ড. আইনুন নিশাত ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং পানিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ। জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনসহ আন্তর্জাতিক জলবায়ুবিষয়ক বিভিন্ন সম্মেলনে বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ২০১৭ সালে বাংলা একাডেমি তাকে সম্মানসূচক ফেলোশিপ প্রদান করে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগে প্রভাষক পদে যোগ দেন। ১৯৭৫ সালে তিনি পানিসম্পদ প্রকৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং ১৯৮৫ সালে পূর্ণ অধ্যাপক হন। ১৯৯৮ সালে আইনুন নিশাত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘে যোগ দেন। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির উপাচার্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনে বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করেছেন। তিনি বাংলাদেশের দীর্ঘতম সেতু যমুনা সেতু নির্মাণকালে এর বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্য ছিলেন। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি চুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন নিশাত। দেশের সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎপার নিয়েছেন এম এম মুসা
দেশের বিভিন্ন অংশে বন্যা দেখা দিয়েছে এবং বিভিন্ন নদীর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বলা হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী হবে এ বন্যা। কভিড পরিস্থিতিতে মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া, ত্রাণ বিতরণসহ বিভিন্ন কাজে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আপনার বিশ্লেষণ কী বলে?
পুরো দেশ করোনা জ্বরে ভুগছে, কভিড-১৯-এর চাপে সবাই বিপর্যস্ত। আর ভাইরাসটির বিস্তার নিয়ন্ত্রণে যখন সামাজিক বা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার কথা বারবার বলা হচ্ছে, ঠিক সেই সময় দেশজুড়ে বন্যার প্রকোপও বাড়ছে। এরই মধ্যে এক দফা বন্যা হয়ে গেছে। যারা পূর্বাভাস তৈরি করেন, বৃষ্টির তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করেন, তাদের বিশ্লেষণের ফলাফলে আশঙ্কা হচ্ছে, ১৫ জুলাই থেকে আগামী সাত-আটদিন খুব খারাপ যাবে। এটি এ কারণে যে উজানে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে, ধেয়ে আসছে বন্যা। গুয়াহাটি, আসাম, মেঘালয়ে বন্যা চলছে, অবিরত বৃষ্টি হচ্ছে। দেশের ভেতরেও বৃষ্টি হচ্ছে, বিশেষত উত্তরাঞ্চলে। আবার সুনামগঞ্জে, চট্টগ্রামে, সিলেটে বৃষ্টি হচ্ছে। এর প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই নদীগুলোর ওপরে পড়ছে।
বন্যায় দুর্ভোগ বাড়ে ঘরবাড়ি ডুবে গেলে। তখন মানুষ অন্য কোথাও আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। দরিদ্র মানুষের জন্য আশ্রয় নেয়া মানে আশপাশের স্কুল-কলেজে যাওয়া। অর্থাৎ আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে গাদাগাদি করে থাকা। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেখানে তো সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে অবস্থান করা সম্ভব নয়। কাজেই সেখানকার একটা ব্যবস্থাপনার কথা ভাবতে হবে, যেটি আমরা অন্য বছর ভাবিনি।
আশ্রয় বা ত্রাণকেন্দ্রে থাকার সময় যতদূর সম্ভব দূরে দূরে বসা কিংবা থাকা, একজনের সঙ্গে অন্যজন যাতে শারীরিক সংস্পর্শে না আসে কিংবা হ্যান্ডশেক যেন না করে বা জড়িয়ে যাতে না ধরে, মুখে যেন মাস্ক পরে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর তত্ত্বাবধানে যারা থাকবেন, তাদের প্রতি অনুরোধ, অব্যাহতভাবে মনিটর করতে হবে। কারো যদি জ্বর, কাশি, নভেল করোনাভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ দেখা যায়, সঙ্গে সঙ্গে তাকে আইসোলেট করা কিংবা হাসপাতালে পাঠাতে হবে।
নভেল করোনাভাইরাস যেমন প্রকৃতিসৃষ্ট, তেমনি বন্যাও প্রাকৃতিক এবং এটি একটি নিয়মিত ঘটনা। প্রতি বছর জুনের মাঝামাঝি থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি দেশের কিছু অংশ বন্যায় আক্রান্ত হয়। এবারো হচ্ছে। এটা নিয়ে খবরের কাগজে প্রচুর লেখা হচ্ছে, প্রচুর ছবি ছাপা হচ্ছে। কিন্তু সাংবাদিক ভাইদের কাছে আমার একটা অনুরোধ, দয়া করে ছবিটা কোথাকার এবং কবে তোলা, সেই কথাটি উল্লেখ করবেন। কারণ আমার বক্তব্য হলো, নদীর অবস্থা যা, তাতে বেশির ভাগ জায়গাতেই পানি হয় বিপত্সীমার নিচে কিংবা বিপত্সীমার এক-দুই ফুট ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ছবিগুলোয় দেখা যাচ্ছে, বাড়িঘরগুলো একেবারে ডুবে আছে, সেটা কেমন যেন অস্বাভাবিক মনে হয়। আসল ব্যাপারটি হলো, ছবিগুলো নদীর চরের ছবি। ফলে বন্যার প্রকৃত চিত্র পাচ্ছি না। তাই আমাদের একটু স্থানভিত্তিক বিশ্লেষণ করতে হবে। এতে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
আজ থেকে ২০-৩০ বছর আগেও আমাদের দেশে বন্যা ব্যবস্থাপনা খুব দুর্বল ছিল। নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস ছিল না। এখন কিন্তু পূর্বাভাস অত্যন্ত উন্নত। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তিনদিন থেকে পাঁচদিনের পূর্বাভাসের ওপর অনেকটা নির্ভর করা যেতে পারে। দ্বিতীয় বিষয় হলো, আমাদের দেশে তখন বন্যা ব্যবস্থাপনা বাঁধ ছিল না বললেই চলে। ষাটের দশকে গাইবান্ধা থেকে ঘুরাসাগর, বাঘাবাড়ী পর্যন্ত যমুনা নদীর পশ্চিম তীরে বাঁধ নির্মিত হয়েছে। উপকূলীয় বাঁধ নির্মিত হয়েছে। আর কিছু জায়গায় টুকরো টুকরো বাঁধ ছিল। জিকে প্রজেক্টের কারণে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ থেকে কুষ্টিয়া পার হয়ে পদ্মার পাড়ে বাঁধ ছিল। আর রাজশাহী শহরকে রক্ষা করার জন্য বাঁধ ছিল। কিন্তু দেশের বাকি অংশের কোথাও বাঁধ ছিল না। যে কারণে নদীর পানি বেড়ে উপচে বন্যার সৃষ্টি হতো। তখন বিপত্সীমা বলে যে শব্দটি গৃহীত হয়েছিল তা হলো, যদি নদীর পাড় উপচে দুই পারের ফসলের ক্ষতি করার আশঙ্কা দেখা দেয়, সেই উচ্চতাকে বিপত্সীমা বলা হয়। অর্থাৎ নদীর পাড়ের ওপরে তিন-চারফুট পানি হলে সেটিকে বিপত্সীমা বলা হতো। কিন্তু যখন বাঁধ নির্মিত হলো তখন এক ধরনের প্রটেকশন বা নিরাপত্তার ব্যবস্থা দেয়া হলো। তখন বলা হলো, বাঁধের ওপর থেকে একটু নিচে অর্থাৎ বাঁধটি কাজ করবে ধরে নিয়ে উপরের কিছু অংশ সেফটির জন্য রেখে একটা মাত্রা নির্ধারণ করে তাকে বিপত্সীমা বলা হয়। অর্থাৎ যেখানে বাঁধ নেই, সেখানে বিপত্সীমার চেহারা এক রকম, আর যেখানে বাঁধ আছে সেখানে বিপত্সীমার চেহারা আরেক রকম। যেমন আমার জানামতে শরীয়তপুর, ফরিদপুরের মাদারিপুরের ওই অংশে টানা বাঁধ নেই। টুকরো টুকরো বাঁধ হয়তো কোথাও কোথাও থাকতে পারে। আর এখন সারা বাংলাদেশে গ্রামীণ রাস্তার নেটওয়ার্ক অত্যন্ত বিস্তৃত। এ নেটওয়ার্কগুলো কিছুটা বাঁধের কাজ করে। সেজন্য নদীর পাড় উপচে পানি উঠলে আগে যে এলাকাটি আক্রান্ত হতো, সেটি এখন আর হয় না রাস্তাগুলোর কারণে। সুনামগঞ্জ শহরে বাঁধ নেই, যে কারণে সুরমা নদীর বিপত্সীমার উপরে ওঠা মানে শহরে পানি ঢোকা। কিন্তু সাধারণভাবে আমরা বলতে পারি যে দেশের ৭০-৮০ শতাংশ এলাকায় বাঁধ আছে এবং সেসব জায়গা বন্যা থেকে মুক্ত থাকার কথা। পুরো উপকূলে বাঁধ আছে। নিঝুম দ্বীপে বাঁধ নেই অবশ্য। শেরপুর, জামালপুরে বাঁধ নেই। আমাদের ঢাকা শহরের পশ্চিম পাড়ে টঙ্গী ব্রিজ থেকে আশুলিয়া হয়ে গোরান চাঁদবাড়ী হয়ে মিরপুর হয়ে কল্যাণপুর হয়ে একেবারে বুড়িগঙ্গা সেতু পর্যন্ত বাঁধ আছে। যে কারণে ঢাকার পশ্চিম পাশ নিরাপদ। কিন্তু পূর্ব পাড়ে কোনো বাঁধ নেই। যে কারণে বালু নদ কিংবা শীতলক্ষ্যা উপচে বন্যার পানি ঢোকে।
এদিকে বাঁধ নির্মাণ করে বন্যা ঠেকানোর প্রক্রিয়ার প্রথম কাজটি হয় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরায় ১৯৬৫-৬৬ সালে। তখন বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে এলাকাটি বন্যামুক্ত করা হয়েছিল। এর আগে বুড়িগঙ্গা বা শীতলক্ষ্যা উপচে বন্যার পানি প্রবেশ করত। কিন্তু এখন বাইরের পানি ভেতরে ঢুকতে পারে না। তবে ভেতর থেকে বৃষ্টির পানি বেরোতে পারে না। এর ফলে জলাবদ্ধতা বা এক ধরনের বন্যা দেখা দিচ্ছে। বাঁধের কারণে এখানে পানি নিষ্কাশনের জন্য যে খালের ব্যবস্থা ছিল, তা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। যে কারণে সামান্য বৃষ্টি হলেই ডিএনডি এলাকা প্লাবিত হয়ে যায়।
আবার বাঁধের সিস্টেমে চলে আসা যাক। অর্থাৎ বাঁধ থাকলে আমরা ভেতরে নিরাপদ বোধ করি। আর নিরাপদ বোধ করলে আমরা ইনভেস্টমেস্ট করি। যেমন খুব নিচু জায়গা ছাড়া আউশ ধান চাষ হতো না। কিন্তু বাঁধ তৈরি করার পরে আমনের প্রটেকশন হচ্ছে, যেটি বর্ষাকালের ফসল। কৃষকরা মাঝে মাঝে আউশ ধান চাষের সাহস করছেন। এখন পাটও চাষ হচ্ছে। কিন্তু যেখানে বাঁধ নেই, সেখানে পুরো সর্বনাশ। কারণ মানুষের নিরাপত্তা ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়ে হুড়হুড় করে পানি ঢোকে এবং পানির সঙ্গে প্রচুর বালি ঢোকে। তাই বাঁধ থাকাটা ও এর ব্যবস্থাপনা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
নদী যেখানে ভাঙে, সেখানে নদীর তলার সেডিমেন্ট ঢোকে। এটি বিস্তীর্ণ এলাকায় ক্ষতি করতে পারে। জামালপুর, শেরপুরে নালিতাবাড়ী, সারিয়াকান্দি প্রভৃতি স্থানে গেলে দেখবেন, নদীর পাড় যেখানে ভাঙে, সেখানে বালি ঢুকে বিস্তীর্ণ এলাকা নষ্ট করেছে। মানুষের বোঝার অভাবের কারণটি হলো ভাষাগত। নদীর তল দিয়ে মোটা বালি, চিকন বালি, নুড়িপাথর, ক্লে, সিল্ট প্রভৃতি প্রবাহিত হয়; তার সব মিলিয়ে ইংরেজিতে বলে সেডিমেন্ট। এ সেডিমেন্টের একটি উপাদান সিল্ট। সিল্টের বাংলা হলো পলি। কিন্তু পলির ইংরেজি সেডিমেন্ট নয়। ফলে এই ছোট বিষয়টি না বুঝে পলি আসা ব্যাহত হওয়ার দোহাই দিয়ে বাঁধের বিরোধিতা করেন বহু পরিবেশবাদী। তাই বাঁধ, বন্যা বুঝতে হলে বিষয়গুলোর প্রতি পুঙ্খানুপুঙ্খ ধারণা থাকতে হবে।
বন্যা তো বাংলাদেশে নৈমিত্তিক ঘটনা। সাম্প্রতিক সময়ে এটি বেড়েছেও বটে। এবারের বন্যায় শঙ্কা কোথায়?
এবার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা যাক। যা বুঝতে পারছি ধরলা-দুধকুমারের গাইবান্ধা-কুড়িগ্রাম অংশে কিংবা লালমনিরহাটের তিস্তা নদীতে কিছু জায়গায় এবার বাঁধ ভেঙেছে। সারিয়াকান্দি এলাকায় বাঁধ ভেঙেছে বলে খবরের কাগজের প্রতিবেদনে এসেছে। তাই ওই এলাকায় কিছুটা বন্যা হয়েছে। পানি অবশ্য দু-তিনদিনের মধ্যে নেমে গেছে। ফলে সেই এলাকাগুলো মুক্ত হয়েছে। কিন্তু এবার যদি আমি আসি সুনামগঞ্জ-নেত্রকোনা-কিশোরগঞ্জে অংশে, সেখানে দেখছি মেঘালয়ে প্রচু্র বৃষ্টি হচ্ছে। আমার ভয় হচ্ছে পানি বেড়ে সেখানে কয়েক দিনের মধ্যে কিছু মাত্রায় বন্যা হবে। তবে হাওড় এলাকার বন্যা পানি দেখলেই বন্যা নয়, সেটিও বুঝতে হবে। আমরা যারা প্লাবনভূমির মানুষ, যারা নিচু জায়গার মানুষ, আমরা পানি দেখলেই বন্যা বলে অভ্যস্ত। কিন্তু হাওড় এলাকার মানুষ হাওড়গুলোকে ভরা দেখতেই পছন্দ করে। তবে এলাকাটির তো পুরোটাই হাওড় নয়, কিছু উঁচু এলাকাও আছে। সেগুলো বোধহয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এর পরে আসি নদীর মাঝখানের অবস্থায়। আমরা যারা নদী নিয়ে কিছু পড়াশোনা করেছি, তারা জানি যে তিন বছরের মধ্যে অন্তত একবার নদী কানায় কানায় ভর্তি হবেই। তাই নদীর মধ্যখানের চরগুলো যে ডুবে যাবে, সেটি খুবই স্বাভাবিক। চরে যারা থাকে, তারা তা জানে। চরের লোকসংখ্যা নিয়েও আমি নিশ্চিত নই। ৫০ লাখ হতে পারে। তার বেশিও হতে পারে। এই লোকগুলো বর্ষার সময় তাদের বাড়িঘর ডুবে যাবে, তার জন্য প্রস্তুত থাকে। এজন্যই গত ১০ বছরে বেসরকারি, সরকারি উদ্যোগে চরগুলোয় যেসব স্কুল স্থাপন হয়েছে, সেগুলোর খেলার মাঠ উঁচু করা হয়েছে। যাতে সেগুলো বন্যা বা বর্ষার সময় আশ্রয়কেন্দ্র-ত্রাণকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। খেলার মাঠগুলো যেন গবাদিপশুর আশ্রয়স্থল থাকে; বাড়তি মানুষকে প্রয়োজনে তাঁবু খাটিয়ে সেখানে আশ্রয় দেয়া যায়। আমি প্রতিটি এলাকার জন্য আলাদা আলাদা বন্যার কারণ চিহ্নিত করছি। সব জায়গার জন্য একই রকম কারণ প্রয়োজ্য নয়।
এবার উপকূলীয় এলাকার মানুষও অত্যন্ত দুর্গতির মধ্যে আছে। বিশেষ করে সাতক্ষীরার শ্যামনগর, কয়রা বা মোংলা প্রভৃতি এলাকায়। তার কারণ হলো, আম্পানের জলোচ্ছ্বাসে সেসব এলাকার বাঁধ ভেঙে গেছে। এ বাঁধগুলো উপকূলীয় অঞ্চলে তৈরি হয়েছে ১৯৬৫-৭০ সালে। পরবর্তীতে এর বিস্তৃতি বেড়েছে। উত্তর দিকে আরো হয়েছে। এ বাঁধগুলো মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রেও বহু দুর্বলতা রয়েছে। এ দুর্বলতার কারণে যে বাঁধ তৈরি হয়েছিল আধা কিলোমিটার দূরে, সেটা ভাঙতে ভাঙতে নদীর পাড়ে চলে এসেছে। বহু জায়গায় বাঁধকেও খেয়ে ফেলেছে নদী। সেই দুর্বল স্থান দিয়ে আম্পান, আইলা, সিডরের সময় বাঁধগুলো ভেঙে নোনা পানি ঢুকেছে। ফলে মানুষের দুর্ভোগ আরো বেশি। যারা বন্যায় আক্রান্ত তাদের সঙ্গে উপকূলের অঞ্চলের মানুষের দুঃখকষ্টের সঙ্গে তুলনা করছি না। সবার দুঃখই দুঃখ। আমি তার প্রতি সহানুভূতিশীল। কিন্তু উপকূল অঞ্চলের মানুষের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। ৮০-৮৫টি স্থানে ভেঙেছে। সেখান দিয়ে প্রতিদিন জোয়ারের সময় পানি ঢুকছে। প্রতি মাসে অমাবস্যা ও পূর্ণিমার সময় তিন থেকে চারদিন গলাসমান পানি ঢুকে সবাইকে বিপর্যস্ত করছে। মানুষ আশ্রয় নিয়েছে বাঁধগুলোর ওপরে। সারা দেশের মোট বাঁধের হয়তো ৩-৪ শতাংশ ভেঙেছে, বাকি অংশ ঠিক আছে।
আমাদের উপকূলের বাঁধের মোট দৈর্ঘ্য হয়তো পাঁচ-ছয় হাজার কিলোমিটারের মতো হবে। ভেঙেছে হয়তো ১০-২০ কিলোমিটার। শুধু ভাঙা জায়গা দিয়ে নোনা পানি ঢুকছে। নিচু জায়গাগুলো নোনা পানি দিয়ে আক্রান্ত হচ্ছে। পুকুরগুলো নোনা পানিতে ডুবে গেছে। খাবার পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। মাঠে ফসল নেই। মাছের ঘের প্লাবিত হয়েছে, নষ্ট হয়েছে। মানুষ আশ্রয় নিয়েছে বাঁধের ওপরে। আশ্রয়কেন্দ্রে তারা গাদাগাদি করে আছে। সেখানেও কভিডের ঝুঁকি ব্যাপক। ঢাকা থেকে কেউ হয়তো আশ্রয়কেন্দ্রে আত্মীয়স্বজনকে দেখতে গেলেন কিংবা যদি কোনো রোগাক্রান্ত ব্যক্তি কোনো কারণে যান সেখানে, তাহলে কভিড আক্রমণ করতে পারে। এ বিষয়গুলো মনে রাখতে হবে।
বন্যা থেকে মুক্তির স্থায়ী কোনো উপায় আছে কি?
প্রতিকারের উপায় হলো ৭০-৮০ শতাংশ এলাকা যে বাঁধের দ্বারা সুরক্ষিত, সেই এলাকার রক্ষণাবেক্ষণের কাজটি সুন্দর হতে হবে, সঠিক হতে হবে। আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী কিংবা সাবডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার কিংবা উপসহকারী প্রকৌশলীদের বকাঝকা করি যে তারা রক্ষণাবেক্ষণের কাজ কিছুই করছেন না। আমি তাদের এ দায় থেকে মুক্তি দিতে চাই। কারণ এ ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া, অর্থায়নের কোনো ক্ষমতা তাদের নেই। বাংলাদেশে প্রশাসন একটা অন্য ধরনের রূপ ধারণ করেছে। এখন প্রশাসনে সচিবালয় মুখ্য ভূমিকা পালন করে। সচিবালয়ের কর্মকর্তারা সব সিদ্ধান্ত নেন। তারা অর্থ বরাদ্দ করেন, এমনকি ডিজাইনও তারা অনুমোদন দেন। তারা প্রকৌশলী কি প্রকৌশলী নন, সেটি আমার বিষয় নয়। আমার বিষয় হলো, সিদ্ধান্ত নেয়ার মালিক যদি সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত না দেন-নেন, তাহলে দেশবাসী আক্রান্ত হবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কেন মার্চ-এপ্রিলে অর্থ বরাদ্দ হবে? প্রতি বছরই দেখেছি, এ বছরও দেখেছি হাওড় অঞ্চলে মার্চ-এপ্রিলে বাঁধ নির্মাণ শুরু বা সম্পন্ন হয়নি। বহু জায়গায় কাজ হাতে নেয়া হয়নি। নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্য হবে, আমি তো টাকা পেলাম ১৫ দিন আগে। আমার টেন্ডার কল করার জন্য একটি কমিটি লাগবে। সেটি ঠিক করবেন জেলা প্রশাসক এবং সদস্যদের নমিনেট করবেন স্থানীয় এমপি। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আমার পক্ষে তো এগোনো সম্ভব নয়। কাজেই এখন আমাদের সত্যিকার দায়টি কার, সেটি ঠিক করতে হবে।
সাধারণভাবে বলছি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীদের বকাঝকা করব না। আমি বকাঝকা করব বড় কর্মকর্তাদের। এ ফাঁকে একটি কথা বলতে চাই, পানি উন্নয়ন বোর্ড যে পর্ষদের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার কথা, আমি বোধকরি তার একজন সদস্য ছিলাম বা আছি। বোধকরি এজন্য বলছি যে গত দুই-তিন বছরে কোনো মিটিং হয়েছে বলে আমার জানা নেই। আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে যে কারণে, তা হয়তো পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে কিছু পড়াশোনা করেছি বলে। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে কিছু সৎ পরামর্শ দিতে পারি সে কারণে। কিন্তু যেখানে মন্ত্রণালয়ই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে আমি, বুয়েটের অধ্যাপক কিংবা অন্য যারা আছেন, তাদের কোনো দিন ডাকারই প্রয়োজন আছে বলে মনে করা হয় না। টেকনিক্যাল বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ব্যর্থতার দায় ও দায়িত্ব মন্ত্রণালয়কেই নিতে হবে। দেশ যদি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় চলে তাহলে মন্ত্রী মহোদয়দেরও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সময়মতো টাকা পাইনি বলে বাঁধ মেরামত করতে পারিনি, তা আর শুনতে চাই না। বাঁধ মেরামতের টেকনোলজি দেখতে হবে, পুরো বিষয়টি নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা ঘন ঘন হবে। বন্যার পানির উচ্চতা বাড়বে। আগে যেখানে ২০-২৫ বছর পরপর বড় বন্যা হতো, সেখানে তা এখন আরো ঘন ঘন হবে। ২০১৯ সালে যমুনার পানি সর্বকালের উঁচুতে পৌঁছেছিল। ২০১৬, ২০১৭ সালে তার আগের বছরের রেকর্ডগুলো ভেঙে গিয়েছিল। এখনো আশা আছে, ২০২০ সালে হয়তো সেই পর্যায়ে পৌঁছবে না, কাছাকাছি পৌঁছবে। চরের মানুষগুলো সত্যিই বিপদে আছে।
আমার প্রথম বক্তব্য হলো, কেন অর্থ বরাদ্দ, কমিটি গঠন, দরপত্র আহ্বানে এত দেরি হয় কিংবা নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যে বাঁধ নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা পুনর্নির্মাণ শুরু করা হয় না এবং এপ্রিল-মের মধ্যে সম্পন্ন করা হয় না। আমার দ্বিতীয় বক্তব্য হলো, বিশেষ করে রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, শেরপুর কিংবা কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, ফেনী এসব অঞ্চলে বন্যার পানি আসছে প্রতিবেশী দেশ থেকে। এখন প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে অন্তত দুই ব্যাপারে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সহযোগিতার ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত। প্রথমত হলো পূর্বাভাস। আমার জানা মতে, পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে সহযোগিতা ভালো। ১৯৮৮ সালের পরে দুই দেশের বন্যা ব্যবস্থাপনা উন্নত করার জন্য যে আলোচনা হয়, সেখানে আমি উপস্থিত ছিলাম। তখন বেশকিছু সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। এখন থেকে প্রায় ৩০ বছর আগে। সেই সিদ্ধান্তগুলো ১০-১২ বছর হলো আস্তে আস্তে কার্যকর হচ্ছে। উজান থেকে আমরা পূর্বাভাস পাচ্ছি। গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে আমরা তা ছড়িয়ে দিতে পারছি। কিন্তু শুধু পূর্বাভাসে কুলোবে না।
পূর্বাভাসে আমরা হয়তো আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে পারি। ফসল যদি বাঁচাতে চাই তাহলে বন্যার পানির ওপর নিয়ন্ত্রণ চাই। আমি গোমতী নদীর উদাহরণ দেব। গোমতী নদী ত্রিপুরা থেকে বাংলাদেশে এসেছে। গোমতী নদীকে কুমিল্লার দুঃখ বলা হতো। এখন থেকে ৫০, ৬০, ১০০ বছর আগে নিয়মিত বন্যা হতো। তখন নদীর পাড়ে বাঁধ ছিল, সেটিকে উঁচু করা হয়েছে ষাটের দশকের দিকে। সত্তরের দশকে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। আশির দশকে সেটি ঠিকমতো মেরামত করা হয়েছে। যে কারণে, সেটি উপচে পানি ঢুকেছে, গত ত্রিশ বছরে তার কোনো নজির নেই। কিন্তু আরেকটি ফ্যাক্ট আমি জানাতে চাই, গোমতীর উজানে ত্রিপুরায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করার জন্য দুটি ড্যাম ও জলাধার আছে। এই ড্যাম ও জলাধার গোমতীর বর্ষাকালীন বাড়তি পানি আটকে রাখে। গোমতী একটি বন্যাপ্রবণ নদী ছিল। এ ধরনের নদীতে হঠাৎ করে পানি বাড়ে। যেটি তিস্তা, দুধকুমার, ধরলা কিংবা শঙ্খ নদীতে হয়। গোমতীতে সেই অবস্থা এখন আর নেই। বরং নদীটিতে সারা বছরই পানি থাকে। গোমতী শীতকালে একেবারে শুকিয়ে যায় না, যা ৫০-৬০ বছর আগে হতো। এখন বর্ষার সময়ও প্রচুর পানি থাকে। যে কারণে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে ভারত সরকার গোমতী দিয়ে ছোট আকৃতির নৌযানের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের কথা বলছেন। আমরা হয়তো দেখতে পাব তিন-চার মাসের মধ্যেই আশুগঞ্জ থেকে বার্জে করে ছোট জাহাজ, ট্রলার ত্রিপুরায় প্রবেশ করছে। অর্থাৎ আমরা যদি সবখানে জলাধার নির্মাণ করতে পারি তাহলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব, একই সঙ্গে নৌব্যবস্থাও চালু করতে পারব। পরিবেশেরও কাজ হবে। আমরা এটি আরো ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারব, যদি কাপ্তাই ড্যামের কার্যকারিতা দেখি। এ ড্যামের জন্য যেসব বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছে, তা আলাদাভাবে আলোচনা করতে হবে। সেগুলো সমাধান করা কিছুটা সম্ভব। কাপ্তাই ড্যাম ১৯৬২ সালে চালু হওয়ার আগে চট্টগ্রামে প্রচুর বন্যা হতো। রাঙ্গুনিয়ায় প্রচুর বন্যা হতো। সেটি থেমে গেছে। বড় জলাধার নির্মাণের পরিবেশগত কিছু আশঙ্কা, কিছু বিপর্যয় আছে। কিন্তু আমরা অনেক ছোট জলাধার নির্মাণ করে বন্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারি। ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ২০১১ সালের চুক্তিতে বলা আছে, নদীর অববাহিকাভিত্তিক পানির সার্বিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।
বারবার বন্যা হওয়া সত্ত্বেও কেন টেকসই ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠছে না?
পুরো ব্যবস্থাপনার বিষয়টি একেবারে নতুন করে ভাবতে হবে। ১৯৮৭-৮৮ সালের বন্যার পর আমরা নতুন করে ভেবেছি। কিন্তু কঠোর পরিবেশবাদীদের চাপে, তারা না বুঝে পুরো বিষয়টি নষ্ট করে দিচ্ছেন। আমি বহু পরিবেশবাদীর কথা বলছি, বাঁধের বিরুদ্ধে যারা সমানে বক্তৃতা দেন। এখন তারা বাঁধ মেরামত করার দাবি জানাচ্ছেন। আমরা কী অবস্থায় আছি, সেটি দেখতে হবে। ১৯৬০ সালে পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলন চাঙ্গা হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল বন্যা ইস্যু। ১৯৫৪ ও ’৫৬ সালের বন্যায় মানুষের দুর্ভাগ্যের কথা আমরা এখন ভুলে গেছি। ক্রুগ মিশন রিপোর্ট বা ১৯৬৪ সালের মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন করতে অনেক টাকা লাগবে বলে পাকিস্তানিরা সেটি বাস্তবায়ন করতে চায়নি। তখন বঙ্গবন্ধু এবং অন্যদের প্রধান দাবি ছিল ক্রুগ মিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন। অর্থাৎ ১৯৫৪-৫৫ সালে একবার নতুন করে ভাবা হয়েছিল। এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। তার চেয়ে বড় কথা হলো, তখন মানুষ কম ছিল। আমন ধান কোনোমতে ঘরে তুলতে পারলেই খাদ্যের জোগান নিশ্চিত হয়ে যেত। সুনামগঞ্জ অঞ্চলে তিন বছরে একবার বোরো ধান হলে তাদের হয়ে যেত। এখন মানুষ অনেক বেশি। গবাদিপশুও আছে। সেটি মাথায় রাখতে হবে। সবকিছু মিলিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে।
ত্রাণ কার্যক্রম ব্যবস্থাপনা কীভাবে করলে ক্ষতিগ্রস্তরা সর্বোচ্চ সুফল পাবে?
বাংলাদেশে ত্রাণ ব্যবস্থায় ভালো নজিরের অনেক ঐতিহ্য আছে। কিন্তু দুর্নীতি তো ঐতিহ্যের মধ্যে পড়ে না। দুর্নীতি হলে তার জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। স্থানীয় প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিধিদের ত্রাণকার্যে সম্পৃক্ত করা উচিত। কাজে স্বচ্ছতা আনা গেলে ত্রাণ কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব। আইলা, সিডরের পরে আমি উপদ্রুত এলাকায় গিয়েছিলাম। সেখানকার স্থানীয় চেয়ারম্যান, এনজিওদের অফিসে গিয়েছিলাম। যেমন দেখেছিলাম যে সিডরের পরে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া শরণখোলা উপজেলা। ইউএনও মহোদয় কারা ত্রাণ পাবে, সেই তালিকা তৈরি করে এনজিওদের মাধ্যমে তা যাচাই করে অফিসের বাইরে টানিয়ে দিতেন। কাজেই ত্রাণের সামগ্রী কারা পাচ্ছে, বাড়ি নির্মাণের জন্য কারা ঢেউটিন ও নির্মাণ উপকরণ পাচ্ছে, সবাই তা দেখতে পেতে। অনিয়মের বিষয়ে তেমন অভিযোগ শুনিনি। অপ্রতুলতার কথা বলা হয়েছিল।
আইলার পরে কয়েক হাজার লোককে কয়েক বছর ত্রাণ দেয়া হয়েছে, যারা বাঁধের উপরে আছে। আমি নিজে কথা বলেছি তাদের সঙ্গে, তারা ১০ বা ১৫ দিন পরপর ত্রাণের একটা প্যাকেট পেয়েছে। মূলকথা হলো, সবাই জানছে কে, কী ধরনের সাহায্য পাচ্ছে। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, এর বিতরণ। যারা ত্রাণকেন্দ্রে আসে তাদের যেমন প্রয়োজন আছে, যারা আসেনি, নিজেদের বাড়ির মধ্যে আছে, তাদেরও কিন্তু প্রয়োজন আছে। ১৯৯৮ সালের বন্যার পর অনেক এলাকা ডুবে গিয়েছিল। একটি সমীক্ষা প্রকাশ হয়েছিল। তাতে আমি দেখেছিলাম যে সবচেয়ে গরিব লোকটি চট করে ত্রাণকেন্দ্রে চলে আসে। কারণ তার তো কিছু নেই। আসতে তার লজ্জাও নেই। উচ্চমধ্যবিত্তরা হয়তো কিছু নিরাপদ জায়গায় যেতে পারে কিংবা তার হয়তো একটি ব্যবস্থা আছে, কিন্তু নিম্নমধ্যবিত্তের অবস্থা খারাপ। তারা লজ্জায় না পারে ত্রাণকেন্দ্রে যেতে, না পারে ত্রাণ চাইতে। আমি সমাজবিজ্ঞানী নই। আমি মনে করি, সমাজবিজ্ঞানীরা বিষয়টি ভালো বুঝবেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ভালো বুঝবে। কয়েক বছর ধরে এ মন্ত্রণালয়ের প্ল্যান ভালো কাজ করছে। সবসময়ই দোষ ধরব আর বলব যে সরকার কিছু করছে না, এটা ঠিক নয়।
একটি এলাকায় এক্ষেত্রে যেন কোনো রাজনৈতিক প্রভাব না থাকে, সেটি সবারই নিশ্চিত করতে হবে। একটি কথা এখন থেকেই চিন্তা করতে হবে। তা হলো পুনর্বাসন। কৃষকের পুনর্বাসনের জন্য কিছুটা উঁচু জায়গায় বীজতলা তৈরি করে চারাগাছ প্রস্তুত করা উচিত, যাতে সেগুলো পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুলভ মূল্যে বিক্রি বা বিতরণ করা যায়। রাস্তাঘাট পুনর্নির্মাণের জন্য এলজিইডির প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। তারা ছোট ছোট কালভার্ট তৈরি করেন খরচ বাঁচানোর জন্য। এটা করতে গিয়ে তারা দেশের নিষ্কাশন ব্যবস্থার সর্বনাশ করছেন। যে দেশে নৌপরিবহন খুব স্বাভাবিক, সেই দেশে কেন কালভার্ট বানাতে হবে। কেন তার স্প্যানগুলো এমন হবে না, যেটি নৌ-চলাচল ও পানি চলাচলের সহায়ক হবে। যেখানে ১০০ ফুট স্প্যানের সেতু দরকার, সেখানে ২০ ফুট, ৩০ ফুট স্প্যানের কালভার্ট হচ্ছে। এটা দয়া করে বন্ধ করতে হবে। এজন্য স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় দায়ী। মন্ত্রণালয়কে কেন দায়ী করছি? সিদ্ধান্ত তো মন্ত্রণালয়ে হয়ে থাকে। তাদের কাছে আবেদন, গতানুগতিকভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন না। সমীক্ষা করে দেখুন, কোথায় ভুল হচ্ছে এবং ভুলগুলো শোধন করুন।
আরো একটি কথা, অনেক সময় দেশের আইন ভাঙে মন্ত্রণালয়গুলো। যেকোনো অবকাঠামো করতে গেলে পরিবেশত সমীক্ষা করা বাধ্যতামূলক। এলজিইডির পরিবেশগত সমীক্ষার গাইডলাইন আছে। সেখানে পরিষ্কার বলা আছে, নৌচলাচল যেন ব্যাহত না হয় এবং নদী বা খালকে যেন সংকুচিত না করা হয়। তাহলে পরিকল্পনা করার সময় ওই গাইডলাইন কেন ব্যবহূত হচ্ছে না? কাজেই অনেক কিছু নতুন করে ভাবতে হবে। এখন থেকে দুর্যোগের সময় অস্থায়ী পুনর্বাসনের কথা ভাবতে হবে। কারণ বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে বন্যা কিংবা জলোচ্ছ্বাসের প্রকোপ আরো ঘন ঘন হবে। সামনের বছরের কথা ভাবতে হবে, কারণ একই ঘটনা ঘটতে পারে। এ বছরই তো আরো দু-একবার বন্যা হতে পারে।
শ্রুতলিখন: হুমায়ুন কবির










