প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী সারা দেশের এক কোটি পরিবারের মধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য বিক্রি শুরু হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য কিনতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে সাধুবাদযোগ্য। বস্তুত দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এ সময়ে দরিদ্র মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দিতে এমন পদক্ষেপ জরুরি ছিল। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় দিন দিন টিসিবির ট্রাকের পেছনে সারি লম্বা হচ্ছে। এমনকি টিসিবির ট্রাকের লাইনে মধ্যবিত্তের দাঁড়ানোর খবরও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। চাহিদার চেয়ে ট্রাকগুলোয় পণ্য সরবরাহ কম থাকায় প্রতিদিন অনেক ক্রেতা পণ্য না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে ফ্যামিলি কার্ড চালুর সরকারি এ উদ্যোগে স্বল্প আয়ের লোকেরা উপকৃত হবেন বলেই আমাদের বিশ্বাস। এক কোটি পরিবারে এ কার্ডের মাধ্যমে অন্তত চার কোটি মানুষ এর সুফল ভোগ করবে। তবে বিভিন্ন সমীক্ষা অনুযায়ী অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, করোনার প্রভাব ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার কারণে অন্তত ছয়-সাত কোটি মানুষ সংকটে আছে। সে বিবেচনায় আরো অধিকসংখ্যক মানুষকে সুযোগ দিতে এ উদ্যোগের আওতা বাড়ানো প্রয়োজন। সর্বোপরি ফ্যামিলি কার্ড প্রদান থেকে শুরু করে পণ্য বিক্রির প্রতিটি স্তরে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে অনেকে মানবিক উদ্যোগ বলে অভিহিত করেছেন, যা যথার্থ বলেই মনে হয়। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় তা সমন্বয় করতে দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়ানো হয়েছে। ফলে পণ্য ও সেবা খাতের ব্যয় বেড়েছে, যা মূল্যস্ফীতির হারে উল্লম্ফন ঘটিয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, মূল্যস্ফীতি এরই মধ্যে জনজীবনে বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির প্রভাব নিম্ন আয়ের মানুষকে চরম দুরবস্থায় নিপতিত করেছে। এমনিতেই করোনার কশাঘাতে চাকরিহারা, বেকার ও আয়-রোজগার কমে যাওয়া জনগোষ্ঠী দৈনন্দিন খরচের টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে। এর মধ্যে মূল্যস্ফীতির চাপে বড় ধরনের ভোগান্তিতে পড়েছে অনেক পরিবার, তা বলাই বাহুল্য। এ অবস্থায় ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় এক কোটি পরিবার উপকৃত হলে তা তাদের জীবনে কিছুটা হলেও স্বস্তি বয়ে আনবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এক্ষেত্রে দেশের বাইরের উৎস থেকে পণ্য এনে তা বিতরণের উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। এতে বাজারে মূল্যের ওপর প্রভাব পড়ায় অন্যরাও উপকৃত হবেন, যা এ মুহূর্তে জরুরি।
ভারতে রেশনের মাধ্যমে খাদ্য সরবরাহ প্রকল্পের পোশাকি নাম ‘জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা মিশন’। কেন্দ্রের এ প্রকল্পের আওতায় রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের ৬ কোটি ২ লাখ রেশনগ্রহীতা। এ প্রকল্পে ভর্তুকি দিয়ে ৩ টাকা কেজি দরে চাল ও ২ টাকা কেজি দরে গম সরবরাহ করে কেন্দ্র। প্রায় প্রতিটি রাজ্যই এ প্রকল্প অনুসরণ করে রেশন ব্যবস্থা চালায়। কিন্তু দেশজুড়ে করোনার প্রবল দাপট শুরু হলে অর্থকষ্টে ভুগতে থাকা সাধারণ মানুষকে খানিক সুরাহা দিতে নতুন রেশন নীতি গ্রহণ করে পশ্চিমবঙ্গসহ ১২টি রাজ্য। ২০২০ সালের এপ্রিলে মমতা সরকার ঘোষণা করে—রেশনের মাধ্যমে যে চাল-গম দেয় কেন্দ্র, তাতে অতিরিক্ত ভর্তুকি দিয়ে বিনামূল্যে তা সরবরাহ করবে রাজ্য খাদ্য দপ্তর। এ নতুন উদ্যোগকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ‘দুয়ারে রেশন প্রকল্প’ চালু করে। অর্থাৎ রেশনের চাল-গম শুধু বিনামূল্যেই নয়, তা গ্রাহকদের দরজায় পৌঁছে দেয়ার দায়িত্বও নেয় সরকার। দেশটিতে আধার কার্ড রয়েছে, যার মাধ্যমে স্বল্প মূল্যে কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য জনগণ পেয়ে থাকে। ভারত সরকার নাগরিকদের জন্য সুনির্দিষ্ট সরকারি সুবিধা ও ভর্তুকি বরাদ্দের প্রক্রিয়া অধিক যৌক্তিকীকরণ এবং এতে স্বচ্ছতা আনার জন্য আধার কার্ড প্রবর্তন করেছে। এখন এর সুবিধা ও ব্যবহার দায় পরিশোধ বা পেমেন্ট ব্যবস্থা, কর নিয়ন্ত্রক এবং আরো অনেক কিছু হিসেবে আবর্তিত হয়েছে। ফলে ভারতীয় সব নাগরিকের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিলে পরিণত হয়েছে। ফলে সুবিধাভোগী নির্বাচন ও ভুল ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির সমস্যা অনেকাংশে কমিয়ে আনা গিয়েছে বলে খবর মিলছে। গবেষণায় উঠে এসেছে ডিজিটাল অবকাঠামো সৃষ্টিতে আধার কার্ডের প্রত্যক্ষ অবদান রয়েছে, যার মধ্য দিয়ে আর্থিক ও সামাজিক বিনিময় ঘটছে। বাংলাদেশও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে পারে।
অতীতের অনেক সরকারি ত্রাণ কর্মসূচিকে আমরা দুর্নীতির কবলে পড়তে দেখেছি। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণের উদ্দেশ্য দুর্নীতি ঠেকানো। তবে এটি কেবল তখনই সুফল দিতে পারবে যখন ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেয়ার জন্য পরিবার নির্বাচন ও বিতরণ প্রক্রিয়াকে দুর্নীতিমুক্ত রাখা হবে। এটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব এড়াতে এবং সুবিধাভোগী তালিকা তৈরির প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কঠোর সরকারি তত্ত্বাবধানের প্রয়োজন হবে। বিশেষজ্ঞরা বারবার রাজনৈতিক নেতাদের এ-জাতীয় কর্মসূচিগুলো নিয়ে সতর্ক করেছেন। কারণ এটি প্রায়ই দরিদ্রদের তাদের সুবিধা থেকে বঞ্চিত করেছে। স্থানীয় প্রশাসনের উচিত কার্ড পাওয়ার যোগ্য সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলো নিয়ে তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা। পূর্ববর্তী ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই অব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য সমস্যার কারণে দীর্ঘ লাইন ও বিশৃঙ্খলা দেখেছি। এ ধরনের সমস্যা এড়াতে সরকারের উচিত আগে থেকেই ব্যবস্থা নেয়া। সরকার যদি ব্যবস্থাগুলো সঠিকভাবে নিতে পারে তবে এ কর্মসূচি নিশ্চিতভাবেই দুর্দশাগ্রস্ত মানুষকে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে আরো কঠোর প্রচেষ্টা প্রয়োজন। কারণ এটিই এ সংকটের একমাত্র বাস্তবসম্মত দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। ঢাকা ও বরিশাল শহরে খোলা ট্রাকে টিসিবির পণ্য বিক্রয়ে নতুন করে অমোচনীয় কালি ব্যবহারের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা মন্দের ভালো। কিন্তু যে পরিবারে চার-পাঁচজন সদস্য রয়েছে তারা প্রতিদিন একজন করে পণ্য ক্রয় করতে বাধা থাকে না। সে কারণে একই পরিবার ইচ্ছা করলে প্রতি সদস্যকে দিয়ে সাশ্রয়ী মূল্যের পণ্য প্রতিদিন ক্রয় করতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। এমনটি অবারিত থাকাও উচিত নয়। সব পরিবারের কথা বিবেচনা করলে এ ধরনের নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবস্থা মূল উদ্যোগটিকেই ব্যাহত করে। ঢাকা ও বরিশালে এ পর্যন্ত টিসিবির পণ্য বিক্রয়ে নানা অনিয়ম এভাবেই ঘটে আসছে। সে কারণে প্রয়োজন ছিল পরিবারের তালিকা প্রণয়নের। এখনো সিটি করপোরেশন সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ অসচ্ছল ও কম আয়ের পরিবারের তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে পারে। বিশেষত টিসিবির পণ্যসামগ্রী যদি দীর্ঘমেয়াদে সরকারের পরিকল্পনার মধ্যে থাকে তাহলে সুষ্ঠু ও দুর্নীতিমুক্ত টিসিবি পণ্য বিপণনের জন্য ফ্যামিলি কার্ড অথবা রেশন কার্ড প্রবর্তনের উদ্যোগ নেয়া দরকার। বিষয়টি সরকারকে এখনই ভাবতে হবে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জায়গাটিতে সরকারকে আরো বেশি সুদৃষ্টি দিতে হবে। যেসব অঞ্চলে এসব দুর্নীতিবাজ প্রতিনিধির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে এসব কাজে সংযুক্ত করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে দেখা যাবে, প্রকৃত পাওয়ার যোগ্য মানুষ সরকারের দেয়া এসব সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাছাড়া সরকার ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যের এ ব্যবস্থা সারা বছর অব্যাহত রাখতে পারলে নিত্যপণ্যের বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। অসাধু কোনো ডিলার যেন এক্ষেত্রে নিয়োগ না পায়, সেটিও নিশ্চিত করতে সরকারকে সুদৃষ্টি রাখতে হবে। যদিও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে বলা হচ্ছে, ফ্যামিলি কার্ড তৈরি বা বিতরণে অনিয়ম হলে তা অবশ্যই খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমরাও আশা রাখছি, অসহায়, হতদরিদ্র মানুষের কথা বিবেচনা করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি থেকে দূরে থাকবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেয়া এ বিরাট উদ্যোগে তারা অবশ্যই সহযোদ্ধা হিসেবে কাজ করবেন। এছাড়া টিসিবির ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি নিত্যপণ্যের বাজারেও দাম স্বাভাবিক রাখতে সরকারের মনিটরিং কমিটি যথাযথভাবে কাজ করবে এমন প্রত্যাশাই রইল।










