একাডেমিক শাখাগুলোর মধ্যকার সীমারেখার বিপরীতে বিশ্লেষণের সুবিধার্থে সবসময় কৃত্রিম বিকল্প তৈরির অভিপ্রায় কিন্তু আমাদেরও এক ধরনের সীমাবদ্ধতা দান করে। অর্থনীতিবিদ অ্যালবার্ট হিরশম্যান একবার যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে এমন একটা সময় আসে, যখন সব দায় আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়। কভিড-১৯-এর বিপরীতে চলমান লড়াই ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় মূলত আমাদের ওই সময়ের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

গোটা বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর করোনা মহামারী একটি ছায়া ফেলেছে। যতদূর সম্ভব ২০২০ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল থেকে জুন) অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে বাজে অবস্থানে ছিল ভারত ও পেরু। দেশ দুটির জিডিপি যথাক্রমে ৩০ দশমিক ২ থেকে ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে, বছর বিবেচনায়। এ ধরনের রেকর্ড পরিমাণ জিডিপি হ্রাসের কারণ মহামারী এবং আমরা মহামারীকে কীভাবে মোকাবেলা করছি তার ওপরও নির্ভর করে।

উদাহরণস্বরূপ পেরুতে মহামারীর কারণে মৃত্যুহার প্রতি মিলিয়নে ৯৩৯ জন, যা কিনা পরিষ্কারভাবে জিডিপির সঙ্গে সম্পর্কিত। ইউরোপীয় বেশকিছু দেশে করোনায় মৃতুহার অনেক বেশি, যেমন স্পেন (৬৪৭) ও যুক্তরাজ্য (৬১৩) এবং এ দেশগুলোর অর্থনীতিতে বড় ধরনের পতনের খবর শোনা যায়। অথচ ভারতে কিন্তু প্রতি মিলিয়নে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা মাত্র ৬০। যদিও এটি এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যে অন্যতম উচ্চহার। দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশটির অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে (যা বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি) এবং তাদের অর্থনৈতিক সংকোচনের কারণগুলো ব্যাখ্যা করাও কঠিন। বিশেষ করে পাঁচ বছর ধরে ভারতের অর্থনীতি যেখানে বিশ্বের অন্যতম তৃতীয় কিংবা চতুর্থ বর্ধমান অর্থনীতির মধ্যে ছিল।

এ ধরনের ব্যতিক্রমগুলোকে আমরা কীভাবে মূল্যায়ন করব?  বিষয়গুলো বুঝতে হলে আমাদের অবশ্যই চিকিৎসা এবং মানুষের আচরণসংক্রান্ত মিথস্ক্রিয়াগুলো উপলব্ধির প্রয়োজন পড়বে।

প্রচলিত ধারণা অনুসারে, করোনাভাইরাস খোলা জায়গার তুলনায় বদ্ধ জায়গায় বেশি ছড়ায়। সুতরাং আবদ্ধ রেস্তোরাঁর চেয়ে খোলামেলা পার্কেই আপনি কারো সঙ্গে বেশি নিরাপদ থাকবেন।

আমরা ধরে নিচ্ছি, এ ধরনের অন্তর্দৃষ্টি চিকিৎসা ও পদার্থবিজ্ঞান থেকে এসেছে, যথাক্রমে যা আমাদের বলে দেয় যে কভিড-১৯ অত্যন্ত সংক্রমিত রোগ এবং এটি সার্চ-কোভ-২ ভাইরাস বহন করে (যার কারণে মূলত রোগটি হয়)। তাই উন্মুক্ত পার্কে ভাইরাসটি হয়তো সরাসরি আপনাকে আক্রান্ত করতে সক্ষম হবে না, আবার আপনি হয়তো কারো সঙ্গে মুখোমুখি কথা বলছেন তখন বাতাসের কারণে এটি সরাসরি আপনার নাকে প্রবেশ করতে পারবে না।

তবে গোটা বিষয়টি কিন্তু এমন নয়। কারণ করোনাভাইরাসের অতিক্ষুদ্র কণাগুলো তুলনামূলক ভারী এবং বাতাসে ভেসে থাকা অবস্থা থেকে দ্রুত পতনের প্রবণতা রয়েছে। বিপরীতভাবে বাতাসে ভেসে আসা ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে উন্মুক্ত স্থানে হঠাৎ করে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যদিও ঘরের মধ্যে বা অভ্যন্তরে এ ধরনের ঝুঁকি নেই।

উন্মুক্ত স্থানের বিপরীতে আবদ্ধ জায়গা অনেক বেশি ঝুঁকিপ্রবণ—দাবিটি সত্যও হতে পারে। তবে করোনাভাইরাস কিংবা ভাইরাসটির বাতাসে ছড়ানো সম্পর্কে আমরা যা জানি তার কারণে নয়, বরং মানুষের আচরণের কারণে।

তর্কের খাতিরে আমরা ধরে নিলাম যে রেস্তোরাঁ কিংবা পার্কে কাছাকাছি কোনো সক্রমিত ব্যক্তি দ্বারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা ৫০ শতাংশ। আরো ধরে নিলাম যে জনসংখ্যার অর্ধেকই আক্রান্ত। সুতরাং আপনি যদি পার্কে বা রেস্তোরাঁয় কোনো ব্যক্তির সংস্পর্শে আসেন, তাহলে আপনার ২৫ শতাংশ কভিডে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।

যা-ই হোক ধরা যাক, নির্ভরযোগ্য কোনো সংস্থা ঘোষণা করল যে পার্কের তুলনায় রেস্তোরাঁয় কভিডে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। লোকেরা যদি এ কথা বিশ্বাস করে, তবে তা স্বসিদ্ধ ভবিষ্যবচনে পরিণত হতে পারে। রেস্তোরাঁগুলো তখন ঝুঁকি প্রতিরোধকারীদের কাছে কম আকর্ষণীয় হবে। ধরুন, ঝুঁকি আছে এমন জায়গায় যেতে অনিচ্ছুক লোকের সংখ্যা ২৫ শতাংশ। তাহলে তখন একমাত্র ঝুঁকি-সহনশীল লোকগুলোই রেস্তোরাঁয় যাবে।

বিষয়টি ধরে নেয়া যুক্তিসংগত হবে যে রেস্তোরাঁর পৃষ্ঠপোষকদের এক্ষেত্রে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকবে। কেননা সংগতকারণেই তাদের বেশি ঝুঁকি নিতে হবে।

সরল সমীকরণের জন্য ধরে নিন যে ঝুঁকি-সহনশীল ৭৫ শতাংশ লোকই আক্রান্ত হয়েছে। বিপরীতে ঝুঁকি গ্রহণে অনিচ্ছুক লোকেদের আক্রান্তের হার ২৫ শতাংশ। সেক্ষেত্রে সংক্রমিত ব্যক্তির ভাইরাসটি ছড়ানোর আশঙ্কা আগের মতো, কিন্তু ৫০ শতাংশই থাকছে। এরপর লোকেরা যদি এটা বিশ্বাস করে যে রেস্তোঁরাগুলো তুলনামূলক বেশি ঝুঁকির (কেননা ঝুঁকি-সহসশীল ব্যক্তিরা এখানে আসে), রেস্তোরাঁ থেকে সংক্রমণের আশঙ্কা ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ, যদিও পার্ক থেকে সংক্রমণের আশঙ্কা ১৫ শতাংশের কম।

মহামারীসংক্রান্ত তথ্যগুলোও এ সম্ভাবনাকে সমর্থন করে এবং বেশির ভাগ মানুষই বিশ্বাস করবে যে সম্পূর্ণভাবে মানুষের আচারণ দ্বারা চালিত হওয়ার চেয়ে বরং ভাইরাসটির প্রকৃতির সঙ্গে এ প্যাটার্নের সম্পর্ক রয়েছে। এ যুক্তি অনুসারে কর্তৃপক্ষ যদি ঘোষণা করত যে পার্কগুলো রেস্তোরাঁর চেয়ে বেশি নিরাপদ, তাহলে পার্কগুলো সময়মতো ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় পরিণত হতো। এমনকি মহামারী বিজ্ঞান ও ভাইরাসের অতিক্ষুদ্র কণার চলাচল বৈশিষ্ট্যের কারণে পার্কগুলো যদি রেস্তোরাঁর চেয়ে নিরাপদ হতো, যদি ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হতো যে পার্কগুলো রেস্তোরাঁর চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, সেক্ষেত্রেও রেস্তোরাঁর তুলনায় পার্কে গিয়ে আপনি বড় ধরনের ঝুঁকির সম্মুখীন হতেন।

এ-জাতীয় সংযোগগুলোকে চিহ্নিতকরণ নীতিগত হস্তক্ষেপের সুযোগ সৃষ্টি করে, যার মাধ্যমে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ছাড়াই ভাইরাসটির নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হতে পারে। ভারতের ভুল ছিল জোর করে চাপিয়ে দেয়া ‘লকডাউন’, যা ছিল স্রেফ লকডাউন শব্দের অপপ্রয়োগ। কারণ এটি ১০ লাখ অভিবাসী শ্রমিককে দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে। এক রাতের নোটিসে কাজ ও মজুরি হারিয়ে তাদের নগ্ন পায়ে মাইলের পর মাইল হাঁটতে বাধ্য করেছে।

জর্জিয়ার ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির জশুয়া ওয়েইটস সম্প্রতি স্টকহোম স্কুল অব ইকোনমিকসের এক ওয়েবিনারে জানিয়েছেন যে একদা আমরা চিকিৎসা ও অর্থনীতির মধ্যে সংযোগগুলো চিহ্নিত করার পর আকর্ষণীয় নীতি ধারণাগুলো উদ্ভূত হতে শুরু করে।

ভারত বা পেরুর মতো দেশগুলোকে অবশ্যই এমন আচরণগত নিয়ম তৈরি করতে হবে, যা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব থাকা অবস্থায় যেন অন্তত আংশিকভাবে হলেও অর্থনীতিকে কাজ করতে দেয়। একটি ধারণা দিচ্ছি। করোনা পরীক্ষার পরিমাণ বৃদ্ধির মাধ্যমে আমরা জানতে পারি যে কে কে কভিড-১৯ পজিটিভ এবং কার শরীরে সার্চ-কোভ-টু অ্যান্টিবডি রয়েছে। তখন আমরা এ মানুষগুলোকে উচ্চবেতনে কভিড-১৯-এর ঝুঁকি রয়েছে এমন ধরনের চাকরির প্রস্তাব দিতে পারি—হাসপাতালের পাশাপাশি যেখানে বিশেষ করে মুখোমুখি ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের প্রয়োজন বেশি পড়ে। তাদের দুর্বল ব্যক্তিদের সংযোগ হিসেবে ব্যবহার করার মাধ্যমে আমরা ভাইরাস সংক্রমণের শৃঙ্খলগুলোকে ব্যাহত করে সরবরাহ শৃঙ্খলগুলো অক্ষুণ্ন রাখতে পারি।

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বাজারগুলো নিজ থেকেই কাজটি করত; শরীরে অ্যান্টিবডি বহন করছে এমন লোকদের বাজার চাহিদা বৃদ্ধি পেত এবং একই সঙ্গে তাদের বেতনও বাড়ত। তবে মহামারীকালে বাজারগুলো কার্যকরভাবে কাজ করে না, বিশেষ করে অনেক কাজই যেখানে বাহ্যিক। এক্ষেত্রে সরকারগুলোকে বুদ্ধিমত্তা ও সুনিপুণভাবে নকশাকৃত নীতি দিয়ে হস্তক্ষেপ করতে হবে। এর মাধ্যমে অর্থনীতিকে বন্ধ না করেই আমরা ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণ করতে সমর্থ হব।

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

 

কৌশিক বসু: বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ও আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস