দেশে ধান-চালের উৎপাদন ও চাহিদার তথ্য-পরিসংখ্যান নিয়ে মতপার্থক্য ক্রমে বাড়ছে। একপক্ষ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের কথা বললেও আরেকপক্ষ বলছে তাহলে প্রতি বছর কেন রেকর্ড পরিমাণ খাদ্য আমদানি করতে হচ্ছে। সবার বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট যে ধান-চালের উৎপাদন ও চাহিদার সঠিক তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। সম্প্রতি এক আলোচনাসভায় কৃষিমন্ত্রী চালের চাহিদার সঠিক পরিসংখ্যানের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। সুষ্ঠু নীতি প্রণয়নের জন্যই খাদ্যের চাহিদা ও উৎপাদনের সঠিক পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানা জরুরি। কাজটি দুটি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে। চালের চাহিদার তথ্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং উৎপাদনের তথ্য আসে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে। এক্ষেত্রে উভয় মন্ত্রণালয়কে সমন্বয় করে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নিতে হবে।
তথ্য ব্যবস্থাপনায় এ সমস্যার কারণে অনেকটা ম্লান হয়ে পড়েছে দেশের খাদ্য উৎপাদনের সাফল্য। এ কারণেই সরকারি পদক্ষেপ কিংবা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মতো বিষয়গুলোও সুপরিকল্পিত ও নির্ভুল হচ্ছে না। পাশাপাশি ব্যবস্থাপনার অভাবে মাঝে মধ্যেই খাদ্যসংকট চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। উৎপাদন বাড়ার পরও বাজারে খাদ্যের অস্বাভাবিক দামের ঊর্ধ্বগতি পিছু ছাড়ছে না। যার মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে। সেজন্য এখন ইতিবাচক অবস্থায় থেকেও স্বস্তিতে নেই সরকারও। বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে কোনো খাদ্যপণ্যের ঘাটতি দেখা দিলেই দেখা যাচ্ছে, ওই খাদ্যশস্যের সঠিক পরিসংখ্যান নেই। যা আছে, তার মধ্যেও বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতা ফুটে ওঠে। একেক সংস্থার পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে একেক তথ্য। তথ্যের অনুপস্থিতির কারণে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলো নিতে হচ্ছে পুরনো তথ্যের ভিত্তিতে। এতে কর্মপরিকল্পনার সিদ্ধান্তে দুর্বলতা পাওয়া যাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে ভুল পরিকল্পনাও হচ্ছে।
দেশে খাদ্যপণ্যের সঠিক চাহিদা কত, সেই হিসাব যেমন নেই, তেমনি উৎপাদনের সঠিক পরিসংখ্যানও নেই, যা পরিকল্পনা গ্রহণে খুব বড় সমস্যা তৈরি করে। তথ্যবিভ্রাট হলে পরিকল্পনা ঠিক হয় না। তথ্যের যথার্থতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি নিশ্চিত হতে বিবিএসকে তার দায়িত্ব পালন করতে দিতে হবে। উৎপাদন শুধুু নয়, বিভিন্ন খাদ্যের ভোগের তথ্যেও বড় বিভ্রাট রয়েছে। বিভ্রান্তি রয়েছে বিবিএসের তথ্যেও। এখন পর্যন্ত দেশের মানুষের মাথাপিছু খাদ্যশস্যের পরিমাণ নির্ধারণ সম্ভব হয়নি বলা চলে। কারণ বিবিএস তাদের সর্বশেষ ২০১৬ সালের হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেনডিচার সার্ভের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দেশে জাতীয় পর্যায়ে মাথাপিছু দৈনিক খাদ্যশস্য ভোগের পরিমাণ ৪০৬ দশমিক ৫ গ্রাম। একই ধরনের সার্ভেতে ২০১০ সালের মাথাপিছু দৈনিক খাদ্যশস্য ভোগের পরিমাণ ছিল ৪৬৩ দশমিক ৯ গ্রাম। মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে জাতীয় পর্যায়ে মানুষের ভোগের পরিমাণ এতটা কমা নিয়ে বেশ সমালোচনা হয়। দুই বছর পর ২০১৮ সালের ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ইফপ্রি) এবং বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জরিপে দেখা যায়, দেশে দৈনিক মাথাপিছু চাল ভোগের পরিমাণ ৩৯৬ দশমিক ৬ গ্রাম। ২০১৬ সালেও তা ছিল ৪২৬ গ্রাম। তখন ওই দুই সংগঠন দাবি করে, শুধু চাল ভোগের পরিমাণ এত (৩৯৬ দশমিক ৬ গ্রাম) হলে সামগ্রিক খাদ্যশস্য ভোগের বিষয়ে বিবিএসের তথ্য সঠিক নয়।
বিশ্বের উন্নত দেশ তো বটে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় খাদ্য পরিভোগের সঠিক তথ্য জরিপের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। ইউরোপের দেশগুলোয় প্রতিটি ভোগ্যপণ্যের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। চাল, গম তো বটে কেক, ক্রিম কেক, চিজ কেকের মতো পণ্যের পরিভোগের তথ্য পাওয়া যায়। যে দেশ যত উন্নত তার তথ্য ব্যবস্থাপনা তত উন্নত। বাংলাদেশ ২০২৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যুক্ত হতে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে আগামীর পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য নির্ভুল ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য নিশ্চিত করা জরুরি। ইউরোপের কিছু দেশ খাদ্য চাহিদাসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের জন্য আলাদা জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। অধিকাংশ দেশ হাউজহোল্ডের আয়-ব্যয় জরিপ, জীবনযাত্রার মান জরিপ প্রভৃতির মাধ্যমে খাদ্যপণ্যের চাহিদার তথ্য সংগ্রহ করে থাকে। খাদ্যমূল্যস্ফীতি সূচক তৈরিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত, খাদ্য পরিভোগের বৈচিত্র্য সম্পর্কে ধারণা, ব্যবসায়ের সুযোগ, পুষ্টিমান উন্নয়নে ফুডফর্টিফিকেশন প্রভৃতির জন্যও খাদ্য চাহিদা ও প্যাটার্নের তথ্য দরকার।
খাদ্যের ক্ষেত্রে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং এর অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদনের প্রকৃত তথ্য অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি। আবার জাতীয় পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিসংখ্যান মেলে অনেক দেরিতে। এ সংস্থার বড় বড় পরিসংখ্যান নিয়েও সমালোচনার শেষ নেই। এমন তথ্য নিয়ে ব্যবস্থাপনার কাজ করতে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিষ্ঠানগুলো অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়েছে বহুবার। আবার বিদেশী সংস্থাগুলো এসব তথ্য আমলেই নেয় না। তাদের তরফ থেকে আসে ভিন্ন তথ্য। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত অর্থবছরে দেশে চাল উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৮৭ লাখ টন। সে হিসাব আমলে নিলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে এ বছর সাড়ে ৫৫ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকার কথা। কিন্তু উল্টো এ পর্যন্ত ৩০ লাখ টন চাল আমদানির প্রয়োজন হয়েছে ঘাটতি মেটাতে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, তথ্যের এ গরমিলের কারণে সঠিক সময়ে চাল আমদানি করতে পারেনি সরকার। শুধু চালই নয়, তিনদিন আগে তেল, চিনি, পেঁয়াজসহ অন্যান্য পণ্যের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি বৈঠকেও তথ্যবিভ্রাটের বিষয়টি সামনে আসে। তেল, চিনি, পেঁয়াজের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সঠিক চাহিদা ও দেশীয় উৎপাদন নির্ধারণ সম্ভব হয়নি সংশ্লিষ্টদের পক্ষে। ফলে ধারণানির্ভর তথ্যের ওপর নেয়া হয়েছে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
খাদ্যশস্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় একদিকে যেমন প্রয়োজন দেশে উৎপাদিত খাদ্যশস্যের সঠিক তথ্য, তেমনি অন্যদিকে দরকার এসব পণ্যের জনপ্রতি ভোগের সঠিক হিসাব। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশে এসব পণ্য উৎপাদন ও জনপ্রতি ভোগের পরিমাণের সঠিক তথ্যের অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয় ও এর অধীন অধিদপ্তর এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো খাদ্যশস্য, বিশেষ করে চালের প্রকৃত উৎপাদনের চেয়ে বেশি পরিমাণ উৎপাদন দেখিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। কৃষি মন্ত্রণালয় প্রদত্ত প্রকৃত পরিমাণের চেয়ে বেশি পরিমাণে চাল উৎপাদনের তথ্য খাদ্য মন্ত্রণালয়কে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিধান্বিত করেছে—এ কথা স্বয়ং খাদ্যমন্ত্রী স্বীকার করেছেন। কৃষিমন্ত্রী বলছেন, চালের চাহিদার অনুপাতে দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে রোডম্যাপ প্রণয়নে সঠিক তথ্য প্রয়োজন। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় একাধিকবার প্রধান খাদ্যশস্য চালের সংকট দেখা দেয় এবং চালের দাম, বিশেষ করে দেশের কম-বেশি ৭০ শতাংশ মানুষের প্রধান খাদ্য মোটা চাল হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্তের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গিয়ে তাদের খাদ্যনিরাপত্তায় হুমকি সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে মাঝারি ও সরু চালের দামও অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়।
সঠিক তথ্যের গুরুত্ব অনেক। সঠিক তথ্য ছাড়া সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা অনেকাংশেই কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ গত আমন ও বোরো মৌসুমে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে যে পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন ও ব্যক্তিপর্যায়ে মজুদের তথ্য দেয়া হয়েছিল, তা সঠিক ছিল না বলে সে মুহূর্তে অনেক বিশেষজ্ঞই মন্তব্য করেছিলেন। কারণ যে পরিমাণ খাদ্য মজুদের কথা বলা হয়েছিল, তা সঠিক হলে খাদ্য সংকট এত তীব্র হওয়ার কথা ছিল না। যে কারণে একটি দেশের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা ও ভোক্তার স্বার্থে সঠিক তথ্য উপস্থাপন করা একান্ত জরুরি। কৃৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে মাঠপর্যায় থেকে সঠিক তথ্য সংগ্রহে আরো আন্তরিকভাবে কাজ করা উচিত। তাহলে উৎপাদনের ভিত্তিতে মজুদ, বিপণন এবং সামাজিক নানা চ্যানেলে খাদ্য সরবরাহ অব্যাহত রেখে সরকারের পক্ষে কর্মকৌশল গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করা যেমন সহজ হবে, তেমনি সাধারণ ভোক্তার স্বার্থও রক্ষা হবে।
চাল দেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। অতীতে কোনো সরকারই চায়নি এবং বর্তমান সরকারও চায় না দেশে চালের ঘাটতি দেখা দিক এবং পণ্যটির দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে যাক। এ কারণেই স্বাধীনতা-পরবর্তী সব সরকারই খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং দেশকে খাদ্যে, বিশেষ করে প্রধান খাদ্য চালে স্বনির্ভর করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। সুষ্ঠু খাদ্যশস্য ব্যবস্থাপনার জন্য খাদ্যশস্য উৎপাদনের এবং এসব পণ্যের মাথাপ্রতি ভোগের সঠিক তথ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। এসবের প্রকৃত তথ্য না থাকলে নীতিনির্ধারকদের পক্ষে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব নয়। প্রকৃত তথ্যের অভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত না নেয়া গেলে খাদ্যশস্য ব্যবস্থাপনা চ্যালেঞ্জের মুখেই রয়ে যাবে, যা দেশের জন্য মোটেই মঙ্গলজনক নয়।










