শিল্প ও কলকারখানাসমৃদ্ধ অঞ্চল নারায়ণগঞ্জ। সেখানেই বৃহস্পতিবার ঘটে গেল মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড। এতে ৫২ জন কর্মীর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। এখনো অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ফায়ার সার্ভিস বলছে এ ভবন পুরোটাই অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত এবং এখানে আগুন নেভানোর কোনো সরঞ্জাম ছিল না। অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ এবং আগুন নেভানোর সরঞ্জাম না থাকা—এটা মূলত কোনো দুর্ঘটনা নয়, সম্পূর্ণ গাফিলতি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেজান জুসের সংশ্লিষ্ট কারখানার নিচতলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হলে নিরাপত্তাকর্মীরা প্রধান গেট লাগিয়ে দেন। শ্রমিকরা আগুন থেকে বাঁচার জন্য ওপরের তলায় উঠে যান। কিন্তু কারখানার নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকজন শ্রমিক ছাদ থেকে লাফিয়ে নিচে নামতে গিয়ে মারাও যান। তবে তাদের বেশির ভাগই মারা যান আগুনে পুড়ে। দেশ এমনিতেই করোনা দুর্যোগের অভিঘাতে বিপর্যস্ত। এমনকি এ ভাইরাসের সংক্রমণে শনাক্ত ও মৃত্যুহার বাড়ায় কঠোর লকডাউনে যখন অফিস-আদালতসহ বাইরের প্রায় সব কাজ বন্ধ, তখন কারখানাগুলো চলছিল প্রশাসনের বিশেষ অনুমতিতে। এমন এক সময়ে রূপগঞ্জের কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নিদারুণ কষ্টের ও দুঃখের।

কোনো কারখানার অনুমোদন পেতে হলে শ্রম আইন অনুসারে যেকোনো দুর্ঘটনার সময় বেরোনোর উপযুক্ত পথ বা সিঁড়ি, কারখানার প্রশস্ত পরিবেশ এবং নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাসহ ন্যূনতম নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকতে হবে। অনেক কারখানায় যন্ত্রপাতি থাকলেও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোকবলও থাকে না। আর হাসেম ফুডের সেজান জুসের কারখানায় যন্ত্রপাতি ও লোকবল কোনোটাই ছিল না বলে খবর মিলছে। কারখানার আগুন নেভানোর দায়িত্বে নিয়োজিত ফায়ার ব্রিগেডের এক কর্মকর্তা বলেছেন, এ ধরনের কারখানায় অন্তত চারটি সিঁড়ি থাকা প্রয়োজন। হাসেম ফুডে ছিল দুটি সিঁড়ি। ফলে শ্রমিকদের সিঁড়ি দিয়ে নামতেও বেগ পেতে হয়েছে। প্রশ্ন, শ্রমিকদের জীবন বাঁচাতে মালিকদের কিছু করণীয় নেই? এতগুলো মানুষের মৃত্যুর দায় কোনোভাবেই কারখানা মালিক এড়াতে পারেন না। দায় এড়াতে পারে না কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরও। কারণ কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা তদারকির দায়িত্ব তাদেরও ছিল। আমরা চাই এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক। দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা হোক। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, কারখানাটিতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু শ্রমিক কর্মরত ছিল বলে জানা যাচ্ছে। এসব ঘটনার সত্যাসত্য যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি দুর্ঘটনা ঘটার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, কিন্তু তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ঠিকভাবে প্রকাশ হয় না কিংবা হলেও তাদের সুপারিশ আমলে নেয়া হয় না। বিশেষত শ্রমিকদের জন্য কর্মপরিবেশ নিরাপদ করার দাবি অনেক দিনের। সে অনুযায়ী অনেকেই তাদের কারখানা শ্রমিক ও পরিবেশবান্ধব করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। আমরা প্রত্যাশা করি, রূপগঞ্জের কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের জন্য গঠিত তদন্ত কমিটি যথাযথ তদন্ত শেষে তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। ভবনের ত্রুটিসহ আগুন লাগার পেছনে দায়ীদের শাস্তির ব্যবস্থা করবে। তবে সবকিছুর আগে আহতরা যাতে উপযুক্ত চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্তরা যথাযথভাবে ক্ষতিপূরণ পান, তার ব্যবস্থা করতে হবে। শিল্প-কারখানাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে জোর দিতে হবে। ভবনের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাসহ সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসনের তদারকিরও বিকল্প নেই। কারখানায় অগ্নিকাণ্ড, সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদন ও দায়ীদের শাস্তি নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। তাজরীনের ঘটনার পর সারা দেশে শ্রমিকদের মধ্যে প্রচণ্ড বিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল। আন্দোলনের মুখে সরকার কারখানার মালিককে গ্রেফতারও করে। কিন্তু এরপর তিনি জামিন নিয়ে বিদেশে চলে যান। নিহত শ্রমিকদের পরিবার ও আহত শ্রমিকরা তাদের ক্ষতিপূরণ ও প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। হাসেম ফুডের ঘটনায় তার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে, সরকারকেই তা নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্বের কয়েকটি দেশে শিল্প-কারখানার কমপ্লায়েন্স বাস্তবায়নে স্কোরের ব্যবস্থা করেছে। এর ওপর নির্ভর করে লাল, নীল, হলুদ, সবুজসহ কয়েকটি ক্যাটাগরিতে কারখানা চিহ্নিত করে সেগুলো উন্নয়নে কাজ করা হয়। যেসব কারখানা নির্দিষ্ট স্কোর অর্জনে সমর্থ হয় না, সেগুলোর পরিচালন বন্ধ করে দেয়া হয়। যেগুলো মোটামুটি স্কোর অর্জন করেছে, সেগুলোর কর্মপরিবেশ উন্নয়নে নিয়মিত বিরতিতে তদারকি, পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দেয়া হয়। বাংলাদেশেও এমন মডেল অনুসরণ করে তৈরি পোশাক শিল্পের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা গেছে। এ প্রক্রিয়া দেশের অন্যান্য শিল্পেও প্রয়োগ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তরের মাধ্যমেই কাজটি করা যায়। তাদের সক্ষমতা, দক্ষতা ও লোকবল বেড়েছে। প্রয়োজনে আরো বিনিয়োগ বাড়িয়ে তাদের সক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে। উন্নত দেশগুলো শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা ও আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করায় এ ধরনের দুর্ঘটনা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে সমর্থ হয়েছে। আমাদের তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী করার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে মালিক, পরিচালক ও তদারকি সংস্থাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

বাংলাদেশে নিয়মিত ঘটতে থাকা বিভিন্ন দুর্ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা যায়, কাঠামোগত কারণে বারবার মর্মান্তিক সব দুর্ঘটনা ঘটে, যার অধিকাংশ কারণই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জানা এবং সুনির্দিষ্ট কতগুলো পদক্ষেপ নিলে সেসব দুর্ঘটনার হার বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। দুর্ঘটনা প্রতিরোধ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য যে বাড়তি বিনিয়োগ করতে হয়, তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক হলেও তাত্ক্ষণিক লাভ-লোকসান বিবেচনায় অনেকেই এ বিনিয়োগ করতে চান না। আর এ কারণেই কর্তৃপক্ষের প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি এক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে খুব কম ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনার জন্য কোনো কারখানা বা যানবাহন বা কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিক ও ব্যবস্থাপক থেকে শুরু করে অনুমোদন ও তদারককারী প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের জবাবদিহি ও শাস্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিশ্বের যেসব দেশে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহি করতে হয়, সেসব দেশে দুর্ঘটনার হার অনেক কম। বাংলাদেশে এমন জবাবদিহিতামূলক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি বলেই দুর্ঘটনার কাঠামোগত ভিত্তিগুলো অক্ষুণ্ন থেকে যাচ্ছে। সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের জন্য মালিকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে বলে খবর মিলছে। আমরা চাইব সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ী সবার শাস্তি নিশ্চিত হবে।

হতাশার বিষয় হলো, জাতীয় স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা কাউন্সিলের পক্ষ থেকে সব কারখানাকে সুরক্ষা কমিটি তৈরির নির্দেশনা দেয়া হলেও পোশাক শিল্প ছাড়া অন্যান্য খাতের কারখানা তা প্রতিপালন করেনি। দেশের তৈরি পোশাক শিল্প এক সময়ে দুর্ঘটনায় কর্মীর মৃত্যুর কারণে সংকটের মধ্যে পড়ে। আজ দেশের পোশাক শিল্পের অনেক কারখানা আন্তর্জাতিক সর্বোচ্চ মান/পদক অর্জন করেছে। কয়েক বছর ধরে তৈরি পোশাক শিল্প যে ধরনের সংস্কারের মধ্য দিয়ে গেছে, তাতে এর ঝুঁকি অনেকটাই কমে এসেছে। ঠিক একইভাবে অন্যান্য শিল্প-কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়নে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে কারখানার অগ্নিনিরাপত্তা থেকে শুরু করে কর্মপরিবেশ উন্নত করতে হবে। এক্ষেত্রে তাদের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তাও জোগাতে হবে।

এর আগে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানা পর্যায়ে বিদেশী ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে কিছু ব্যবস্থা নেয়। এ কারণেই পোশাক শিল্পে সুরক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি হলেও অন্যান্য খাত অবহেলিত থেকে গেছে। সব শিল্প খাতকে এখন অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে; ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ কারখানা চিহ্নিত করে সেগুলো বন্ধ করতে হবে অথবা অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ হিসেবে স্বল্পমেয়াদি সময় দিয়ে সংস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে; ভবনগুলোয় নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ও জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে; পর্যাপ্তসংখ্যক ফায়ার হাইড্রেন্ট স্থাপন করতে হবে; রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা প্রতিষ্ঠার লাইসেন্স প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক ও স্বচ্ছ করতে হবে; আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজনীয় ক্ষমতা প্রদান করতে হবে। একই সঙ্গে তাদের জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করা জরুরি।