বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে এবার সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা সরকারি অফিসের সময় এগিয়ে আনার পাশাপাশি ১ ঘণ্টা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ব্যাংক লেনদেনের সময়ও এগিয়ে আনা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাপ্তাহিক ছুটি করা হয়েছে দুদিন। তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সময়সূচি পরিবর্তন করা হয়নি। গত মাসে ১ ঘণ্টা করে লোডশেডিং, সরকারি সব দপ্তরে বিদ্যুতের ব্যবহার ২৫ শতাংশ কমানোসহ আট দফা সিদ্ধান্তও নিয়েছিল সরকার। ব্যয় সাশ্রয়ে এমন পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন হলো এতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও ব্যয়ের কতটা সাশ্রয় হয়েছে? সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কিছু জানানো হয়নি, এ-সংক্রান্ত কোনো গবেষণা হয়েছে বলেও জানা যায় না। জ্বালানি সাশ্রয় করতে গিয়ে সেবা বিঘ্নিত ও উৎপাদনশীলতা কমছে কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এরই মধ্যে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, সেগুলো কতটুকু কার্যকর এবং কতটুকু জ্বালানি ও ব্যয় সাশ্রয় হয়েছে বা অর্থনীতির গতিশীলতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কিনা, তার মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি করেছে, তার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে। সম্প্রতি দেশজুড়ে লোডশেডিং ফিরে এসেছে। জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে বাড়ানো হয়েছে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। এ পরিস্থিতি লকডাউনের সময়ের মতো হোম অফিস চালু, অফিসের কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনা, এসি ব্যবহারে সংযমী হওয়াসহ বেশকিছু পদক্ষেপ নিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কাছে সুপারিশ করেছিল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়। কিছু সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এতে জ্বালানির সাশ্রয় হয়েছে কিনা, সেটি জানা না গেলেও বিভিন্ন স্থান থেকে প্রাপ্ত খবর বলছে এতে প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বেড়েছে। লোডশেডিংয়ের সময় জেনারেটর চালিয়ে কাজ করায় বাড়তি খরচ হচ্ছে। এক্ষেত্রে জ্বালানি স্বনির্ভরতা অর্জনে অভ্যন্তরীণ সম্পদের সুষ্ঠু ও সাশ্রয়ী ব্যবহার দরকার। একই সঙ্গে অপচয় রোধ করে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। দেশে প্রতিদিন কী পরিমাণ বিদ্যুৎ ও গ্যাস চুরি হচ্ছে, তাও বারবার আলোচনায় আসে। প্রশ্ন হলো, যারা গ্যাস ও বিদ্যুৎ চুরি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে? চলমান জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে নেয়া সরকারের পদক্ষেপগুলো বড় ধরনের সুফল বয়ে আনবে কিনা এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন অনেক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ। তারা মনে করেন, জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পাশাপাশি এ খাতে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করতে দ্রুত জোরালো ব্যবস্থা নেয়া দরকার। এরই মধ্যে এ খাতে যেসব দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ উঠছে, সেগুলোর সুষ্ঠু তদন্তের বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের ভ্রান্ত নীতিরও পরিবর্তন দরকার। করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠে দেশের অর্থনীতি গতিশীল হতে শুরু করেছিল। এর মধ্যে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক পণ্যমূল্য বেড়ে ওঠায় বাংলাদেশের সরকারের পক্ষে চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। সেক্ষেত্রে উৎপাদনশীল খাতে সম্পদ সঞ্চালন ও সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অপচয়, অপব্যয় ইত্যাদির রাশ টেনে ধরতে হবে। তবে সেটি করতে গিয়ে কোনো ভুল নীতির কারণে অর্থনীতির গতিশীলতা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। এক্ষেত্রে মানভিত্তিক জ্বালানি ও ব্যয় সাশ্রয়ের হিসাব করে দেখা প্রয়োজন প্রকৃত অর্থে কতটা সাশ্রয় হয়েছে আর অর্থনীতির ক্ষতি হচ্ছে কিনা।
নিরক্ষরেখা থেকে দূরে যত উত্তর বা দক্ষিণ গোলার্ধের দিকে যাওয়া যায়, তত দেখা যায় গ্রীষ্মকালে দিন শীতকালের চেয়ে বড় হয়। গ্রীষ্মকালে যেহেতু দিন বড় হয়, তাই প্রাকৃতিক আলোর ব্যবহার বাড়াতে আর কৃত্রিম আলোর ব্যবহার কমাতে গ্রীষ্মকালে ঘড়ির সময় কিছুটা এগিয়ে দেয়া হয়। এতে দিনের আলো বেশিক্ষণ থাকার ফলে সে আলোর ব্যবহার বেশি হয়। আর কৃত্রিম আলোর ব্যবহার কিছুটা হলেও কম হয়। ফলে বিদ্যুতের ব্যবহার ও ব্যয় কমে। আবার শীতের সময় ঘড়ি পিছিয়ে দেয়া হয়। ইংল্যান্ডে মার্চ মাসের শেষ রোববার রাতে ১টার সময় ঘড়িটি এগিয়ে রাত ২টা করা হয়, তখন শুরু হয় ডে লাইট সেভিং টাইম। আবার অক্টোবরের শেষ রোববার রাত ২টার সময় ঘড়িটি পিছিয়ে রাত ১টা করা হয় এবং এতে ডে লাইট সেভিং টাইম শেষ হয়। ইংল্যান্ডের অফিসের টাইম পরিবর্তন হয় না। ফলে সব অফিস আগের মতোই চলে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে ভিন্ন। সরকারি অফিস চলবে ৮টা-৩টা, ব্যাংক চলবে ৯টা-৪টা পর্যন্ত, বেসরকারি অফিস চলবে ১০টা-৫টা পর্যন্ত। এতে কতটা বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বরং উৎপাদনশীলতা হ্রাস ও সেবা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে। বেসরকারি খাতের অনেক কাজ সরকারি অফিসের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ফলে দিনের শেষ অংশে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজ আটকে যেতে পারে। তাছাড়া বিশ্বায়নের এ যুগে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও অফিসের কার্যক্রম বিশ্বের সঙ্গে অনেক বেশি সম্পর্কযুক্ত, বিশেষত ইউরোপের সঙ্গে। ওই দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে এবং তাদের সঙ্গে আমাদের সময়ের ব্যবধানও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে ব্যাংক থেকে শুরু করে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সন্ধ্যা ও রাতে কাজ করতে হয়। তাদের ক্ষেত্রে এমন নিয়ম বাস্তবায়ন কঠিন।
সরকারি অফিস আগে, পরে ব্যাংক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ায় সেবা পেতে ভোগান্তির শিকার হওয়ার শঙ্কাও রয়েছে। অফিসের সময়সূচি এগিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে যানজট কমানোর যুক্তি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু আশ্চার্যর বিষয় হলো, যানজট কমানোর কথা বলে বিদ্যালয়ের সময়সূচি পিছিয়ে ৮টা থেকে নির্ধারণ করা হয়েছিল। এখন সরকারি অফিসের সময়সূচি ও স্কুলের সময় এক হয়ে যাওয়ায় সকালে যানজট বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। অভিজ্ঞতা বলে, সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় তার উদ্দেশ্য অর্জিত হয় না। এবার যেন তার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে সরকারি অফিসে সেবা নিতে যান। সেখানে সকাল ৮টায় অফিস শুরু হবে এটা ‘টু আর্লি’ হতে পারে। সাধারণ সেবাপ্রত্যাশীরা অফিসে যেতে যেতেই অনেকের যাওয়ার সময় হয়ে যেতে পারে। ১৯৯৬ সালে সরকার জ্বালানি সংকটের জন্যই সাপ্তাহিক ছুটি দুদিন করেছিল। ওই সময় আরো যুক্তি ছিল মানুষ যেন গ্রামে থেকেও অফিস করতে পারে। পরিবারের সদস্যদের কাছে থাকতে পারে। কিন্তু সেটা খুব বেশি সফল হয়নি। কারণ যোগাযোগ মাধ্যমের অনেক উন্নতি হলেও যানবাহনের চাপ বাড়ার কারণে কর্মীদের অফিসের কাছাকাছিই থাকতে হতো।
অফিসের সময়সূচি পরিবর্তন বা ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে এনে জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্যোগটি পুরনো এবং বহু দেশে এর চর্চা রয়েছে। এক্ষেত্রে মূল পার্থক্য হলো, দেশগুলো সমন্বিতভাবে উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করে। শুধু সরকারি অফিসের সময় পরিবর্তন ও কমিয়ে আনলেই চলবে না, অন্যান্য বিষয়ও বিবেচনায় রাখতে হবে। আগে অফিস ত্যাগ করলেই বিদ্যুতের সাশ্রয় হবে বিষয়টি তা নয়, এতে বাসায় বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার। আশার কথা হলো, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে নতুন সময়সূচি বাস্তবায়ন হওয়ার পর পর্যবেক্ষণপূর্বক পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য নেয়া পদক্ষেপে সুফল না মিললে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করাই প্রত্যাশিত। সর্বোপরি সমন্বিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্যোগ নেয়া উচিত, অ্যাডহক ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নে লাভবান হওয়ার চেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাই থাকে বেশি। গ্রহীত সিদ্ধান্তে সরকারি সেবা যেন ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রত্যাশা থাকবে নীতিনির্ধারকরা বিষয়টি অনুধাবন এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।










