২০১৭ সালের কথা। অর্থমন্ত্রী প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার একটি ঘাটতি অর্থায়ন পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন সঞ্চয়পত্র থেকে, কিন্তু বছর শেষে দেখা গেল, প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা উঠে এসেছে। লক্ষ্যমাত্রার দ্বিগুণের বেশি তহবিল কোষাগারে জমা হওয়ায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকরা খুশি হয়েছিলেন, নাকি কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছিল, তা অবশ্য আমরা জানি না। তবে বিজ্ঞজনদের অনুমান, সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নিশ্চয়ই ভীষণ গোলমাল লেগে গিয়েছিল।
সঞ্চয়পত্রের জন্মলগ্নে মানুষকে সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করা, বাজেট ঘাটতি পূরণ, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি লক্ষ্য সামনে রাখা হয়েছিল। কিন্তু সঞ্চয়পত্রের চেয়ে ঢের ভালো সঞ্চয় উপকরণ এখন সরকারি নীতিনির্ধারকদের হাতে রয়েছে। এ অবস্থায় বিশেষ জনগোষ্ঠীকে আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে আনার লক্ষ্যটিই জনমানসে সঞ্চয়পত্রের প্রধান স্লোগান হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সত্যি বলতে, মধ্য ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে তাদের ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের বিপরীতে যথেষ্ট ভালো রকমের মুনাফা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার একটি মহৎ দর্শন ছিল সঞ্চয়পত্রের মাঝে, যা আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষাকেও পূরণ করে। কিন্তু বাংলাদেশের ধনিক শ্রেণী ঝাঁপিয়ে পড়ল ঝুঁকিবিহীন এই যন্ত্র থেকে মুনাফা নিংড়ে নিতে। বিনিয়োগ ছেড়ে দিয়ে তারা হয়ে পড়ল সঞ্চয়ী, কারণ ঘরে বসে থেকেই তারা ঘাম ঝরানো বা স্নায়ুক্ষয়ী বিনিয়োগকারীদের চেয়ে বেশি মুনাফা করতে পারত।
সঞ্চয়পত্র ১১ শতাংশের অধিক হারে ঝুঁকিবিহীন মুনাফা বর্ষণ করে পুঁজিবাজার-বিনিয়োগকারীদের চোখে ঝুঁকিমুক্ত আয়ের নতুন নির্দেশক হয়ে দাঁড়াল। সঞ্চয়পত্রের কালবৈশাখী চলাকালে ব্যাংকের সঞ্চয় স্কিমের সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের পার্থক্য বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৩-৪ শতাংশে, তাই যারা সঞ্চয়পত্র বুঝত না বা জটিলতা এড়াতে চাইত, তারাই শুধু ব্যাংক মার্কেটে পড়ে রইল।
আমাদের পাঁচ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ড ৪ দশমিক ৫ থেকে ৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ হারে লাভ দিয়ে থাকে। তো ১১ শতাংশের ওপর একটি লাভের পিঁড়িতে বসে থাকা সঞ্চয়পত্রভুকরা দায়িত্ব নিতে চাইল না বন্ড মার্কেট শক্তিশালী করার সরকারি এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার।
সঞ্চয়পত্র আমাদের উন্নয়ন বাজেটের ওপরও অভাবনীয় চাপ সৃষ্টি করছে ক্রমবর্ধমান সুদ দায়ের পাহাড় তৈরি করে। চলতি অর্থবছরে সুদ ব্যয় প্রাক্কলিত হয়েছে ৫৭ হাজার ৬৩ কোটি টাকা, যা পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের ১০ দশমিক ৯ শতাংশ।
অবশেষে ২০১৯ সালে ‘জাতীয় সঞ্চয় স্কিম অনলাইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ চালু করা হলো। উদ্দেশ্য ছিল সঞ্চয়পত্র ক্রয়ের ঊর্ধ্বসীমা নিয়ন্ত্রণ করা, এ খাতে সুদ বাবদ ব্যয়ের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে হ্রাস করা, আর এভাবে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসা।
তবে শুভঙ্করের ফাঁক থেকে গেল। অচিরেই দেখা গেল ব্যাংকের স্থায়ী আমানত আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এল, আগে যেসব সঞ্চয়ী সঞ্চয়পত্র থেকে দূরে থাকতেন দূরত্ব, লভ্যাংশ উত্তোলন বা নগদায়নসংক্রান্ত ঝামেলা এড়াতে, তারা এবার দলে দলে ব্যাংকের অন্দরে সুবিধাজনক পরিবেশে এফডিআর ভাঙাচ্ছেন আর সঞ্চয়পত্র আহরণ করছেন! ফলে সঞ্চয়পত্রের সংকোচনমূলক নীতিমালার ফলে সরকারের ব্যাংকঋণ বেড়ে যাওয়া এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের উত্খাত হওয়ার আশঙ্কায় যারা ঘুম হারাম করছিলেন, তারা আপাতত দুশ্চিন্তা সরিয়ে রাখতে পারেন।
এই তো গত জুনেই সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৯৩ দশমিক ২৩ বিলিয়ন টাকা, যদিও কেউ কেউ বিদেশফেরত রেমিট্যান্সের আধিক্যকে কারণ হিসেবে দেখছেন, আসল কারণটি আমার মতে, বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর একক অংকের সুদ যুগে প্রবেশ।
সঞ্চয়পত্র পদ্ধতিগতভাবে চরম অ-বাজারি স্বভাবের, একে কেন্দ্র করে তহবিলকে ঘুরিয়ে আনা যায় না এবং বাজারকে স্পন্দিত করা যায় না। সঞ্চয়পত্রকে ঘিরে বাজেট ঘাটতি পূরণের পরিকল্পনা ঐতিহাসিকভাবেই অসুবিধাজনক প্রমাণিত হয়েছে। এদিকে সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তার জাল ক্রমে বড় হচ্ছে। ফলে একমাত্র সংবেদনশীল লক্ষ্যটিও খুইয়ে ফেলেছে সঞ্চয়পত্র। এখন সময় এসেছে বাজারবিনাশী সঞ্চয়পত্রকে অবসরে পাঠানোর।
এদিকে সঞ্চয়পত্রকে অবসরে পাঠালে সরকারের অভ্যন্তরীণ তহবিলে যে শূন্যতা সৃষ্টি হবে, তা পূরণে সরকারের হাতে কিন্তু যন্ত্রপাতির অভাব নেই। এর মধ্যে সবচেয়ে অনালোচিত অথচ সম্ভাবনাময় যন্ত্রটি হলো সরকারের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে বসে থাকা বিপুল বিশালাকায় ‘প্রভিডেন্ট ফান্ড’ বা ‘ভবিষ্যৎ তহবিল’। তবে এই তহবিল সরকারের সিঙ্গেল ট্রেজারি অ্যাকাউন্টে এমন করে মিলেমিশে থাকে যে এর সংরক্ষিত ও সঞ্চিত তহবিলকে পৃথক করে হিসাব করা এবং পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগ করে আয় করার সুযোগ একেবারেই নেই।
বিজ্ঞজনদের মতে, এই প্রভিডেন্ট ফান্ড যদি বাজারি যন্ত্রে পুনর্বিন্যাস করা যায় তাহলে একসঙ্গে অনেক সমস্যার সমাধান হয়। প্রভিডেন্ড ফান্ডের জন্য একটি পৃথক তহবিল ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সৃষ্টি করা যায়, যার একটি আইনি সত্তা থাকবে এবং একটি পৃথক দায় হিসাব থাকবে। সঞ্চিত অর্থ থেকে বিনিয়োগ করে প্রস্তাবিত ভবিষ্যৎ তহবিল কর্তৃপক্ষ নিজস্ব লাভ-ক্ষতি ও বাজেট ঘাটতি নির্ধারণ করবে। প্রস্তাবিত ভবিষ্যৎ তহবিল কর্তৃপক্ষ তার আয়-ব্যয়ের হিসাব সংসদে পেশ করবে, ফলে এই ফান্ড-সংক্রান্ত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হবে।
ভারতে জাতীয় পেনশন সিস্টেম চালু হয়েছে ২০০৫ সালে। সেখানে অংশগ্রহণমূলক ভবিষ্যৎ তহবিলের মতো একটি পদ্ধতি সব সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, ‘টায়ার ওয়ান’-এর আওতায় এই তহবিল আবার ‘স্থায়ী অবসর হিসাব’-এ সংরক্ষিত হচ্ছে এবং বিনিয়োগ করা হচ্ছে সুসংঘবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। শুধু তাই নয়, সর্বসাধারণের জন্য রাখা হয়েছে ‘টায়ার টু সিস্টেম’, যেখানে যেকোনো নাগরিক সঞ্চয় করতে পারে ইচ্ছেমতো স্কিমে।
দেশের যৌথ সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, মানুষের গড় আয়ু কমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় আমাদের দেশেও দরকার এমন একটি সর্বজনীন ভবিষ্যৎ তহবিল ব্যবস্থা, যাতে দেশের যেকোনো নাগরিক ভবিষ্যৎ তহবিলে সঞ্চয় করতে পারেন, বেছে নিতে পারেন তাদের বিনিয়োগের মাধ্যম ফিলিপাইন বা ভারতীয় নাগরিকদের মতো। একটি সর্বজনীন ভবিষ্যৎ তহবিল হয়ে উঠতে পারে সঞ্চয়ের সূতিকাগার।
প্রস্তাবিত ভবিষ্যৎ তহবিল কর্তৃপক্ষকে সরকারি বন্ড মার্কেটের প্রাইমারি ডিলার হিসেবে দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। কল্পিত সঞ্চয়পত্রবিহীন দুনিয়ায় অভ্যন্তরীণ সম্পদের যে শূন্যতা বিরাজ করবে, তা ভবিষ্যৎ তহবিল পূরণ করতে পারবে রাশি রাশি সরকারি বন্ড ক্রয় করে।
ব্যংকগুলোও ভবিষ্যৎ তহবিলে তাদের বন্ড বিক্রি করে যথেষ্ট তহবিল জোগাড় করে নিতে পারে। তাছাড়া সঞ্চয়পত্র অবসরে গেলে দেশের সঞ্চয়ীরা আবার ব্যাংকে ভিড় করবে, সেক্ষেত্রে ব্যাংকের কোষাগার সঞ্চয়ে থই থই করবে। এদিকে সঞ্চয়পত্রের বিলোপ বিনিয়োগকারীদের আবার উদ্যোক্তা করে তুলবে। সর্বজনীন ভবিষ্যৎ তহবিল কাঠামো সরকারের অভ্যন্তরীণ সম্পদের ক্ষুধা কমিয়ে দেয়ায় ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ রাজ্যে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রায় একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। এভাবে সঞ্চয়পত্রের অবসায়ন এবং ভবিষ্যৎ তহবিলের বিনিয়োগ দেশের অর্থনীতিকে দিতে পারে বহুল কাঙ্ক্ষিত নিরাময় ও সুস্বাস্থ্য।
‘দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ’—নজরুল সেই কবে বলে গেছেন। সঞ্চয়পত্রের সৃষ্ট বহুদিনের দেনা ঘোচাতে পারে ‘ভবিষ্যৎ তহবিল’ নামে তারই এক সহোদরা।
মোহাম্মদ কাজী মামুন: এভিপি ও শাখাপ্রধান, ব্যাংক এশিয়া লি., কাজীপাড়া শাখা, মিরপুর, ঢাকা










