ডিজিটাল যুগে প্রচার যোগাযোগ আগের চেয়ে আরো বেশি বৈচিত্র্যময় এবং বহুমাত্রিক। ব্যক্তি পর্যায়ের যোগাযোগ থেকে শুরু করে ভোক্তা গ্রাহকদের কাছে কোনো ব্র্যান্ডের বার্তা প্রচার যোগাযোগের ধরন আজ পুরোটাই বদলে গেছে। ১৯৯০ দশকের গোড়ার দিকে ইন্টারনেটের মূলধারায় আগমন যোগাযোগের পদ্ধতিকে আমূল পরিবর্তন করেছে। প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে নির্দিষ্ট ব্যবহারকারীদের কাছে আরো দ্রুত, স্পষ্ট ও ভিন্ন আঙ্গিকে নিজেদের বার্তাকে উপস্থাপন করার। কানাডীয় যোগাযোগতাত্ত্বিক Marshall McLuhan ষাটের দশকে এজন্য হয়তো বলেছিলেন ‘মিডিয়াম ইজ দ্য ম্যাসেজ’ অর্থাৎ বাহনই বার্তা—তার দেয়া ধারণাটি আজ ইন্টারনেটের সৃষ্ট ডিজিটাল মিডিয়ার দৃশ্যপটকে দেখলে সঠিকভাবে উপলব্ধি করা যায়।
প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে ডিজিটাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে ব্যবসায়িক ব্র্যান্ডগুলো তাদের ভোক্তাদের সঙ্গে নতুন মাধ্যমে নিজেদের প্রচারণা করছে। যা প্রথাগত যোগাযোগের ধারণাকে পুরো পাল্টে দিয়েছে। ফলস্বরূপ যোগাযোগের নতুন ল্যান্ডস্কেপ সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষ বিনোদন, সংবাদ ও ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য ডিজিটাল মিডিয়ার দিকে ক্রমেই ঝুঁকছে পড়ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের মতে, ডিজিটাল মিডিয়া ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৮৬ শতাংশ মার্কিন প্রাপ্তবয়স্করা অনলাইন থেকে সংবাদ গ্রহণ করে। অনলাইন মিডিয়ার গ্রাহক সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল প্লাটফর্মের সংখ্যাও বাড়ছে। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে যোগাযোগভিত্তিক ক্যারিয়ারগুলো হবে সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজার, ডিজিটাল মিডিয়া ম্যানেজার, কনটেন্ট কৌশলী, ডাটা বিশ্লেষক ইত্যাদি। বিশেষজ্ঞরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা, ব্লগ পোস্ট, ভিডিও কন্টেন্টসহ অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে যোগাযোগের কৌশলগুলোকে সম্পাদনের দিকে এখন বেশি মনোনিবেশ করছেন।
ডিজিটাল মিডিয়া আধিপত্যের প্রমাণ বোঝা যায় বর্তমানে মানুষ কীভাবে তথ্য গ্রহণ করে ও সেটা কোন কোন মাধ্যমে প্রচার, প্রসার করে থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয় জনগণের মধ্যে আলোচনার বিষয়বস্তু ও জনমত তৈরি করছে। বর্তমানে মিডিয়ার ক্ষেত্রে উদ্ভাবনটাই আজকের নতুন স্বাভাবিক। ভবিষ্যতের মিডিয়া ধারণাগুলোকে ভালো করে দেখলে এ ধারার পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ডিজিটাল বিজ্ঞাপন, বিভিন্ন স্মার্ট ডিভাইসের মাধ্যমে ইন্টারনেটে ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ ডিজিটাল মিডিয়াকে প্রতিনিয়ত শক্তিশালী করছে। গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চের গবেষণা প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিনের বাজারের আকার ২০২১ সালে ৩৪ দশমিক ২৪ বিলিয়ন এবং ২০২২ সালে ৩৫ দশমিক ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে হওয়ার পূর্বাভাস করা হয়েছে।
গ্রাহক ও ভোক্তাদের নিত্যনতুন চাহিদা মাথায় রেখে ডিজিটাল মিডিয়া বিকশিত হচ্ছে নিত্যনতুন পন্থা উদ্ভাবনের মাধ্যমে। ডাটারিপোর্টাল জানুয়ারি ২০২৩ গ্লোবাল ওভারভিউ অনুসারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। বিশ্বের প্রায় ৫৯ শতাংশ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন মানুষ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে। গত এক বছরে ১৩৭ মিলিয়ন নতুন ব্যবহারকারী অনলাইনে সংযুক্ত হয়েছে। তাই আশা করা হচ্ছে, ডিজিটাল মিডিয়ায় সবার সহজে অংশগ্রহণের সক্ষমতা সামনের দিনে আরো বৃদ্ধি পাবে। মোবাইল ভিডিও, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর), অগমেন্টেড রিয়েলিটি (এআর) এবং ডাটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং, ডাটা অ্যানালিটিকস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার ডিজিটাল মিডিয়ার ভবিষ্যৎকে তীব্রমাত্রায় ত্বরান্বিত ও প্রভাবিত করবে।
ডিজিটাল মিডিয়ায় বিজ্ঞাপনদাতারা ভোক্তা ও গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানোর জন্য যে প্রথাগত পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করত সেগুলো আজ তেমন কার্যকরী নয়। দ্য ট্রেড ডেস্কের জরিপ অনুসারে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৮-৩৪ বছর বয়সী ৭৪ শতাংশ পরিবার কেবল টিভি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করছে বা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনায় আছে। এদের মধ্যে অধিকাংশই আগে সাবস্ক্রিবশন-ভিত্তিক ডিজিটাল মিডিয়া পরিষেবা ক্রয় করেনি। অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ইউটিউব প্রিমিয়াম, নেটফ্লিক্স, হুলু এবং অ্যামাজন, এইচবিওর মতো ভিডিও স্ট্রিমিং পরিষেবাগুলো স্থানান্তর হয়ে যাচ্ছে। তাই বিজ্ঞাপনদাতাদের নতুন কৌশল অবলম্বন করতে হচ্ছে। প্রতি বছর আগের চেয়ে অধিক সংখ্যক গ্রাহক কেবল টেলিভিশন থেকে অনলাইন ভিডিও প্লাটফর্মগুলোয় স্থানান্তর হচ্ছে। এ স্থানান্তর সহজ ও গতি দিয়েছে সাশ্রয়ী ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা, স্মার্টফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ, ইন্টারনেট টিভির মতো ডিভাইস ও সেবার সহজলভ্যতা। এতেই ডিজিটাল মিডিয়ার ভবিষ্যৎ কোন পথে এগিয়ে যাচ্ছে তার স্পট ইঙ্গিত আছে।
বর্তমানে জনসংযোগ ক্ষেত্রেও ডিজিটাল জগতের বিগ ডাটা বিশ্লেষণ কৌশল আরো আধুনিক ও উন্নত হয়েছে। এ ধরনের ডাটা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে প্রচারণার কাজে। অনলাইন বিজ্ঞাপনের বিশ্লেষণ দিয়ে নির্দিষ্ট বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযানের সাফল্যের সঙ্গে প্রচারাভিযানের সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলোকেও শনাক্ত করা যায়। সংগৃহীত তথ্যের বিশ্লেষণ থেকে বিজ্ঞাপনের বার্তার ধরন, প্লাটফর্ম নির্বাচন এবং সর্বোপরি নির্দিষ্ট বিজ্ঞাপন বার্তার জন্য সঠিক ভোক্তাদের খুঁজে বের করতে সহায়তা করে। ডাটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে জনসংযোগ পেশাদাররা আরো বেশি কার্যকরী প্রচারাভিযান তৈরি করতে পারে। প্রাপ্ত বিপুল পরিমাণের তথ্য থেকে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা সংবাদ চক্রের ধারা এবং মানুষের আগ্রহের পূর্বাভাস পর্যন্ত করতে এখন সক্ষম। এতে করে তারা কোন ক্ষেত্রগুলোয় কোন শিল্প-ইন্ডাস্ট্রি সর্বাধিক কাভারেজ পাবে সেটা বের করতে পারেন।
ব্যক্তিগত ও পেশাদার যোগাযোগের ক্ষেত্রে ডিজিটাল মিডিয়ার ব্যবহার সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কভিড-১৯ মহামারী সেই গতিকে ত্বরান্বিত করছে। কভিড লকডাউন, সংক্রমণের উদ্বেগ এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর বিধিনিষেধগুলো মানুষকে আরো বেশি অনলাইননির্ভর করেছে। উদাহরণস্বরূপ বাজার গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ওয়েব ইনডেক্সের তথ্যে দেখা যায়, ২০২০ সালের আগস্টে ৪৩ শতাংশ ভোক্তা মহামারীর কারণে দীর্ঘ সময়ের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছিল। অন্যদিকে র্যান্ড আমেরিকান লাইফ প্যানেল জরিপে অনুসারে কভিড মহামারীকালে প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষ অনলাইনে বেশি কেনাকাটা করছে। মহামারীর ডিজিটাল মিডিয়া ল্যান্ডস্কেপকে স্থায়ীভাবে প্রভাবিত করেছে।
গত এক দশকে বাংলাদেশেও অকল্পনীয়ভাবে ইন্টারনেট সেবা ছড়িয়ে পড়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে ইন্টারনেট সেবাপ্রাপ্তি এবং অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে এ খাতে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো ততটা দৃঢ় না হলেও এ খাতে খুব সম্ভাবনাময়। যথাযথ দক্ষ ও গুণগত মানসম্মত জনশক্তির জন্য অকাঠামোগত পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে শিগগিরই বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে এবং বিশ্বগ্রামের অন্যতম অংশীদার হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে পারবে। সেবা ও পণ্যের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে বাংলাদেশে ডিজিটাল মিডিয়ার প্রসার দ্রুতগতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে। ইন্টারনেটে সংযুক্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে সরকারি উদ্যোগে টেলিকমিউনিকেশন টাওয়ার স্থাপন, স্বল্প মূল্যে ইন্টারনেট সংযোগ, ইন্টারনেট অ্যাকসেস বৃদ্ধি, স্মার্ট ডিভাইসের প্রাপ্তি বাংলাদেশকে ডিজিটাল উন্নয়নের পথে সামনে এগিয়ে নিয়ে চলছে। প্রথাগত প্রচার মাধ্যমের পাশাপাশি আজ ডিজিটাল মিডিয়াও বাংলাদেশের জন্য ব্যবসা ও বাণিজ্য প্রসারে যোগাযোগের অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে তৈরি হয়েছে। ই-কমার্স ও ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন স্টার্টআপ শুরু হয়েছে। তবে এখনো পর্যাপ্ত পরিমাণে আন্তর্জাতিক মানসম্মত ও দক্ষ ডিজিটাল কমিউনিকেশন বিশেষজ্ঞ ও কর্মী তৈরি হয়নি। আমাদের উচিত হবে এখন থেকে আমাদের দেশের ডিজিটাল মিডিয়ার যোগাযোগের জন্য দক্ষ ও মানসম্মত কর্মশক্তি তৈরিতে আরো বেশি জোর দেয়া। তবে শুধু সরকারের ওপর নির্ভর না করে বেসরকারি খাতকেও এ খাতে বিনিয়োগ করতে হবে। তবেই ডিজিটাল মিডিয়ার প্লাটফর্মগুলোকে যথাযথ ব্যবহার করে আমরা শুধু নিজের দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রচার-প্রসার করতে পারব। এর সঙ্গে বৈদেশিক বাণিজ্য প্রসারেও কার্যকরী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হব।
মো. আবিদ মঈন খান: সাংবাদিক










