যথাযথ উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল জনশুমারি। প্রতি ১০ বছর পরপর এটি পরিচালিত হয় বলে সব দেশের ক্ষেত্রে মনোযোগের কেন্দ্রে থাকে বিষয়টি। এবার ডিজিটাল পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করায় অপেক্ষাকৃত নির্ভুল ও দ্রুত পরিসংখ্যান পাওয়ার আশা করেছিল সবাই। তথ্য দ্রুত মিলেছে তবে সেটি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছে। প্রথম প্রশ্নই উঠেছে মোট জনসংখ্যার হিসাব নিয়ে। শুধু তা-ই নয়, শহর ও গ্রামে, নারী ও পুরুষের সংখ্যায় বড় ব্যবধান লক্ষ করা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে যেন নির্ভুল শুমারি হয়, তার নির্মোহ পর্যালোচনা প্রয়োজন। সম্প্রতি ঘোষিত প্রতিবেদনটি প্রাথমিক, আরো কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে জনশুমারির চূড়ান্ত তথ্য প্রকাশ করা হবে। প্রত্যাশা থাকবে, প্রাথমিক খসড়ায় চিহ্নিত ত্রুটি সংশোধনে পরবর্তী ধাপের কর্মপরিকল্পনাগুলো সাজানো হবে। লক্ষ্য একটিই নির্ভুল তথ্য ও উপাত্ত জনসম্মুখে হাজির করা।

শুমারি আয়োজন অনেক ব্যয়বহুল হলেও এটিই নির্ভুল জনসংখ্যার উপাত্ত প্রদানের একমাত্র পথ। জনসংখ্যার উপাত্ত ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিস্তৃত ধারণা দেয় জনশুমারি। এর ওপর নির্ভর করেই আগামী ১০ বছরের কর্মপরিকল্পনা সাজানো হয়। তবে শুমারি সফল হবে কিনা, তা নির্ভর করে কাজটি কেমনভাবে সম্পাদন করা হচ্ছে। শুমারির শুরুতেই প্রশ্ন উঠেছিল। ঢাকা শহরের অনেক বাড়িতে তথ্যসংগ্রহের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি যায়নি, আবার গেলেও দারোয়ান বা কাজের লোক ও ড্রাইভারের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে চলে গেছে। এজন্য কিছু পদক্ষেপও নেয়া হয়েছিল, কিন্তু তাতে কতটা সুফল মিলেছে তা পরিষ্কার নয়। একটি সফল শুমারি নির্ভর করে তথ্য সংগ্রহ, তথ্য সংকলন এবং তা প্রকাশের ওপর। এ প্রেক্ষাপটে সুষ্ঠু শুমারির বেশকিছু করণীয় আছে। প্রথমত, গুণগত মান নিশ্চিতকরণে বিভিন্ন স্তর বা এলাকাভিত্তিক তদারকি কার্যক্রম জোরদার করা। প্রশিক্ষিত তথ্য সংগ্রহকারী, সব পর্যায়ে মনিটরিং টিম গঠন, যারা তথ্য প্রদান করবেন তাদের মধ্যে গণনায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার চাহিদা সৃষ্টিতে সংবাদমাধ্যম ও স্থানীয় বা কমিউনিটি পর্যায়ের ব্যক্তিদের উদ্বুদ্ধকরণ। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল ম্যাপভিত্তিক পরিবীক্ষণ, তথ্যের সঠিক সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহে ব্যবহূত ট্যাবলেটগুলো থেকে সংগৃহীত তথ্য ডাটা সার্ভারে সংযুক্তিতে যেকোনো বাধা অপসারণ। নেটওয়ার্ক অপারেশন সেন্টার, মুঠোফোন ডিভাইস সফটওয়্যার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা। তৃতীয়ত, সবার অংশগ্রহণ, কেউ বা কোনো খানা যাতে বাদ না পড়ে, ভূমিহীন, ভাসমান জনগোষ্ঠী, ট্রান্সজেন্ডার, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, বস্তিবাসীদের দিকে বিশেষ মনোযোগ প্রদান, যাতে সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়। চতুর্থত, লক্ষ রাখতে হবে, এবার যেহেতু বিদেশীদের থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, ফলে সুশিক্ষিত ও দক্ষ গণনাকারী নিশ্চিত করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে অনেক ব্যত্যয় লক্ষ করা গেছে।

জনশুমারির তথ্য নিয়ে প্রশ্ন সব দেশেই ওঠে। পাশের দেশ ভারতেও জনগণনা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের বাদ পড়ার ঘটনা ঘটেছে। শুধু তা-ই নয়, জার্মানিতে জনশুমারির তথ্য যাচাইয়ের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল বেশকিছু সংস্থা। দেশগুলো সংগৃহীত তথ্য যাচাই-বাছাইয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেয় এবং বিতর্কের অবসান ঘটে। ২০১১ সালে জনশুমারির সময়ও জনসংখ্যার সংখ্যা ও বৃদ্ধির হার নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সরকার স্বাধীন প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে তথ্য যাচাই করে। জনগণের নতুন হিসাব ঘোষণা করা হয়। এবারো তথ্য যাচাই করা হবে। পরিকল্পনামন্ত্রী এরই মধ্যে জনশুমারির ত্রুটির কথা স্বীকার করে তা সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলেছেন। আশ্বাস দিয়েছেন পরবর্তী ধাপের যাচাই কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা হবে।

করোনাকালে হালনাগাদ অনেক উপাত্ত না থাকায় অনেক কর্মসূচির সাফল্য নিয়ে সংশয় দেখা গেছে। করোনাকালে বাল্যবিবাহ, কিশোরী মাতৃত্ব, মাতৃমৃত্যু হার, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি, অপূর্ণ চাহিদা, শ্রমবাজারের অংশগ্রহণ, বেকারত্বের হার—এমন অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় আপডেট তথ্যের ঘাটতি ছিল। সে প্রেক্ষাপটে এবারের জনশুমারিটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যমান বাস্তবতায় সবাইকে গণনার আওতায় আনতে হবে। গণনাকারীদের তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। মনিটরিং করতে হবে। কাউকে বাদ দেয়া যাবে না। সঠিক জনসংখ্যা না এলে সেক্ষেত্রে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ যথাযথ হবে না। কী পরিমাণ মানুষ গণনা থেকে বাদ পড়েছে, তা নিরপেক্ষভাবে নিরূপণ করতে হবে। তথ্য সংগ্রহ, তথ্য সংকলন ও তথ্য প্রকাশ—এ তিনটি কাজই সুচারুভাবে করতে হবে। শুমারিটি বর্ষাকালে করা ঠিক হয়নি। শুমারি চলাকালীন সিলেট ও উত্তরাঞ্চল বন্যাকবলিত ছিল। তাছাড়া কুমিল্লায় স্থানীয় সরকার বা মেয়র নির্বাচন ছিল। ফলে এ সময়কালকে পরিহার করতে পারলে ভালো হতো। কতসংখ্যক মানুষ ‘আন্ডার কাউন্ট’ হয়েছে, তা অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে নির্ধারণ করতে হবে। জনশুমারি নিয়ে বিতর্ক থাকলে অবশ্যই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সেক্ষেত্রে বিতর্ক পরিহারের ব্যবস্থা নিতে হবে।

আন্তর্জাতিকভাবে সাধারণত ডি-ফ্যাক্টো বা ডি-জুরি পদ্ধতিতে জনশুমারি ও গৃহগণনার কাজটি করা হয়। ডি-ফ্যাক্টো পদ্ধতিতে খানার সদস্যদের শুমারি মুহূর্তে তাদের অবস্থানে গণনাভুক্ত করা হয়। ডি-জুরি পদ্ধতিতে খানার সদস্যদের শুধু তাদের সচরাচর বসবাসের স্থানে গণনা করা হয়। তবে আরেকটি পদ্ধতি রয়েছে, যাকে মডিফায়েড ডি-ফ্যাক্টো পদ্ধতি বলে। এ পদ্ধতিতে খানার সদস্যদের শুমারি মুহূর্তে তাদের অবস্থানে গণনাভুক্ত করার পাশাপাশি শুমারি মুহূর্তে যারা দায়িত্বরত ও ভ্রমণরত থাকবেন, তাদের নিজ নিজ খানায় গণনাভুক্ত করা হবে। জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ মডিফায়েড ডি-ফ্যাক্টো পদ্ধতিতে পরিচালনা করা হয়েছে বলে গণমাধ্যম সূত্রে জানা গিয়েছে। এটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন করা হয়। প্রথম পর্যায়ে জোনাল অপারেশন, প্রশ্নপত্র টেস্ট, পাইলটিং, দ্বিতীয় পর্যায়ে মূল শুমারি (প্রশিক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ), তৃতীয় পর্যায়ে শুমারি-পরবর্তী যাচাই (পিইসি), চতুর্থ পর্যায়ে আর্থসামাজিক ও জনতাত্ত্বিক জরিপ এবং পঞ্চম পর্যায়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন। তবে তৃতীয় পর্যায়ে শুমারি-পরবর্তী যাচাই (পিইসি) জাতিসংঘের নির্দেশিত নীতিমালা অনুযায়ী নিরপেক্ষ ও স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করতে হয়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশেও এসব নিয়মনীতি অনুসরণ করার কথা। এক্ষেত্রে যারা পিইসি করবেন, তাদের দায়িত্ব ও ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।