জনপ্রত্যাশা ছিল প্রস্তাবিত বাজেট হবে মূল্যস্ফীতি থেকে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেয়ার দলিল। বাজেট অন্যবারের মতো গতানুগতিক ধারাতেই প্রণয়ন করা হয়েছে, যেটি বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় যথেষ্ট নয়। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে যে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে সেটি প্রশংসনীয়, তবে যথেষ্ট নয়। অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হলেও সেটির বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় থেকে যায়। নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা ও পুরনো চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে ওঠার জন্য তেমন বিশেষ কিছু নেই বাজেটে। চ্যালেঞ্জগুলো হলো যেমন- বাণিজ্য ঘাটতি, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান, টাকার অবমূল্যায়ন, কর্মসংস্থানের অভাব, আয়বৈষম্য। মানুষ শুনতে চায়, যারা বঞ্চিত তাদের জন্য বাজেটে কী বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তারা জানতে চায়, সমসাময়িক সমস্যা থেকে পরিত্রাণ এবং কীভাবে জীবনযাত্রার মানের আরেকটু উন্নয়ন ঘটানো যাবে। দেশের প্রবৃদ্ধি হবে, রিজার্ভ বাড়বে—এগুলো অর্থনীতির সূচক মাত্র। জীবনমানের উন্নয়ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের স্বস্তি প্রদানই হওয়া উচিত এবারের বাজেটের মূল লক্ষ্য। 

করোনা অতিমারী এবং পরবর্তী সময়ে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার শঙ্কা বৈশ্বিক সংকট সৃষ্টি করেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব দেশেও পড়েছে, পড়ছে। বাজেটে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেয়া প্রয়োজন ছিল। প্রথমত, ডলার সংকট। ডলার সংকটের একমাত্র কারণ আমদানি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নয়, অর্থ পাচারও অনেকাংশে দায়ী। আমদানিতে ওভার-ইনভয়েসিং যাতে না হয়, তার জন্য নজরদারি বাড়াতে হবে। বাজেটে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য নেই। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। ক্রমাগত মূল্যস্ফীতি মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। এ সংক্রান্ত সরকারি তথ্যে বিভ্রান্তি আছে। সরকার বলছে, মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে তা ১২ থেকে ১৫ শতাংশ। সরকারি প্রতিষ্ঠান টিসিবিও বলছে-চাল, ডাল ও তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ। সুতরাং প্রকৃত তথ্য না পেলে কোনো নীতি প্রণয়নই কাজে আসবে না। অথচ অর্থমন্ত্রী উচ্চ মূল্যস্ফীতির বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক হিসেবে অভিহিত করে পাশ কাটিয়ে গেলেন। তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জ্বালানি সংকট। আমাদের জ্বালানি খাতের মহাপরিকল্পনার একটি বড় অংশ সাজানো হয়েছে আমদানীকৃত এলএনজির ওপর নির্ভর করে। গত বছরের শেষদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে স্পট মার্কেটে পণ্যটির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ৫৫ ডলারে উঠে যায়। এর মধ্যে শুরু হয় ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। জ্বালানির বাজার আরো অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। শেষতক প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৮৮ ডলারে। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, সরকারিভাবে জ্বালানির দাম বাড়ানো হলে কারখানা সচল রাখাই দুরূহ হয়ে পড়বে। এজন্য বিশেষ করে বস্ত্র, সিরামিক ও ইস্পাতের মতো ভারী শিল্পে আশঙ্কা বিরাজ করছে। চতুর্থ চ্যালেঞ্জ কর-জিডিপি অনুপাত। আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত খুবই কম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও কর-জিডিপির গড় অনুপাত ১৫ শতাংশ, যেখানে আমাদের ৮ শতাংশেরও কম। গবেষকরা মনে করেন, এ হার অন্তত ২২ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন। এর জন্য সম্পদ কর আরোপসহ কর-কাঠামোকে সম্প্রসারিত করতে হবে। কর আহরণে দক্ষতা বাড়াতে হবে, পাশাপাশি আহরণের ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর করতে হবে। বাজেটে কর আহরণ বাড়াতে নতুন কোনো উদ্যোগের কথা বলা হয়নি। উল্লিখিত চারটি চ্যালেঞ্জের বিপরীতে একটি সুযোগও সরকারের কাছে রয়েছে। আমরা জানি, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হলো ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী জনসংখ্যা। এটাকে বলে জনমিতি ডিভিডেন্ড বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড। আশার কথা, এই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড আমাদের অনুকূলে আছে। আমাদের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৬ শতাংশ এ স্তরে অবস্থান করছে। আমরা যদি প্রকৃত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের দক্ষ করে তুলতে পারি, তাহলে উৎপাদনশীলতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে। অদক্ষ শ্রমিকের পরিবর্তে দক্ষ শ্রমশক্তি রফতানির সুযোগ বাড়বে। এর জন্য প্রয়োজন সরকারের সুষ্ঠু পরিকল্পনা। বছরের পর বছর ধরে বলা হলেও এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে কোনো ঘোষণা আসেনি।

করোনাকালে শিক্ষা খাতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। সেগুলো পুষিয়ে নিতে শিক্ষার সঙ্গে কিন্তু অনেক খাত রয়েছে। সেসব বাদ দিয়ে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় যতটা বিনিয়োগ দরকার ছিল এবং জাতীয় আয়ের ক্ষেত্রে যতটুকু অংশ হওয়ার কথা ছিল, সেই অংক এখনো অপ্রতুল। প্রাথমিক শিক্ষায় যে ক্ষেত্রটিতে শিক্ষার অধিকার আইন সার্থক করতে সরকার দায়বদ্ধ, সেখানে টাকা বরাদ্দ হয়েছে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। মানুষের জীবনে উন্নতি সাধনের চেষ্টা করতে, তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার জন্য ব্যবস্থা নিতে বিপুল রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন, সে কথা বোধ হয় আলাদা করে না বললেও চলে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় সেটি যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। কারণ একে তো কভিড-পরবর্তী সময়, তার ওপর আছে মূল্যস্ফীতি। দুটো মিলিয়ে অনেকেরই দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়ার শঙ্কা আছে। আবার মধ্যবিত্তদেরও আরো নিচে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেদিক বিবেচনা করে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ আরো বাড়ানো হবে বলে প্রত্যাশা ছিল। সামষ্টিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ ও মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে বিলাসদ্রব্য আমদানির ক্ষেত্রে একটু কড়াকড়ি করা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতা আগেও দেখা গেছে। রফতানি খাতকে এক ধরনের প্রণোদনা দেয়ার মাধ্যমে ডলারের সংকট কাটানো এবং আমদানি কমানোর মাধ্যমে ডলারকে ধরে রাখার একটা অভিপ্রায় লক্ষ করা যায় বটে, তবে তা পর্যাপ্ত নয়। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, অর্থ পাচার বন্ধে পুরস্কৃত করার নীতি গ্রহণ করছেন অর্থমন্ত্রী, ঠিক যেমন অপ্রদর্শিত অর্থের মালিকদের সুযোগ দিয়েছেন। বৈষম্য নিরসনে কার্যকর কোনো ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। সর্বজনীন পেনশনের ঘোষণা আছে কিন্তু বাস্তবায়ন কাঠামো সম্পর্কে কোনো দিক নির্দেশনা নেই।

প্রচুর ব্যবসাকে প্রণোদনা দিতে অনেক সুযোগ রয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। করপোরেট কর পরপর তিনবার কমানো হলো। এখানে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হচ্ছে, আগে তৈরি পোশাক খাতে প্রণোদনা থাকলেও এখন সার্বিক রফতানি খাতে প্রণোদনা বাড়ানো হয়েছে। এটি একদিক দিয়ে ভালো। এতে রফতানি বহুমুখীকরণ হবে। তবে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির যে চেষ্টা রয়েছে, সার্বিকভাবে তা ইতিবাচক হলেও এ ধরনের উদ্যোগ অন্যান্য বছর দেখা গেছে। সামষ্টিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে রফতানি বৃদ্ধির উদ্যোগ হয়তো সফলতা আনছে, কিন্তু সার্বিকভাবে এ সুবিধা ব্যবসায়ীদের শিল্পায়ন এবং তার মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরির জন্য দেয়া হয়, সেখানে অগ্রগতি নেই। এ জন্য ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা দরকার। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুতের পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নত করতে হবে। যতদিন ব্যবসার পরিবেশ উন্নত না হবে ততদিন ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়বে না। আর ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ না বাড়লে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নতুন শিল্পায়নের ক্ষেত্রে ইতিবাচক কিছু দেখার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

বাজেট হতে হবে সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়নযোগ্য কাঠামোনির্ভর। মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দক্ষতার ওপর জোর দিতে হবে। আর্থিক ও ব্যাংক খাতে সুশাসনের অভাব, অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থ পাচার—এসব বিষয়ে সুষ্ঠু নজরদারি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও সংস্কার আনার বিকল্প নেই। বাজেটের ক্ষেত্রে প্রতি বছর এসব চলমান সমস্যা নিয়ে আলোচনা হলেও দিন শেষে তা কাগজেই থেকে যায়। এটা বললে ভুল হবে না যে বাংলাদেশ এখনো মহামারীর ক্ষতি পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তার সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে মূল্যস্ফীতির চাপ। বিপুলসংখ্যক লোক চাকরি হারিয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। তাই বাজেটে আরো কর্মসংস্থান সৃষ্টির দিকে মনোযোগ দেয়া উচিত। অবশ্য মহামারীর আগেও সরকার কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে হিমশিম খেয়েছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আমদানীকৃত পণ্যের মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিয়েছে। বাজেটে মূল্যস্ফীতি কমাতে দরিদ্র মানুষের জন্য বাড়তি আয়োজন নেই।

বিভিন্ন বাহ্যিক পরিস্থিতির কারণে সম্প্রতি অবশ্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমেছে। এছাড়া উচ্চ সুদের কিছু জাতীয় ঋণের বিষয়ে উদ্বেগ আছে। আমাদের যে সম্পদ আছে, সরকারকে আরো বিচক্ষণতার সঙ্গে তা ব্যবহার করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকারের উচিত সতর্ক অবস্থানে থাকা। মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে সরকারের ব্যয় বাড়ানো উচিত। এ পরামর্শও শোনা হয়নি। যাহোক, দেশের রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ ও তাদের গাড়ি আমদানির মতো অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো উচিত। কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বটে, তবে তা পর্যাপ্ত নয়। মূল্যবান তহবিল নষ্ট করার চর্চা পরিত্যাগ করা প্রয়োজন। বাস্তবায়নের সক্ষমতা নেই—এমন উচ্চাশার পরিকল্পনা তৈরির পরিবর্তে সরকারের প্রয়োজনীয় কর্মসূচিগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নে আরো বেশি মনোযোগ দেয়া উচিত।