খাদ্য
উৎপাদনকারী থেকে বিভিন্ন স্তরের ব্যবসায়ীকে সরকারি প্রায় ১৮টি সংস্থার অধীনে কাজ করতে হয়। ফলে কার্যক্রম পরিচালনা ও কর্তৃপক্ষের তদারকিতে বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি হয়। এ কারণে সরকার নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের এক সংস্থার অধীনে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। খাদ্যমন্ত্রী সম্প্রতি এক আলোচনা সভায় বিষয়টি উল্লেখপূর্বক বলেছেন, খাদ্য ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কৃষি, বাণিজ্য, শিল্প ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সংস্থাগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এজন্য কারা তদারক করবে সে বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদ সভায় উত্থাপন করা হয়েছে। তারা সিদ্ধান্ত দেবে এগুলো কার কাজ। এ উদ্যোগের দ্রুত ও সফল বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এতে খাদ্য ব্যবসায়ীদের জবাবদিহিতা যেমন প্রতিষ্ঠিত হবে, তেমনি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস পেয়ে ব্যবসার ব্যয়ও কমে আসবে। খাদ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ওয়ান স্টপ সেবা প্রদান ও কার্যকর নজরদারি এ মুহূর্তে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা ও সুষ্ঠু খাদ্য ব্যবস্থাপনা কোনো সহজ কাজ নয়। সবাইকে নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে। বর্তমান সরকার বিভিন্নভাবে ভোক্তাদের সচেতন করছে। কিন্তু খাদ্য ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না। এ কারণে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পণ্য নিয়ে কারসাজি করে অতিমুনাফা লাভের অভিযোগ উঠছে। সব মানুষের জন্য নিরাপদ ও পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা একটি জাতীয় প্রত্যাশা। দেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাস, ধর্মীয় মূল্যবোধ, সংস্কৃতি, আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে যেন সবাই সহজে ও সুলভ মূল্যে খাদ্য পেতে পারে সেজন্য সবার সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় গুণগত পরিবর্তন আবশ্যক। দেশে ক্ষুদ্র বা অনানুষ্ঠানিক খাদ্য ব্যবসায়ীদের বেশির ভাগের পেশাগত জ্ঞান বা প্রশিক্ষণ নেই। খাদ্যের মান ঠিক রাখতে সরবরাহকারীকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে এবং ভোক্তাদের নিরাপদ খাদ্যের ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিক্রয় ও ভোক্তার খাদ্যগ্রহণ—প্রতিটি পর্যায়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে সরকারি, বেসরকারি খাতসহ সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের প্রায় ৪৮৬টি প্রতিষ্ঠান আছে, যারা খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানের অধীন প্রায় ১২০টি আইন ও নীতিমালা রয়েছে। তাই ২০১৩ সালে নিরাপদ খাদ্য আইন প্রণীত হয়েছে। সর্বস্তরে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যত আইন রয়েছে, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ সেগুলো কার্যকর করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এছাড়া নিরাপদ খাদ্য আইন মেনে চলার জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।
আজ থেকে ১০০ বছরেরও আগে থেকে যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে পিওর ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাক্ট এবং ফেডারেল মিট ইন্সপেকশন অ্যাক্ট আইন পাস হয়। এর আগ পর্যন্ত দেশটিতে নিরাপদ খাদ্যের জন্য আলাদা কোনো আইন ছিল না। এরপর নানা সময়ে যুক্ত হয়েছে নানা আইন। ২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নিরাপদ খাদ্যের জন্য আরেকটি আইন পাস করেন ফুড সেফটি অ্যান্ড মডার্নাইজেশন অ্যাক্ট নামে। এ আইনগুলোর সঠিক প্রয়োগের কারণেই আসলে দেশটিতে খাদ্য এত নিরাপদ। খাবারের সঙ্গে স্বাস্থ্যের বিষয়টিও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রীয়ভাবে তো বটেই, স্থানীয় পর্যায়েও নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি নজরদারি করা হয়। আর এজন্য গড়ে উঠেছে সরকারি সংস্থা। মূলত নিরাপদ খাবার ও স্বাস্থ্যের বিষয়গুলো তদারক করে যেসব সংস্থা, সেগুলো হলো ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ), ফুড
সেফটি অ্যান্ড ইন্সপেকশন সার্ভিস (এফএসআইএস), দ্য
সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি), ডিপার্টমেন্ট
অব পাবলিক হেলথ ও ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচার। এ সবগুলোই কোনো না কোনোভাবে নিরাপদ খাদ্য, খাদ্যজনিত রোগ ও নজরদারি নিয়ে কাজ করে। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বণ্টন, পরিবহন, বাজারজাত প্রতিটি ধাপেই সংস্থাগুলো কাজ করে। খাদ্যে ভেজাল রোধ ও মান নিয়ন্ত্রণে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্বে রয়েছে মার্কিন সংস্থা এফডিএ। যুক্তরাষ্ট্রে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা এফডিএ বিক্রয়যোগ্য খাবার ও ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ, বাজারে তামাকজাত পণ্যের সরবরাহ, বিভিন্ন মেডিকেল যন্ত্রাংশ ও রাসায়নিক এবং প্রসাধনীর মান পরীক্ষা করে। রোগ নিয়ন্ত্রণে রক্ত প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়া ও টিকার মানও পরীক্ষা করে সংস্থাটি। এফডিএ মানুষের পাশাপাশি পশুখাদ্য ও ভেটেরিনারি ওষুধের মানও পরীক্ষা করে। খাদ্য সুরক্ষা আইনের আওতায় যেসব নির্দেশ রয়েছে তা সবাই পালন করছে কিনা, সেটা দেখা তাদের কাজের মধ্যে অন্যতম। ১৯২৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এফডিএ। এটি যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন এ সংস্থার ক্ষমতা ছিল নামমাত্র। খাবারে বিষাক্ত বা ক্ষতিকর কিছু পাওয়া গেলে কিংবা সঠিক মান ব্যবহার করা না হলে কাউকে দণ্ড দেয়ার ক্ষমতা তাদের ছিল না। তবে ১৯৩০ সালের পর নিরাপদ খাদ্য আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বেশ ক্ষমতা পেয়ে যায় সংস্থাটি। বর্তমানে দেশটির প্রায় ৭৫ শতাংশ খাদ্য ও স্বাস্থ্যের বিষয় রয়েছে এফডিএর নজরদারির মধ্যে। তাদের রয়েছে নিরাপদ খাদ্যের জন্য আলাদা বিধি ও মানদণ্ড রক্ষার বিভিন্ন পদ্ধতি। সুপারমার্কেট ও রেস্টুরেন্টগুলোয় রয়েছে এফডিএর খাদ্য কোড। উৎপাদন থেকে ভোক্তার কাছ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ ভালোমতো মেনে চলা না হলে এর যেকোনো এক ধাপে খাবার হয়ে যেতে পারে অনিরাপদ। বিশেষ করে প্রাণিজ আমিষের চাহিদা মেটাতে দেশটিতে গড়ে উঠেছে বিশাল পোলট্রি শিল্প। কিন্তু উৎপাদন, পরিবহন ও বিপণন নিরাপদ না হলে ভোক্তার স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে যায়। পশু ও প্রাণীকে যে খাবার খাওয়ানো হয়, সেই খাবারে কোনো ক্ষতিকর জিনিস রয়ে গেছে কিনা, যা মানবদেহের জন্যও ক্ষতিকর, এসব বিষয় নজরদারি করে সংস্থাটি। এফডিএর আদলে খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী সংস্থা গঠন বা বিদ্যমান সংস্থাকে সক্ষম করে তোলা প্রয়োজন।
দেশে প্রায় সব ধরনের খাদ্যই উৎপাদন হচ্ছে। তবে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অনিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও বাজারজাত নিয়ন্ত্রণ করতে সব খাবার ও পানীয় নিয়মিত পরীক্ষা এবং জনসম্মুখে তার ফল প্রকাশ করা জরুরি। খাদ্যের মানের ব্যাপকভিত্তিক পরীক্ষা না হলে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা দুরূহ। এছাড়া নিরাপদ খাদ্য কার্যক্রম পরিচালনা ও নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন অধিক দক্ষ লোকবল, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, উন্নত মানের গবেষণাগার এবং অভিজ্ঞ প্রযুক্তিবিদ। খাদ্য উৎপাদন ও খাবারের টেবিলে আসার আগ পর্যন্ত যত ধাপ পার হয়, তার মধ্যে অনেক কিছু যুক্ত হয়ে খাদ্যকে বিষাক্ত করে তুলতে পারে। এজন্য প্রয়োজন সঠিকভাবে প্রতিটা ধাপের নিয়ন্ত্রণ। এক্ষেত্রে নতুন উদ্ভাবিত Hayard
Analysis Critical Control Points (HACCP) একটি সক্রিয় কারিগরি পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাতের প্রতিটি পর্যায়ে সম্ভাব্য কী কী ভুল হতে পারে আর সেই ভুল শোধরাতে কী কী করা যায় তা তুলে ধরা হয়। এটি এখন খাদ্যনিরাপত্তার জন্য সর্বাধিক পরিচিত পদ্ধতি। এ পদ্ধতির মাধ্যমে ক্ষতিকর আণুবীক্ষণিক জীবাণু বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে একটি সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাত, বিতরণ ও প্রস্তুতিতে এইচএসিসিপি সিস্টেম ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশ সরকারও এ মানদণ্ড অনুসরণে কঠোর হতে পারে।
বিশ্বায়নের চাপ, উপর্যুপরি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারে অস্থিরতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সংকটকালে খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনের জন্য কৃষিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। আমাদের খাদ্য আমাদেরই উৎপাদন করতে হবে। দেশের মাটি, পানি, প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার এবং নিজস্ব প্রচেষ্টার মাধ্যমেই তা করতে হবে। পরিবর্তিত জলবায়ুতে খাপ খাইয়ে আমাদের উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। একটি দেশের স্থিতিশীলতার জন্য খাদ্যমূল্য নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে। আবার সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রতিটি মানুষের প্রয়োজন বিশুদ্ধ ও পুষ্টিকর খাদ্য। এ বিশুদ্ধ খাদ্যই যদি অখাদ্যে রূপান্তরিত হয়, তা গ্রহণের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। এ খাদ্য যদি আমাদের জীবন-জীবিকার অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় তাহলে আমরা যে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির শিকার হব তা কিন্তু যুদ্ধ ও মহামারীর ভয়াবহতার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। কাজেই কালবিলম্ব না করে এমন পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজে বের করতে
হবে।










