‘নয়-ছয়’ সুদনীতি নিয়ে এত কথা হচ্ছে যে বোঝাই যাচ্ছে না, এখানে কে কার প্রতিপক্ষ। সরকার চায় এই নীতি বাস্তবায়ন করতে, আর ব্যাংকাররা তা বাস্তবায়ন করছেন না। আবার মনে হয় ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা চান, ব্যাংকাররা তা করছেন না। আসলে সমস্যাটা আমার কাছে এমন মনে হয় না। এখানে কেউ কারো প্রতিপক্ষ বা পক্ষ নয়। যারা শিল্প-ব্যবসার মালিক, পোশাক কারখানার বড় বড় মালিক, বস্ত্রকলের মালিক, নিট ওয়্যারের মালিক; তারাই ব্যাংকের মালিক। বীমা ব্যবসা, লিজিং ব্যবসা, আমদানি-রফতানি ব্যবসা যারা নিয়ন্ত্রণ করেন, তারাই ব্যাংকের মালিক। তাই নয় কি? যেকোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের তালিকা নিয়ে মেলালে দেখা যাবে এরা কারা? কেউ আমদানি ব্যবসা থেকে পয়সা করে ব্যাংকে ঢুকেছেন, কেউ পোশাক রফতানি করতে করতে ব্যাংকের মালিক হয়েছেন, কেউ জমির ব্যবসা করে ব্যাংকের মালিক হয়েছেন। শুধু ব্যাংক নয়, কার্যত এখন ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্প, আবাসন, হাসপাতাল থেকে শুরু করে সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যারা জড়িত, তাদের বিচরণক্ষেত্র বহু বিস্তৃত। এ অবস্থায় আমার প্রশ্ন, ব্যাংকের চেয়ারম্যান সাহেবরা কি শিল্পের সমস্যা বোঝেন না, তারা কি পোশাক কারখানার সমস্যা বোঝেন না, তারা কি বস্ত্র শিল্পের সমস্যা বোঝেন না? যদি বোঝেন, তাহলে বারবার ‘নয়-ছয়’ সুদনীতি বাস্তবায়ন আটকে যাচ্ছে কেন? ব্যাংক মালিকরা প্রধানমন্ত্রীকে কথা দিয়েছেন। প্রতিদিন অর্থমন্ত্রী ব্যবসায়ী ও ব্যাংক মালিকদের সঙ্গে কথা বলছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখানে ব্যতিক্রমভাবে সাইড রোলে রয়েছে গত দুই বছরে। কত না কথা হলো, তবু কিছুতেই কিছু হলো না। বিষয়টি বিশেষ করে বোঝা যাচ্ছে না আরেকটি কারণে। সরকার এখন আগের চেয়ে শক্তিশালী। পাঁচ-পাঁচজন বড় ব্যবসায়ী সরকারের মন্ত্রী। অর্থমন্ত্রী বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, শিল্পমন্ত্রী ব্যবসায়ী, বাণিজ্যমন্ত্রী ব্যবসায়ী, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী ব্যবসায়ী। সর্বোপরি সরকারের শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টাও একজন বড় মাপের ব্যবসায়ী। এ রকম ব্যবসায়ীবান্ধব সরকার কেন এখনো পারছে না ‘নয়-ছয়’ সুদনীতি বাস্তবায়ন করতে। অর্থমন্ত্রী তো বলেই ফেলেছেন সরকারের চেয়ে কেউ বেশি শক্তিশালী নয়। তার অর্থ কী? তার অর্থ এমন কিছু ঘটেছে, যার কারণে তিনি এ কথা বলতে বাধ্য হয়েছেন। বেশ কিছুদিন আগে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, ‘সরকারের ভেতরে সরকার আছে।’ কথাটি গুরুত্বপূর্ণ বটে। এসব নানা কারণে বর্তমান সমস্যাটি আমরা বাইরে থেকে বুঝতে পারছি না।

‘নয়-ছয়’ সুদনীতিতে যদি আমানতকারী অথবা সাধারণ মানুষ একটি পক্ষ হতো, তাহলে না হয় বুঝতাম এ নীতি বাস্তবায়নে বাধা আছে। সাধারণ মানুষ যদি বলত ব্যবসায়ীদের উচিত বেশি বেশি করে শেয়ারবাজার থেকে পুঁজি সংগ্রহ করা। সেখান থেকে অর্থ তুললে এর কোনো সুদ ব্যয় নেই। লাভ হলে শেয়ারের মালিকরা লভ্যাংশ পাবেন, না হলে পাবেন না। এতে বর্তমান সমস্যার সমাধান হয়। বর্তমানে সমস্যা ‘সুদব্যয়’। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এত সুদ বহন করে ব্যবসা করা যায় না। উন্নত দেশে এত সুদ লাগে না। ভালো কথা, তাহলে ব্যবসায়ীরা মাত্রাতিরিক্ত হারে ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে ব্যবসা না করে শেয়ারবাজারে যেতে পারেন। তারা বড় বড় ব্যবসা করেন, জনগণকে এর ভাগ দেবেন না কেন? বস্তুত অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল দায়িত্ব নেয়ার পর একটি বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘ব্যবসায়ীদের শেয়ারবাজারে যাওয়া উচিত।’ তার পরামর্শ ব্যবসায়ীরা শুনলে শেয়ারবাজারটা চাঙ্গা হতো। বিপরীতে ব্যাংকের টাকাও শোধ হতো। পুঁজি হিসেবে উত্তোলিত টাকা দিয়ে তারা ঋণ


পরিশোধ করতে পারতেন। এতে ব্যাংকের খেলাপি ঋণও কমে যেত। কিন্তু এক্ষেত্রে মুশকিল হচ্ছে একটিই—ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিনের সরকারি নীতি থেকে বুঝতে পারছেন সরকারের শিল্পায়ন নীতি ‘ব্যাংক ফিন্যান্সলেড’ ও রফতানিনির্ভর। ব্যাংক ফিন্যান্সলেড ব্যবসা নীতির ফলে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। দু-দুটো ব্যাংক ডুবেছে। একটি বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক (বিএসবি), অন্যটি বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থা (বিএসআরএস)। এ দুটো ব্যাংক বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের ভার নিয়ে এখন নতুন নাম নিয়েছে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল), যেমন হয়েছে পদ্মা ব্যাংকের ক্ষেত্রে। এরও আগে দুটি বিনিয়োগ কোম্পানি জালিয়াতিতে ডুবেছে, পরে এক ব্যাংক হয়েছে। প্রথম প্রজন্মের ব্যাংকগুলো জন্মের পর পরই কী করেছিল? পুরনোদের এসব কথা মনে আছে। আমি তিক্ত অতীতে যেতে চাই না। আমার ধারণা, সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংক ফিন্যান্সলেড গ্রোথ নীতির কারণেই অংশত আজকের সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ‘এক্সপোর্ট অর পেরিশ’ নীতিও অন্যভাবে আমাদের সম্পূর্ণ বিদেশী বাজারের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলেছে—তাও এক পণ্যের ওপর। এ এক ভিন্ন আলোচনা। এতে আমি যাচ্ছি না। আমার কথা হচ্ছে উপরে বর্ণিত যুক্তিগুলো দেশের সাধারণ মানুষ ব্যবসায়ীদের বলতে পারত। আর তা জোরদার হলে ‘নয়-ছয়’ সুদনীতির কথা হয়তো উঠত না। আমাদের সাধারণ মানুষ এসব না করে বরং সরকারের নীতিকেই সমর্থন করেছে এবং করছে। কারণ দেখা যাচ্ছিল দেশে পুঁজি নেই। মর্টগেজ দিতে ঋণ নিয়ে পারে এমন লোকেরই অভাব। মুশকিল হচ্ছে এ নীতি সমর্থন করে এখন সবাই বিপাকে। এখন ব্যাংক মালিকরাও পথ পাচ্ছেন না, সরকারও পথ পাচ্ছে না। সুদের হার না কমালে ব্যবসা হয় না, প্রতিযোগিতা হয় না। ব্যবসায়ীরা ঋণী হয়ে পড়ছেন, দেনা শোধ করতে পারছেন না। আবার কম সুদে ঋণ দিতে হলে কম সুদে আমানত পেতে হবে। কম সুদে আমানত পাওয়া যায় না। মানুষ কেন কম সুদে ব্যাংকে টাকা রাখবে? বাধ্য না হলে কেন রাখবে? এখন যদি সঞ্চয়পত্র পাওয়া না যায়, শেয়ারবাজার না থাকে, জমি কেনা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়, তাহলে মানুষ বাধ্য হয়ে নিশ্চয়ই ব্যাংকে যাবে। কিন্তু এসব তো বাজার অর্থনীতির কথা নয়। বাজারের নীতি লঙ্ঘন করে বেশি কি এগোনো যাবে? বহু সাধনা করে বাংলাদেশ ‘হাইলি রেগুলেটেড’ সুদনীতি থেকে প্রতিযোগিতামূলক সুদনীতিতে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছিল। এতে এখন বাধা পড়ছে। আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণের ওপর সুদের হার, আমানতের ওপর সুদের হার, বিভিন্ন ধরনের ব্যাংক চার্জ ঠিক করে দিত। সব ব্যাংক বাধ্য হতো ওই হার মানতে। কোনো ব্যতিক্রম ছিল না। এটি ১৯৮০-৮২ সালের কথা। তারপর দীর্ঘদিন আমরা প্রতিযোগিতামূলক সুদনীতি ধীরে ধীরে গড়ে তুলছিলাম। এখন সরকার আবার ওই ফিক্সড সুদনীতির দিকেই এগোচ্ছে বলে মনে হয়। এখন মনে হয় আগামী দিনে আমানতের ওপর সুদ পাওয়া যাবে না। বরং ব্যাংকে টাকা রাখলে ব্যাংককে উল্টো সার্ভিস চার্জ দিতে হবে। দিতে হবে কারণ তারা আমাদের টাকা নিরাপদে রাখবে। এরই মধ্যে এর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এখনই সরকারি ব্যাংক ৬ শতাংশের বেশি সুদ দেয় না। মাঝখানে তো ৫ থেকে সাড়ে ৫ শতাংশ সুদ দিত। এখন ৬ শতাংশ হারে সুদ দেয়। এ সুদের ওপর ১০-১৫ শতাংশ হারে উেস কর কেটে নেয়া হয়। যাদের টিআইএন আছে, তাদের ১০ শতাংশ এবং যাদের নেই, তাদের ১৫ শতাংশ হারে উেস কর কাটা হয়। এর অর্থ প্রকৃত সুদপ্রাপ্তি হবে মোটামুটি ৫ শতাংশ। এ সুদের সঙ্গে যদি মূল্যস্ফীতির হার তুলনা করি, তাহলে প্রকৃত সুদ নেতিবাচক। কারণ মূল্যস্ফীতির হার এখন ৬ শতাংশ। এর অর্থ সরকারি ব্যাংক এখন কোনো সুদ দেয় না। কাজটি অনেক বেসরকারি ব্যাংক করছে না। অথচ তারা সরকারের কাছে কথা দিয়েছিল। কেন করছে না, এটিই হচ্ছে প্রশ্ন। আমি নিবন্ধের শুরুতেই বলেছি, প্রশ্ন করেছি—কে কার পক্ষ? ব্যবসায়ী ও ব্যাংকের মালিকরা তো প্রকৃতপক্ষে একই পক্ষ। তাহলে ‘নয়-ছয়’ সুদনীতি বাস্তবায়ন হচ্ছে না কেন? আমার ধারণা ব্যাংকগুলো আমানতের ইস্যুতে দ্বিধাগ্রস্ত। তাদের আমানত দরকার। এর নিশ্চয়তা দরকার। এজন্য তারা সরকারি আমানত যাতে কম দরে পায়, তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে। সরকারের মোট ফান্ডের ৫০ শতাংশ তারা এখন পাচ্ছে। তারা মানে বেসরকারি ব্যাংক। ওইদিন কাগজে দেখলাম অর্থমন্ত্রী বলেছেন, দরকার হলে সরকারি ব্যাংক সাড়ে ৫ শতাংশ সুদহারে আমানত নেবে, যাতে মানুষ ৬ শতাংশের আশায় বেসরকারি ব্যাংকে যায়। বেসরকারি ব্যাংকের আপত্তি ছিল সঞ্চয়পত্রের উচ্চসুদে। তাদের কথায় সঞ্চয়পত্র বিক্রি প্রায় বন্ধই করে দেয়া হয়েছে। সরকার এখন উপায়ান্তর না দেখে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে। এতসব করার পরও মনে হচ্ছে আমানতের ক্ষেত্রে বেসরকারি ব্যাংকগুলো নিশ্চিত হতে পারছে না। তারা তাদের লাভ-ক্ষতি নিয়ে চিন্তিত, প্রশাসনিক ব্যয় নিয়ে চিন্তিত। এরই মধ্যে অনেক ব্যাংকে কর্মীদের চাকরি চলে যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। বাঁচার জন্য পথ খুঁজছে। শত হোক ‘নয়-ছয়’ সুদনীতি কার্যকর হলে এটা হবে ব্যাংকিং ব্যবসার জন্য একটি উল্টো মাইলফলক। বাজার অর্থনীতির উল্টো দিকে যাত্রা। এর ফলাফল কী হবে? ঋণের ওপর সুদের হার নিয়ে প্রশ্ন কম। প্রশ্ন আমানতের ওপর সুদ নিয়ে। ব্যাংক ওই সুদে আমানত পাবে কিনা। বড় প্রশ্ন আরো রয়েছে। এ প্রশ্ন সঞ্চয় সম্পর্কে, এ প্রশ্ন সঞ্চয়কারীদের সম্পর্কে। তারা এত অল্প সুদে ব্যাংকে টাকা রেখে সংসার চালাতে পারবে কিনা। হাজার হাজার, লাখ লাখ মানুষ ব্যাংকের সুদে, আমানতের সুদে সংসার চালায়। এখানে আঘাত এলে তাদের অবস্থা কী হবে? তারা বাজারে যেতে পারবে তো? ৬০০-৭০০ টাকা কেজির শোল মাছ, ৮০-১০০ টাকা কেজির পেয়ারা, ৫০-৬০ টাকা কেজির চালসহ অন্যান্য উচ্চমূল্যের ভোগ্যপণ্য তারা কিনতে পারবে তো? যারা বেকার, যারা নতুন বেকার হচ্ছে, তাদের কী হবে? অবসরপ্রাপ্ত মানুষ, বেওয়া-বিধবা, সাধারণ মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তের অবস্থা কী দাঁড়াবে? তাদের আয় বাড়ানোর ব্যবস্থা কী? এখানেই কি আটকে গেছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো? সাধারণ আমানতকারীরাই কি প্রকারান্তে আরেক পক্ষে পরিণত হয়েছে? যদি তা-ই হয়, তাহলে কি সঞ্চয়কারীদের স্বার্থ রক্ষা করে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় কোনো ব্যবস্থা করা যাবে?

 

আরএম দেবনাথ: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক