করোনার সময়ে জাতীয় দৈনিক, টেলিভিশনসহ ফেসবুক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত আলোচিত বিষয় হলো দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ‘সরকারের দেয়া উপহার’ স্বল্পমূল্যের চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ত্রাণ চুরির সংবাদ এবং তা নিয়ে বিভিন্ন ট্রল। অনেকেই প্রতিদিন করোনা রোগী আক্রান্তের নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশের সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের ছবিসহ ত্রাণ ও চাল চোরদের সংখ্যা প্রকাশ করছেন। মন্তব্য করছেন ‘করোনা রোগীর চেয়ে ত্রাণ চোরের সংখ্যা বেশি’ এভাবে! এ নিয়ে প্রতিদিনই আপডেট হচ্ছে তথ্য-উপাত্ত। ত্রাণ চোরদের নিয়ে প্যারোডি, মাইকিং পর্যন্ত হচ্ছে—এমন ভিডিও দেখলাম। বর্তমান সংকটের সময়ে দলীয় নেতাকর্মীদের ত্রাণ, চাল চুরি নিয়ে সরকারপ্রধানসহ কর্তাব্যক্তিরাও অনেকটাই বিব্রত, যা তাদের বক্তব্য-বিবৃতি থেকেই বোঝা যায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের দলীয় সাধারণ সম্পাদক পর্যন্ত যুবলীগ, কৃষক লীগ নেতা ও কর্মীদের এই চুরি নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। যদিও নেতাকর্মীদের কেউ কেউ আবার মোট ত্রাণ কার্যক্রমের তুলনায় চুরি-দুর্নীতির সংখ্যা একেবারেই কম বলে কখনো হয়তোবা ডিফেন্ড করার চেষ্টাও করছেন।
যাই হোক, চাল চুরি, ত্রাণ চুরি থেমে নেই। প্রতিবাদ করায় কেউ কেউ মার খেয়েছেন, এমনকি মারাও গেছেন। ফলে গত কয়েক দিনের পত্রিকা দেখলে স্বভাবতই সংবাদপত্রের পাতায় ও অনলাইন ব্লগগুলোয় চাল চোর বা ত্রাণ চোরদের সংখ্যা, বিস্তার ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে মতামত পাতায় বিভিন্নভাবে বিশেষজ্ঞ মতামত, যুক্তি-বুদ্ধি উপস্থাপন করছেন। এই নিয়ে নানা ডিসকোর্স ও তাত্ত্বিক আলোচনা চলছে। কেউ কেউ বিভিন্ন দুর্ভিক্ষের সময় শ্রেণীগতভাবে ধনিক শ্রেণী কীভাবে সামাজিক অসমতা ও বৈষম্যের সুযোগ নিয়ে মানুষের সম্পদ কুক্ষিগত করে কৃত্রিম আকাল তৈরি করে দুর্ভিক্ষ, মহামারী সৃষ্টি করে, তা তুলে ধরেছেন। আবার কেউ কেউ বিশেষ করে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের কথা সামনে এনে সরকারের রাজনৈতিক ব্যর্থতার কথা বলছেন এবং পরামর্শ দেন কীভাবে এ সময়ে রাজনৈতিক এই দুর্বৃত্তদের কঠোর হাতে দমন করা যায়।
আমি যেহেতু অপরাধতত্ত্ব ও পুলিশবিজ্ঞান পাঠদানের সঙ্গে যুক্ত, সেহেতু এ সময়ে সৃষ্ট সংকটের সঙ্গে যুক্ত অপরাধীদের কীভাবে বিচারের আওতায় আনা যাবে, তার মধ্যেই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করব। আমার এই ভাবনার পেছনে কাজ করেছে একটি ফেসবুক পোস্ট। আমার শিক্ষক যুক্তরাষ্ট্রের এলিজাবেথ সিটি স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের হোমল্যন্ড সিকিউরিটি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ফেসবুকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর কামরুল হাসান মামুন স্যারের টাইমলাইন থেকে কিছু ছবি শেয়ার করছেন। ছবিগুলোয় ব্যানার-ফেস্টুন দিয়ে লেখা আছে—‘চাল চোরের বাড়ি’, ‘ইয়াবা ব্যবসায়ীর বাড়ি’, ‘গরিবের ত্রাণ চোরের বাড়ি’। ছবিগুলোয় তীর দিয়ে নির্দেশ করছেন চাল চোর, ত্রাণ চোর ও ইয়াবা ব্যবসায়ীদের ঠিকানা ও বাড়িগুলোকে। সেখানে সামাজিকভাবে এদের বয়কটের ডাক আছে। আহ্বান করা হয়েছে এর সঙ্গে ‘ঘুষখোর’ ও ‘দুর্নীতিবাজ’দের যুক্ত করার। ছবিগুলোর মধ্যে আশাবাদিতা আছে। ছবিগুলোয় নিঃসন্দেহে সমাজবিরোধীদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে একটি দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়। ফলে আমি শুধু এ বিষয়টির সুবিধা ও অসুবিধা নিয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করব।
স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রতিটি সরকারের সময়ে সাধারণভাবে কিছু সহিংস ও সম্পত্তিসংক্রান্ত ব্যক্তিগত অপরাধের শাস্তি ও বিচার হলেও বিশেষভাবে রাজনৈতিক অপরাধ যেমন কালোবাজারি, মজুদদারি, পণ্য গুদামজাত, ত্রাণ চুরি ও আত্মসাতের বিচার খুব বেশি হয়নি। অথবা শাস্তি হলেও এমন হয়েছে, যা জনগণের কাছে খুব ভালো উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারেনি। যেমন এ ধরনের অপরাধের শাস্তি হয়তো সর্বোচ্চ পণ্য উদ্ধার বা তাত্ক্ষণিক জরিমানা আদায়! যদিও আমাদের আইনে এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্তদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়ার বিধানও ছিল। এখন অবশ্য অন্যান্য আইনে তা কিছুটা কমানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আইনে যা থাকুক না কেন, তা বিধিসম্মতভাবে কার্যকর হয়নি। অনেকেই অবশ্য আবেগী হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এদের মৃত্যুদণ্ডের কথা বলেন। আমি অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে এ ধরনের অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবনও সাপোর্ট করি না। যদিও চিন্তাগত দিক থেকে অনেক মানুষ অবশ্য সবকিছুতেই সরাসরি অ্যাকশন চায়, তাই কখনো কখনো তারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, পিটিয়ে মারা ও সরাসরি ব্রাশফায়ারকে সাপোর্ট করে। আমি মনে করি, এসব চিন্তার সীমাবদ্ধতা বা বিচারহীনতার সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া।
মনে রাখতে হবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সহিংস অপরাধের প্রভাব সাধারণত ব্যক্তি ও পরিবারের ওপর পড়ে, সেখানে এ ধরনের অপরাধের নেতিবাচক প্রভাব একটি সম্প্রদায়, সমাজ ও সর্বোপরি দেশের ওপর পড়ে। ফলে একদিক থেকে বিবেচনা করলে তা অসহিংস মানবতাবিরোধী অপরাধ। সাধারণ অপরাধের চেয়ে এর মাত্রাগত সীমা ও গভীরতা অনেক বেশি। কিন্তু সবসময়ই এর সঙ্গে যুক্তদের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে প্রকৃত অর্থে শাস্তি হয়নি। যদিও আমাদের দেশে ভিন্ন মত রুখতে সরকারবিরোধী মানুষকে সবসময়ই লঘু অপরাধে গুরু দণ্ড দেয়ার প্রবণতা আগে থেকেই ছিল এবং এখনো তা আছে। সেজন্য এ ধরনের লোক দেখানো বিচার শাস্তির মূল উদ্দেশ্যকে সফল করেনি। অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে শাস্তির মূল উদ্দেশ্য হলো অপরাধীর সংস্কার, যাতে পরবর্তীতে সে আর অপরাধের সঙ্গে যুক্ত না হয়। কিন্তু এ ধরনের অপরাধের বিচার ও শাস্তিহীনতা পরবর্তীতে অপরাধীর নিজেকে ও অন্যকে অপরাধকর্ম থেকে দূরে রাখার উদ্দেশ্য পূরণে খুব বেশি কাজ করেনি। তাই রাজনৈতিক পরিচয়ে সংগঠিত এ ধরনের অপরাধের শাস্তি হবেই, তা জনগণ কখনই বিশ্বাস করে না। ফলে ভুক্তভোগী জনগণের কাছে অন্তত অপরাধীদের চিহ্নিত করার অংশ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের পরিচয় প্রকাশ করার বিষয়টি খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, যার কারণে এগুলো খুব দ্রুত ভাইরাল হয়।
করোনা মহামারীর কালে যেহেতু বাংলাদেশে বিচারিক প্রক্রিয়া বন্ধ আছে, সেহেতু আমার মনে হয় একদিক থেকে অনেকেই বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখবেন। কারণ এভাবে যেকোনো একজন অপরাধীকে সহজেই চিহ্নিত করা যায়। আইন ও বিচার প্রক্রিয়ার প্রাথমিক উৎস হিসেবে অপরাধীকে চিহ্নিত করা প্রয়োজন হয়। তাই এসব তথ্য-উপাত্ত হয়তো এফআইআর থেকে শুরু করে মামলা ও চার্জশিট গঠনের কাজে প্রাথমিক পর্যায়ে কাজ করতে পারে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে কাউকে এভাবে চিহ্নিত বা লেভেলিং করে দিলে তার পরিবারের সদস্যদের অনেকেই হয়তো সামাজিকভাবে কলঙ্ক বা স্টিগমার মুখোমুখি হতে পারেন। এ কারণে ত্রাণ ও চাল চোরদের পরিবারের নিষ্পাপ সদস্যরাও বিভিন্নভাবে বৈষম্যমূলক ও নেতিবাচক আচরণের শিকার হতে পারে। তাদের সন্তানদের যারা স্কুল-কলেজে পড়ালেখা করে, তাদের অনেকেই সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক অনেক সমস্যার মুখোমুখি হবে। দ্বিতীয়ত, অনেকেই এ সুযোগে পুরনো কোনো রাগ বা ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে অনেককেই সামাজিকভাবে ফাঁসিয়ে দিয়ে কলঙ্ক দিতে পারেন। শত্রুতামূলকভাবে যাতে তা কাজ করতে না পারেন, সেজন্য আমাদের এ পদ্ধতির কার্যকারিতার প্রশ্নটি মাথায় রাখতে হবে। বিষয়গুলো বুঝতে অস্ট্রেলীয় অপরাধবিজ্ঞানী জন ব্রেইথওয়েটের চিন্তাভাবনা ইতিবাচক হিসেবে কাজ করতে পারে। জন ব্রেইথওয়েট শাস্তি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে এই ‘অপরাধী চিহ্নিতকরণ’ প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করেছেন। যাকে বলেছেন ‘লজ্জামূলক শাস্তি’। এ ‘লজ্জামূলক শাস্তি’ যাতে অপরাধীকে সমাজবহির্ভূত কাজে আরো বেশি যুক্ত করতে না পারে। তাই লজ্জা অপরাধীকে এমনভাবে দিতে হবে, যাতে সে আরো বেশি সামাজিক দায়িত্বমূলক কাজে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য হয়। সমাজের প্রতি সংহতিমূলক অবস্থান তৈরি করে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সমাজভেদে এ ধরনের শাস্তি কি কোনো বিশেষ সময়ে বা কোনো ভৌগোলিক অবস্থানে ক্রিয়াশীল ছিল বা আছে? এ ধরনের শাস্তি সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রচলিত ছিল বলে অনেকের লেখালেখিতে এসেছে। এ প্রসঙ্গে ১৯৪৫ সালে বিখ্যাত কানাডীয় সাংবাদিক, লেখক ও কমিউনিস্ট ডাইসন কার্টার ‘পাপ ও বিজ্ঞান’ নামে একটি বই লেখেন। সেখানে তিনি পাশ্চাত্য সমাজে মাদকাসক্তি, পতিতাবৃত্তি ও ভয়াবহ যৌন রোগের অবশ্যম্ভাবিতা সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন কীভাবে পতিতাবৃত্তি ও গণিকাবৃত্তিকে শূন্যের কোটায় নামিয়ে এনেছিল, সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন শাস্তির একটি অনানুষ্ঠানিক প্রথা সেখানে ছিল, যার মাধ্যমে অপরাধীকে চিহ্নিত করা হতো বিভিন্ন লেভেল দিয়ে। কেউ পতিতালয়ে গেলে রাস্তার মোড়ে তাদের তালিকা টানিয়ে দেয়া হতো, যার কারণে পরবর্তীতে সে আর ওই ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত হতো না। এ ধরনের অনানুষ্ঠানিক শাস্তি তাদের দেশে কার্যকর ছিল। শুধু ডাইসন কার্টার নয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রাশিয়ার চিঠি’ ও ইরিনা স্কিরিয়াতিনার বই থেকে প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ‘অক্টোবর বিপ্লবের সাংস্কৃতিক তাত্পর্য’ লেখায় সোভিয়েত বিচার, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা সম্পর্কে মূল্যবান পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। রবীন্দ্রনাথের উদ্ধৃতি তুলে ধরে তিনি লিখেছেন, “‘একটি মেয়ে বললে, বিচার সভা যাকে বলে তা নয়, আমরা বলা কওয়া করি। কাউকে অপরাধী করাই শাস্তি, তার বড় শাস্তি আর নেই।’ একটি ছেলে বললে, সেও দুঃখিত হয়, আমরাও দুঃখিত হই, ব্যস চুকে গেল।” বেত মারা নেই, কানে ধরে উঠবস নেই, জরিমানা নেই, বহিষ্কার করতে হয় না অথচ শাস্তি হয়ে যায়। প্রশাসনিক শাস্তির তুলনায় এই সামাজিক শাস্তি অত্যন্ত সরল, অথচ অনেক বেশি ফলপ্রসূ নানা দিক দিয়ে (চৌধুরী, ২০১৭: ৪৩)।
কিন্তু মনে রাখতে হবে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা ছিল একটি মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার নৈতিক সমাজ। যেহেতু ওখানে সমাজ ছিল, ফলে সেখানে কোনো মানুষকে দেখার অন্তর্দৃষ্টিটাই ছিল ভিন্ন। মানুষকে একেবারে মানবিক অনুভূতি থেকে দেখা হতো। কেউ যদি সেখানে অপরাধ করে, তবে তাকে নৈতিকভাবে বিষয়টি বোঝানো ব্যাপকভাবে কার্যকর ছিল। কোনো মানুষ যদি অপরাধ করত, তবে সেখানে অপরাধ স্বীকার করাই তার বিচার। ফলে সেখানে কোনো এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক শাস্তির গ্রহণযোগ্যতা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশে যেখানে সমাজ ক্রিয়াশীল নয়, বরং রাষ্ট্রের আধিপত্যবাদিতা ব্যাপকভাবে কার্যকর, সেখানে আমাদের বিবেচনা করে দেখতে হবে বাংলাদেশের মতো বৈষম্যমূলক ও অসমতামূলক রাষ্ট্রে সেই ধরনের ‘চিহ্নিতকরণ’ প্রক্রিয়া কার্যকরী হবে কিনা?
মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম: সহযোগী অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
সন্তোষ, টাঙ্গাইল










