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলেই মনে হবে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, এক দশকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়লেও সেবার মান বাড়েনি, দুর্নীতি ও অনিয়মও কমেনি। বাজেট বাস্তবায়নেও তারা অদক্ষতা, সমন্বয়হীনতা ও অব্যবস্থাপনার অনেক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারফরম্যান্সের সঙ্গে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত না করায় তাদের মধ্যে উৎসাহে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। ফলে সেবার মানও বাড়ছে না।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা করা যায় সেবার মান বাড়বে এবং দুর্নীতি কমে আসবে। দুর্নীতি মূলত দুটি কারণে হয়—চাহিদা ও লোভ। লোভের সমাধান করা যায় না, কিন্তু চাহিদা মেটানো যায় এবং সরকার অষ্টম বেতন কাঠামো চালুর মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তার পরও দুর্নীতি যে পর্যায়ে ছিল, সেখানেই থেকে গেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) দুর্নীতির ধারণাসূচক ২০২০-এ বাংলাদেশের অবস্থান দুই ধাপ পিছিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দুর্নীতিতে বাংলাদেশ শুধু আফগানিস্তানের চেয়ে ভালো অবস্থানে আছে। বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশ নিচের দিক থেকে ১২তম স্থান দখল করেছে। সূচকে উচ্চক্রম (ভালো থেকে খারাপের দিকে) অনুযায়ী, টানা তিন বছর ধরে বাংলাদেশের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। এবারো ১৪৬তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। সূচকে অবনমনের অন্যতম কারণ সরকারি অফিসের দুর্নীতি।
প্রশাসনের অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে বারবার হোঁচট খেতে হচ্ছে। প্রতিটি অর্থবছরের শেষের দিকে এসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) জন্য বরাদ্দ সংশোধন করে কমিয়ে দেয়া হয়, যাতে বাস্তবায়নের হারকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা যায়। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের দেয়া তথ্য অনুযায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরে সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৮০ দশমিক ৪ শতাংশ। নতুন বেতন স্কেল চালুর পর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাস্তবায়নের হার ছিল ৯২ দশমিক ৭ শতাংশ। এখন কাজ চলছে এ রকম বেশকিছু প্রকল্পের সময়সীমা আগামী বছর শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু এগুলোর কোনোটিই বাস্তবায়নের কাছাকাছি পর্যায়েও পৌঁছতে পারেনি। করোনা মহামারীতে এডিপি বাস্তবায়ন অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলেও চলতি অর্থবছরে তা বাস্তবায়নের হার খুবই হতাশাজনক। গত এপ্রিল শেষে অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে সংশোধিত বরাদ্দের মাত্র ৪৯ শতাংশ। বাস্তবায়নের এ হার গত পাঁচ বছরে সর্বনিম্ন। প্রায়ই দেখা যায় প্রকল্পের নকশায় সমস্যা, তা বেশ কয়েকবার পরিবর্তন করতে হয়। ফলে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয় এবং প্রকল্পের খরচ বাজেটকে ছাড়িয়ে যায়। প্রকল্প পরিচালকরা প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়ভার নেন না। তারা শুধু দামি গাড়ি ও বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে উৎসাহী বলে অভিযোগ রয়েছে। এটি প্রশাসনের অদক্ষতারই প্রতিফলন।
বিশ্বের অনেক দেশই করোনার প্রভাব মোকাবেলায় কৃচ্ছ্র সাধনের নীতি গ্রহণ করছে। নিউজিল্যান্ডের মন্ত্রিসভা নিজেদের ২০ শতাংশ বেতন-ভাতা কমিয়েছে। জার্মানিসহ উন্নত বিশ্বের অনেক দেশের সরকার এমনকি উন্নয়নশীল দেশের সরকারও তাদের ব্যয় কমিয়ে আনার পরিকল্পনা নিয়েছে। ভারতে সরকারি বিভাগগুলোকে ৬০ শতাংশ ব্যয় কমানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মন্ত্রী, সংসদ সদস্যদের বেতন কমানো হয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমান নতুন নিয়োগ পাওয়া সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ২০ শতাংশ কমিয়েছে। এরই মধ্যে বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় কমিয়ে এনেছে ভিয়েতনামও। নিজেদের অর্থনীতিকে কক্ষপথে রাখতে একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আরেক দেশ কম্বোডিয়া। সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে তারাও রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের বেতন যৌক্তিকীকরণের পথেই হেঁটেছে। বাংলাদেশ সে পথে না হাঁটলেও যে হারে বেতন-ভাতা বাড়ছে, সে অনুপাতে প্রশাসনের সেবা বাড়ছে না; বরং নানা ঘটনায় প্রশাসনের সমালোচনা বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রীও একাধিক দফায় তাদের সেবার নিম্নমান ও অনিয়মের জন্য সতর্ক করেছেন। কিন্তু পরিস্থিতি খুব বেশি বদলায়নি। বড় বিষয় হলো, আমলাদের বেতন-ভাতা বাড়লেও তাদের দক্ষতা কিংবা জবাবদিহিতা বাড়েনি।
চলতি অর্থবছরেই মোট রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রাথমিক বাজেটেই ঘাটতি ছিল প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। প্রত্যাশামতো বৈদেশিক ঋণ আসেনি। এদিকে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার কারণে সুদ ব্যবস্থা বা মানি সাপ্লাই ও নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা সফল হচ্ছে না। তৈরি হয়েছে করোনাসংক্রান্ত আরো বিরাট ব্যয়ের চাপ। স্বাভাবিকভাবেই সরকারের হাতে অর্থ কম থাকবে। অবকাঠামো বিশেষত সেতুর টোল আদায়ও কমে গেছে। সরকারের রাজস্ব, ব্যয় নির্বাহ, বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা ও কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা প্রাক্কলন করা খুবই দরকার।
এদিকে সরকারি কর্মচারীদের জন্য বরাদ্দ বাড়াতে গিয়ে দরিদ্য জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেয়া যাচ্ছে না। সমস্যা রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে। আমাদের প্রত্যাশা, করোনা-পরবর্তী সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনা আরো উন্নত হবে। ব্যক্তিগত কাজে সরকারি সম্পদ ব্যবহার, প্রকৃত দাম থেকে অনেক বেশি দামে পণ্য ক্রয় ইত্যাদি পরিহারে ব্যয় সংকোচনে তারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কাজ করবে। তবে ব্যয় সংকোচন করতে গিয়ে অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প স্থগিত করা যাবে না। কারণ এর সঙ্গে বিপুল মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত।
বাংলাদেশে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে নানা প্রণোদনা ও দরিদ্রদের সহায়তা কর্মসূচি বিন্যাস করা হয়েছে বটে, তবে প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। তার ওপর আবার অনেক ক্ষেত্রে পরিকল্পনামাফিক বাস্তবায়নও করা যাচ্ছে না। এমন এক প্রেক্ষাপটে কার্যকরভাবে বাজেট বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা আরো বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। নানা সমালোচনা সত্ত্বেও গত বছর উচ্চাভিলাষী বাজেট ঘোষণার পেছনে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাজেট বাস্তবায়নে শ্লথগতির কারণে সে উদ্দেশ্যও অনেকখানি ব্যাহত হচ্ছে। একে তো সরকারি সহায়তার পরিমাণ অপ্রতুল, তার মধ্যে বাজেট বাস্তবায়নে চলমান স্থবিরতা বজায় থাকলে জীবন ও জীবিকা রক্ষা করা অনেক দুরূহ হবে। এক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি প্রত্যাশা থাকবে, তারা সক্রিয় হয়ে সরকারের পরিকল্পনা দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করবে।










