আইনস্টাইন একসময় আমাদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ‘মহাবিশ্ব নিয়ে ঈশ্বর কখনো জুয়া খেলেন না।’ কথাটি সত্য। তবে অদ্ভুত হলেও এটাও সত্য, রবিনহুডের মতো ফাইন্যান্স অ্যাপগুলোসহ (অনলাইন ট্রেডিং প্লাটফর্ম) একঝাঁক চতুর খেলোয়াড়ের দল রীতিমতো এখন আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।

নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকাভুক্ত মার্কিন ভিডিও গেম বিক্রেতা ‘গেমস্টপ’-এর শেয়ার ১ হাজার ৭০০ শতাংশ বৃদ্ধির ঘটনাটি হইচই ফেলে দেয়ার পাশাপাশি আরো একটি বিষয় তুলে ধরে, তা হচ্ছে অর্থনীতির মূল অংশগুলোর সঙ্গে এক ধরনের জুয়া খেলা শুরু হয়ে গেছে। যদিও গেমস্টপের শেয়ার ১ হাজার ৭০০ শতাংশ বৃদ্ধির ঘটনাটি খবরের শিরোনাম হওয়ার আগেই ইউএস কংগ্রেস থেকে হেজ ফান্ড নির্বাহীদের কাছে (সরাসরি এবং জুম ব্যবহারের মাধ্যমে) সাক্ষ্য দাবি করা হয়। 

নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত মার্কিন ভিডিও গেম বিক্রেতা গেমস্টপের একটি শেয়ারের দাম আগে যেখানে ছিল ৪৩ দশমিক শূন্য ৩ ডলার (৩ হাজার ৬৫৩ টাকা)। এ বছর জানুয়ারিতেই মাত্র সাতদিনের ব্যবধানে তা বিক্রি হয় ৩৪৭ দশমিক ৫১ ডলারে (২৯ হাজার ৫০৪ টাকা)। এর নেপথ্যে মূল ভূমিকা রাখে সামাজিক মাধ্যম ‘রেডিট’-এর চ্যাট ফোরাম ‘ওয়াল স্ট্রিটবেটস’ রিটেল ট্রেডাররা। এ ফোরামের মাধ্যমে রিটেল ট্রেডাররা নিজেরা গেমস্টপের শেয়ার কেনার পাশাপাশি অন্যদেরও তা কিনতে উৎসাহ জোগায়। এভাবে তারা শেয়ারের দাম বাড়াতে সমর্থ হয়। 

সামাজিক মাধ্যম দ্বারা প্রভাবিত গেমস্টপ ও এএমসি থিয়েটারের (হঠাৎ করে এদের শেয়ারের দাম চার গুণ বেড়েছে) লাগাম টানতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বিধায়ক এখন স্টক ব্যবসার ওপর নতুন করারোপের প্রস্তাব দিয়েছেন। মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স তার প্রস্তাবিত আইনের খসড়াটিকে অভিহিত করেছেন ‘ইনক্লুসিভ প্রসপারেটি আইন’ বলে। জন মেনার্ড কেইনস ও তার ইয়েল শিষ্য জেমস টবিন অবশ্য আর্থিক লেনদেন করের ধারণাটি অনেক আগেই চালু করেছিলেন। তবে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে অবশ্যই এর অনুমোদন দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ এ ধরনের কর আরোপ করা হলে তা শেয়ারবাজারে ভারসাম্য এনে যতটা না ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে, বিপরীতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের যন্ত্রণার কারণ হবে। এ অবস্থায় আমরা বরং আইনস্টাইনের আরো একটি উক্তির আশ্রয় নিতে পারি। উক্তিটি হচ্ছে—‘দূর থেকে ভয় দেখানো ভালো।’

নীতি প্রস্তাবনাগুলোর গুণাগুণ পরীক্ষা করার আগে প্রথমেই স্বীকার করছি রবিনহুডের মতো চটকদার অ্যাপগুলো স্টক ট্রেডিংকে ত্বরিত, সস্তা এবং লোভনীয় করে তোলে। ঝাঁ-চকচকে রঙ এবং ঘুরতে থাকা বিভিন্ন প্রতীক সহকারে রবিনহুডের অ্যাপ্লিকেশন এখন মেরিল লিঞ্চ ও বার্কলেস অ্যাপ্লিকেশনের সঙ্গে তুমুল প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এগুলো দেখে স্বাভাবিকভাবেই মনে হয় যে এর নকশা করা হয়েছে ‘ম্যাড মেন’ সিরিজের জন্য, যেখানে চরিত্রগুলো মধ্যযুগীয় সময়ে তৈরি আসবাবের ওপর বসে চাঁদে অবতরণের বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছে। যা-ই হোক, রবিনহুড তৈরি হয়েছে মূলত গেমারদের জন্য, যারা শিকারে অভ্যস্ত। অ্যাপেক্স লিজেন্ডসের মতো শুটার গেমে একে একে শত্রুদের খুঁজে বের করা কিংবা স্টক শেয়ারের দর কষাকষির জন্য খুচরা বিক্রেতাদের অনুসন্ধান করা হোক না কেন, গেমাররা স্ক্রিন চালু করার সময় স্বভাবসুলভ এক ধরনের তাড়না অনুভব করে। ফাইন্যান্স অ্যাপ রবিনহুডও এর ব্যবহারকারীদের দিয়ে ঠিক এ কাজটিই করিয়ে নেয়। কয়েক বছর আগে আমি স্প্রোগলিট নামে শিক্ষাবিষয়ক একটি গেম অ্যাপের সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে কাজ করি। অ্যাপটি শিশুদের অংক শিখতে সাহায্য করে। কাজটি করতে গিয়ে আমি জানতে পারি গেম ডেভেলপাররা কীভাবে আপনার মনকে প্ররোচিত করার ফাঁদ পেতে রাখে। তারা আপনার মনোযোগ ধরে রাখার গোপন কৌশলগুলো এমন সূক্ষ্মতার সঙ্গে প্রয়োগ করে এবং তৃপ্তির মাত্রাকে প্রভাবিত করে যে আপনি চাইলেও খেলাটি ছেড়ে বের হতে সমর্থ হন না। কোনো না কোনোভাবে আপনি বারবার তাদের নিপুণভাবে পেতে রাখা একের পর এক ফাঁদে পড়ে সে চক্রে ঘুরপাক খেতে থাকেন। তারা আপনাকে পুরস্কৃত করে। খেলোয়াড়দের সামনে উত্তেজনাপূর্ণ মহাকাব্যিক মিশনে নামার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। তারপর অপ্রত্যাশিত জয়ের ঘোরগ্রস্ত এক নেশা চাপিয়ে দেয়। প্রত্যেকবার আপনি যখন জয়ের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যান তখন হঠাৎ আরো দুর্বোধ্য কোনো প্রতিবন্ধকতা এসে হাজির হবে কিংবা পর্দায় ভেসে উঠবে নতুন কোনো লোভনীয় পুরস্কার, যা খেলোয়াড়দের মন ও মস্তিষ্কে নতুন এক তাড়না তৈরি করে। রবিনহুড এ কৌশলগুলো জানে; এর বিনিময়ে তারা পকেটে ভরে মোটা অংকের মূলধন।

কোটি কোটি মানুষ গেম খেলতে উত্সুক। তাই রবিনহুডের ঘটনাগুলো এড়ানোর উপায় নেই। বরং এটি অনিবার্য। বিবেচনা করুন, ভিডিও গেম কল অব ডিউটির নতুন একটি সংস্করণ আসার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে তিন কোটি খেলোয়াড় সেখানে যুক্ত হয়েছে। মিলেনিয়াল ও জেন জেড প্রজন্ম বড় হয়েছে ভিডিও গেম খেলতে খেলতে। ভিডিও গেম ওয়ার্ল্ড অব ওয়ারক্রাফটের একটি পর্ব আসার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই তা বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রীত পণ্যে পরিণত হয়। এমনকি স্টার ওয়ার্স চলচ্চিত্রের চেয়েও এর চাহিদা বেশি। মহামারীর বছরেও ভিডিও গেম হলোর সিক্যুয়াল আসার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তা বিক্রির পরিমাণ অন্যতম জনপ্রিয় মিউজিক্যাল হামিলটনের বিক্রীত টিকিটের চেয়ে বেশি। অনেকেই এটা বলে নাক সিটকান যে তারা একজন গেমারে পরিণত হওয়ার মতো অতটা নির্বোধ বা বোকা নন, তারা বরং অনেক বেশি ছিমছাম ও পরিশীলিত। সত্যিই কি তাই? প্রতিবার আপনি যখন স্টারবাকসে কোনো বিশেষ পুরস্কার কার্ড ব্যবহার করেন, আপনি তখন একজন গেম খেলোয়াড়ের খাতায় নাম লেখান। কফি কেনার মাধ্যমে একটি ‘স্টার’ সংগ্রহ করেন। এভাবে আরো কয়েকটি ‘স্টার’ সংগ্রহের মাধ্যমে আপনার মধ্যে এক ধরনের বিনা মূল্যে এক কাপ কফি খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। বিমানে অতিরিক্ত ফ্লাইটের বিপরীতে গ্রাহককে সিলভার, গোল্ড কিংবা প্লাটিনাম খেতাব দেয়া হয়। আপনি যখন এ প্রক্রিয়াটিতে শামিল হবেন, তখন থেকেই কিন্তু আপনিও একজন খেলোয়াড়ের ভূমিকাই পালন করছেন। কর্মী আকর্ষণের জন্য কোম্পানিগুলোও এ ধরনের গেম চালু করেছে। বিশ্বখ্যাত প্রসাধনী ব্র্যান্ড ল’রিয়েল যেমন নিয়ে এসেছে ল’রিয়েল ব্র্যান্ডস্ট্রম। যেখানে ছুড়ে দেয়া হয়েছে নতুন পণ্য উদ্ভাবন ও প্যাকেজিংয়ে বৈচিত্র্য আনার নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ ।

সুতরাং গেমিং যদি আমাদের প্রভাবিত করে বিভিন্ন কায়দায় কাজ হাসিল করে নেয় এবং আমাদের সুকৌশলে ফাঁদে ফেলে, সেক্ষেত্রে শেয়ার ব্যবসা কি নিয়ন্ত্রণ করা উচিত নয়?

এক কথায় উত্তর হলো, না। ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে লেনদেনের ওপর কর বসালে হিতে বিপরীতই হবে। এতে শেয়ারের চূড়ান্ত মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি দীর্ঘায়িত হয়ে বিষয়গুলোকে আরো খারাপ করে তুলবে।

তাছাড়া ইতিহাস অনুসারে লেনদেন কর প্রায়ই ব্যাকফায়ার হয়, কারণ এটি তারল্য সংকোচন করে প্রস্তাবিত মূল্য ও দামের মধ্যে একটি বিস্তৃত ব্যবধান তৈরি করে। ১৯৮৪ সালে বন্ড ও শেয়ার লেনদেনের ওপর সুইডেন কর আরোপ করে। তখন অর্ধেকেরও বেশি সুইডিশ ব্যবসা স্টকহোম থেকে তারল্য সরিয়ে নিয়ে লন্ডনে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৯১ সালে সুইডেন তাদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার পর দেশটির শেয়ারবাজারে শান্ত অবস্থা ফিরে আসে বা বলা যায় শেয়ারবাজার আরো বিচক্ষণতার সঙ্গে কাজ করতে শুরু করে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ-জাতীয় কর প্রত্যাহার করেছে জার্মানি, জাপান ও নেদারল্যান্ডসের মতো দেশ। বিপরীতে অসহায় ভেনিজুয়েলা ২০১৫ সালে অনুরূপ কর চালু করে। ফলে পুঁজি পাচার আর উচ্চ মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে দেশটির শেয়ারবাজার প্রায় বিলুপ্ত হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

গেমস্টপের ব্যাপক উত্থান ও পতনের নেপথ্যে ইন্ধন জুগিয়েছে সোস্যাল মিডিয়া, চাকচিক্যময় গ্রাফিকসের উপস্থিতি এবং অবশ্যই সুকৌশলে প্রদত্ত চাল। তবে এ ধরনের পরিস্থিতিটি এখন সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে। এটি যত দ্রুত শেষ হবে ততই মঙ্গল। আর তা ঝোঝার জন্য আইনস্টাইনের দরকার পড়ে না।

[স্বত্ব:
প্রজেক্টসিন্ডিকেট
]

 

টড জি বাকলস: সাবেক পরিচালক, অর্থনৈতিক নীতি, হোয়াইট হাউজ এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক, টাইগার ম্যানেজমেন্ট হেজ ফান্ড

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস