মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় চলছে কঠোর লকডাউন। কাজকর্ম বন্ধ থাকায় আয়-রোজগারের পথ রুদ্ধ বিপুল শ্রমজীবী মানুষের। আর্থিকভাবে কষ্ট হচ্ছে তাদের। বিশেষ করে দিন এনে দিন খাওয়া মানুষগুলো ভুগছে বেশি। এমন এক প্রেক্ষাপটে লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য নতুন প্যাকেজ ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। এর আওতায় ৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারকে আড়াই হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা দেবে বলে খবর মিলছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বরাদ্দকৃত অর্থ উদ্দিষ্ট পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছে দেয়ার কথা। দ্রুত ও স্বচ্ছতার সঙ্গে ভালো উদ্যোগটির বাস্তবায়ন জরুরি।

বেশ কিছুদিন থেকেই দরিদ্র জনগোষ্ঠী তথা নিম্ন আয়ের মানুষ আর্থিক চাপে রয়েছে। চাল, তেল, পেঁয়াজ, শাকসবজিসহ নিত্যপণ্যের দাম এবার তুলনামূলক বেশি। কয়েক দফায় বেড়েছে এসব পণ্যের দাম। সর্বশেষ চলমান রোজা উপলক্ষে বেড়েছে আরেক দফা। এর মধ্যে চলছে লকডাউন। এর ফল দ্বিবিধ। একে তো অনেকের আয়-উপার্জন নেই, তার ওপর বাজারে পণ্যের দাম চড়া। স্বভাবতই তাদের ভোগান্তি এখন বহুগুণ। এ অবস্থায় ঘোষিত হারে সরকারের নগদ সহায়তা দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে বৈকি। তবে এর বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে যায় সুষ্ঠু বাস্তবায়নে। বলা হচ্ছে, প্রণোদনার অর্থ বিতরণ হবে গভর্নমেন্ট টু পাবলিক (জিটুপি) পদ্ধতিতে। এমএফএসের মাধ্যমে সরকারি সুফলভোগীদের কাছে অর্থ পাঠানো হবে। কিন্তু মূল শঙ্কা সুফলভোগী নির্বাচন নিয়ে। গত বছর সুফলভোগীর তালিকা তৈরিতে অনেক ত্রুটি ও অনিয়ম ছিল। তালিকা তৈরি করা হয়েছিল জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ইউএনও, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের সমন্বয়ে। ওই তালিকায়  কোনো কোনো ক্ষেত্রে সচ্ছল পরিবারকে অন্তর্ভুক্তি, অন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে সুবিধা নেয়া পরিবারকে সংযোজন, সরকারের পেনশনভোগী পরিবারকে যুক্ত করা এবং জনপ্রতিনিধিদের আত্মীয়স্বজনদের নাম অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ মেলে। এমনকি অস্তিত্বহীন নামের বিপরীতে কিছু জায়গায় অর্থ হাতিয়ে নেয়ার মতো অনিয়মও উঠে এসেছিল সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে। এসব কারণে প্রকৃত সুফলভোগীদের অনেকেই নগদ সহায়তা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। নতুন নগদ সহায়তা কার্যক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অতীতের পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়।

জরুরি আপত্কালীন সহায়তার পাশাপাশি প্রায় সারা বছরই রাষ্ট্রীয় তরফে দেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন হয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্থানীয় সরকারগুলো এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে। তাদের কাছে একটা ব্যাপকতর তালিকা আছে। আবার অনেক এনজিও প্রতিষ্ঠানও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে। তাদের কাছেও নাজুক জনগোষ্ঠীর একটি বিস্তৃত তালিকা বিদ্যমান। সময়ান্তরে হয়তো সেখান থেকে অনেকে বাদ পড়েছে, আবার অনেকে হয়তো তাতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার তালিকা পর্যালোচনা করে আলোচ্য নগদ সহায়তা প্রদানের জন্য হালনাগাদ নতুন তালিকা তৈরি করতে হবে। শুধু গ্রাম বা প্রত্যন্ত এলাকা নয়, শহরাঞ্চলেও এ সহায়তা দেয়া দরকার। শহরে নগর দারিদ্র্য একটা বড় ইস্যু। নগরের দরিদ্রশ্রেণীর কাছেও সহায়তা পৌঁছে দেয়া রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে নগর ও স্থানীয় সরকারগুলোর সহযোগিতা নেয়া চাই। আজকাল সব দেশেই সুফলভোগীর তালিকা প্রস্তুত এবং স্বচ্ছভাবে বিতরণের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে। ভারতসহ কিছু প্রতিযোগী দেশ এক্ষেত্রে বড় দৃষ্টান্ত। তাদের থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রযুক্তির মাধ্যমে এখানে একটি দুর্নীতিমুক্ত, নির্ভেজাল ও গ্রহণযোগ্য তালিকা প্রস্তুত করা সম্ভব। এদিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে।

চলমান পরিস্থিতিতে অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারও কষ্টে দিনাতিপাত করছে। তারা সংকোচে কারো কাছে সহায়তা যেমন চাইতে পারে না, আবার রাষ্ট্রীয় সহায়তা কার্যক্রমগুলোয় তাদের অন্তর্ভুক্তও করা হয় না। মহামারীতে এ ধরনের অনেক পরিবার দরিদ্রের সারিতে যোগ হয়েছে। তাদেরও সহায়তা দরকার। প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের যুক্ত করা সহজ হবে। এক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা আমলে নেয়া যেতে পারে। দেশটি একটি হটলাইন নাম্বার চালু করেছে। সেখানে সহায়তা প্রয়োজন হওয়া ব্যক্তিরা অনায়াসে ফোন করতে পারে। ফোন করলে রাষ্ট্রীয়ভাবে সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি বা পরিবারের প্রয়োজনীয় তথ্যাদি নিবন্ধন করা হয় এবং তার ভিত্তিতে যাচাই-বাছাইপূর্বক সহায়তা পৌঁছে দেয়া হয়। আমাদের দেশেও এটা অনুসরণ করা যেতে পারে। এতে সুফলভোগী নির্বাচনে স্বচ্ছতা যেমন আসবে, তেমনি প্রকৃত অভাবগ্রস্তরা পাবে সহায়তা। মহামারীতে প্রায় প্রতিটি দেশই তার জনগণকে আর্থিক সহায়তা জোগাচ্ছে। কাজেই বহির্বিশ্বের ভালো দৃষ্টান্তগুলো এখানে প্রবর্তন করা এখন সময়ের দাবি। দুঃখজনকভাবে, সুফলভোগীর তালিকা তৈরি এখনো আমলা ও দুর্নীতিগ্রস্ত জনপ্রতিনিধিদের ঘেরাটোপে বন্দি। তালিকা তৈরির এ প্রক্রিয়া নতুনভাবে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। এক্ষেত্রে কমিউনিটির কার্যকর সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। প্রক্রিয়াগত দুর্বলতাগুলো দূর না করলে অর্থের নয়-ছয় প্রতিরোধ করা কঠিন। কাজেই সুফলভোগী নির্বাচন থেকে শুরু করে বিতরণ পর্যায়ে আগে যেসব ত্রুটি বা দুর্বলতা ছিল, তা দূর করতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। দরিদ্রদের জন্য নতুন প্যাকেজ ঘোষণা নিঃসন্দেহে সময়োচিত। এখন সহায়তা যেন প্রকৃত সুফলভোগীরা পায়, তা নিশ্চিতের দায়িত্ব প্রশাসনের। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে উদ্যোগটি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টরা সচেষ্ট হবে, এটিই প্রত্যাশা।