বিশ্ববাজার করোনা মহামারী ও রাশিয়া-ইউক্রেন  যুদ্ধের কারণে অস্থির, ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণের জীবিকা নির্বাহ দিন দিন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছে। এ অবস্থায় ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির জন্য নানা দিক সামাজিক ফোরামে আলোচনা তুমুল পর্যায়ে। কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২২ সালে বাংলাদেশের ন্যূনতম মজুরি মাসিক গড়ে ৮ হাজার টাকা ছিল, যা ৭৪ দশমিক ৭২৬ মার্কিন ডলার অপরিবর্তিতভাবে রয়েছে। কর্মচারীদের ন্যূনতম মজুরির সর্বোচ্চ হার ছিল মাসিক ৮ হাজার ১০০ টাকা এবং সর্বনিম্ন মাসিক ৫ হাজার ৩০০ টাকা। যেহেতু শ্রম ও মজুরির মধ্যে  সম্পর্ক একটি অন্যটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ন্যূনতম মজুরি শ্রমবাজার আইন ও বিধানে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একদিক, যা শ্রমজীবীদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতের জন্য তৈরি করা হয়েছে। দ্রুত বর্ধনশীল কর্মসংস্থান খাত এবং স্বল্প মজুরির শ্রমিকদের একটি উল্লেখযোগ্য অনুপাত দেখা যায় আমাদের বাংলাদেশে, তবে ন্যায্যতার খাতিরে ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো হবে কিনা এ প্রশ্ন সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এ লেখনী দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে বাংলাদেশের কর্ম ও চাকরি খাতে ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর উপকারিতা ও অসুবিধাগুলো অন্বেষণ করার প্রয়াস মাত্র। 

প্রথমেই আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ন্যূনতম মজুরির বৃদ্ধির সুফলগুলো দেখা যাক— 

ক) দারিদ্র্য বিমোচন এবং উন্নত জীবনযাত্রার মান: ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর অন্যতম প্রধান সুবিধা হলো দারিদ্র্য হ্রাস করার পাশাপাশি নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার সম্ভাবনা তৈরি হয়ে থাকে। উচ্চ ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করে যে শ্রমিকরা তাদের মৌলিক চাহিদাগুলোকে পূরণ করতে সক্ষম হন, আর এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ তৈরিতে উৎসাহিত করে এবং মানুষের সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান উন্নত করে। 

খ) বর্ধিত কর্মশক্তি অনুপ্রেরণা দেয়া এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিকরণ: মজুরি বাড়ানোর মাধ্যমে নিয়োগদাতারা শ্রমিকদের আরো ভালোভাবে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করতে পারে, যার ফলে কর্মে উৎপাদনশীলতা এবং দক্ষতা উভয়ই বৃদ্ধি পায়। এছাড়া মজুরির মাধ্যমে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ কর্মচারীদের নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার জন্য এক ধরনের প্রণোদনা রূপে কাজ করতে পারে, যার ফলে কাজের আউটপুট মানসম্মতভাবে উন্নত হয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটে। 

গ) আয়বৈষম্য হ্রাসকরণ: উচ্চহারে ন্যূনতম মজুরি আয় বৈষম্য হ্রাস করতে সহায়তা করে, যা প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের শ্রমবাজারে ভারসাম্য ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আয়ের ব্যবধান কমিয়ে এনে, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির মাধ্যমে সম্পদের আরো ন্যায়সংগত বণ্টনে অবদান রাখে এবং সামাজিক সংহতিকে উৎসাহিত করে। 

ঘ) ভোক্তা চাহিদা সম্প্রসারণ: যখন কম মজুরির শ্রমজীবীরা বেশি উপার্জন করে, তখন তাদের ক্রয় সক্ষমতা বাড়ে, যার ফলে ভোক্তাদের চাহিদাকে উদ্দীপক রূপে এটি কাজ করে থাকে। ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধি হওয়ার কারণে দেশের ব্যবসাগুলো উপকৃত হয় এবং সেটি সার্বিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক তরঙ্গ প্রভাব তৈরি করে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখে। 

ঙ) চাকরি কাজের খাতের আনুষ্ঠানিকতা: ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির ফলে অনানুষ্ঠানিক শ্রমের প্রসারকে নিরুৎসাহিত করে এবং চাকরি খাতের মধ্যে আনুষ্ঠানিকতাকে প্রচার করে। আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান শ্রমজীবীদের আইনি সুরক্ষার পথ দেয়, যেমন সামাজিক সুরক্ষা বেনিফিট, নিরাপদ কাজের পরিবেশ এবং ক্যারিয়ার বৃদ্ধির পথ, যার ফলে সামগ্রিক শ্রমবাজার উন্নত হয়। 

এবার দেখা যাক ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির অসুবিধা  কী কী হতে পারে। 

ক) ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর বোঝা: ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত প্রাথমিক উদ্বেগের বিষয়গুলোর মধ্যে একটি হলো এটি ছোট ব্যবসাগুলো ওপর সম্ভাব্য বোঝা বৃদ্ধি করে। ক্ষুদ্র, মাঝারি আকারের ব্যবসাগুলো অর্থাৎ এসএমই খাত, যা বাংলাদেশে কর্মসংস্থান তৈরির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, তারা বর্ধিত শ্রম ব্যয় বহন করতে হিমশিম করবে। এর ফলে নিয়োগ কমে যাবে, এমনকি কিছু ব্যবসা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতেও থাকবে, যেজন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উভয়ই বাধাগ্রস্ত হতে পারে। 

খ) মূল্য স্তর এবং মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব: উৎপাদনশীলতার অনুরূপ উন্নতি ছাড়াই মজুরি বৃদ্ধি করা হলে সম্ভাব্যভাবে অতিরিক্ত উৎপাদন ব্যয় তৈরি হবে। এ বর্ধিত খরচের ক্ষতিপূরণ করতে ব্যবসাগুলো উৎপাদনকৃত পণ্যদ্রব্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে, যার ফলে মূল্যস্ফীতি দেখা যেতে পারে। 

গ) শ্রমনিবিড় শিল্পে চাকরি হারানোর আশঙ্কা: শ্রমনিবিড় শিল্প, যেমন টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রির উচ্চশ্রম ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য করার ক্ষেত্রে ব্যাপক মাত্রায় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে। এসব খাতের নিয়োগকর্তারা কম শ্রম ব্যয়ের জন্য অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় মেশিন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শ্রমে ঝুঁকে যাবেন অথবা অন্য কম ব্যয়ের দেশগুলোয় আউটসোর্সিংয়ের আশ্রয় নিতে পারেন, যার ফলে বাংলাদেশের কর্ম ও চাকরি খাতে অনেকেরই চাকরি চলে যেতে পারে। 

ঘ) দক্ষতা উন্নয়নের জন্য প্রণোদনা: ন্যূনতম মজুরির উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি অনিচ্ছাকৃতভাবে কর্মীদের দক্ষতার উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করতে পারে। এতে কিছু নিয়োগকর্তা কম শ্রমিক বা কর্মী নিয়োগ করার জন্য এবং বর্ধিত মজুরি ব্যয়কে ন্যায়সংগত করার জন্য চাকরি দেয়ার ক্ষেত্রে অধিক দক্ষতা দাবি করতে পারেন। এটি ক্যারিয়ার শুরু করছে অর্থাৎ এন্ট্রি-লেভেল কর্মীদের জন্য সুযোগ সীমিত করবে এবং তাদের দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ারের সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিতে পারে। 

ঙ) সম্ভাব্য প্রতিযোগিতামূলক চ্যালেঞ্জ: প্রতিবেশী দেশগুলোয় অনুরূপ সমন্বয় ছাড়া দেশে ন্যূনতম মজুরির উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করলে দেশগুলোর মধ্যকার প্রতিযোগিতাকে প্রভাবিত করতে পারে। উচ্চশ্রম ব্যয় সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগকে (এফডিআই) নিরুৎসাহিত করতে পারে। এতে ব্যবসাগুলো কম মজুরির প্রয়োজনীয়তাযুক্ত দেশগুলোয় নিজেদের ব্যবসা স্থানান্তরিত করতে পারে, যা সম্ভাব্যভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধীরগতির করে দিতে পারে। 

বাংলাদেশের চাকরি ও কর্ম খাতে ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর সিদ্ধান্তের পূর্বে এর সম্ভাব্য সুবিধা ও অসুবিধার মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ বিচার-বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে। কোনো ধরনের বিচার-বিবেচনা ছাড়াই বাজারের মূল্যস্ফীতির কারণ, দারিদ্র্য হ্রাস করতে গিয়ে এবং কর্মীদের কাজের প্রতি আরো অনুপ্রেরণা বাড়ানোর জন্য বেতন ও মজুরি বৃদ্ধি করা হয়, তাহলে তা হিতে বিপরীত হয়ে যেতে পারে। বরং তা উল্টো প্রভাব ফেলবে আমাদের অর্থনীতিতেই দীর্ঘমেয়াদিভাবে। তাই এখানে প্রয়োজন যথাযথ ভারসাম্য বজায় রেখে বেতন ও মজুরি বৃদ্ধি করা, যাতে প্রবৃদ্ধির চাকা সচল থাকে এবং একই সঙ্গে এ বৈশ্বিক মন্দার বাজারে শ্রমজীবীরা যেন তাদের ন্যায্য অংশ পান তা যেন নিশ্চিত করা হয়।

মো. আবিদ মঈন খান: সাংবাদিক