কানাডায় কয়েক মাস থাকাকালীন এখানকার কিছু কাঠামোগত সংস্কার আমাকে মুগ্ধ করেছে। সেসব বিষয় নিয়ে আজকের নিবন্ধ। প্রথমে কানাডার সড়কপথে যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়ে কিছু লিখব। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে এবং বাংলাদেশে দূষণের কারণ যে অপরিচ্ছন্নতা এবং অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনাই এজন্য দায়ী।
কানাডার বড় বড় শহর-উপশহর এমনকি গ্রাম এলাকার সড়কপথগুলো অত্যন্ত মজবুত ও মনোরম সাজে সজ্জিত করে নির্মাণ হয়েছে। মনে হয় যেন একেকটি রাস্তা একেকটি ছবি। কংক্রিটের ঢালাই ছয়-চার ফুট রাস্তার দুপাশে মজবুতভাবে গেঁথে আছে। সারি সারি নানা প্রজাতির রঙ-বেরঙের গাছগাছালি এবং মাঝেমধ্যে গভীর বনের সমাহার। নানা প্রজাতির পাখির সুমধুর কিচিরমিচির ডাক। মনে হয় যেন প্রকৃতির নির্মল বিশুদ্ধ বায়ু পাখিদের প্রাণচাঞ্চল্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। পুরো উত্তর আমেরিকা মহাদেশের দূষণমুক্ত আবহাওয়ার কারণেই রাস্তাঘাটগুলোর এত সজীবতা। গাছ আর বনের প্রতি এ দেশের সরকার ও জনগণের যে কী মায়া, তা না দেখলে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হবে না। কানাডার বৃক্ষপ্রেমিক, যারা গাছগাছালি নিয়ে গবেষণা করেন, তারা বলেছেন, পৃথিবীজুড়ে যত গাছপালা আছে, তার ১৫ শতাংশ রয়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ কানাডায়। এসব গাছগাছালি গভীর বনের সমাহার শহরের সড়কপথগুলোর সৌন্দর্য দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কানাডায় আমার দেখা কয়েকটি রাস্তার প্রবেশপথ, যেমন টরন্টো, অটোয়া, ১৬, আট ও ছয় লেনের এবং ডাউন টাউনের সড়কপথগুলো চার লেনের। ছোট শহর ও উপশহরের প্রবেশপথগুলো, উদাহরণস্বরূপ কুবেক প্রদেশের মনট্রিল, অ্যালবাটা প্রদেশের ক্যালগিরি, অনটারিও প্রদেশের হেমিলটন, বারলিংটন, লন্ডন, নায়াগ্রা ফলস এবং কানাডা ও আমেরিকার মিশিগান ডেট্রয়েড শহরের সীমান্তঘেঁষা কানাডারই একটি শহর উইনজারের সড়কপথগুলো আট, ছয় ও চার লেনে সাজানো হয়েছে। কানাডার ভিলেজ ও কমিউনিটি এরিয়ার সড়কপথগুলো দুই ও চার লেনের। এ দেশে একজন কৃষকের খামার বাড়িতে গাড়িতে যেতে হয়। প্রতিটি কৃষকের বাড়িতে যেতে রয়েছে চওড়া রাস্তা। আমাদের বাসা থেকে কৃষকের বাড়ির দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার যেতে সময় লাগে মাত্র ২০ মিনিট। আমরা প্রতি সপ্তাহে একবার গাড়িতে করে ওই কৃষকের বাড়িতে যেতাম অর্গানিক ডিম এবং আরো কিছু কৃষিপণ্য কিনতে। কানাডার প্রতিটি কৃষক ধনী পরিবারের সদস্য। নিজস্ব গাড়ি তো আছেই, এছাড়া পণ্য সরবরাহের জন্য রয়েছে তাদের একাধিক গাড়ি। স্বাস্থ্যবান্ধব এসব অর্গানিক ন্যাচারাল ফুড দামেও সস্তা। কানাডার বহু মানুষ এ ধরনের খামার বাড়ির নিয়মিত কাস্টমার। প্রতিটি শহর ও গ্রামাঞ্চলে রয়েছে এ রকম বহু খামার বাড়ি। বাড়িগুলোর নির্মাণ কাঠামো অতি চমত্কার। কানাডার রাস্তাগুলো এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে যানবাহন চলাচলে কোনো অসুবিধার সৃষ্টি না হয় এবং রাস্তায় যাতে যানজটের সৃষ্টি না হয়। যথাসময়ে যাতে যানবাহনগুলো পণ্য ও যাত্রী নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছতে পারে সেদিকে লক্ষ রাখা হয়েছে। এখানে সময়কে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়। অন্যদিকে দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য রাস্তাকে একাধিক লেনে বিভক্ত করা হয়েছে। অফিস ও আদালত পাড়া এবং বড় বড় শপিংমলসংলগ্ন সড়কগুলোয় একাধিক লেন করা হয়েছে। একটি শপিংমলে যেতে একাধিক রাস্তা। কানাডায় রাস্তার শেষ নেই। উপরে-নিচে (সাব ওয়ে) চারদিকে ঘিরে জনগণের দ্রুত চলাচলের সুবিধার জন্য রাস্তাগুলো এভাবে সাজানো হয়েছে। মেট্রোরেল, পাতাল রেলসহ সব ধরনের যানবাহন আছে। রাস্তার দুই পাশে পথচারীর জন্য পাঁচ ফুট বাই চার ফুট রাস্তা রয়েছে। এসব রাস্তা দিয়ে শুধু মানুষ চলাচল করে এবং সড়কের দুই পাশেই রয়েছে কানাডার জাতীয় গাছ ম্যাপল ট্রি। এছাড়া বিচিত্র সাজে সজ্জিত নানা প্রজাতির গাছ রয়েছে রাস্তার দুই পাশে, যা দৃষ্টিনন্দন। শহর-উপশহর ও গ্রামাঞ্চলে নিয়মমাফিক গড়ে তোলা হয়েছে আবাসিক প্রকল্প। সেখানে কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নেই। এমনকি কোনো ফুটপাত ব্যবসাও নেই। ফেরিওয়ালা নেই। দুই ও তিন চাকার কোনো গাড়ি নেই। খোলা ট্রাকও নেই। এগুলো কানাডার আইনে নিষিদ্ধ। কেনাকাটার জন্য বড় বড় সুপার মার্কেট ও অফিস-আদালতের জন্য ভিন্ন ভিন্ন জায়গা রয়েছে। কেনাকাটা ও কর্মস্থলে যেতে হলে অবশ্যই গাড়ি লাগবে। কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাসরত সবারই গাড়ি আছে। গাড়ি এ দেশে বিলাসসামগ্রী নয়, বরং বলা যায় অতি প্রয়োজনীয় সামগ্রী। এ দেশে গাড়ির দাম অধিকাংশ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা হয়েছে। কিন্তু গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অনেক বেশি। মাথাপিছু গড় আয় অনেক বেশি। তাই ক্রয়ক্ষমতাও বেশি। মাথাপিছু গড় আয় ৫২ হাজার মার্কিন ডলার। ফলে জীবনধারণ তেমন কষ্টকর নয়। কিন্তু অপরিসীম পরিশ্রম করতে হয়। কাজ আছে তো খাবার আছে। এখানে যারা নাগরিক, তিনি প্রধানমন্ত্রী বা ক্লিনার হলেও, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা সবার জন্য একই রকম। ছাত্রছাত্রীদের জন্য সরকারি বাড়িভাড়া এতটাই কম, যা ভাবা যায় না। এসএসসি পর্যন্ত লেখাপড়ার খরচ সরকার বহন করে। কানাডার প্রাইভেট কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার জন্য সরকার ঋণ দেয়। চাকরি করে মাসিক ভিত্তিতে টাকা পরিশোধ করার সুব্যবস্থা আছে। যে যত বড় চাকরি করুক না কেন কমিউনিটি বা এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই তাকে পড়তে হয়। বাংলাদেশে এ ধরনের নাগরিক সেবা কোনো কালে হবে কিনা সন্দেহ। হলেও আমরা তা দেখে যেতে পারব না। অলস জীবন যাপন করা কানাডায় একেবারেই অসম্ভব। আবাসিক ও অনাবাসিক প্রকল্পগুলো পৃথক রাখার মূল কারণ হলো শহর-নগর, বন্দর-গ্রাম সবকিছুকেই দূষণমুক্ত রাখা এবং শহরকে সাজিয়ে গুছিয়ে সুন্দর করে ছিমছামভাবে গড়ে তোলা। কানাডার সুপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শেখার বিষয়। দেশটির কোথাও কোনো বর্জ্য জমে আছে বা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এমন দৃষ্টিকটু দৃশ্য আমি দেখিনি।
দেখেছি
সব জায়গায়ই
একই নিয়মে
বর্জ্য অপসারণ
করা হচ্ছে।
আমি অনটারিও
লন্ডন শহরে
যে বাড়িতে
থাকতাম, সে বাড়ির গার্বেজ
(পেপার, প্লাস্টিক,
কার্ডবোর্ড, ক্যানস
ও বোতল)
রিসাইকেলিং করে তিন ভাগ করে ভিন্ন
রঙের তিনটি
পাত্রে রাখা
হয় এবং বর্জ্যের পাত্রের
মুখ শক্ত
করে বন্ধ
করে তা প্রত্যেক বাড়ির
বা বাসার
সামনের রাস্তার
পাশে নির্দিষ্ট
স্থানে রাখা
হয়। এসব রিসাইকেলিং বর্জ্যের
জন্য রয়েছে
ভিন্ন ভিন্ন
গাড়ি। সপ্তাহের
একেকদিন একেক
গাড়ি এসে ময়লা নিয়ে
যেত। গাড়িগুলো
উন্মুক্ত নয়। দেখতেও সুন্দর।
প্রথমে বুঝতে
পারিনি বর্জ্য
নেয়ার গাড়ি
এত সুন্দর
কী করে হয়। তারপর
বুঝতে পারলাম
এ দেশে
সবকিছুই দৃষ্টিনন্দন। বাংলাদেশে সড়ক মেরামতে
যে সময় নেয়, কানাডায়
তা অনেক
কম সময়ে
শেষ হয়। আমরা যে বাড়িতে থাকি,
সেই বাড়ির
ভাঙা রাস্তা
মেরামত করতে
সময় নিয়েছে
মাত্র চারদিন।
এ দেশে
বাড়ি ছোট হোক বা বড়, সামনে
বা পেছনে
একটি বাগান,
পাশাপাশি একাধিক
গাছ থাকা
চাই। বাগানে
কাজ করা থেকে শুরু
করে বাড়ির
আশপাশ পরিষ্কার
ও পরিচর্যার
দায়িত্ব তাদের,
যারা বাড়িতে
বসবাস করে।
এখানে কাজের
বুয়া নেই।
নিজের কাজ নিজেকেই করতে
হয়। সিটি
করপোরেশন যেসব
গাছ রাস্তার
দুই পাশে
লাগিয়েছে এবং যেসব গাছের
পাতা ঝরে যায় শীতকালে,
সেগুলোর ডালাপালা
কেটে ছোট করে দেন সরকারের কর্মচারীরা, যাতে যানবাহন ও মানুষের পথচলায়
ব্যাঘাত সৃষ্টি
না হয়। কিন্তু বাড়ির
সামনে যেসব
গাছ বাড়ির
মালিকরা লাগিয়েছেন,
তার সৌন্দর্যবর্ধনের দায়িত্ব বাড়ির মালিকদের
এবং রাস্তার
দুই পাশে
গাছের পাতা
ও বাড়ির
চারপাশের ময়লা-আবর্জনা পেপার
ব্যাগে জমিয়ে
তা বাড়ির
সামনে নির্দিষ্ট
স্থানে রাখার
দায়িত্ব বাড়ির
মালিকদের। কোন পাত্রে কোন ধরনের ময়লা
যাবে সেটা
সিটি করপোরেশন
থেকে বলে দেয়া হয়েছে।
তিন শ্রেণীর
ময়লার জন্য
রয়েছে তিন ধরনের গাড়ি।
প্রতি সপ্তাহে
বর্ণিত দিন-তারিখ ও নির্ধারিত সময় অনুযায়ী গার্বেজের
পাত্র প্রতিটি
বাড়ির সামনে
থেকে নিয়ে
যায়। সিটি
করপোরেশনের বর্ণিত
নিয়মের বাইরে
কারো কোনো
কাজ করার
সুযোগ নেই।
কেউ যদি নিয়ম ভঙ্গ
করে তাহলে
সিটি করপোরেশন
তার বিরুদ্ধে
কালক্ষেপণ না করে বড় ধরনের জরিমানা
বা গ্রহণযোগ্য আইনি ব্যবস্থা নেয়।
আইন তার নিজস্ব গতিতে
চলে বিধায়
এখানে বেআইনি
কাজকর্ম হয় না বললেই
চলে। ঘনবসতির
কারণে ধুলাবালি
ও জমে থাকা ময়লা
থেকে যে ভয়ানক দূষণ
সৃষ্টি হয়, সেটা কানাডার
সুপরিকল্পিত উপায়ে
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ
ও বর্জ্য
ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণের কারণে তা হয় না। ২০২১
সালের ৩ ডিসেম্বর অনটারিও
লন্ডন শহরে
বিকালে ভিক্টোরিয়া পার্ক দেখতে গিয়েছিলাম,
কারণ বড়দিন
উপলক্ষে এক মাসব্যাপী পুরো
কানাডায় বিশেষ
বিশেষ এলাকা
আলোক সজ্জিত
করা হয়েছিল।
পাশাপাশি বরফে
ঢাকা পার্কের
একটি অংশে
শিশু, কিশোর
ও বয়স্ক
মানুষ মাইনাস
৫ ডিগ্রি
সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কীভাবে আইস হকি খেলছে তা ভাবনার বিষয়।
বাংলাদেশ এত ছোট জায়গা, মাত্র ১ লাখ ৪৪ হাজার বর্গকিলোমিটারের ভূখণ্ড, কিন্তু মানুষ ১৬ কোটি। আগামী ১০ বছরে যা দাঁড়াবে ২৫ কোটি। এ রকম একটি জটিল অবস্থার দিকে আমরা ধাবিত হচ্ছি। বিশ্বে এ রকম একটি দৃশ্য আর কোথাও নেই। এরপর আমরা আবার সময়োপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ করছি না। আমরা মেনে চলছি না আইনকানুন। সচেতনতার প্রচণ্ড অভাব। বহুতলবিশিষ্ট কংক্রিটের ইমারত বানিয়ে ঢাকা শহরকে দূষণের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। টাকা রোজগারের জন্য কংক্রিটের আবাসনগুলো শুধু উপরের দিকে উঠছে। চারদিকে একটুও ফাঁক নেই। আলো-বাতাসহীন দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো এক অসুস্থ পরিবেশে রাত যাপন করতে হয় বাংলাদেশের মানুষের। আজ বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দূষণের দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে । বিশ্বের সবচেয়ে বেশি শব্দদূষণ ঢাকাতেই ঘটে। বধির হওয়ার সংখ্যা বেড়ে গেছে দেশের শব্দদূষণে। অযথা হর্ন বাজানো বাংলাদেশের গাড়িচালকদের বড় বদভ্যাস। ট্রাফিক সিগন্যাল ও জ্যামে আটকে থাকার সময় সামনে এগোনো যাবে না জেনেও হর্ন বাজান তারা। পথচারীকে লক্ষ্য করে প্রতিনিয়ত হর্ন বাজানো হয়। এটা দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে ফ্যাশনে রূপ নিয়েছে। সব কয়টি বিভাগীয় শহরে শব্দের মাত্রা ১৩০ ডেসিবল ছাড়িয়ে গেছে, যা স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে আড়াই থেকে তিন গুণ বেশি। কয়েক বছর আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের এক জরিপে এ তথ্য জানা যায়। কোন পথে যাচ্ছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ, তা আমরা খুব কম লোকই ভাবছি।
এক কথায় বলতে হয়, কানাডায় সবকিছুই নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে চলছে। ফলে পানি, বায়ু, মাটি, শব্দ ও পরিবেশ দূষণ থেকে দেশটি সম্পূর্ণ মুক্ত। এ দেশে কোনো ভিক্ষুক নেই। দু-একজন মানুষ দেখেছি রাস্তায় সাহেবি পোশাকে পিয়ানো বাজাচ্ছেন, সাদা কাগজে লেখা I am
homeless. এ দৃশ্য আমি নায়াগ্রা ফলসে দেখেছি। এ দেশের গরিব মানুষও হাত পেতে কিছু চাওয়ায় অপমান বোধ করে। কানাডার লন্ডন শহরে ওয়ালমার্ট সুপার মার্কেট, মেট্রো, হ্যাডসন অ্যান্ড বের মতো বড় বড় শপিংমলে ৮৫-৯০ বছর বয়সের মানুষকে কাজ করতে দেখেছি। সরকার যে বয়স্ক ভাতা দেয়, তা দিয়ে সংসার চলে না। তাই বেশি বয়সেও কাজ করতে হয়। এখানে কে বড় কে ছোট চাকরি করে—এ নিয়ে কোনো হিংসা, অহংকার বা গীবত নেই। সবাই একটি পরিবারের সদস্য হিসেবে কাজ করে। পাছে লোকে কিছু বলে—এ চিন্তা তাদের মধ্যে নেই। নিজ নিজ কাজ নিয়ে সবাই ব্যস্ত। অফিসে দুপুরে লাঞ্চের সময় সবাইকে এক জায়গায় বসে খেতে দেখেছি। এ দেশেও গরিবদের সাহায্য করা হয়। কিন্তু নীরবে, অর্থাৎ বিষয়টি অজানা থেকে যায়।
পুরো রাস্তা দখল করে কথা বলাকে কানাডার মানুষ অপছন্দ করে। চলার পথে ডান-বাম মেনে চলতে হয়। রাস্তায় কোনো ট্রাফিক পুলিশ দেখিনি। সবাই ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলে। ইউনিফর্ম পরিহিত আইন-শৃঙ্খলা কোনো বাহিনীর লোক রাস্তায় দেখিনি। কানাডা প্রাইভেট পড়াশোনা ও গবেষণায় অনেক এগিয়ে গেছে। কানাডার উন্নতির পেছনে টেকনোলজি নয়, বরং এ দেশের মানুষ মিথ্যা কথা বলে না—এটাই একমাত্র কারণ।
অ্যাম্বুলেন্স, মরদেহবাহী ও স্কুল বাস, ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি এলে ডানে-বামে চলমান গাড়িগুলো ধীরগতিতে চলে বা থেমে যায়। যদি কোনো বয়স্ক মানুষ রাস্তা পার হতে দেখে তখনো একই গতিতে গাড়ি থেমে যায়। মনে হয় কোনো এক অদৃশ্য শক্তি দেশটিকে এত নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে পরিচালিত করছে। একই দৃশ্য আমি ২০০৫ সালে হজের সময় মদিনায় দেখেছিলাম। সেই দৃশ্য ২০২১-এ কানাডায় এসে দেখলাম। প্রতিটি সুপার মার্কেট, পার্ক ও মানুষের সমাগম হয় এমন সব স্থানে ওয়াশরুম, টয়লেট প্রযুক্তির সর্বোচ্চ উপাদানে নির্মাণ করা হয়েছে। এসব পরিচর্যার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। মনে হয় যেন বাথরুমগুলো এই মাত্র নির্মাণ করা হয়েছে।
কানাডা বিশ্বের অষ্টম অর্থনৈতিক শক্তি। আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, জাপান, সৌদি আরব, ভারত, আরব আমিরাত, কাতার ইত্যাদি ধনী ও শক্তিশালী রাষ্ট্র কিন্তু সুখী নয়। বিষয়টি আমাদের বুঝতে হবে। সুখী দেশ হওয়ার মানবিক দিকগুলো ধনী দেশগুলোয় অনুপস্থিত বলেই তারা অসুখী।
হারুন-আর-রশিদ: গ্রন্থকার ও গবেষক










