সংগঠিত সরকারি শাসন ব্যবস্থার অস্তিত্ব অতি প্রাচীন। ঐতিহাসিকভাবে প্রায় ৫ হাজার বছর আগের ছোট শহরকেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থায় প্রশাসন গঠনের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। বাণিজ্যের অস্তিত্ব আরো প্রাচীন। মানুষ যখন থেকে বৃহৎ গোষ্ঠীতে বসবাস শুরু করে, তখন থেকে ব্যবসা-বাণিজ্যের সূত্রপাত ঘটে।

সেই সূত্রে প্রশাসন ও বাণিজ্য সংস্থা যেকোনো সমাজ ও রাষ্ট্রের দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান। প্রশাসন নাগরিকদের সুবিধার জন্য বিবিধ নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করে, বাণিজ্য সংস্থাগুলো সেই নীতিমালার আলোকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্থায়িত্ব প্রদানের লক্ষ্যে কাজ করে। প্রশাসন ও বাণিজ্য সংস্থার মধ্যে এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতা সময়ের সঙ্গে বিকশিত হয়েছে এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সভ্যতার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রগতি সম্পন্ন হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশ্বিক সংকট হলো কভিড-১৯ অতিমারী। অতিমারী-পরবর্তী বিশ্বে প্রশাসন, বাণিজ্য সংস্থাগুলো কী ভূমিকা পালন করবে এবং ভবিষ্যতে তাদের পারস্পরিক সহযোগিতা কীভাবে বিকশিত হবে তার ওপর রাষ্ট্র তথা সভ্যতার প্রগতি নির্ভর করছে। এই দুই প্রকার প্রতিষ্ঠানকে অতিমারীজনিত আঘাত মেরামত ও কৌশলগত পরিমার্জনের মাধ্যমে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখার কাজ করতে হবে এবং আমূল পরিবর্তনের সম্মুখীন হতে হবে। বিশেষত ভবিষ্যতের প্রশাসনকে তাদের নাগরিকদের জন্য প্রাসঙ্গিক ও কার্যকরী হয়ে উঠতে বাণিজ্য সংস্থাগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণ ও পুনর্গঠন করতে হবে।

২০২০ সালের গোড়ার দিকে অতিমারীটির সূত্রপাত সব স্তরের মানুষকে প্রভাবিত করেছিল। এ ভাইরাস ধনী কিংবা দরিদ্র, জাতি কিংবা রঙের মধ্যে পার্থক্য করে না। অতিমারীটি তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব শ্রেণীর মানুষকে তাদের নিয়মিত জীবনযাপন করা থেকে বিরত থাকতে হয়েছিল।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে অতিমারীটি বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন ত্বরান্বিত করেছে। আধুনিক ও ডিজিটাল বাণিজ্য সংস্থার মালিকানার কারণে ধনী ব্যক্তিরা আাারা ধনী হতে শুরু করেন, কারণ আরো বেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল কার্যক্রম যেমন কেনাকাটা ও কাজ করার দিকে অগ্রসর হয়। ডিজিটাল অর্থনীতির কর্মীরা ঘরে বসে কাজ করার মাধ্যমে আয় করতে সক্ষম হন। একই সময়ে অনেক দেশে লকডাউন, চিকিৎসার অসাধ্য খরচ ও অপ্রাপ্য স্বাস্থ্যসেবা সুবিধার কারণে নিম্ন আয়ের লোকদের জীবিকা ও জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়েছে। বিশেষত উন্নয়নশীল দেশগুলোয় তাদের বৃহত্তর জনসংখ্যার সাপেক্ষে অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্য পরিষেবা দরিদ্রদের পক্ষে চিকিৎসার সংস্থান আরো কঠিন করে তুলেছে।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিভাজনের এই ত্বরান্বিত পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী প্রশাসনগুলোকে তাদের নাগরিকদের আরো ন্যায়সংগত, সবুজ ও টেকসই সমাধান প্রদানের জন্য কাজ শুরু করতে হবে। সেই সঙ্গে শহর ও গ্রামীণ এলাকায় সামগ্রিক বৈষম্য মোকাবেলায় প্রশাসন ও বাণিজ্য সংস্থাগুলো কীভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারে তার ওপর নজর দিতে হবে। সেই সঙ্গে কী ধরনের রূপান্তরের মাধ্যমে ভবিষ্যতের প্রশাসন যথার্থ নাগরিক পরিষেবা প্রদানের উপযোগী হয়ে উঠবে তার পর্যালোচনা করা শিগররিই প্রয়োজন।

উদাহরণস্বরূপ, কী ধরনের বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে তা বোঝার জন্য শহর ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য বিশ্লেষণ করতে হবে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহর ও তার আশেপাশের শহরাঞ্চলে স্মার্টসিটি উন্নয়নে বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। একই সময়ে গ্রামীণ বাংলাদেশে উন্নত কৃষিকাজ ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির জন্য টেকসই বিকল্পের প্রয়োজন হবে এবং পাশাপাশি দক্ষতার মানোন্নয়নের জন্য প্রশাসন ও বাণিজ্য সংস্থাগুলোকে একযোগে পরিকল্পনা করে তা প্রণয়ন করতে হবে।

বাংলাদেশ একটি উদীয়মান অর্থনীতি এবং গত কয়েক বছরে উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার প্রত্যক্ষ করেছে। বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীর জাতীয় বাজেট বক্তৃতা অনুসারে, অতিমারীর মারাত্মক প্রভাব সত্ত্বেও ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশের জিডিপি বৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ২ শতাংশ।  আর্থিক বছর ২০২১-২২-তে এ বৃদ্ধির হারের লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। স্পষ্টতই, বাংলাদেশ সাফল্যের সঙ্গে তার আর্থিক প্রবৃদ্ধির যাত্রা ধরে রেখেছে, যা বেশ কয়েক বছর আগে শুরু হয়েছিল এবং আশা করা হচ্ছে পুরো দশকে এ উচ্চ প্রবৃদ্ধির হার বজায় থাকবে।

এ ধরনের উচ্চ আর্থিক প্রবৃদ্ধির হার কেবল তখনই টিকিয়ে রাখা যেতে পারে যখন প্রশাসন অর্থনীতির দ্রুত ও ন্যায়সংগত পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি সামাজিক গতিশীলতা ত্বরান্বিত করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর সমাধান করবে। নাগরিক পরিষেবার রূপান্তর, বিশেষ করে প্রযুক্তির নেতৃত্বে ডিজিটাল রূপান্তর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনকে বাণিজ্য সংস্থার সঙ্গে একযোগে কাজ করার নতুন পদ্ধতি নির্ধারণ ও নতুন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পরিকল্পনা করা উচিত। সরকারি ও বেসরকারি উভয় শ্রেণীর জনশক্তিকে একসঙ্গে কাজ করার নতুন দক্ষতা বিকাশ করতে হবে, সাধারণ লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করতে হবে এবং আরো গুরুত্বপূর্ণভাবে নাগরিকদের পরিষেবা দেয়ার জন্য একটি হাতিয়ার হিসেবে ডিজিটালাইজেশন ব্যবহারের জন্য নিজেদের উন্নত করতে হবে।

ভবিষ্যতের প্রশাসন বর্তমানের তুলনায় বেশ ভিন্নভাবে কাজ করবে। প্রযুক্তির নেতৃত্বে নাগরিক পরিষেবার রূপান্তরের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হবে। সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন ও বাণিজ্য সংস্থার পারস্পরিক সহযোগিতা এক নতুন পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সেই লক্ষ্য অর্জনের কাজ এখনই শুরু করা উচিত। (মতামত লেখকের নিজস্ব)

 

অরিজিৎ চক্রবর্ত্তী: প্রাইসওয়াটারহাউজকুপার্সের পার্টনার