অনেক ভুল ধারণার কারণে মানুষের মাঝে টিকা গ্রহণে অনীহা দেখা যায়। সম্প্রতি কভিড-১৯ টিকার ক্ষেত্রে বিষয়টি আবারো সামনে এসেছে এবং তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টিকার নিরাপত্তার বিষয়টি। আমরা অনেক দিন ধরে জেনে এসেছি, যেকোনো টিকা মানুষের শরীরে প্রয়োগের অনুমোদনের আগে অনেক বছর ধরে তা কতটুকু নিরাপদ, এ বিষয়ে গবেষণা করা হয়। একটি নিরাপদ টিকা পেতে আমাদের অনেক বছর অপেক্ষা করতে হয়। কিছু টিকার ক্ষেত্রে ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে গবেষণা হচ্ছে, এখনো নিরাপদ টিকা পাওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু কভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে এক বছরেরও কম সময়ে টিকার অনুমোদনের কারণে টিকার নিরাপত্তার বিষয়টি অনেকের মনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষভাবে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বে অনেকের মধ্যেই টিকা না নেয়ার মানসিকতা লক্ষ করা যাচ্ছে। কভিড-১৯ টিকার ক্ষেত্রে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত অনুমোদিত ফাইজার-বায়োএনটেক ও মডার্নার টিকা দুটি একেবারে নতুন প্রযুক্তিতে তৈরি। আগের কোনো টিকাই এ প্রযুক্তিতে তৈরি হয়নি এবং এ প্রযুক্তিতে তৈরি টিকার সফলতা নিয়ে বিজ্ঞানীদের তেমন কোনো ধারণা ছিল না। আজকের লেখায় আমি কভিড-১৯-এর জন্য অনুমোদিত প্রধান টিকাগুলো এবং সেগুলো মানবশরীরে কতটুকু নিরাপদ, সে বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করব।

ভাইরাস বা এ-জাতীয় জীবাণুর সংক্রমণের ফলে মানুষের শরীরে সাধারণত ইমিউন মেমোরি তৈরি হয়। আমরা যখন কোনো ধরনের সংক্রামক জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হই, আমাদের সংক্রমণ প্রতিরোধে নিয়োজিত কোষগুলো সর্বপ্রথম জীবাণুটিকে চেনার এবং জীবাণুটির বিরুদ্ধে তাদের সক্রিয়তার পূর্ব কোনো অভিজ্ঞতা আছে কিনা, তা বোঝার চেষ্টা করে। আর যদি কোনো ধরনের অভিজ্ঞতার তথ্য পেলে তা হবে ইমিউন মেমোরি। ইমিউন মেমোরি অনেকটা আমাদের ব্রেইন মেমোরির মতো। আমরা কোনো কিছুকে যেমন স্মরণ করতে চাই আমাদের পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা দিয়ে। ইমিউন মেমোরিও স্মরণ করে তার আগের অভিজ্ঞতা থেকে, তারপর সক্রিয় হয় সংক্রমণ থেকে আমাদের সুরক্ষার জন্য।

আমাদের ইমিউন সেলগুলো যখন সংক্রমণটিকে চিনতে পারে তখনই সংক্রমণকারী জীবাণু এবং আমাদের ইমিউন সেলগুলোর মধ্যে এক ধরনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধ রীতিমতো আমাদের পরিচিত যুদ্ধের মতোই আর যুদ্ধক্ষেত্রটি হয় আমাদের শরীর। এই যুদ্ধে যারা জয়ী হয়, তারাই আমাদের শরীরে প্রভাব বিস্তার করে। ইমিউন মেমোরি প্রধানত তিন ধরনের কোষের সমন্বয়ে তৈরি হয় এবং তার সঙ্গে অনেকগুলো সহযোগী কোষ থাকে। আর এই প্রধান তিন ধরনের কোষ হলো মেমোরি ই-কোষ, যেটা অ্যান্টিবডি তৈরি করে; সাহায্যকারী টি (CD4+) কোষ, যেটা আক্রমণকৃত কোষকে চিনতে সাহায্য করে এবং ঘাতক টি (CD8+) কোষ, যেটা আক্রমণকৃত কোষকে ধ্বংস করে। কোনো একটি সংক্রামক জীবাণু সৃষ্ট রোগ থেকে এভাবেই ইমিউন মেমোরি আমাদের সুস্থ করে তোলে।

এখন কথা হলো টিকা কী কাজ করে? সহজ কথায় টিকা আমাদের রোগ প্রতিরোধ কোষগুলোকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে ইমিউন মেমোরি তৈরির মাধ্যমে। আমরা টিকার মাধ্যমে কোষগুলোকে বার্তা পৌঁছাই যে তোমরা প্রস্তুতি গ্রহণ করো। তোমাদের সুনির্দিষ্ট জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হতে পারে। আমাদের কোষগুলো তখন সব ধরনের যুদ্ধাস্ত্রসহ সক্রিয় থাকে।

ভাইরাসের বহিরাবরণে যে প্রোটিন থাকে, তার মধ্য থেকে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রোটিন দিয়েই ভাইরাস আমাদের দেহকোষে বসে এবং ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করে। অনেক ক্ষেত্রেই কোষ ভাইরাসকে প্রবেশের অনুমতি দেয় না। তারপর ভাইরাস কোষে প্রবেশের জন্য অনেক কৌশল অবলম্বন করে। অনেক ক্ষেত্রে কোষ ভাইরাসের কৌশল বুঝতে না পেরে তাকে প্রবেশের অনুমতি দেয়। কোষে প্রবেশে সফলতার পর ভাইরাস আমাদের কোষের উপাদান ব্যবহার করে নতুন ভাইরাস তৈরি করে। আর এভাবেই সংক্রমণটি প্রথম সংঘটিত হয়। কিছু ক্ষেত্রে ভাইরাস কোষের কোনো ক্ষতি করতে না চাইলেও একটা সময় এসে কোষ ভেঙে নতুন ভাইরাসগুলো বের হয়ে আরো নতুন কোষে সংক্রমণ করে। এভাবে অল্প সময়ে মিলিয়ন-বিলিয়ন ভাইরাস তৈরি হয় আমাদের কোষগুলোর অনেক ক্ষতি করার মাধ্যমে।

সাধারণত গবেষকরা প্রথমে ভাইরাসের বহিরাবরণের এই সুনির্দিষ্ট প্রোটিনের বিরুদ্ধে টিকা বানানোর লক্ষ্যে কাজ করে। আমাদের শরীরের কোনো ধরনের প্রোটিন দিয়ে ভাইরাসের এই নির্দিষ্ট প্রোটিনগুলোকে যদি আবরণ দিয়ে মুড়িয়ে দেয়া যায় তাহলে ভাইরাস আর আমাদের কোষে বসতে পারবে না। ফলে কোনো সংক্রমণও হবে না। এতদিন পর্যন্ত যতগুলো ভাইরাসবিরোধী টিকা মানুষের শরীরে প্রয়োগের জন্য অনুমোদিত হয়েছে। তার প্রায় সবগুলোই তৈরি হয়েছে ভাইরাসের বহিরাবরণের সুনির্দিষ্ট প্রোটিনগুলোকে মুড়িয়ে দেয়ার জন্য আমাদের অ্যান্টিবডি সক্রিয় করাকে লক্ষ করে। নভেল করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রেও ঠিক একইভাবে বহিরাবরণের স্পাইক প্রোটিনের বিরুদ্ধে আমাদের অ্যান্টিবডি সক্রিয় করাকে লক্ষ করে গবেষকরা টিকা তৈরিতে কাজ শুরু করেন। আর ভিন্ন ভিন্ন সংস্থা ভিন্ন ভিন্ন প্লাটফর্মে কাজটি করতে থাকে। জরুরি প্রয়োগের অনুমোদিত পাওয়া ফাইজার-বায়োএনটেক ও মডার্নার টিকার জন্য তারা একেবারেই নতুন ধরনের প্লাটফর্ম নিয়ে কাজ করেন। গবেষকরা চেষ্টা করেন, এই স্পাইক প্রোটিন তৈরির বার্তাটুকু (mRNA) আমাদের কোষে প্রবেশ করিয়ে দিলে আমাদের কোষ বার্তানুযায়ী নিজস্ব পদ্ধতি ব্যবহার করে স্পাইক প্রোটিন তৈরি করবে। কোষ যখন পর্যাপ্ত পরিমাণ স্পাইক প্রোটিন তৈরি করে, কোষের বহিরাবরণে প্রকাশ করে, তখন আমাদের রোগ প্রতিরোধ কোষগুলো সক্রিয় হবে এবং স্পাইক প্রোটিনের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি আর ইমিউন মেমোরি তৈরি করবে।

mRNA হলো বার্তার সমষ্টি। আমাদের কোষের যখন কোনো ধরনের প্রোটিন তৈরির প্রয়োজন পড়ে, তখন কী এবং কেমন প্রোটিন হবে, তার বার্তা আমাদের ডিএনএ থেকে mRNA-এর মাধ্যমে দিয়ে থাকে। কোষ তখন বার্তানুসারে প্রোটিন তৈরি করে তার নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে। এই mRNA বার্তাগুলো অনেক সাময়িক। প্রোটিন তৈরির পর তা নষ্ট হয়ে যায়। করোনার টিকার ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই ধরনের। আমাদের কোষ যখন স্পাইক প্রোটিন তৈরির বার্তা পায়, তখন স্বল্প সময়ে বার্তানুযায়ী অনেকসংখ্যক প্রোটিন তৈরি করে। সাধারণত কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রোটিন তৈরি সমাপ্ত করে mRNA-গুলো নষ্ট হয়ে যায়। করোনার অনুমোদিত টিকাগুলোর ক্ষেত্রে mRNA-গুলোকে কিছুটা স্থায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এই mRNA-গুলো সম্ভবত কয়েক দিন পর্যন্ত স্থায়ী থাকে পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রোটিন তৈরির জন্য। এই প্রযুক্তিতে টিকা তৈরির প্রক্রিয়া একেবারেই নতুন। গত ১০ বছরের বেশি সময় ধরে এই প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে অনুমোদিত করোনার টিকার আগে এ প্রযুক্তিতে আর কোনো টিকাই অনুমোদিত হয়নি এবং এ প্রযুক্তিতে তৈরি অন্য টিকাগুলো এখনো গবেষণা পর্যায়েই আছে।

এই mRNA টিকা তৈরির অনেক সুবিধা থাকলেও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল mRNA-গুলোকে স্থিতিশীল রেখে সেগুলো আমাদের কোষে প্রবেশ করানো। আমরা না-হয় ইনজেকশনের মাধ্যমে mRNA-গুলোকে আমাদের শরীরে প্রবেশ করলাম কিন্তু আমাদের কোষ কখনো এই ফ্রি mRNA-গুলোকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেবে না। তখন তারা এই mRNA-গুলোকে লিপিড ন্যানোপার্টিকলে দিয়ে লেপে সুরক্ষিত করে কোষে প্রবেশের চেষ্টা করে সফল হয়। আর এতে আমরা পেয়ে যাই সবচেয়ে কম সময়ে অত্যন্ত কার্যকর টিকা। টিকাগুলো প্রবীণসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের শরীরে বিস্ময়করভাবে দুর্দান্ত কাজ করছে।

অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকাসহ আরো কয়েকটি টিকা তৈরির প্রতিষ্ঠান টিকা তৈরি করছে কিছুটা ভিন্ন উপায়ে। তারা স্পাইক প্রোটিনের বার্তাকে অন্য একটি ভাইরাল বাহক, যা মানবশরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়, ব্যবহার করে কোষের নিউক্লেসে পৌঁছে দিয়ে প্রোটিন তৈরি করছে।

অন্য অনেক ভাইরাসের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন প্রোটিনকে টার্গেট করে টিকা তৈরিতে কাজ করা হলেও করোনার ক্ষেত্রে শুধু স্পাইক প্রোটিনকে লক্ষ করে টিকা বানালে টিকা কাজ করবে বলে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা  গেছে। কিছুু যেমন ফ্লু ভাইরাস মিউটেশনের মাধ্যমে তাদের ভ্যাকসিন টার্গেটেড প্রোটিনকে পরিবর্তন করতে পারে। তার কারণে মানুষকে প্রতি বছর টিকা পরিবর্তন করতে হয়। করোনার ক্ষেত্রে মনে হচ্ছে তেমনটি হবে না। হয়তো হতেও পারে কিন্তু তা এখনো বলা যাচ্ছে না। অনেক ভাইরাস আছে, যাদের মিউটেশনের প্রবণতা অনেক কম এবং অনেক বড় পরিবর্তনে সক্ষমতা নেই। যেমন পোলিও, মাম্পস ইত্যাদি। এসব ভাইরাসের ক্ষেত্রে একবার টিকা নিলে আর কখনো নেয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

সাধারণত এসব টিকায় mRNA অথবা DNA ছাড়া স্নেহপদার্থ, লবণ ও চিনি থাকে। কিছু টিকার ক্ষেত্রে কিছুটা অ্যাডজুভেন্ট ব্যবহার করে টিকার কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য। আমরা প্রতিনিয়ত লবণ, চিনি, স্নেহপদার্থ আমাদের খাবারের সঙ্গে নিয়ে থাকি। কাজেই টিকায় এমন কোনো ক্ষতিকর জিনিস নেই, যা আমাদের টিকা গ্রহণে নিরুৎসাহিত করবে।

এখন পর্যন্ত টিকাগ্রহীতাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যমতে, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুবই সামান্য। টিকা দেয়ার স্থানে সামান্য ব্যথা, টিকা দেয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জ্বর আসা, কাজে অনীহা সৃষ্টি, কিছুটা দুর্বল অনুভব করা ইত্যাদি। গবেষকরা এ লক্ষণগুলোকে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া না বলে টিকার নরমাল প্রক্রিয়াই মনে করছেন। কেননা এ লক্ষণগুলো বলে দেয় টিকা আপনার শরীরে কাজ করছে। সুতরাং টিকা নেয়ার ফলে এসব লক্ষণ দেখা দিলে ভাবার কোনো কারণ নেই যে টিকা আপনার কোনো ক্ষতি করছে।

আমি এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নই কবে নাগাদ বাংলাদেশে কভিড-১৯ টিকা পৌঁছবে এবং কবে নাগাদ তা প্রান্তিক মানুষকে দেয়া সম্ভব হবে। পরামর্শ থাকবে সুযোগ এলে নির্দ্বিধায় টিকা নিন, বিশ্বাস রাখুন বিজ্ঞানে। মনে রাখতে হবে স্বল্প সময়ে কার্যকর কভিড-১৯ টিকা মহাসংকটময় বিশ্বের জন্য সত্যিই বিজ্ঞানের অবিস্মরণীয় সাফল্য।

(তথ্যসূত্র: বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র ও প্রতিষ্ঠিত ভাইরোলজিস্টদের লেকচার)

 

ড. মুহাম্মদ নুরে আলম ছিদ্দিকী: ভাইরাস গবেষক

লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র