বাংলাদেশের বাণিজ্যের লাইফলাইন চট্টগ্রাম বন্দর। দেশের আমদানি-রফতানির ৯০ শতাংশের বেশি এ বন্দরের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। স্বভাবতই বন্দরে ব্যয়ের একটি প্রভাব পণ্য আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে পড়ে। বন্দরের ব্যয় কম হলে ব্যবসায়ের ব্যয় কমে আসে, উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও বাড়ে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় এফবিসিসিআই সভাপতি বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে ৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যবসার ব্যয় কমানো সম্ভব। চট্টগ্রাম বন্দরে পরীক্ষাগারের স্বল্পতা, পণ্য বা কনটেইনার রাখার স্থানস্বল্পতা, কাস্টমসের জটিলতা, উচ্চ ট্যারিফ, পণ্য খালাসে বিলম্ব প্রভৃতি কারণে ব্যবসার ব্যয় বাড়ছে। এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী বাণিজ্যের গতিশীলতা বজায় রাখা এবং প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে এটি সহায়ক নয়। সেক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দরকে সাশ্রয়ী মূল্যে আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করতে হবে। সে প্রস্তুতি এখন থেকেই নেয়া প্রয়োজন।
প্রতি বছর চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের পরিধি বাড়ছে। কিন্তু বন্দরের সক্ষমতা না বাড়ায় ব্যবসায়ীদের প্রায় সময়ই নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। নানা উদ্যোগের পরও কনটেইনার জট ঠেকানো যায়নি। বাড়ানো হয়েছে ট্যারিফ। জেটিতে ভেড়ানোর অপেক্ষায় বহির্নোঙরে জাহাজ অলস বসে থাকার জন্য ব্যবসায়ীদের বৈদেশিক মুদ্রায় ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের এমন প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে তারা বিদেশী ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য পাঠাতে পারছেন না, ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। এতে অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। চীন, সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার বন্দরগুলোর তুলনায় কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের চার্জ বাংলাদেশের বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া কনটেইনার স্থানস্বল্পতা ও শেডের ভাড়া বেশি। শুধু তা-ই নয়, বন্দরের নাব্য সংকটের কারণে বড় জাহাজ বন্দরে আসতে পারে না। এ কারণে ছোট ছোট জাহাজে পণ্য আনা-নেয়া করায় বাড়তি খরচ হয়। স্টোর রেন্ট, লোডিং-আনলোডিং ফি, রিভার ডিউস, পোর্ট ডিউস, স্টাফিং-আনস্টাফিং ফির হার অন্যান্য দেশের চেয়ে বেশি বলে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন। এ কারণে বাণিজ্যের ব্যয় বেড়ে যায়। পার্শ্ববর্তী ও সমসাময়িক দেশের বন্দর ব্যবহারে ফি ও চার্জের আলোকে চট্টগ্রাম বন্দরের ফি ও চার্জ সমন্বয় প্রয়োজন। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় অনেক সময় ব্যয় হয়। দীর্ঘ সময় বন্দরে পণ্য রাখতে ব্যবসায়ীদের বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে। এভাবে ধাপে ধাপে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সৃষ্ট ব্যয় কমিয়ে আনা গেলে অবশ্যই বাণিজ্যের ব্যয় কমে আসবে। যার সুবিধা শুধু ব্যবসায়ীরা নয়, পুরো দেশের অর্থনীতি লাভ করবে।
বন্দরে উৎপাদনশীলতা বা সক্ষমতা পরিমাপ করা হয় কনটেইনার ওঠানো-নামানোর সংখ্যা হিসাব করে। যে বন্দর দিয়ে যত দ্রুত ও ব্যয়সাশ্রয়ী প্রক্রিয়ায় কনটেইনার ওঠানো-নামানো যায়, সেই বন্দরই অধিক সক্ষম। ২০২০ সালে সারা বিশ্বের বন্দরগুলোর ব্যস্ততা, অর্থাৎ কনটেইনার পরিবহনের সংখ্যা ও চার্জ হিসাব করে শীর্ষ ১০০টি বন্দরের তালিকা তৈরি করেছে লয়েডস লিস্ট। বাংলাদেশের গেটওয়ে খ্যাত চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান নেমে গেছে ৬৭তম স্থানে। তালিকার ওপরে রয়েছে চীনের সাংহাই বন্দর, দ্বিতীয় সিঙ্গাপুর বন্দর। সুতরাং চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে আরো অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। জার্মানির হামবুর্গ পোর্ট কনসাল্টিংয়ের গবেষণা বলছে, ২০৩৬ সালে ২০ ফুট দীর্ঘ ৫৬ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করতে হবে চট্টগ্রাম বন্দরকে। ক্রমবর্ধমান সমুদ্র বাণিজ্য সামাল দিতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের এ পরামর্শ আমলে নেয়া প্রয়োজন।
যে দেশের সমুদ্রবন্দর যত উন্নত ও ব্যয়সাশ্রয়ী, তার অর্থনৈতিক উন্নয়নও দ্রুত হয়েছে। বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গায় অবস্থিত। বাংলাদেশের বন্দরগুলো থেকে ভারতের উত্তর-পূর্বের প্রদেশগুলো খুব কাছে। চীনেরও দক্ষিণ ভাগের স্থলবেষ্টিত অঞ্চলের জন্য বাংলাদেশের বন্দরগুলো সুবিধাজনক। এছাড়া নেপাল, ভুটান তো আছেই। এদিকে বাংলাদেশে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাবে বাংলাদেশ ১১ উদীয়মান অর্থনীতির দেশের একটি। উন্নয়নের এ ধারা অব্যাহত থাকলে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা আরো বাড়াতে হবে। জাহাজ ও কনটেইনার জট দূর করে বন্দরকে আরো গতিশীল করতে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। গত এক দশকে বন্দরে কোনো টার্মিনাল না বাড়লেও এখন কর্ণফুলীর মোহনায় বে-টার্মিনাল, পতেঙ্গায় কনটেইনার টার্মিনাল, লালদিয়া টার্মিনাল ও কর্ণফুলী কনটেইনার টার্মিনাল নামে চারটি স্বতন্ত্র টার্মিনাল নির্মাণের প্রকল্প চূড়ান্ত করা হয়েছে। ১২৯ বছরে যে বন্দরে চারটি কি গ্যান্ট্রি ক্রেন এসেছে, সেই বন্দরে এখন একসঙ্গে আনা হচ্ছে ছয়টি কি গ্যান্ট্রি ক্রেন। বন্দরে কনটেইনার জট কমাতে ৩৭ একর জায়গার ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে নতুন ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড। আবার সাউথ কনটেইনার ইয়ার্ড চালু করে তাতে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে নিলাম পণ্যের কনটেইনার। বন্দর সম্প্রসারণ করতে সীতাকুণ্ড এলাকায়ও আরেকটি টার্মিনাল নির্মাণের ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হচ্ছে। বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পগুলোর কাজ শুরু ও শেষ করা গেলে গতি বাড়বে চট্টগ্রাম বন্দরের। কমবে কনটেইনার ও জাহাজ জট। উদ্যোগগুলো অবশ্যই ইতিবাচক, তবে বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে সুযোগ থেকে উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ এরই মধ্যে পার হয়েছে, বেড়েছে ব্যয়ও। এটি বাণিজ্যের ব্যয় বাড়িয়ে তুলছে। বড় বিষয় হলো বন্দর ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন।
বন্দরের যে সক্ষমতা আছে, তাতে আরো কয়েক বছর হয়তো ব্যবসায়িক চাহিদা মেটানো যাবে। কিন্তু যে হারে দেশের আমদানি ও রফতানি বাড়ছে, তাতে বন্দরের সক্ষমতা আরো বাড়াতে হবে। প্রথমত, চট্টগ্রাম বন্দরে আরো জেটি ও কনটেইনার ওঠানো-নামানোর জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতির জোগান দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, পতেঙ্গা টার্মিনালের কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে। বে-টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী টার্মিনাল স্থাপনের কাজও দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে যত পণ্য পরিবহন হয়, তার অধিকাংশই আনা-নেয়া হয় কনটেইনারবিহীন সাধারণ জাহাজে। সাধারণ জাহাজের (বাল্ক, ব্রেক বাল্ক ও ট্যাংকার) খোলে আমদানি হয় মূলত সিমেন্ট, ইস্পাত ও সিরামিক কারখানার কাঁচামাল এবং পাথর, কয়লা, ভোগ্যপণ্য ও জ্বালানি তেল। পরিমাণে এক-চতুর্থাংশ পণ্য পরিবহন হলেও কনটেইনারে বেশির ভাগ শিল্পের কাঁচামাল, বাণিজ্যিক পণ্য ও ভোগ্যপণ্য আমদানি হয়। অন্যদিকে সমুদ্রপথে রফতানির পুরোটাই যায় কনটেইনারে। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশীয় পণ্যের আমদানি-রফতানির বাইরে সম্প্রতি ভারত দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য পরিবহনে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করছে। প্রাথমিকভাবে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ কম হলেও ভবিষ্যতে তা বাড়বে। নেপাল ও ভুটানও সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহারে আগ্রহী। সেক্ষেত্রে চট্টগ্রামসহ তিনটি সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বন্দর ব্যবহারের ব্যয় কমিয়ে আনতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে ব্যয় হ্রাস সম্ভব। থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুুরের বন্দরগুলো কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণপূর্বক ব্যয় কমিয়ে এনেছে। তাছাড়া পণ্য পরিবহন বেড়ে উঠলে বন্দরের আয়ও বেড়ে উঠবে। সেক্ষেত্রে চার্জ বা ফি বৃদ্ধি নয়, অধিক পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে বাড়তি আয় করা যাবে। তবে সর্বাগ্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সময়ক্ষেপণের কারণে যে ব্যয় বাড়ে, সেটি কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। বন্দর কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা ও অবকাঠামো সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এটি অর্জন কঠিন নয়।










