বাংলাদেশ সরকার দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেছে, যার আকার প্রায় ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা এবং যেটি মোট জিডিপির ১৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এটি মূলত জন ব্যয়ের ওপর সরকারের প্রাক্কলিত উন্নয়ন ও সেবা পরিকল্পনা। প্রণীত বাজেট দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার সম্যক ধারণা দিলেও প্রকৃত অর্থনীতির জানান দেয় না, বরং বাজেটের অর্থ সংগ্রহের টেকসই উৎস ও বাজেটের যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই বাজেট প্রণয়ন ও রাষ্ট্রের অর্থনীতির প্রকৃত সক্ষমতার প্রমাণ মেলে। তবে অধিকতর গণমুখী উন্নত পরিকল্পনানির্ভর বাজেট যেকোনো দেশের ভবিষ্যৎ শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিনির্মাণে গুণগত ভূমিকা পালন করে। করোনা মহামারীর আঘাতে বিশ্বব্যাপী আর্থসামাজিক ব্যবস্থাপনার ব্যাপক পরিবর্তনের ফলে মানুষের জীবনাচরণেও আমূল পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। তাই গতানুগতিক ব্যবস্থাপনা থেকে বেরিয়ে এসে বাজেটে নতুনত্ব ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ খুবই অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে। ইসলাম একটি সর্বজনীন ও পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে সব মানুষের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিতকরণকে মৌলিক উদ্দেশ্য বিবেচনা করে। তাই ইসলাম যেকোনো ক্ষেত্রেই বাস্তবমুখী ও স্বভাবজাত পরিকল্পনা গ্রহণকে উৎসাহ দিয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে বাজেট প্রণয়নে গতানুগতিক পদ্ধতির পাশাপাশি ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনায় আনলে বাজেটের কার্যকারিতা ও উদ্দেশ্য অর্জন অনেকটাই ফলপ্রসূ হতে পারে। সে ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের প্রস্তাবিত বাজেট কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বুনিয়াদি পর্যালোচনার দাবি রাখে।

মানুষের জীবন পরিচালনাগত নানামুখী টেকসই কল্যাণ বা মাসলাহা নিশ্চিত করা ইসলামের দুনিয়াবি মৌলিক লক্ষ্য, তাই বাজেট প্রণয়নের প্রথম ধাপ হচ্ছে বাজেটকে রাষ্ট্রের সব মানুষের সামগ্রিক কল্যাণ উপযোগী করে প্রণয়ন করা। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, পণ্য কিংবা সেবা খাতকে অপ্রয়োজনীয় সুবিধার অধীনে না রেখে বাহুল্য ও প্রান্তিকতা পরিহার করে ইসলামের মধ্যম পন্থা নীতির অনুসরণে বাজেট প্রণয়ন করা এবং একই নীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্রের আয় ও ব্যয়ের সমন্বয়ে বাস্তবধর্মী বাজেট প্রণয়ন ও অবাস্তবায়নযোগ্য উচ্চাভিলাষী বাজেট থেকে নিবৃত্ত থাকা জরুরি। তবে প্রয়োজনের আলোকে বাজেটে খাতভিত্তিক প্রাধান্য দেয়াও ইসলামেরই ঐতিহাসিক অনুশীলিত নীতি। এক্ষেত্রে ফিকহুল আওলাউয়িয়্যাহ বা প্রাধান্য দেয়া নীতির আলোকে জনগুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো, যেমন দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো খাতগুলোর জন্য অতিরিক্ত তহবিল ও অন্যান্য সুবিধা বরাদ্দ দেয়াও মূলত ইসলামেরই নীতি ও কর্মকৌশল। তবে প্রণিধানযোগ্য খাত শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ফিক্বহুল আওলাউয়্যাহ নীতির পাশাপাশি ইসলাম আরো তিনটি মৌলিক নীতি প্রস্তাব করে। সেগুলো হচ্ছে জরুরিয়্যাত বা অতি গুরুত্বপূর্ণ, হাজিয়্যাত বা গুরুত্বপূর্ণ এবং তাহসিনিয়্যাত বা পরিপূরক। বাজেট প্রণয়নে জরুরিয়্যাত নীতি মূলত অগ্রাধিকার উপযোগী খাতগুলো শনাক্তকরণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। যেসব খাত মূলত রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, জীবন ও সম্পদ রক্ষা এবং দেশের জন্য উন্নত গুণাবলিসম্পন্ন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরির ক্ষেত্রে অপরিহার্য সেসব খাতকে জরুরিয়্যাতের ভিত্তিতে সবার আগে বরাদ্দের আওতায় নিয়ে আসা। পরবর্তী সময়ে যেসব খাত সার্বিকভাবে প্রয়োজনীয় কিন্তু উল্লিখিত খাতগুলোর চেয়ে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ, সেসব খাতকে হাজিয়্যাত নীতির অধীনে অন্তর্ভুক্ত করা এবং যেসব খাত গুরুত্ব বিবেচনায় উল্লিখিত দুটির কোনোটিরই সমপর্যায়ের নয়, বরং কিছুটা বিলাসিতা বা পরিপুরককেন্দ্রিক সেসব খাতকে তৃতীয় তথা তাহসিনিয়্যাত নীতির অধীনে রেখে বাজেট প্রণয়ন করা। যেহেতু করোনার কারণে পৃথিবীব্যাপী অর্থ ও জীবন ব্যবস্থাপনায় মানুষের আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, সেক্ষেত্রে শুধু আগের বাজেটগুলোর ওপর ভিত্তি করে বাজেট প্রণয়ন না করে বরং মহামারীর প্রভাবে বৈশ্বিক পরিবর্তনের সামগ্রিক চিত্র সামনে রেখে ইসলামের প্রস্তাবিত ফিকহুল ওয়াকে বা ‘পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনা’ নীতির আলোকে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন-পরিবর্ধন, সংশোধন, সংযোজন ও বিয়োজনের মাধ্যমে সার্বিকভাবে কল্যাণ উপযোগী বাজেট প্রণয়ন করা। বাজেট প্রণয়নে অন্যতম ইসলামী কৌশল হলো রাষ্ট্রের বিদ্যমান খাতগুলোর টেকসই কল্যাণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের সম্ভাব্য যেকোনো ঝুঁকি মোকাবেলায় দূরদৃষ্টিসম্পন্ন প্রস্তুতিমূলক বরাদ্দ। এক্ষেত্রে দুর্যোগ মোকাবেলায় ইউসুফের (আ.) প্রণীত নীতিগুলো অত্যন্ত কার্যকরী উদাহরণ হতে পারে। তিনি সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় প্রথমত জনগণকে টেকসই ও অতিরিক্ত শস্য উৎপাদনের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। দ্বিতীয়ত, স্বাভাবিক ও নিরাপদ সময়ে মিতব্যয়িতার নির্দেশনা দেন এবং তৃতীয়ত, আপত্কালীনের জন্য অতিরিক্ত শস্য গুদামজাত করে রাখার আদেশ দেন। কোরআনের সেই আয়াতটিও এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যেখানে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘আর প্রত্যেকের উচিত চিন্তা করে দেখা সে আগামীকালের জন্য কী প্রেরণ (জমা) করেছে।’ পারস্পরিক পরামর্শের আলোকে বাজেট প্রণয়ন করাও অন্যতম ইসলামী নীতিমালা। কোরআন বলছে, ‘আর কাজে-কর্মে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করো।’ তাই শুধু নির্দিষ্ট কিছু মন্ত্রণালয় বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত না করে বরং বিশেষায়িত দক্ষতার আলোকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে মুসলিমপ্রধান দেশ হিসেবে ধর্মীয় প্রতিনিধিত্বের দায়িত্বপ্রাপ্ত ইসলামী ফাউন্ডেশনকে বাজেট প্রণয়নে অন্তর্ভুক্ত করার নীতি গ্রহণ করা যেতে পারে।

বাজেট প্রস্তুতির ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী কিংবা প্রস্তাবিত বাজেটের নানা দুর্বলতা পর্যালোচনা করে দ্রুত সময়ের মধ্যে সে দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার যথাযথ পদক্ষেপ নেয়াও ইসলামী নীতিমালার অংশ। এক্ষেত্রে ‘সেই প্রজ্ঞাবান যে নিজের ব্যাপারে হিসাব করে এবং পরবর্তী সময়ের (জীবনের) জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে’ হাদিসটি মূলনীতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যেমন এরই মধ্যে প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি দেখানো হয়েছে প্রায় ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং মোট জিডিপির ৭ শতাংশ, পাশাপাশি এটি গত সংশোধিত বাজেট ঘাটতির তুলনায় প্রায় ১৩ দশমিক ৫ শতাংশেরও বেশি। ঘাটতি নিয়ে বাজেটের পূর্ণ বাস্তবায়ন অনেকাংশেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তবে অর্থনীতির রীতি অনুযায়ী বাজেট ঘাটতি নতুন কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বেকারত্ব দূরীকরণে ভূমিকা পালন করে কিন্তু বিষয়টি যতটা সরলীকরণ করে বলা হয়, আসলে ততটা সরল নয়। মূলত বাজেট ঘাটতি তখনই নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবে যখন নীতিনির্ধারকরা মনে করবে ঋণনির্ভরতা নয়, বরং নতুন আয় উৎস সৃষ্টি ও সেসব উৎস থেকেই এ বাজেট ঘাটতি পূরণ করবে। নচেৎ বাজেট ঘাটতি শক্তিশালী অর্থনীতি বিনির্মাণে একটি বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি, অতিরিক্ত করারোপ ও সরকারি ব্যয় সংকোচনের মতো সিদ্ধান্তের দিকে ধাবিত করে, যেটি একটি অসম বাজেটের প্রতিচ্ছবি হিসেবে বিবেচিত হয়। বাজেট ঘাটতি পূরণে নতুন অর্থ উৎস সৃষ্টির ব্যাপারে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো পরিকল্পনা চোখে না পড়লেও বরং যেসব খাত থেকে ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে এ ঘাটতি পূরণ করা হবে সেগুলো প্রস্তাবিত বাজেটে উল্লেখ রয়েছে। এক্ষেত্রে বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১ হাজার ২২৮ কোটি টাকা, অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা ও ব্যাংক থেকে ৭৬ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। উল্লেখ্য, শুধু বিদেশী ঋণের পরিমাণই গত বাজেটের বিদেশী ঋণের তুলনায় ৩৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ বেশি। আগের ন্যায় এই বিশাল ঋণের ওপর যদি সরকারকে ১০ শতাংশ (মূলত এটি আরো বেশি) সুদও আদায় করা লাগে তাহলে এটি গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় ২১ হাজার ৪৬৮ কোটি টাকা। যা অনেক মৌলিক খাতের পুরো বাজেটের পরিমাণের চেয়েও অনেক বেশি এবং আর্থিক খাতে ঝুঁকি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ব্যাপক সহায়ক। তার ওপর নির্ধারিত সময়ের ভেতর সে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে নতুন করে চক্রবৃদ্ধি হারে সুদের পরিমাণ বাড়তেই থাকবে, যেটি ভাঙা পা নিয়ে মরুভূমি পাড়ি দেয়ার মতো বিড়ম্বনা তৈরি করবে। নীতিনির্ধারকদের দাবি অনুযায়ী করোনাভাইরাসের অভিঘাতের কারণে রাজস্ব আদায়ে আশানুরূপ ফল না আসায় মূলত এত বিশাল পরিমাণ সুদভিত্তিক ঋণ গ্রহণের দিকে ঝুঁকতে সরকারকে বাধ্য হতে হয়েছে। কিন্তু সুদ যেহেতু একটি অনুৎপাদনশীল এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরিকারী খাত, সেক্ষেত্রে সুদের বিকল্প অর্থ উৎস সন্ধানের দিকে নজর দেয়াই প্রজ্ঞার পরিচয় হতো। এক্ষেত্রে প্রথমত বিদেশী ঋণনির্ভরতা কমিয়ে বরং বড় পরিসরে বিদেশী বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে ব্যাপক রাজস্ব আদায়ের দিকে মনোযোগ দিতে পারলে বাজেট ঘাটতি সংকোচনের পাশাপাশি ঋণনির্ভর বাজেট অনেকাংশেই কমে আসত। অন্যদিকে সঞ্চয়পত্র বা বন্ড থেকেও সরকার বাজেটের বড় একটি অংশ সংস্থান করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তবে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করলেও ঋণের মতোই তার বিপরীতে সরকারকে সুদ গুনতে হচ্ছে, অর্থাৎ এখানেও সংগৃহীত তহবিলের সঙ্গে অতিরিক্ত টাকা আদায় করতে হচ্ছে। আশার কথা হলো, এ সুদভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের বিকল্প হিসেবে সরকার এরই মধ্যে দেশে প্রথমবারের মতো সম্পদনির্ভর (অ্যাসেট বেসড) সুদমুক্ত ইসলামিক বন্ড বা সুকুক অনুমোদন করে। বিশ্বব্যাপী সুকুকের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে সুদভিত্তিক ঋণের বিকল্প সুদমুক্ত অর্থ আহরণের উৎস হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে সুকুক। ফলে ২০১৯ সালের শেষ নাগাদ বৈশ্বিক সুকুক স্থিতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫৪২ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশেষ করে মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ অনেক মুসলিম দেশের পাশাপাশি বেশকিছু অমুসলিম দেশ, যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও সিঙ্গাপুর সুকুকের মাধ্যমে তাদের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক সফলতা অর্জন করে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকার সুকুকের মাধ্যমে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহ করলেও সম্ভাবনার বিচারে এটি খুব সামান্য। প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কর প্রণোদনার মাধ্যমে এটিকে দেশে ও বিদেশে জনপ্রিয় করতে পারলে সুকুকের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের মাধ্যমেও সরকার দ্রুত সময়ের মধ্যেই সুদভিত্তিক বাজেট ঋণের চাপ থেকে অনেকাংশেই বেরিয়ে আসতে সক্ষম হবে। অন্যদিকে মুসলিমপ্রধান দেশ হলেও বাংলাদেশে জাকাত ব্যবস্থাপনা এখনো হ-য-ব-র-ল অবস্থায়। জাকাত আদায় ও বিতরণের মূল কর্তৃত্ব রাষ্ট্রের হলেও পদ্ধতিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে সরকার উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেট প্রণয়নের মতো অর্থনীতির মূল স্রোতে বিশাল অর্থ জোগানদানকারী এ খাতকে সংযুক্ত করতে পারছে না। সঠিক ব্যবস্থাপনার অধীনে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকার জাকাত আদায় সম্ভব। অথচ ইসলামী ফাউন্ডেশনের এক তথ্যমতে জানা যায়, ২০১৮ সাল পর্যন্ত গত দশ বছরে সরকারি ব্যবস্থাপনায় জাকাত বোর্ডের মাধ্যমে মাত্র ১৮ কোটি টাকার জাকাত আদায় হয়েছে, যেটি সম্ভাব্য আদায়যোগ্য জাকাতের পরিমাণ অনুপাতে শুধু গৌণ নয়, অনুল্লেখযোগ্যও বটে। তবে শুধু জাকাত নয়, ইসলামী অর্থনীতির অন্য খাতগুলো, যেমন আওক্বাফ ও উসরের মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে রাষ্ট্রের মূলধারার অর্থনীতিতে সংযুক্ত করতে পারলে সরকারের বাজেট ঘাটতি কাটিয়ে বরং উদ্বৃত্ত থাকার সমূহ সম্ভাবনা থাকবে। এদিকে বাজেট বরাদ্দ কমেছে প্রায় ১৩টি মন্ত্রণালয়ের, স্বল্পমেয়াদে এটি কল্যাণমুখী চিন্তা হলেও দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত। বরাদ্দ কমিয়ে দেয়ার অর্থ হচ্ছে এসব মন্ত্রণালয় প্রত্যাশিত উৎপাদনশীল নয়। মাথাব্যথায় মাথা কেটে না ফেলে বরং বিকল্প ব্যবস্থায় চিকিৎসা করাই কল্যাণকর। এক্ষেত্রে বরাদ্দ কমিয়ে দেয়া মন্ত্রণালয়গুলোকে নিজস্ব উদ্যোগে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে অর্থনৈতিক অবদান রাখার জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা সহযোগিতা ও প্রকল্প প্রণয়নে বাধ্য করতে পারলেই মূলত তারা উৎপাদনমুখী হওয়ার দিকে গুরুত্ব দেবে। যেমন ডাক ও পর্যটন খাত। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোয় ডাক বিভাগ ডাক যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত লাভজনক ও গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎস। সীমাহীন ব্যস্ততায় মানুষ সময় বাঁচানো এবং করোনার প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় অতিক্ষুদ্র ও বৃহৎ আকারের সম্ভাব্য সব ধরনের পণ্য ঘরে বসে কেনাকাটা করছে। প্রাতিষ্ঠানিক ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়িয়ে এ বিশাল সম্ভাবনাকে ডাক বিভাগ কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে কয়েক হাজার কোটি টাকার রাজস্ব সংযোজন করতে সক্ষম। অন্যদিকে বিশ্বের অনেক অর্থনৈতিক শক্তিশালী দেশের অর্থ উপার্জনের অন্যতম উৎস হচ্ছে পর্যটন খাত, এমনকি কোনো কোনো দেশের প্রধান আয়ের উৎস এ পর্যটন। প্রাকৃতিক নৈসর্গিক অনেক গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন শিল্প উৎসের পাশাপাশি মুসলিমপ্রধান দেশ হিসেবে হালাল পর্যটনের ব্যাপক চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে সরকার রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ব্যাপক রাজস্ব আহরণে সক্ষম হতে পারে। ঠিক একইভাবে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক সম্ভাবনাময় রাজস্ব উৎসের খাতগুলো শনাক্ত করে উপার্জন উপযোগী করতে পারলে শুধু বাজেট ঘাটতি নয়, বরং ঘাটতি কাটিয়ে সরকার আরো বড় আকারের সুষম বাজেট বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হতে পারবে।

অন্যদিকে স্বাস্থ্য-শিক্ষা ও প্রযুক্তি গবেষণা খাতে সব মিলিয়ে বাজেটের পরিমাণ মাত্র ১০০ কোটি টাকা। যেটি খাত দুটিতে অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন ও বিশ্বব্যাপী চাহিদার তুলনায় শুধু অপ্রতুল নয়, বরং একেবারেই নিগৃহীত নীতির প্রতিফলন। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব, করোনায় মানুষের প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন, ফাইন্যান্স ও অর্থনীতির নিরাপত্তাজনিত কারণে পৃথিবী যখন তীব্র গতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা,  ইন্টারনেট অব থিংকস, ব্লক চেইন, ক্লাউড ও বিগ ডাটা ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য ফিনটেক সেবার মতো ডিজিটাল রূপান্তরের দিকে ছুটে চলছে তখন প্রযুক্তি গবেষণা খাতের দুর্বল বরাদ্দ পিছিয়ে পড়ার ইঙ্গিত বহন করে। 

করোনার কারণে দেশব্যাপী মোট ৩ কোটি ৯৯ লাখ ৩৬ হাজার ৮৪৩ জন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন হুমকির মুখে পড়ে। শিক্ষায় সংকট নিরসনে সরকার অনলাইন ও সংসদ টেলিভিশনের মাধ্যমে দূরশিক্ষণ পদ্ধতি চালু করলেও বিদ্যুৎ বিভ্রাট, দারিদ্র্য, ইন্টারনেটের চড়া মূল্য, ডিভাইস ও নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ সুবিধার অভাবে প্রায় ৬৮ শতাংশ শিক্ষার্থীই এ দূরশিক্ষা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। অন্যদিকে দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অসচ্ছল শিক্ষার্থীরা শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি মানসিক অবসাদগ্রস্ত হয়ে মাদকাসক্ত হওয়া ও চুরি-ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল আকার ধারণ করেছে, যেটি ভবিষ্যতে আর্থসামাজিক অবক্ষয়ে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। এ অবস্থায় শিক্ষায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা প্রদান করার মাধ্যমে দ্রুত শিক্ষার্থীদের শিক্ষামুখী করা দরকার। তবে শিক্ষা খাতের অপর্যাপ্ত বাজেট এক্ষেত্রে কতটুকু কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো যেখানে শিক্ষা খাতে মোট বাজেটের ১৫-২০ শতাংশ ও মোট জিডিপির ৪-৬ শতাংশ বরাদ্দ করে, সেখানে বাংলাদেশের মোট বাজেটের মাত্র ২ শতাংশের মতো শিক্ষা খাতে বরাদ্দ। অথচ দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর শিক্ষা বাজেট বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। যেমন আফগানিস্তান (৪.১%), ভুটান (৬.৯%), মালদ্বীপ (৪.১%) ও নেপাল (৫.১%)। সে অনুযায়ী বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের বাজেট আশাজাগানিয়া বলা দুষ্কর।

দেশের মোট জনসংখ্যার প্রতি ১০ হাজারের জন্য সরকারি-বেসরকারি সব মিলিয়ে গড়ে মাত্র ৭ দশমিক ৫টি হাসপাতাল বিছানা, অপ্রতুল চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য সহযোগী নিয়েই চলছে দেশের স্বাস্থ্য খাত। করোনার প্রকোপে যেখানে আইসিইউ অনেকটা অপরিহার্য, সেখানে দেশের ৪৭টি জেলাতেই নেই কোনো আইসিইউ বেড। এ অবস্থায় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ও করোনা মোকাবেলায় থোক বরাদ্দ থাকলেও সেটা পরিস্থিতি ও প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। তার ওপর স্বাস্থ্য সরঞ্জামাদি ক্রয়ে অতীতে বিভিন্ন দুর্নীতির প্রতিবেদন ওই খাতের বরাদ্দ যথাযথ বাস্তবায়নে সন্দেহের উদ্রেক করে।

মূলত পরিস্থিতির আলোকে বাজেট প্রণয়ন এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে সর্বাধিক গুরুত্ব ও প্রাধান্য দেয়ার ভিত্তিতে বাজেট বরাদ্দ দিলে আশা করা যায় বাজেটের ফল প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছবে।

 

ড. মোহাম্মদ কবির হাসান: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিন্স, যুক্তরাষ্ট্র

মুহাম্মদ মোস্তফা হোসাইন শাহীন: পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব মালয়, মালয়েশিয়া