গত শীত মৌসুমে পদ্মা সেতু দেখতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। নির্মাণকাজ প্রায় শেষের পথে, সেতুর ওপরে তিন-চারশ গজ হেঁটে গেলাম নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর সঙ্গে। তীর থেকেও দেখলাম দীর্ঘ সেতুটি, আবার পদ্মার বিশাল জলরাশিতে ভাসমান ছোট্ট একটি জাহাজ থেকেও।

সেতুটি দেখতে দেখতে একটি অসাধারণ অভিজ্ঞতা হলো, মনে হলো একটি ঐশ্বরিক, অলৌকিক আর অসীম রেখা পদ্মার উত্তাল জলরাশির ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে বিলীন হয়ে গেছে ভবিষ্যতের অজানা জগতে। অভিজ্ঞতাটা ছিল একই সঙ্গে জাদুকরী আর আধ্যাত্মিক।

পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত সেতু দেখেছি। ফ্লোরেন্সের পন্তে ভেকিও, নিউইয়র্কের ব্রুকলিন ব্রিজ, সানফ্রান্সিসকোর গোল্ডেন গেট, সিডনির হারবার ব্রিজ আর লন্ডনের টাওয়ার ব্রিজ। এ সেতুগুলো তাদের নিজ নিজ শহরের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাহলে পদ্মা সেতুর তাৎপর্য কী হবে, কী হতে পারে? পদ্মার পাড়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম এ সেতুর নৃতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাই-বা কী?

প্রথমেই স্বীকার করে নিই, প্রথমবারের মতো পদ্মা সেতু দেখার অভিজ্ঞতাটি কিছুটা অবাস্তব, এমনকি পরাবাস্তব মনে হয়েছিল। সেই সঙ্গে আবার কেমন একটা সূক্ষ্ম দুঃখবোধ। ভাবছিলাম এই বিশাল সড়ক অবকাঠামোটি প্রযুক্তির কবিতায় আমাদের চিরচেনা শাশ্বত গ্রামবাংলার নীরবতা আর প্রশান্তিকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে কিনা। গ্রামবাংলার যে চিত্র আমরা সনাতনভাবে লালন করতে শিখেছি—সীমাহীন সবুজ ধানের জমি, ছোট ছোট খাল, কুঁড়েঘর, পুকুর, অনুত্তেজিত জীবন আর নৈঃশব্দ্য—তা যেন পরাজয়ের সন্দিক্ষণে পৌঁছে গেছে পদ্মা সেতুর ঐশ্বরিক ব্যাপ্তি, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আর ভবিষ্যত্মুখী চেতনার প্রাচুর্যের কারণে। 

ভাবছিলাম প্রযুক্তি কীভাবে পদ্মার মতো বিশাল নদীকে এত সহজেই জয় করে নিল। পেন্সিলের একটি দীর্ঘ টান যেন নদীর এপার থেকে ওপারে চলে গেছে কী অনায়াসে। প্রকৌশল যেন আমাদের মনোজগতের শাশ্বত নদীমাতৃক গ্রামবাংলাকে ওলটপালট করে দিয়েছে। নদী প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ। সেই সঙ্গে নদী আবার ভৌগোলিক মহাকাব্যও। নদী যুগ যুগ ধরে অনুপ্রাণিত করেছে মানবতাকে, মানুষের কল্পনাকে। প্রকৌশল যখন সেই কল্পনার প্রকৃতিকে পরিবর্তন করে ফেলে তখন আমাদের চেতনার অবকাঠামো নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন হয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মায় কোনো বিশাল সেতু নেই, আছে শুধু অনন্ত জলযাত্রা আর সেটা থেকে মাঝিদের জীবনযুদ্ধে বেঁচে থাকার প্রত্যয় খুঁজে ফেরা। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘দূর আকাশের নিচে বেঁকে যাওয়া পদ্মাকে অনুসরণ করে চলে মনোজগৎ মহা আলস্যে।’ রবীন্দ্রনাথের পদ্মাকে হরণ করেনি কোনো দানবিক শক্তির প্রযুক্তি। 

পদ্মা সেতুর মুখোমুখি হয়ে কীভাবে প্রকৃতি আর প্রযুক্তির মিলনকে আত্মস্থ করেছিলাম? এ অনুভূতির একটি নৃতাত্ত্বিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক আর রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করব। অনুভূতিটা ছিল রহস্যময়—আধ্যাত্মিকতা আর ভীতির একটা জটিল সংমিশ্রণ। দার্শনিকরা এ ‘সাবলাইম’ অনুভূতি আর তার মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়ার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ব্রিটিশ রাজনৈতিক চিন্তক এডমন্ড বার্কের (১৭২৯-১৭৯৭) কাছে সাবলাইম এমন একটা অনুভূতি, যা সৌন্দর্যের মোলায়েম চেতনা থেকে ভিন্ন এবং তৈরি করে এমন এক ধরনের প্রতিক্রিয়া, যাতে আছে আকর্ষণ আর ভীতির বৈপরীত্য। সাবলাইম একই সঙ্গে বিশাল আর বিপজ্জনক। জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট (১৭২৪-১৮০৪) বলেন, সাবলাইম অনুভূতি তৈরি হতে পারে বিস্ময় উদ্রেককারী আর অসীম ধরনের ঘটনার মুখোমুখি হয়ে। মহাসমুদ্রের তীরে অথবা মহাপর্বতের সামনে দাঁড়িয়ে যখন মানুষ নিজের তুচ্ছতা বুঝতে পারে তখন সাবলাইমের চেতনা তৈরি হতে পারে।

বিংশ শতাব্দীতে আমেরিকান তাত্ত্বিক পেরি মিলার এবং তার কিছু পরে ডেভিড নাই ‘প্রযুক্তিগত সাবলাইম’-এর ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তারা বলেছেন, শুধু প্রকৃতি নয়, প্রযুক্তির মুখোমুখি হয়েও মানুষের এক ধরনের শংকর অনুভূতি হতে পারে—পরমানন্দ (এক্সটেসি), আনুগত্য, বিস্ময়, বিভ্রান্তি আর ভীতির সংমিশ্রণ। তাদের দাবি, ঊনবিংশ আর বিংশ শতাব্দীতে বিশাল প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো আমেরিকান মনকে প্রভাবিত করেছে। ১৯৩০-এর দশকে নির্মিত কলোরাডো নদীর ওপরে হুভার ড্যামের দানবীয় কংক্রিট স্ট্রাকচারের সামনে দাঁড়িয়ে বুঝেছিলাম প্রযুক্তিগত সাবলাইম বলতে কী বোঝানো হচ্ছে।

আমার মনে হয়, পদ্মা সেতু বাংলাদেশে প্রযুক্তিগত সাবলাইমের প্রথম উদাহরণ। এ সেতুর বিশালতার মুখোমুখি হয়ে আমি ভাবছিলাম, এটি কীভাবে আমাদের রাজনৈতিক দর্শন, আমাদের আত্মকল্পনা, আমাদের নদীমাতৃক ভৌগোলিক চেতনাকে রূপান্তর করবে। কিন্তু তার আগে এ সেতুর ব্যবহারিক কার্যকারিতাকে ভুলে গেলে চলবে না। এ বহুমুখী সেতুর দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার, ওপরের তলায় চার লেনের মহাসড়ক। নিচের তলায় এক লেনের রেলসড়ক। এটি হবে পৃথিবীর দীর্ঘতম নদী পারাপারের একটি। যখন এটি পুরোপুরি ব্যবহারযোগ্য হবে, প্রতিদিন ৭৫ হাজার যানবাহন পদ্মা পার হবে এর ওপর দিয়ে। ফলে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার জিডিপি বাড়বে শতকরা ২ দশমিক ৫ ভাগ। জাতীয় জিডিপি বাড়বে শতকরা ১ দশমিক ২ ভাগ। তাছাড়া গবেষণায় দেখা গেছে, এ সেতুতে বিনিয়োগকৃত প্রতি টাকার বিপরীতে ২ টাকার সামাজিক উন্নয়ন হবে। জাতীয় অর্থনীতি আর সামাজিক উন্নতিতে পদ্মা সেতুর অবদান নিয়ে কোনো সংশয় নেই।

কিন্তু ভাবছিলাম প্রযুক্তিগত আর অর্থনৈতিক উন্নতির বাইরে এ সেতু আমাদের জাতীয় চেতনাকেও কীভাবে রূপান্তর করতে পারে। এ সেতুর বৃহত্তর রাজনৈতিক, সামাজিক আর সাংস্কৃতিক অর্থ কী?

প্রথমত, পদ্মা সেতু যে জাতীয় আত্মবিশ্বাসকে মজবুত করেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ব্যাপারটা আরো জটিল। ২০১২ সালে বিশ্বব্যাংক যখন দুর্নীতির অভিযোগে পদ্মা সেতুর অর্থায়নে অস্বীকৃতি জানায়, তখন এক ধরনের বাঙালি জাতাভিমান তৈরি হয়েছিল। যার মূলে ছিল উপনিবেশোত্তর পশ্চিমা শক্তির নব্য সভ্যকরণের একপক্ষীয় বর্ণবাদী মানসিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। দুর্নীতির অভিযোগ সত্যি না মিথ্যা, সেটা এ জাতাভিমানের মূল বিষয় নয়; বরং নিজ অর্থায়নে এ সেতু বিনির্মাণের প্রত্যয় হয়ে দাঁড়াল দেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে আত্মনির্ভর, আত্মবিশ্বাসী জাতিতে রূপান্তর করার একটি প্রতীকী যাত্রা। পদ্মা সেতুর স্বপ্ন পরিণত হলো একটি প্রতিবাদী সংগ্রামে। এ সেতুর বিনির্মাণে বাংলাদেশ সারা বিশ্বকে একটি নেলসন ম্যান্ডেলীয় বার্তা দিতে চাইল—পশ্চিম থেকে পূর্ব, উত্তর থেকে দক্ষিণ, পশ্চিমা শক্তির রাজনৈতিক বশীকরণ প্রক্রিয়ার যুগ সমাপ্ত হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, পদ্মা সেতু একটি বিপরীত ধারাকে প্রতীকায়িত করে। ভারতীয় উপমহাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রসার হয়েছে শুষ্ক উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল থেকে দক্ষিণ-পূর্ব ব-দ্বীপে। গঙ্গা নদীর জলপ্রবাহের একই দিকে। হিমালয়ে সৃষ্টি হয়ে উত্তর-পশ্চিম থেকে গঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে কুষ্টিয়ার উত্তর সীমানা দিয়ে। তার পরে বাংলাদেশের ভৌগোলিক কেন্দ্র দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এ নদীমাতৃক ব-দ্বীপের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে মিশে গেছে। এ গাঙ্গেয় নদীযাত্রার একই পথে ইন্দো আর্য, ভেদিক ব্রাহ্মণ, তুর্ক-মঙ্গোলীয় অশ্বারোহী, সামরিক ভাগ্যান্বেষী, ধর্মপ্রচারক আর ভিনদেশী ব্যবসায়ীরা উপমহাদেশে এসে তাদের জায়গা দখল করেছে। উপমহাদেশের ফ্রন্টিয়ার অগ্রসর হয়েছে গঙ্গার পার ধরে। ১২০৪ সালে মোহাম্মদ বখতিয়ারের সৈন্যরা এ পথেই উপমহাদেশে সামরিক তৎপরতা চালিয়েছে। ১৬০৮ সালে মোগল সুবেদার ইসলাম খান চিশতি এ পথে এসেই ঢাকার মোগলীকরণ করেছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকশ্রেণী এ পথেই প্রতীকী অর্থে পূর্ব পাকিস্তানে এসে প্রতিষ্ঠিত করেছিল তাদের বৈষম্যমূলক রাজনীতি। সেই গাঙ্গেয় রাজনীতির শিকড় অনেক গভীরে। পদ্মা সেতু গাঙ্গেয় রাজনীতির শোষণমূলক ইতিহাস আর সেই সঙ্গে প্রতীকী অর্থে পশ্চিমা মোড়লীপনার বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিবাদ; এক ধরনের বিপরীত সংগ্রামী যাত্রা। পদ্মা সেতু দক্ষিণ থেকে উত্তরে যাওয়ার এক নতুন দিকনির্দেশনা, নতুন ফ্রন্টিয়ার চেতনা। এ সেতু ছোট দেশের মাথা তুলে দাঁড়ানোর মহাকাব্য, যার ভাষা প্রযুক্তি, কংক্রিট, স্টিল আর ভবিষ্যৎ চেতনা।

সব শেষে পদ্মা সেতু নদী পারাপারের ব্যবহারিক ব্যবস্থা হলেও এটি একটি সামাজিক দর্পণও। এটা প্রতিফলিত করে বাঙালির হতাশা, উদ্বেগ, আশা আর আকাঙ্ক্ষা। এ সেতু বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে আমরা যুদ্ধ করছি তলাবিহীন ঝুড়ির তকমার বিরুদ্ধে। ছড়ি ঘোরানো পশ্চিমা শক্তির নব্য ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে আর আত্মঘাতী বাঙালি চরিত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে। সামাজিক মাধ্যমে পদ্মা সেতু নিয়ে তর্ক-বিতর্ক থেকে বোঝা যায়, এ সেতুকে ঘিরে বাঙালি আসলে আত্মপরিচয়ের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত।

পদ্মা সেতুর ওপরে হাঁটতে হাঁটতে একই সঙ্গে আনন্দিত আর বিষাদগ্রস্ত হয়েছিলাম। আনন্দিত, কারণ এ সেতু আক্ষরিক আর প্রতীকী অর্থে সাগরের মতো একটি নদীকে জয় করে গ্রামবাংলাকে নিয়ে এসেছে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার আওতায়। ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে, বাঙালির কল্পনার আড়ষ্ঠতা কাটিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখার প্রবণতা তৈরি করবে পদ্মা সেতু। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে তৈরি হওয়া এই বিশাল অবকাঠামো গ্রামীণ বাংলার মানসিকতায় আনবে জাতীয় উন্নয়নের ভবিষ্যত্মুখী চেতনা। আর বিষাদগ্রস্ত, কারণ আমরা শিগগিরই ৫-৬ মিনিটে গাড়িতে বা বাসে বসে অনায়াসে পদ্মা পার হয়ে যাব। এই আধুনিক জীবনধারায় হারিয়ে যাবে পদ্মার ঢেউয়ের সঙ্গে আমাদের শাশ্বত আত্মীয়তা। ফেরিতে পদ্মা পারাপারের সময় এক ধরনের আধ্যাত্মিক অনুভূতি হতো এই নদীর বিশাল জলরাশিকে ঘিরে। এ অনুভূতি অনুপ্রাণিত করেছে বাংলার কবি, ঔপন্যাসিক আর চলচ্চিত্র নির্মাতাদের। ঐতিহাসিকভাবে বাঙালির সামাজিক-সাংস্কৃতিক চরিত্র তৈরি হয়েছে নদীকে ঘিরে। হয়তো পদ্মা সেতু সেই চরিত্রে যোগ করবে ভিন্ন মাত্রা। সব শেষের বাস্তবতা হলো, এ সেতু দক্ষিণ বাংলার স্থবির অর্থনীতিতে আনবে নতুন প্রাণ আর চাঞ্চল্য। সেটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।   

 

আদনান মোর্শেদ: স্থপতি, স্থাপত্য ইতিহাসবিদ ও নগরবিদ; ওয়াশিংটন ডিসিতে অধ্যাপনা করেন এবং ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ আর্কিটেকচার অ্যান্ড আরবানিজমের নির্বাহী পরিচালক