তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতায় তথ্য আজ অনেকটাই ব্রহ্মাস্ত্রের মতো হয়ে গেছে। একদিকে এটি আশীর্বাদস্বরূপ, অন্যদিকে অভিশাপময় অর্থাৎ উভয় রূপ বিদ্যমান আছে এতে। এ সময়ে মানুষের সবচেয়ে বড় অস্ত্র আর দুর্বলতা হচ্ছে নিজেদের তথ্য। আজকের বিশ্বে যে যত বেশি ও হালনাগাদ তথ্যে নিজেকে এগিয়ে রেখেছে বিশ্বে তার অবস্থান ততটাই এগিয়ে। সার্ভিল্যান্স ক্যাপিটালিজম বা নজরদারির পুঁজিবাদ হলো একটি নতুন অর্থনৈতিক মডেল, যা মানুষের ব্যক্তিগত ডাটা বা তথ্য সংগ্রহ এবং সে তথ্যের ব্যবহারপূর্বক শোষণমূলক ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। মডেলটিতে ব্যবসায় বড় কোম্পানি বা সংস্থাগুলো মানুষের অনলাইন এবং অফলাইন আচরণ, কার্যকলাপ, পছন্দ ও অপছন্দ প্রায় সব বিষয় সম্পর্কে ডাটা বা তথ্য সংগ্রহ করে এবং তারপর সে তথ্য ব্যবহার করে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাদের পণ্যদ্রব্য বিক্রি বা প্রচার করা হয়। যেমন কেউ কোনো সার্চ ইঞ্জিনে নিজের অসুস্থতার উপসর্গ নিয়ে সার্চ করলে সে তথ্য যদি কোনো ওষুধ কোম্পানির কাছে পৌঁছে যায় এবং সেটা দিয়ে তাদের নিজস্ব ওষুধের বিজ্ঞাপন ব্যক্তির কাছে বিজ্ঞাপন আকারে সামনে আনতে পারাটাই এই মডেলের ক্ষুদ্র পরিসরের উদাহরণ।

এক যুগ ধরে বাংলাদেশে ইন্টারনেট সহজলভ্যতা এবং ইন্টারনেটভিত্তিক প্রযুক্তির সহজে প্রাপ্তি আমাদের ইন্টারনেট জগতের অন্যতম অংশ করে তুলেছে। তাই নজরদারির পুঁজিবাদ বাংলাদেশে একটি নতুন চিন্তার বিষয় হিসেবে চিন্তার জগতে ধরা দিয়েছে। দেশের ক্রমবর্ধমান জনগণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিত্যদিন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে। এর মানে হচ্ছে, বাংলাদেশীদের সম্পর্কে প্রচুর পরিমাণে ব্যবহৃত তথ্য রয়েছে, যা বড় কোম্পানিগুলো সংগ্রহ এবং সেগুলো নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। আরো বড় চিন্তার কারণ বাংলাদেশের বেশির ভাগ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নিজেদের তথ্য নিয়ে খুব একটা সচেতন নয়। আর এ নিয়ে সামাজিক পর্যায়ে আলোচনাও খুব বেশি হয় না। 

নজরদারির পুঁজিবাদ নিয়ে বেশ কয়েকটি উদ্বেগজনক চিন্তার জায়গা রয়ে গেছে। তার অন্যতম একটি হলো, এটি মানুষের ব্যবহার-আচরণকে প্রভাবিত করতে তথ্যের ম্যানিপুলেশনের মাধ্যমে ব্যবহার হতে পারে, কোম্পানিগুলো তাদের সাধারণ মানুষের চাওয়া, ইচ্ছা ও পছন্দকে প্রভাবিত করার জন্য সংগ্রহ করা তথ্যেরে ভিত্তিতে সুনির্দিষ্টভাবে ডিজাইন করা বিজ্ঞাপন টার্গেট করে লক্ষ্য আদায় করতে ডাটা ব্যবহার করতে পারে। এটি মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং এর ফলে বৈষম্য সৃষ্টি হতে পারে। অর্থাৎ এতে তথ্য ব্যবহারকারীরা অতিরিক্ত সুবিধা ভোগ করবে, অন্যদিকে যারা ডাটা ব্যবহার করছে না তারা পিছিয়ে থাকবে। 

নজরদারির পুঁজিবাদের আরেকটি চিন্তার বিষয় হলো, এটি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কমিয়ে দিতে পারে। আসলে কোম্পানিগুলো যখন মানুষের সম্পর্কে ডাটা সংগ্রহ করে, তখন তারা মূলত মানুষের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে, যা মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এমন অনুমতিহীনভাবে গোপনে তথ্য সংগ্রহ করা এবং সেই তথ্য ব্যবহার করে মানুষের গতিবিধি ট্র্যাক করা, তাদের কার্যকলাপকে বিশ্লেষণ ও নিরীক্ষণ করা এবং মানুষের আচরণের পূর্বাভাস দেয়া যেতে পারে। এবং এতে সাধারণ জনগণ এমন অনুভব করতে পারে যে তারা ক্রমাগত পর্যবেক্ষণে রয়েছে—যেন কোনো আতসী কাচের নিচে রয়েছে তারা। তাদের কাছে মনে হবে তাদের সব কাজকর্মে নিজস্ব গোপনীয়তা হারিয়ে গেছে। 

নজরদারির পুঁজিবাদ যেকোনো সময় গুরুতর সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে, যার সমাধানে এখন থেকে আমাদের মনোযোগী হওয়া দরকার। জনগণের গোপনীয়তা রক্ষা ও কোম্পানিগুলো যাতে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার করতে না পারে সেজন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এখন থেকেই নিতে হবে। আর সেটা করার জন্য ব্যক্তিগত ডাটা সংগ্রহ এবং তার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে এমন আইন পাস করা দরকার। এছাড়া নজরদারির পুঁজিবাদের ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষকে শিক্ষিত ও সমাজে সচেতনতা গড়ে তোলা যেতে পারে।

উল্লিখিত বিষয়গুলো ছাড়াও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নজরদারির পুঁজিবাদ সম্পর্কে উদ্বিগ্ন হওয়ার বিষয় রয়েছে। যেমন ভিন্নমত ও রাজনৈতিক বিরোধিতা দমনে নজরদারির পুঁজিবাদের ব্যবহার করা, নারী ও সংখ্যালঘুদের মতো দুর্বল জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করার জন্য নজরদারির পুঁজিবাদের ব্যবহার, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকে ক্ষুণ্ণ করার জন্য নজরদারি পুঁজিবাদের ব্যবহার, নজরদারির পুঁজিবাদ বাংলাদেশের মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য মারাত্মক হুমকি হতে পারে। তাই এ সমস্যা সমাধানে সরকারকে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।

বাংলাদেশে এ সমস্যার কিছু সম্ভাব্য সমাধান আমরা করতে পারি সেগুলো হলো, সরকার এমন আইন পাস করতে পারে যা ব্যক্তিগত ডাটা সংগ্রহ ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করবে। এ আইনগুলো কোম্পানিকে ডাটা সংগ্রহের আগে সম্মতি নিতে বাধ্য করতে পারে এবং এ আইন কোম্পানিগুলোকে ডাটা সংগ্রহ ও সঞ্চয় করার পরিমাণকেও সীমাবদ্ধ করতে পারে। এছাড়া সরকার এর ঝুঁকি সম্পর্কে জনগণকে শিক্ষিত করতে পারে। জনসচেতনতামূলক প্রচারণা, স্কুল প্রচারণা প্রোগ্রাম এবং অন্যান্য উদ্যোগের মাধ্যমে এ সচেতনতার জ্ঞানকে ছড়িয়ে দেয়া যেতে পারে। সরকার গোপনীয়তাবর্ধক প্রযুক্তির উন্নয়নে সহায়তা করতে পারে। অর্থাৎ যে প্রযুক্তিগুলো মানুষকে অনলাইনে তাদের গোপনীয়তা রক্ষায় সহায়তা করবে। এসব পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে সরকার মানুষের গোপনীয়তা রক্ষা এবং কোম্পানিগুলোকে ব্যক্তিগত ডাটা সংগ্রহ করে শোষণমূলক ভুল ব্যবহার থেকে বিরত রাখতে সহায়তা করতে পারে।

নজরদারির পুঁজিবাদ বাংলাদেশের মানুষের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কমায় অনলাইনভিত্তিক কোম্পানিগুলো মানুষের সম্পর্কে আরো বেশি ডাটা সংগ্রহের সঙ্গে তাদের পক্ষে মানুষের গতিবিধি ট্র্যাক করা, তাদের ক্রিয়াকলাপকে পর্যবেক্ষণ করা, এমনকি তাদের আচরণের পূর্বাভাস দেয়া সহজ হয়ে যায়। এটি বাকস্বাধীনতা এবং মুক্তভাবে মতামত প্রকাশে গভীরভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। একাডেমিক গোপনীয়তার তত্ত্বগুলো বলছে যে মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রয়োজনীয়তা এবং ব্যক্তিগত স্বায়ত্তশাসনের মধ্যে এক ধরনের সম্পর্ক রয়েছে। আর বৈষম্য বাড়তে পারে কোম্পানিগুলো যেহেতু মানুষের পছন্দকে প্রভাবিত করতে পারে সুনির্দিষ্ট ডিজাইন করা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে হাতে থাকা তথ্য দিয়ে। তাই ডাটা নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে যেকোনো বিষয়ে মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলা সম্ভব। যেমন কোম্পানিগুলো তাদের জাতি, লিঙ্গ বা অন্যান্য ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তাদের পণ্যগুলোর বিজ্ঞাপন নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে প্রচার করতে পারে। কিন্তু এর ফলে কিছু মানুষ নির্দিষ্ট পণ্য বা পরিষেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারে আর যাদের এ ধরনের বিজ্ঞাপন নেই তারা ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নজরদারির পুঁজিবাদ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংবিধান স্বীকৃত অধিকার নষ্ট করে, তাই এটি গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী আর তাই একাডেমিক গণতান্ত্রিক তত্ত্বগুলো দেখায় যে স্বায়ত্তশাসন ও গণতন্ত্রের মধ্যে একটি পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ ব্যক্তিগত স্বায়ত্তশাসন গণতন্ত্রকে কার্যকর করার জন্য একটি অপরিহার্য শর্ত হিসেবে পাওয়া যায়। তাই তথ্যের মাধ্যমে মানুষের আচরণ পরিবর্তনের ফলে স্বায়ত্তশাসনের ক্ষতি হতে পারে, যা নজরদারি পুঁজিবাদের ক্ষেত্রে সহায়ক, কার্যকর গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের ওপর তা সরাসরি প্রভাব ফেলবে। সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত গণতন্ত্র ও গোপনীয়তা রক্ষার্থে অনুকরণীয় দেশ সুইজারল্যান্ড বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে কার্যকরভাবে সফল নীতি অবলম্বন করতে সক্ষম হয়েছে। রাষ্ট্রটি তার সংবিধানের অধীনে নাগরিকদের গোপনীয়তার অধিকার নিশ্চিত করেছে এবং প্রবিধান প্রণয়ন করেছে। সুইস ফেডারেল ডাটা প্রটেকশন অ্যাক্ট (ডিপিএ) ব্যক্তির সম্মতি ব্যতীত ব্যক্তিগত ডাটা প্রক্রিয়াকরণ নিষিদ্ধ করে। আমাদের সরকারকেও এমন শক্তিশালী আইন প্রণয়নের মাধ্যমে দেশের নাগরিক তথ্যের সুরক্ষায় উদ্যোগী হতে হবে। তাহলে নজরদারির পুঁজিবাদের হাত থেকে সাধারণ মানুষ নিরাপদ থাকবে। 


মো. আবিদ মঈন খান: সাংবাদিক