করোনার দ্বিতীয় ঢেউ গত বছরের প্রথম ঢেউয়ের চেয়ে অনেক বেশি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। হাসপাতালগুলোয় আইসিইউ বেডসহ চিকিৎসা যন্ত্রপাতির পাশাপাশি এখন অক্সিজেন সংকটের কথাও উঠে আসছে। দুদিন আগে উচ্চ আদালতের একটি রিটের জবাবে দেশে অক্সিজেনের কোনো সংকট নেই বলে জানিয়েছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের বক্তব্যও একই রকম। কিন্তু মাঠের চিত্র ভিন্ন। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে হাসপাতালগুলোয় অক্সিজেনের সংকট এবং সামনের দিনগুলোয় এটি আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। বিদ্যমান বাস্তবতায় সংকট নিরসনে জরুরি উদ্যোগ না নিলে সামনের দিনগুলোয় করোনা রোগীদের চাহিদার চার ভাগের এক ভাগ অক্সিজেনও সরবরাহ করা সম্ভব হবে না বলে বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন। সময় পাওয়ার পরও কভিড চিকিৎসার জন্য জরুরি অক্সিজেনের সরবরাহ নির্বিঘ্ন করতে না পারাটা দুঃখজনক।
গত বছর করোনা সংক্রমণের শুরুতেই দেশের হাসপাতালগুলোয় নানা সংকটের চিত্র উঠে আসে। যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয়-তৃতীয় ঢেউ মোকাবেলা করছে তখন আমাদের দেশে হাসপাতালের শয্যা, আইসিইউ ও অক্সিজেনের মতো অতি জরুরি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ নতুন বৃহত্তম করোনা হাসপাতাল চালু করা হলেও রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের বাঁচাতে এসব উদ্যোগ তেমন কোনো কাজে আসবে না। তবে অল্প সময়ের মধ্যে বিশালাকৃতির নতুন হাসপাতাল চালুর উদ্যোগের মধ্য দিয়ে যে নতুন আশাবাদের সঞ্চার হয়েছে, তাতে সরকারের সঠিক সিদ্ধান্ত ও দিকনির্দেশনায় অক্সিজেন সংকট উত্তরণ অসম্ভব নয়। করোনা মোকাবেলায় বিশ্বের অনেক দেশ সাফল্য দেখিয়েছে, যার মধ্যে ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। দেশগুলো এ সময়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। শুধু তাই নয়, অক্সিজেন তৈরি, মাস্ক, পিপিপিসহ কভিড চিকিৎসায় ব্যবহূত যন্ত্রপাতির সরবরাহও নিশ্চিত করেছে। সদ্দিচ্ছা থাকলে আমাদেরও না পারার কথা নয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দাবি করছে, হাসপাতালগুলোয় অক্সিজেনের কোনো অভাব নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, কীসের ভিত্তিতে এ দাবি করা হচ্ছে? সামনে সংক্রমণের সম্ভাব্য সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে কি আদৌ কোনো হিসাব-নিকাশ করা হয়েছে? সংকট না থাকলে দাম বাড়ছে কেন? আর হাসপাতালে অক্সিজেন থাকলেই হবে না, সেটি ব্যবহারের সব সরঞ্জাম অর্থাৎ ট্রলি, মাস্ক, ভেন্টিলেটর ইত্যাদিও নিশ্চিত করা জরুরি। রোগীদের অক্সিজেন নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকাটি তৈরি করা হয়েছে হাসপাতালের ব্যবস্থাপক, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী চিকিৎসক, ক্রয় কর্মকর্তা, পরিকল্পনা কর্মকর্তা, বায়োমেডিকেল প্রকৌশলী ও হাসপাতাল প্রকৌশলীদের জন্য। এতে অক্সিজেনের চাহিদা নিরূপণ করা, অক্সিজেনের উৎস চিহ্নিত করার বিষয়ে পরামর্শ দেয়া আছে। নির্দেশনায় আরো বলা হয়েছে, কভিড-১৯-এর জন্য নির্ধারিত হাসপাতালে মারাত্মক ও জটিল রোগীদের চিকিৎসা হবে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। এখানে সবচেয়ে অসুস্থ রোগীদের জন্য ভেন্টিলেটর (কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র) রাখতে হবে, থাকবে পালস অক্সিমিটারসহ অন্যান্য সামগ্রী। দেশের অধিকাংশ হাসপাতালে এসবের মারাত্মক সংকট রয়েছে। এক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের অবস্থা বিবেচনায় নেয়া আবশ্যক। তারাও প্রথম দফায় অক্সিজেনের সংকট নেই বলে দাবি করেছিল। এখন দেশটিতে অক্সিজেন সংকটে কভিড রোগী মারা যাওয়ার মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তারা অক্সিজেন আমদানির পদক্ষেপ নিয়েছে। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বাংলাদেশকেও অক্সিজেনের মজুদ গড়ে তুলতে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। ভারতের বিমান বাহিনী, সেনাবাহিনী এমনকি ব্যবসায়ী উদ্যোক্তারা স্ব-উদ্যোগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অক্সিজেন আনার উদ্যোগ নিয়েছেন। এক্ষেত্রে তারা ব্যয়বহুল বিমান পরিবহনের ব্যবস্থা করছে। এমন ব্যয়ে বাংলাদেশের সামর্থ্য আছে কিনা, তা পর্যালোচনার দাবি রাখে। তাই আর সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত অক্সিজেন আমদানি ও মজুদের উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার, সৌদি আরব, আরব আমিরাতসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর সহায়তা নেয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশ অক্সিজেন উৎপাদনের জন্য বিদেশ থেকে প্লান্ট আমদানিতে ব্যবসায়ীদের ভর্তুকিও প্রদান করা যেতে পারে। অক্সিজেন উৎপাদনে জড়িত অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। ভারতে কভিড সংক্রমণ অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় ভারতীয় উৎস থেকে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে দ্রুতই অক্সিজেনের বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কভিড রোগীদের অক্সিজেনের সম্ভাব্য সংকট মোকাবেলায় প্রয়োজন হলে শিল্প-কারখানায় অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ রাখতে হবে। সেই সঙ্গে মেডিকেল গ্রেড অক্সিজেন উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে অক্সিজেন সংগ্রহ এবং তা সংরক্ষণ ও পরিবহন নিশ্চিত করতে হবে।
অক্সিজেন কেবল করোনায় আক্রান্ত রোগী নয়, আরো অনেক গুরুতর রোগীর জন্য অক্সিজেন সরবরাহ জরুরি হয়ে পড়ে। করোনা সংকট শুরু হওয়ার আগে হাসপাতালগুলোয় যে পরিমাণ অক্সিজেন লাগত, বর্তমানে তার চাহিদা বহুগুণ বেড়ে গেছে। প্রশ্ন হলো, সেই চাহিদা পূরণের সামর্থ্য, অবকাঠামো ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা আছে কিনা। যেসব হাসপাতালে অক্সিজেন সরবরাহের কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা আছে, সেসব হাসপাতালে সমস্যা কম। কিন্তু আমাদের সরকারি-বেসরকারি বেশির ভাগ হাসপাতালে তো কেন্দ্রীয়ভাবে অক্সিজেন সরবরাহের সুযোগই নেই। ফলে সিলিন্ডারের মাধ্যমে রোগীকে অক্সিজেন দিতে হয়। দেশে অক্সিজেন সিলিন্ডারের সংখ্যা জনসংখ্যা অনুপাতে নগণ্য, তা বিবেচনায় রাখতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার চাইলেও নির্ধারিত হাসপাতালগুলোয় অল্প সময়ে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ অবকাঠামো গড়ে তোলা কঠিন হবে। পরিকল্পনা করে ফেব্রুয়ারি বা মার্চের শুরুতে উদ্যোগ নিলে বেশ কয়েকটি হাসপাতালে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হতো। এ পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত সরকারি-বেসরকারি যেসব হাসপাতালে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা আছে এবং রোগী কম আছে, সেগুলোকে কভিড-১৯ রোগের আওতায় নিয়ে আসা এবং এসব হাসপাতালের রোগীদের দ্রুত সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা।
উদ্বেগজনক তথ্য এসেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে। সম্প্রতি অক্সিজেন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দেশে যেকোনো সময় অক্সিজেনের ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি হতে পারে। মেডিকেল গ্রেড অক্সিজেনের মূল জোগানদাতাদের কারখানায় কোনো ত্রুটি দেখা দিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিবে। দেশের সব সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের বড় অংশ সরবরাহ করে একটি বা দুটি প্রতিষ্ঠান। জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অক্সিজেনের তিনটি নতুন উেসর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে যে পরিমাণ অক্সিজেন পাওয়া যেতে পারে, তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। এদিকে দেশে করোনা পরিস্থিতির যেভাবে অবনতি হচ্ছে, তাতে সামনের দিনগুলোয় অক্সিজেনের চাহিদা আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। সেক্ষেত্রে অক্সিজেনের অন্য বিকল্প উেসর সন্ধান করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বস্তুত করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ার পর দেশে করোনা সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এ অবস্থায় অক্সিজেনের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না থাকলে চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। তাই যে উপায়েই হোক, অক্সিজেনের সম্ভাব্য সংকট মোকাবেলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরকে তত্পর হতে হবে।










