এ লেখা যখন লিখছি তখন নিজে প্রতিদিন কাজের জন্য করোনা ওয়ার্ডে যাতায়াত করি এবং করোনার ডেল্টা ধরন কতটা খারাপ তার নমুনা নিজের চোখে দেখি। আবার একই সময় দেখি কত অবহেলায় মানুষ করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে ভাবছে। গ্রামের মানুষের ধারণা, এটি তেমন কোনো সমস্যা না। আসল বিষয় হলো, সবার জন্য একই না। আমার এক সহকর্মী খুব মজা করে বলেছিলেন, ‘করোনা সবাইকে মেরে ফেলার চেষ্টা করে। কারো ক্ষেত্রে সে সফল হয় আর কোনো ক্ষেত্রে মানুষ সফল হয়।’ এ ক্ষমতাটা করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের ক্ষেত্রে একটু বেশিই বলা যায়।

করোনার ডেল্টা ধরনের উপসর্গ কি ভিন্ন?

গ্রামের বাড়িতে চুরি হওয়া বেশি সহজ হয় যদি সিঁধ কেটে কেউ চুরি করে। করোনার ডেল্টা ভ্যরিয়েন্টের উপসর্গ অনেকটা তাই। ডেল্টার যে ধরনের জন্য গ্রামের মানুষ সহজেই ভুল করছে তা হলো, করোনার অন্যান্য ধরণ থেকে ভিন্ন উপসর্গ। দীর্ঘদিন গণমাধ্যমে বা অন্যান্য মাধ্যমে আমরা ধারণা দিয়েছি যে জ্বর, গলাব্যথা, শুষ্ক কাশি, গন্ধ না পাওয়া করোনার প্রধান উপসর্গ। কিন্তু করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। এক্ষেত্রে মাথাব্যথা প্রধান উপসর্গ। তারপর জ্বর কিছুটা কম। সর্দি থাকে। ফলে সহজেই মানুষ বিভ্রান্ত হয়। এ ধরনে গন্ধ না পাওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে এটিকে সাধারণ জ্বর ও সর্দিই মনে করছে মানুষ। গ্রামে কারো যতক্ষণ না শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, ততক্ষণ তিনি কাউকে বলতেও চান না বা চিকিৎসা করাতে চান না। করোনার ডেল্টা ভ্যরিয়েন্ট চুপিচুপি আসে, তারপর ফুসফুসে বাসা বাঁধে। এখানেই সমস্যাটা হচ্ছে।

কেন ফুসফুসকেই বেশি আক্রান্ত করে?

সাধারণ মানুষের জন্য করোনার মিউটেশনের সংখ্যা বা ভয়াবহতা বোঝানো বেশ কঠিন। করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট প্রায় ২৩-এর অধিক মিউটেশন আছে। কিন্তু চার থেকে পাঁচটি বেশি ভয়ংকর। করোনার যে নাম, যার কারণে ক্রাউন, সেই স্পাইক প্রোটিনটাই এখন প্রধান খেলার হাতিয়ার এ ভাইরাসের। করোনা তার প্রধান ছলাকলাটা কিন্তু দেখাচ্ছে এ প্রোটিন দিয়েই। ওই স্থানে মিউটেশন করে সে চেহারা পাল্টিয়ে ফেলে। বৈজ্ঞানিক ভাষায় তিনটি বিশেষ মিউটেশন—যাকে বলে এল৪৫২আর, পি৬১৪আর ও টি৪৭৮কে—এর জন্য এ ধরন খুব ভালোভাবে নাকের বিশেষ জায়গায় আংটার মতো আটকে যায়। অন্য ধরনও আটকাতে পারত, তবে ডেল্টার আটকানোটা অনেকটা কাঁঠালের আঠার সঙ্গে তুলনা করা যায়। মানে হলো সে বেশি আটকাবেই। একই ধরনের আটকানোর জিনিস থাকে ফুসফুসে। যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন এসিই২ রিসিপ্টর। এ দুষ্টু জায়গাটার জন্য এত যন্ত্রণা। ফুসফুসে বেশি আটকায় তা-ই নয়, ওখানে সে বহাল তবিয়তে করোনার অন্য ধরনের চেয়ে বেশি বেশি সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারে। ফলে ফুসফুস হচ্ছে ডেল্টা ধরনের জন্য একটি ভালো বসবাসের স্থান। তাই যা হওয়ার তাই হচ্ছে। হাসপাতালে আসা অনেক রোগীর ৩০-৫০ শতাংশ ফুসফুস আক্রান্ত থাকছে। তখনই চিন্তার বিষয়।

করোনার ডেল্টা ভ্যরিয়েন্ট কি সর্বোচ্চ সংক্রামক?

উত্তরটা বলা কঠিন আবার কঠিন নয়। যদি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট দেখি, তাহলে দেখব করোনার আগের কোনো ধরণই গ্রামে তেমন যেতে পারেনি। কিন্তু ডেল্টা গ্রামে গিয়ে তার সব ক্ষমতা দেখানো প্রায় শেষের পথে। কী বলছেন বিজ্ঞানীরা? এ-যাবত্কালের সবচেয়ে ছোঁয়াচে ধরন এটি। কীভাবে? বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন এটি আলফা বা আমরা যাকে আগে ইউকে বলতাম তার চেয়ে ৬০ শতাংশ বেশি ছোঁয়াচে। আলফা ভ্যারিয়েন্ট নিজেই ছিল মূল চায়নিজ উহানের ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় ৫০ গুণ বেশি ছোঁয়াচে। সুতরাং চীনের আসল ভাইরাসের তুলনায় ডেল্টা বা ভারতীয় ধরন কতটা সংক্রামক বা ছোঁয়াচে চিন্তা করে দেখুন। এ কারণেই সে বিশ্বের ৯০টির বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের গ্রামেও ছড়িয়ে গেছে। এছাড়া করোনার ফিউরিন ক্লিভেজ সাইট বলে একটা জায়গা আছে, সেটিও অবশ্য সেই বিখ্যাত স্পাইক বা কাঁটায়। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের ওই স্থানে একটি মিউটেশনের জন্য তার সংক্রমণের ক্ষমতা বেশি। আমার মনে হয়, এজন্য কম ডেল্টা ভাইরাস থাকলেও রোগ সৃষ্টি হচ্ছে। তাই বিখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেটের তথ্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ডেল্টা গ্রামের খোলা স্থানেও ছড়াচ্ছে। ল্যানসেটে বলা হয়েছিল, খোলা স্থানে করোনা কম হবে। প্রকৃত বাস্তবতা হলো, ভ্যাকসিন ও মাস্ক। সেই প্রসঙ্গে পরে আসব। কোনো ব্যক্তি করোনার উহান ধরন দিয়ে আক্রান্ত হলে আশপাশে কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা না নিলে কমপক্ষে দুজনকে আক্রান্ত করে। সেখানে আলফা আক্রান্ত করে চারজনকে। কিন্তু ডেল্টা আক্রান্ত করে কিছু বিজ্ঞানী বলছেন ছয়জন, কেউ বলছেন আটজন পর্যন্ত। এ কারণে গ্রামে কম মাস্ক ব্যবহার ও টিকা নেয়ার পরিমাণ কম বলে করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট বেশি ছড়িয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রেও কম টিকা নেয়া এলাকায় ডেল্টা বেশি ছড়িয়েছে। 

ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে মৃত্যুহার বেশি কেন?

আমরা সবাই গণমাধ্যমের কল্যাণে এবং যারা সরাসরি রোগীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তারা দেখছেন যে এ ধরনে মৃত্যুহার বেশি। সাম্প্রতিক যুক্তরাজ্য ও স্কটল্যান্ডের দুটি গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে যে ডেল্টা ধরনে হাসপাতালে যাওয়ার হার আলফা বা ইউকে ধরনের তুলনায় আড়াই গুণ বেশি। যেসব দেশে পর্যাপ্ত সামগ্রী আছে হাসপাতালে বা উন্নত ধরনের চিকিৎসা ব্যবস্থা, সেখানেই যদি আড়াই গুণ হয়, তাহলে আমাদের দেশে কত হওয়া উচিত? উন্নত দেশগুলোয় মৃত্যুহার আগে যা ছিল ১ দশমিক ৯ শতাংশ, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ২ শতাংশ। সেখানে আমাদের আরো বেশি হবে নিশ্চয়ই। যারা হাসপাতালে চিকিৎসা দিচ্ছেন তারা দেখেছেন হাসপাতালে ভর্তিকৃত রোগীর বেশির ভাগের ফুসফুসের সংক্রমণ ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার হার বেশি। যদিও বাংলাদেশের এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণা নেই এ বিষয়ে। বেশির ভাগ রোগীর ফুসফুসের সংক্রমণের কারণে অক্সিজেন লাগছে বেশি। গ্রামের মানুষ শ্বাসকষ্ট শুরু হলেই হাসপাতালে যায় এমন নয়। যখন যায় তখন এত বেশি সংক্রমণ হয়ে যায় যে অনেক ক্ষেত্রে আর বাঁচানো যায় না। এছাড়া গ্রামের মানুষ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গ্রাম্য চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা নেয়। কিন্তু অক্সিজেন স্যাচুরেশন না মাপতে পারলে কোনো কারণে অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৭৫-এর নিছে নামলে তখন রোগীকে বাঁচানো অনেক কঠিন। চিকিৎসকরা ৯০-এর নিচে এলেই হাসপাতালে আসতে বলেন। কিন্তু গ্রামের অনেক ক্ষেত্রে সেটা মাপা সম্ভব না হওয়ার কারণে জটিলতা তৈরি হয়। এছাড়া অনেক দূর থেকে হাসপাতালে আসতেও সময় লাগে। এতেও কিছু সমস্যা হচ্ছে এবং রোগী মারা যাচ্ছে। এছাড়া হাসপাতালগুলোর পক্ষে এত বিশাল অক্সিজেনের চাপ নেয়াও অনেক কঠিন হয়ে যাচ্ছে। যদিও আমরা সৌভাগ্যবান যে এখনো দেশ অক্সিজেন সংকটে পড়েনি। ফলে দেরি করে হাসপাতালে আসায় রোগী মারা যাচ্ছে বেশি।

উদ্বেগের ধরন কী?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি প্রথম উদ্বেগের ধরনের সংজ্ঞা দেয়। এখন পর্যন্ত সব ধরনকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। আবার এ ভাগের একটিতে কেউ নেই। বাকি দুটির যেটি বেশি ভয়াবহ, তা হলো উদ্বেগের ধরন। অন্যটির নাম আগ্রহের ধরন। এ উদ্বেগের ধরনে আছে চার ভাই। নাম আলফা, বেটা, গামা ও ডেল্টা। যাদের আগের নাম ছিল যথাক্রমে ইউকে, সাউথ আফ্রিকা, ব্রাজিল ও ভারতীয়। চার ভাইয়ের মধ্যে দেখা গেল ডেল্টা সবচেয়ে ভয়ংকর। কী যোগ্যতা আছে তাদের? বেশি ছোঁয়াচে, রোগীকে বেশি বেশি হাসপাতালে পাঠায়, রোগের প্রকোপ বেশি, টিকা কাজ করে কম, প্লাজমা ট্রিটমেন্ট বা অ্যান্টিবডি দিয়ে কাজ করে কম, অনেক ক্ষেত্রে শনাক্ত হয় কম। এ চরিত্রগুলো যার সবচেয়ে বেশি, সেটিই হলো ডেল্টা। এ কারণে আমি নই, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে এ-যাবত্কালের সবচেয়ে ভয়ংকর করোনার ধরণ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

এর শেষ কোথায়?

এখন বিজ্ঞানীরা কিছুটা আশার বাণী শোনাচ্ছেন। যেহেতু সবচেয়ে ভয়ংকরটির মোকাবেলা কম-বেশি হয়ে গেছে, এজন্য বিজ্ঞানীরা বলছেন, এখন মহামারী কমে যাবে। যে দেশগুলোর ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ টিকা নিয়েছে, সেখানে সমস্যা কম, এমনকি ডেল্টা দিয়েও। যতগুলো ভয়ংকর সম্ভাবনা ছিল, সেটি নাকি কমে আসবে এমন ধারণা বিজ্ঞানীদের।

কী করণীয়?

বাংলাদেশ একটি ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের দেশ, সুতরাং দ্রুত টিকা প্রদান একমাত্র সমাধান। বর্তমানে এখানকার ৬৫ শতাংশ মানুষের বয়স ১৫ থেকে ৬৪ বছরের মধ্যে। বাংলাদেশের এ অবস্থা থাকবে মাত্র ২০৪০ সাল পর্যন্ত। তবে গণমাধ্যমে দেখলাম সামনে সাত কোটির মতো টিকা আসবে, সুতরাং ৫০-৬০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনতে পারলে সমস্যা সমাধান হবে। নইলে কর্মক্ষম এ বিপুল জনগোষ্ঠী একসময় আমাদের জন্য বোঝা হয়ে যাবে। একই সঙ্গে অন্য কোনো স্বাস্থ্যবিধি না মানলেও ন্যূনতম মাস্ক ব্যবহার সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা বড় প্রয়োজন।  

 

ড. মো. ইকবাল কবীর জাহিদ: অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ এবং সহযোগী পরিচালক, জিনোম সেন্টার, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়