সরকারের সার্বিক সহযোগিতা ও দেশীয় উদ্যোক্তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দেশে ইলেক্ট্রিক, ইলেক্ট্রনিকস ও ইলেক্ট্রিক্যাল শিল্পে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। দেশেই এখন গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। যা দামেও বেশ সাশ্রয়ী, পরিবেশ বান্ধব ও দেশীয় আবহাওয়া উপযোগী। সরকারের শিল্পনীতিতে ‘আমদানি বিকল্প স্থানীয় শিল্পের উন্নয়ন’-এর কথা বলা হলেও বিভিন্ন সংস্থার বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ দুর্বলতায় অবাধে আমদানি হচ্ছে নিম্নমানের ইলেক্ট্রিক ও ইলেক্ট্রনিকস পণ্য। 

একদিকে যেমন বিদ্যমান পিপিআর-২০০৮  বিধি ২৯(৩) এর সরাসরি ব্যত্যয় ঘটিয়ে বিভিন্ন বিদেশী ব্র্যান্ড ও দেশের নাম উল্লেখ করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দরপত্র আহ্বান করছে, অন্যদিকে কোনরূপ মান যাচাই না করে বা বিএসটিআই সনদ ছাড়াই বিদেশী পণ্য অবাধে আমদানি হচ্ছে। যেখানে গুণগত মানসম্মত পণ্য উৎপাদনে দেশ এখন স্বয়ং-সম্পূর্ণ, সেখানে আত্মমর্যাদাশীল স্বাধীন বাঙালি জাতি হিসেবে ক্রয় টেন্ডারে অন্য দেশের নাম বা ব্র্যান্ড উল্লেখ থাকা দুঃখজনক। যা দরপত্র আহ্বানের ক্ষেত্রে বিদ্যমান পিপিআর-২০০৮- বিধি ২৯(৩) এর সরাসরি ব্যত্যয় ঘটাচ্ছে। একইসাথে বিএসটিআই সনদের বাধ্যবাধকতা না থাকায় নিম্নমানের বিদেশী পণ্যে দেশ সয়লাব হয়ে যাচ্ছে।

দেশে এখন অত্যাধুনিক মেশিনারি সম্বলিত আন্তর্জাতিক মানের ফ্যাক্টরিসমূহে এখন এ দেশেই এয়ারকন্ডিশনার, রেফ্রিজারেটর-ফ্রিজার, কম্প্রেসার, টেলিভিশন, প্যাসেঞ্জার লিফ্ট, কার্গো লিফ্ট, ইলেকট্রিক্যাল সুইচ-সকেট, ফ্যান, এলইডি লাইট-বাল্ব, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ-ডেস্কটপ কম্পিউটার ও ইলেকট্রিক্যাল হোম এবং কিচেন অ্যাপ্লায়েন্সসহ নানা কিছু উৎপাদিত হচ্ছে। যা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন, দামে সাশ্রয়ী এবং পরিবেশ বান্ধব। দেশ এখন উল্লেখিত পণ্যসমূহ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ।

এদেশের আবহাওয়া ও বৈদ্যুতিক অবকাঠামো বিবেচনা করে উল্লেখিত পণ্যসমূহের মধ্যে যে সমস্ত পণ্যের দেশীয় মান নিয়ন্ত্রণ সনদ (বিএসটিআই সনদ) দেশীয় উৎপাদনকারী বা ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক রয়েছে, পণ্যগুলোর আমদানি পর্যায়ে বিদেশী ব্র্যান্ডগুলোরও দেশীয় মান নিয়ন্ত্রণ সনদ (বিএসটিআই সনদ) বাধ্যতামূলক করা সময়ের দাবি। 

আমাদের দেশে উৎপাদিত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের এয়ারকন্ডিশনার, রেফ্রিজারেটর-ফ্রিজার, কম্প্রেসার, কম্প্রেসার পার্টস ও টেলিভিশন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। বর্তমানে খ্যাতনামা বিভিন্ন ইউরোপিয়ান ও কোরিয়ান ব্র্যান্ডের ইলেক্ট্রনিকস পণ্য এদেশে উৎপাদন হয়ে তা রফতানি হচ্ছে। অনেক আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড বা প্রতিষ্ঠান ও দেশীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের নিজস্ব ব্র্যান্ডে আমাদের দেশীয় ফ্যাক্টরি হতে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে ইলেক্ট্রিক্যাল ও ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য তৈরি করে নিচ্ছে। এতে বিপুল পরিমানে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও সাশ্রয় করার পাশাপাশি ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

বিদেশে কোন পণ্য রফতানি করতে গেলে সেই দেশের মান নিয়ন্ত্রণ সনদ নেওয়া আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক। কিন্তু আমাদের দেশে যেকোন পণ্যই খুব সহজে আমদানি হয় কোনরূপ দেশীয় মান নিয়ন্ত্রণ সনদ ছাড়াই। ফলে নিম্নমানের পণ্যে দেশ সয়লাব হয়ে বিপুল অর্থের অপচয় ও পরিবেশের ক্ষতি করছে। পার্শ্ববর্তী দেশসহ যেকোন দেশে পণ্য রফতানি করতে গেলে আমাদের নিয়মতান্ত্রিকতার বাইরেও বিভিন্ন শুল্ক ও অশুল্ক বাধার সম্মুখীন হতে হয়। কারণ তারা দেশীয় শিল্প বিকাশ ও পরিবেশের স্বার্থে আমদানি পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতামূলক ব্যবস্থা করে রেখেছে। স্থানীয় উৎপাদনকারীদের স্বার্থ রক্ষা ও আমদানি ব্যয় কমানোর জন্য স্থানীয় শিল্প সুরক্ষার জন্য আমদানি নীতিতে পরিবর্তন এনে একই রকম পদক্ষেপ আমাদের স্থানীয় শিল্পের স্বার্থে অতীব জরুরি।

বিপুল জনসম্পদের এই দেশে অভ্যন্তরীণ চাহিদার যোগান দেয়ার সুযোগ যদি দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহ পায়, তাহলে মানসম্মত পণ্য সাশ্রয়ী মূল্যে উৎপাদন করে বিপুল বৈদেশিক মূদ্রার অপচয় রোধ করে আরো ব্যাপক হারে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে মনে করি।

লেখক: উপদেষ্টা
বাংলাদেশ ইলেকট্রিকাল অ্যান্ড হোম অ্যাপ্লায়েন্স এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন