দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের মতো বড় শিল্প খাতে উৎপাদন সূচক প্রথমবারের মতো ঋণাত্মক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে এ শিল্পের উৎপাদন সূচক ঋণাত্মক দশমিক ৩৮ শতাংশে নেমেছে। অথচ আগের বছরগুলোয় ছিল ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে ইতিবাচক ৭ শতাংশ থেকে ঋণাত্মক পর্যায়ে চলে আসা শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির গভীর সংকটকেই ইঙ্গিত করে। অবশ্য এ সংকট শুধু একটি কারণের ফল নয়। গ্যাস এবং বিদ্যুতের অনিশ্চিত সরবরাহ, বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকট, ব্যাংক ঋণের উচ্চ চাপ, অভ্যন্তরীণ বাজারে দুর্বল চাহিদা ও নীতিগত অনিশ্চয়তা— সবকিছুর যৌথ চাপ মিলে পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে। উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগের কথা তো ভাবতেই পারছেন না; বরং বর্তমান উৎপাদন ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে গেছে। সরকার ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটিয়ে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে পৌঁছার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। এছাড়া আরো পাঁচ লাখ কর্মসংস্থান তৈরিরও পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু বড় শিল্প খাতে যদি বিনিয়োগ হ্রাস, উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হতে থাকে তাহলে এসব লক্ষ্য পূরণ হবে কিনা এ নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে।

গত জুলাইয়ে এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর থেকে গ্যাস সংকট সারা দেশেই ভোগান্তি বাড়িয়েছে। দেশের প্রধান শিল্প এলাকা সাভার-ধামরাইয়ে দিনের বড় অংশজুড়ে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্য থাকছে। এ সংকটের কবলে পড়েছে গ্লাস, সিরামিক, বস্ত্র ও তৈরি পোশাক শিল্প। গ্লাস শিল্পের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বিশেষভাবে জটিল। গ্লাস ফার্নেস বা চুল্লি একবার বন্ধ করলে তা পুনরায় চালু করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। তাই উদ্যোক্তারা উৎপাদন চালু রাখতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডিজেল ব্যবহার করছেন। এটি বড় আর্থিক চাপ তৈরি করছে, যা দীর্ঘায়িত হলে এ শিল্পই ঝুঁকিতে পড়বে। অন্যদিকে গাজীপুর জেলায় প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা ছিল ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট, কিন্তু বর্তমানে মাত্র ২৬০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ হচ্ছে। এ বিশাল ঘাটতি মেটাতে তৈরি পোশাক শিল্পের ডায়িং, ওয়াশিং ও স্পিনিং কারখানাগুলো ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছে। তাতে উৎপাদন কমেছে ৩০-৪০ শতাংশ। বস্ত্র শিল্পের অবস্থা আরো গুরুতর। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের ১ হাজার ৮৫০টি কারখানার মধ্যে প্রায় ৯০০টিতে গ্যাস না থাকায় উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সংকট নতুন জটিলতা যোগ করেছে। ডলারের বিপরীতে টাকার মান ৮৪ থেকে ১২২ টাকায় পৌঁছে গেছে। যারা বৈদেশিক ঋণ নিয়েছেন তাদের ঋণের বোঝা বেড়ে গেছে বিপুল পরিমাণে। ব্যাংক ঋণের সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে দেশীয় শিল্প এখন আর্থিক সংকটের খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির মধ্যেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে, অথচ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ ঋণ বাস্তবায়নের হার লক্ষ্যের অর্ধেকের সামান্য বেশি। উদ্যোক্তারা এ পরিবেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী নন। ইস্পাত শিল্পের অনেক প্রতিষ্ঠান এখন খেলাপি ঋণের মুখোমুখি হতে চলেছে।

শিল্প সংকটের সবচেয়ে গুরুতর পরিণতি দেখা যাচ্ছে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে। সরকারের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের আটটি শিল্প এলাকায় ৭৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে এবং চাকরি হারিয়েছেন ১৭ হাজার ৮৫৬ শ্রমিক। মোট ৩৩৯টি কারখানা এখন সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে এবং ১৭টি কারখানা কোনো উৎপাদন করতে পারছেই না। তৈরি পোশাক শিল্পেও গত সাত মাসে ৩৮টি কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের সাময়িক ছুটি বা দীর্ঘমেয়াদি লে-অফ দিচ্ছে। যেখানে অনেকে কাজ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন, এমন অবস্থায় নতুন কর্মসংস্থান গড়ার বিষয়েও উদ্বেগ দেখা দিচ্ছে।

বাংলাদেশের শিল্প খাত এখনো গভীরভাবে আমদানিনির্ভর। কাঁচামাল, জ্বালানি, যন্ত্রপাতি এবং মধ্যবর্তী পণ্য সরবরাহে সামান্যতম বাধাই উৎপাদন ব্যাহত করে। এ কাঠামোগত দুর্বলতা শিল্পকে বাহ্যিক ধাক্কার প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছে। শিল্প সংকটের আরেকটি কারণ হলো অভ্যন্তরীণ বাজারে দুর্বল চাহিদা। মূল্যস্ফীতির কারণে ভোগ্যপণ্যের বাজারে ক্রয়ক্ষমতা দুর্বল হয়েছে। চাহিদা কম থাকায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন সংকুচিত করছে। নীতির অনিশ্চয়তা ও ব্যবসায় পরিবেশে আস্থার সংকটও এ শিল্পের অচলাবস্থা বাড়াচ্ছে। বিনিয়োগ পরিবেশ ঘিরে অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ নিরুৎসাহী করে। যখন বৃহত্তর ব্যবসায়িক পরিবেশ নেতিবাচক থাকে, তখন কোনো ব্যক্তিগত প্রণোদনা শিল্প খাতকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে না।

বর্তমান সংকট অতিক্রম করতে শুধু স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়, বরং নির্ভরযোগ্য এবং সাশ্রয়ী গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে বিকল্প গ্যাস উৎস খুঁজে বের করতে হবে। এরপর বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে হবে। টাকার অত্যধিক অবমূল্যায়ন শিল্পের আমদানীকৃত কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মুদ্রা বাজারে পূর্বানুমানযোগ্যতা না থাকলে আমদানিকারকরা ক্রয় পরিকল্পনা তৈরি করতে পারেন না। এছাড়া ব্যাংক ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধিও জরুরি। উচ্চ সুদের হার বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগকে নিরুৎসাহী করছে। এক্ষেত্রে সরকারকে সুদহার সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে আনাসহ ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।

এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি না নিলে আগামী বছরগুলোয় এ পতন আরো গভীর হবে। বিশ্ব বাজারে আমাদের অবস্থান দুর্বল হবে, রফতানি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ব। সরকার ও ব্যাংক খাত এখনই একটি সমন্বিত কর্মসূচি নিতে পারে, যাতে জ্বালানি, বৈদেশিক মুদ্রা, ঋণপ্রবাহ ও নীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয়। এ পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে বিলম্ব মানে শিল্প খাতের আরো অবনয়ন ও বেকারত্ব এবং রফতানি আয়ের হ্রাস। প্রতিটি হারানো মাস, প্রতিটি বন্ধ কারখানা, প্রতিটি চাকরি হারানো শ্রমিক ভবিষ্যতের সুযোগকে আরো সংকুচিত করে দিচ্ছে। এ মুহূর্তে কঠোর সিদ্ধান্ত ও এর জরুরি বাস্তবায়ন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।