বিষয়টি বেশ আনন্দের ছিল যে অন্য অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশ আগেই করোনাভাইরাসের টিকা পায় এবং গণটিকাদান শুরু করে। যেহেতু কভিড-১৯ রোগের নিরাময় নিশ্চিত করার মতো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা এখনো উদ্ভাবিত হয়নি, সেহেতু এই অতিসংক্রামক মহামারী প্রতিরোধই হওয়া উচিত প্রথম অগ্রাধিকার। সংক্রমণ বিস্তার রোধের কার্যকর উপায়গুলো, যেমন সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করা, মাস্ক পরা, ঘন ঘন হাত ধোয়া এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় জনঘনত্বপূর্ণ এ দেশে বেশকিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে টিকাই সংক্রমণ প্রতিরোধের প্রধান সুযোগ নিয়ে এসেছিল। টিকার সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় তাতে ছেদ পড়ে। এখন কিছু টিকা হাতে আসায় সরকার আবার গণটিকাদান কার্যক্রম শুরু করছে। কিন্তু পর্যাপ্ত টিকার জোগান নিশ্চিত না হওয়ায় কার্যক্রম চলমান রাখা নিয়ে শঙ্কা রয়েই যাচ্ছে। দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকা দিতে হলে ২৬ কোটি ডোজ (১৩ কোটি লোক দুই ডোজ করে নিলে) টিকা প্রয়োজন, যার সরবরাহের নিশ্চয়তা এখনো মেলেনি। এ কারণে সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির এক বৈঠকে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। তারা বলছে, এ ধারায় চললে কাম্য জনগণকে টিকা দিতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে টিকার ঘাটতি মেটাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেই জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। 

জনগণের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। ‘কভিড ভ্যাকসিন পাসপোর্ট’ ইস্যু নিয়ে বিশ্বে আলোচনা শুরু হয়েছে। মহামারীর বিভীষিকা প্রতিরোধে উন্নত দেশগুলো সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে, এটিই স্বাভাবিক। টিকাকরণ ছাড়া বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, পড়াশোনার জন্য কোটি মানুষের বিদেশে যাওয়া হুমকিতে পড়ে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে। তাই টিকা সংগ্রহে উদাসীনতা দেখালে পরে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ২০২১ সালে প্রথম সারির ১০টি ক্যান্ডিডেট ভ্যাকসিনের সম্ভাব্য উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ১০ বিলিয়ন ডোজ। পুরো বিশ্বের ৭৫০ কোটি মানুষকে টিকা দিতে প্রয়োজন হবে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডোজ (প্রতিজনে দুই ডোজ)। তাই টিকা নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে ব্যাপক প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। অসম প্রতিযোগিতার কারণে নিম্নমধ্যম ও নিম্ন আয়ের ৯২টি দেশের কয়েক কোটি মানুষ কভিডের টিকা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় টিকা সংগ্রহের জন্য উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও গ্যাভির মধ্যস্থতায় গঠিত কোভ্যাক্স উদ্যোগটি উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে ন্যায়সংগত ভ্যাকসিন বিতরণের প্রাথমিক লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কোভ্যাক্সের উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রতিটি দেশে ২০২১ সালের মধ্যে জনসংখ্যার (উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী) ২০ শতাংশ মানুষকে টিকা প্রদান করা। দুর্ভাগ্যজনক অগ্রিম বুকিং প্রতিযোগিতার কারণে কোভ্যাক্স মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় পরিমাণে ডোজ সংগ্রহের জন্য কোভ্যাক্সের ওপর নির্ভর করা সুবিবেচনাপ্রসূত হবে না। কালক্ষেপণ না করে ভ্যাকসিন সংগ্রহে অগ্রিম বুকিংকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।   

পুরো জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনতে হলে গুটিকতক উৎস থেকে প্রাপ্ত টিকা দিয়ে তা সম্ভব নয়। যেসব উৎসের সঙ্গে টিকার ব্যাপারে চুক্তি হয়েছে, সেসব ক্ষেত্র থেকে চুক্তি অনুযায়ী টিকা পেলেও আমাদের সবাইকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হবে না। আমরা যদি দ্রুত পুরো জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় এনে গোষ্ঠীবদ্ধ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, তাহলে অবশ্যই অন্যান্য উৎস থেকে টিকা আনার ব্যবস্থা করতে হবে। নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতিক্রমে নিজেরা টিকা উৎপাদন করতে চাইলেও ব্যাপক প্রস্তুতি প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও জরুরি। টিকা উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল প্রয়োজন। শুধু কাঁচামাল পেলেই টিকা উৎপাদনে যাওয়া যাবে না। দরকার প্রযুক্তি সহায়তা। মনে রাখতে হবে করোনাভাইরাসের টিকা যত তাড়াতাড়ি আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে, আর কোনো টিকার ক্ষেত্রে এমনটি হয়নি। এক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রেখেছে পারস্পরিক সহযোগিতা।

মানসম্পন্ন কিন্তু দাম কম এবং সাধারণ তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা যায়, এমন অগ্রগামী টিকার অগ্রীম অর্ডার করতে কালবিলম্ব করা যাবে না। সরকারি অনুদানযুক্ত টিকা কর্মসূচির মাধ্যমে পুরো দেশে টিকা দিতে প্রায় ২০২৩-২৪ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। যাদের সামর্থ্য আছে তারা যেন বেসরকারি উদ্যোগের টিকা নিতে পারে, সেজন্য সরকারকে উদ্যোগ নেয়া উচিত। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোয় স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করে। জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বেসরকারি উদ্যোগ থেকে টিকা নেয়ার সামর্থ্য রাখে। সরকার এক্ষেত্রে ফার্মাসিউটিক্যাল বা যেকোনো বেসরকারি উদ্যোগে ভ্যাকসিন সংগ্রহের নীতি-নৈতিকতা, পলিসি বাতলে দিতে পারে। স্বল্প সময়ের মধ্যে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন পেতে বোতলজাত পদ্ধতিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া যেতে পারে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং মানসম্মত কোয়ালিটি নিশ্চিত করতে পারে এমন প্লাটফর্মগুলোকে সদ্ব্যবহার করার উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারি মধ্যস্থতায় বিভিন্ন ভ্যাকসিন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে পারলে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন সংগ্রহের বড় বাধা দূর হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে ভ্যাকসিনের ন্যায়সংগত বণ্টন আন্দোলনে বাংলাদেশকে বলিষ্ঠ ভূমিকা নিতে হবে।

দুই দশক ধরে ওষুধ শিল্পে বাংলাদেশের অগ্রগতি ব্যাপক। আমাদের দেশের ওষুধ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। এতে প্রমাণিত হয় ওষুধ উৎপাদনে আমাদের দেশের প্রাপ্তি অনেক। বাস্তবতা হলো, বেসরকারি কয়েকটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির যৌথভাবে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন উৎপাদনে সক্ষমতা রয়েছে। এখন সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করলে এর সুফলও দ্রুত পাওয়া যাবে। চীন ও রাশিয়ার টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান দুটির নিজের দেশের চাহিদা পূরণ করে অন্যদের চাহিদা অনুযায়ী টিকা সরবরাহ করার সক্ষমতা কম। সে কারণে তারা বাংলাদেশে টিকা উৎপাদনের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, তারা টিকা উৎপাদনসংক্রান্ত প্রযুক্তি সরবরাহ করবে এবং তার সহায়তায় বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো এ দেশেই টিকা উৎপাদন করবে। বিষয়টি যাচাই করে দেখা যেতে পারে। একই সঙ্গে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকাসহ অন্যান্য টিকার উৎপাদন, বোতলজাত করা যায় কিনা, তা খতিয়ে দেখা যেতে পারে।

সম্প্রতি অক্সফামের এক প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে, বিশ্বের ধনী দেশগুলো মোট উৎপাদিত ভ্যাকসিনের ৫১ শতাংশ এরই মধ্যে কিনে রেখেছে। এমন অসম প্রতিযোগিতায় শুধু পিছিয়ে পড়বে দরিদ্র দেশগুলো। কারণ টিকার মূল্য ও চাহিদা। উচ্চমূল্যের কারণে ধনী দেশগুলোর সঙ্গে পেরে উঠবে না দরিদ্র দেশগুলো। তাই এক্ষেত্রে ধনী দেশগুলোকে শুধু নিজেদের কথা না ভেবে সবার কথা ভাবতে হবে। তবে ভালো খবর হলো, ধনী দেশগুলোর সঙ্গে যেন দরিদ্র ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোও চাহিদা অনুযায়ী ভ্যাকসিন পায়, সেটি নিশ্চিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। যাদের অন্যতম টার্গেট দরিদ্রদের ভ্যাকসিন নিশ্চিত করা। তবে ভ্যাকসিন নিয়ে যেন বিশ্বে রাজনীতি না হয়, সেই প্রত্যাশা সবার। বিশেষ করে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো যেন কম দামে বা বিনামূল্যে ভ্যাকসিন পায়, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের টিকা গ্রহণের বর্তমানের গতির সঙ্গে সংগতি রেখে হাতে প্রয়োজনমাফিক টিকা আছে। কিন্তু টিকাদানের গতিটা আরো বাড়াতে হবে এবং তখনই টিকার চাহিদা বাড়বে। এক্ষেত্রে নতুন নতুন উৎস থেকে টিকা পাওয়ার ক্ষেত্রে যাতে অগ্রগতি হয়, এখন সেটাই জরুরি কাজ। ভবিষ্যতে টিকা কার্যক্রম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে—এ শঙ্কা যেহেতু রয়েছে সেহেতু টিকা সংগ্রহ ও দেশে উৎপাদন এই উভয় প্রক্রিয়াই সময়ক্ষেপণ না করে গতিশীল করতে হবে। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। এর জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরো জোরদার করতে হবে।