২০১৯ সালে অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র ‘প্যারাসাইট’ বিশ্বব্যাপী বিপুল দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে।
এতে অনবদ্য দক্ষতায় চিত্রায়ণ করা হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার তীব্র আয় অসমতার বিষয়টি। সন্দেহ নেই, চলচ্চিত্রটিতে দেখানো নিম্ন আয়ের পরিবারের তীব্র বিচ্ছিন্নতাবোধ ব্যাপকভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে দর্শকদের। কেননা অনেক দেশেই সমরূপ দৃশ্যপট, দৃষ্টিভঙ্গি এখন প্রতীয়মান। শুধু দক্ষিণ কোরিয়া নয়, বর্তমানে কভিড-১৯ অতিমারী ও জলবায়ু পরিবর্তনের দ্বৈত চ্যালেঞ্জের কারণে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান আরো অনেক দেশেই বাড়ছে। এটা যেন আজ সর্বত্রই এক সাধারণ চিত্র।
বরাবরই যেকোনো সংকটের সময়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীই সবচেয়ে বেশি ভোগে। কারণ যে ধরনের সামাজিক মূলধন সচ্ছল জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেয়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা দরিদ্রদের থাকে না। যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিংয়ের ভাষা ধার করে বলা যায়, ‘অসমতার বৃত্ত মানুষকে আরো অসমতার দিকে ঠেলে দেয়।’ মূলত এটিই (উদ্ধৃত বাক্যের সারাৎসার) ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বেড়ে চলা ব্যবধান মোকাবেলার কৌশল এবং যাদের সবচেয়ে প্রয়োজন, তাদের পর্যাপ্ত সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে আনতে নীতিনির্ধারকদের প্রণোদিত করে বৈকি।
দারিদ্র্য নির্ণয়ের পুরনো পদ্ধতিগুলো অনেকটা অকেজো হয়ে গেছে। এখন নতুন নতুন পদ্ধতির বিষয়ে বিশ্বব্যাপী আলাপ-আলোচনা চলছে। এর মধ্যে বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক (এমপিআই) একটি দারিদ্র্য সমস্যার ব্যাপকতা-পরিধি নির্ণয়ের আবশ্যকীয় হাতিয়ার; যেটি আয়বৈষম্যের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবনমানের মতো বঞ্চনাগুলোও চিহ্নিত করে। অনেক বছর ধরে দারিদ্র্য নির্ণয়ের সনাতনী পদ্ধতি ব্যবহারের পর আমার দেশ মালয়েশিয়া একটি বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, যেসব দেশ ২০১৩ সালেই এমপিআই ব্যবহার করেছে। অতি দারিদ্র্য ও মানবাধিকারবিষয়ক তখনকার বিশেষ দূত ফিলিপ অ্যালসটনের পর্যবেক্ষণমূলক গভীর সমালোচনা ২০১৯ সালে আমাদের সরকারকে অবশেষে তার দারিদ্র্য সম্পর্কিত সংজ্ঞা পরিবর্তনে চালিত করেছে।
মালয়েশিয়ায় আয় অসমতা মোকাবেলার
ক্ষেত্রে এমপিআই
অব্যাহতভাবে ভূমিকা
রেখে চলছে।
২০২১ সালের
এপ্রিলে দারিদ্র্য
গবেষণার অন্যতম
বিশেষজ্ঞ মালয়
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির
অধ্যাপক ফাতিমাহ
কারি আমার
সংসদীয় আসন পেনাংয়ের পার্মাট্যাং পোতে নিচের ৪০ শতাংশ উপার্জনকারীর মধ্যে একটি এমপিআই
জরিপ পরিচালনা
করেছিলেন। জরিপের
উদ্দেশ্য ছিল দরিদ্র পরিবারগুলোর ওপর মহামারীর প্রভাব
কেমন, সেটি
খতিয়ে দেখা।
গতানুগতিক পরিমাপকের সঙ্গে আলোচ্য জরিপে অতিমারী সৃষ্ট আয়ের ক্ষতি, অনলাইন শিক্ষায় শিশুদের আপেক্ষিক প্রবেশগম্যতা এবং লকডাউনের সময়ে ঘরবন্দি থাকাকালীন দুর্গতিসহ সার্বিক বিষয়গুলো মূল্যায়ন করা হয়েছে। কভিড-সমন্বিত দারিদ্র্য নির্ণয়ে ভূমিকা রাখা এ পাইলট প্রজেক্ট মালয়েশিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার জাতীয় পর্যায়ে গ্রহণ ও ছড়িয়ে দেয়ার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে।
ছয় মাস পরে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের অর্থনৈতিক-বিষয়ক মন্ত্রী মোস্তফা মোহাম্মদ ওই গবেষণার পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় এমপিআই পদ্ধতি জোরালোভাবে এগিয়ে নিতে সরকারের ইচ্ছার কথা ঘোষণা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, নতুন পদ্ধতি আরো ভালোভাবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বিন্যাসে ভূমিকা রাখবে। তার দেয়া খবরকে আইনপ্রণেতারা স্বাগত জানিয়েছিলেন, যারা নিম্ন আয়ের পরিবরারগুলোর চাহিদা বুঝতে ও মেটাতে এমপিআই ব্যবহারের আহ্বান অনেক আগে থেকে জানিয়ে আসছিলেন।
সন্দেহ
নেই, পরিবর্তনটাও ছিল সময়োপযোগী। অতিমারীর
অভিঘাতে সৃষ্ট
দুদর্শার সঙ্গে
অতি বৃষ্টিপাতও মালয়েশিয়াকে পর্যুদস্ত করেছিল।
অতি বৃষ্টিপাতে দেশটিতে সৃষ্টি হয়েছিল
প্রবল বন্যা
পরিস্থিতির। সরকারি
কর্মকর্তারা সাম্প্রতিক বন্যাগুলোকে বারবারই এক শতকে একবার
ঘটে এমন
প্রপঞ্চ হিসেবে
বলে আসছিলেন,
কিন্তু শেষবার
বড় বন্যা
সংঘটিত হয়েছিল
আট বছর
আগে এবং
তাতে প্রায়
তিন লাখ
লোক বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। আর সর্বসাম্প্রতিক বন্যায় নয় প্রদেশজুড়ে আনুমানিক ৮০ হাজার
মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
আলোচ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের তাত্ক্ষণিক পর এনজিও এবং কমিউনিটি গ্রুপগুলো ত্রাণসহায়তা প্রদানে এগিয়ে এসেছিল। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মালয়েশিয়ার সাধারণ নাগরিক দুর্গত এলাকায় ভুক্তভোগীদের উদ্ধারে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নেমে পড়েছিল। এসব প্রচেষ্টা সরকারের আপেক্ষিক প্রস্তুতিহীনতার সঙ্গে লক্ষণীয়ভাবে ভিন্নতর ছিল।
আমরা দেখছি অতিমারী ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সাম্প্রতিক বন্যা মালয়েশিয়ায় গভীর ক্ষত রেখে গেছে। তার প্রতিক্রিয়ায় বর্তমান প্রশাসন অর্থনৈতিক প্রভাব প্রশমনে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ত্বরিত প্রকল্প গ্রহণ করেছে। তাত্ক্ষণিক সমাধানে নজর দিয়েছে আর সেটি করেছে পুরো বাজেটে ভবিষ্যতের ভয়াবহ পরিণামের বিষয়টি না ভেবেই। অতিমারীতে গৃহীত কিছু প্রকল্পের একটিতে দেশটি নাগরিকদের অবসরকালীন সঞ্চয় তহবিল থেকে তাড়াতাড়ি অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দিয়েছিল। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে মালয়েশিয়ার কর্মীদের ভবিষ্যৎ তহবিল (ইপিএফ) থেকে মোট ১০১ বিলিয়ন মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত (২৪ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার) উত্তোলন করা হয়েছে। ফলে ছয় মিলিয়নেরও বেশি সদস্যের এখন নিজেদের ইপিএফ অ্যাকাউন্টে ১০ হাজারের কম রিঙ্গিত আছে এবং তাদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি লোকের আছে ১ হাজার রিঙ্গিতেরও কম।
প্রকৃতপক্ষে, মালয়েশিয়া সরকারের অতিমারী পুনরুদ্ধার সম্পর্কিত মোট অর্থনৈতিক প্রণোদনা প্যাকেজের ২২ শতাংশ ছিল নিজেদের অবসর তহবিল থেকে নাগরিকদের অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেয়ার এ প্রকল্প। কিন্তু ২০৩০ সাল নাগাদ যেহেতু দেশটির জনসংখ্যার ১৫ শতাংশেরও বেশি ৬০ বছর বা তদূূর্ধ্ব বয়সী হবে বলে আশা করা হচ্ছে, সেহেতু আলোচ্য প্রকল্পটি আসলে একটি বিপর্যয়ের ফর্মুলা ছাড়া অন্য কিছু নয়। এর অন্যতম প্রবক্তার মধ্যে ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক, দুর্নীতির অভিযোগে যিনি অভিযুক্ত। তিনি ফেসবুকে এ প্রকল্পের সপক্ষে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। এটি অর্থ সংকটে ভোগা অবসরপ্রাপ্তদের নিজেদের সঞ্চয় ভাঙতে উৎসাহ জুগিয়েছিল।
মালয়েশিয়া এখন অতিমারী ও বন্যার বিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কাজেই নাজুক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর নীতি গ্রহণের একটা সুযোগ দেশটির আছে। এর মধ্যে বাস্তবসম্মত এমপিআই পদ্ধতির উন্নয়ন ঘটানো একটি আবশ্যকীয় পদক্ষেপ। কারণ এটি স্যানিটেশন ও নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা ঘাটতি থেকে শুরু করে অনলাইন শিক্ষার ইন্টারনেট কাভারেজসহ বর্তমানে সম্মুখীন হওয়া
মালয়েশিয়ার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর চ্যালেঞ্জগুলো বিস্তারিতভাবে বুঝতে সরকারকে সমর্থ করে তুলবে। সুবিন্যাসিত এমপিআই গবেষণাগুলো মানুষের জীবনের এসব গুরুত্বপূর্ণ দিক নীতিনির্ধারকদের নজরে আনতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে ধনী ও দরিদ্রদের সার্বিক ব্যবধান নির্ণয় এবং তার প্রতিবিধানও সহজতর করবে। এ জ্ঞান-অভিজ্ঞতায় সুসজ্জিত হয়ে শুধু মালয়েশিয়া নয়, বিশ্বের অন্য দেশ, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের সরকারগুলোও প্যারাসাইটে চিত্রায়িত সামাজিক উত্তেজনা, অস্থিরতা প্রশমন করতে পারবে বৈকি।
[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]
নুরুল ইজ্জাহ আনোয়ার: মালয়েশিয়ার সংসদ সদস্য
ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির










