আমি এ সময়টায় বিদেশে। হঠাৎ বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নুরুল ইসলাম স্যারের না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার খবরটি শুনে প্রায় নিস্তব্ধ হয়ে গেছি। সরাসরি ছাত্র না হলেও তিনি ছিলেন আমার শিক্ষাগুরু, আমার অভিভাবক। ছাত্র অবস্থাতেই লক্ষ করেছি তিনি অর্থনীতিচর্চায় তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণের পক্ষে ছিলেন। মনে আছে, ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ওপর একটি আলোচনার আয়োজন করে তখন সামনের সারিতে বসে তিনি চুপচাপ শুনেছেন। তিনিই যেহেতু এ পরিকল্পনা দলিল তৈরির দলনেতা, তাই গভীর আগ্রহ নিয়ে সব প্রশংসা ও সমালোচনা শুনেছেন। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। আমারও সৌভাগ্য হয়েছিল তার সামনে পরিকল্পনা দলিলটির জনসম্পদ উন্নয়ন অংশের ওপর কথা বলার। বলা যায়, শক্ত ভাষায় সমালোচনাই করেছিলাম। তিনি তাতে সামান্য বিরক্ত হয়েছেন বলে মনে হয়নি। তার প্রমাণ পেলাম কিছুদিন পরই। আমি এবং ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক প্রয়াত মোয়াজ্জেম ভাই সাংবাদিক হিসেবে নিমন্ত্রণ পেয়ে যাচ্ছিলাম পশ্চিম জার্মানিতে। পথে এথেন্সে বিমান থামল। দেখলাম নুরুল ইসলাম স্যারও ওই বিমানে যাচ্ছেন। ভয়ে ভয়ে স্যারকে সালাম করলাম। ঠিকই চিনতে পারলেন। সেদিনের বক্তৃতার প্রশংসাই করলেন। আরো অনেক আলাপ হলো স্যারের সঙ্গে। অবাকই হলাম। একজন ছাত্রের সঙ্গে এভাবে যিনি মিশতে পারেন তিনি যে আলাদা ধাঁচের এক শিক্ষক তা বোঝাই যায়। পরবর্তী সময়ে স্যার বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (বিআইডিএস) আসতেন। কথা হতো। তখনো দেখতাম তরুণদের প্রতিই তার আগ্রহ ব্যাপক। তরুণদের সহায়তায় তিনি ছিলেন অগ্রণী।

এভাবেই স্যারের সঙ্গে আমার গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেই সম্পর্ক স্যারের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অটুট ছিল। স্যারকে একবার আমার প্রতিষ্ঠিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘‌উন্নয়ন সমন্বয়’-এ এনেছিলাম। তরুণ গবেষকদের সঙ্গে আলাপ করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। দীর্ঘক্ষণ তিনি সেদিন তাদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। বিশেষ করে গবেষণা পদ্ধতি নিয়ে তরুণদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন।

আরেকবার বাংলাদেশ ব্যাংকের তরুণ গবেষক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসেছিলেন। তখন আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। সেবারও তিনি তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে কথা বলে খুবই খুশি হয়েছিলেন।

অর্থনীতি গবেষণা ও চর্চা নিয়ে তার আগ্রহ ছিল অনেক। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য চিন্তা করে গেছেন। এর প্রতিফলন দেখি বাংলাদেশ ইকোনমিস্টস ফোরামে তিনি যে ভাষণটি দিয়েছিলেন তাতে। দীর্ঘক্ষণ তিনি গবেষণা পদ্ধতি এবং বাংলাদেশের ও বিশ্বের সমকালীন অর্থনীতির নানা দিক নিয়ে কথা বলেছিলেন। মনে হলো তিনি যেন ক্লাসই নিচ্ছেন। 

এ বরেণ্য অর্থনীতিবিদকে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংক পুরস্কার দিতে পেরে এখনো গর্ব বোধ করি। রাষ্ট্রীয় কোনো পুরস্কার তিনি পাননি। কিন্তু যে ভালোবাসা তিনি তার ছাত্র ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে পেয়েছেন তার মূল্যই বা কম কী?

পেশাগত পরিচয় ছাড়াও বাঙালিরা তাকে মনে রাখবেন তার অসামান্য দেশপ্রেম ও বঙ্গবন্ধুর প্রিয়জন এক অর্থনীতিবিদ হিসেবে। তিনি নিজেও দুই অর্থনীতির একজন প্রবক্তা ছিলেন। পাকিস্তানের পরিকল্পনা বিতর্কে তিনি ছিলেন পূর্ব বাংলার কণ্ঠস্বর। এ কারণেই তিনি বঙ্গবন্ধুর নজরে আসেন। বঙ্গবন্ধুর সাহচর্যে তিনি ছয় দফার বিশ্লেষণ ও প্রচারে অংশ নেন। সত্তরের নির্বাচনের আগে নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নে ভূমিকা ছিল তার। নির্বাচনের পর ছয় দফাভিত্তিক সংবিধানের খসড়া প্রণয়নে অবদান রাখেন। অসহযোগের দিনগুলোয় ইয়াহিয়ার অর্থনৈতিক টিমের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় তিনি অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি অল্পের জন্য বেঁচে যান। কয়েক দিন ভারতে থেকে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। সেখান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে জোরালো তথ্যাভিযান শুরু করেন। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের কয়েক দিন বাদেই তাকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান করেন। নুরুল ইসলাম স্যারও তার সুযোগ্য সহযোগীদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুর পরামর্শ অনুযায়ী প্রণয়ন করেন প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক পরামর্শক। 

অধ্যাপক ড. নুরুল ইসলাম তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও ভাবনার জায়গা থেকেই বঙ্গবন্ধুর চিন্তা ও কর্মকে মূল্যায়ন করেছেন ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কাছ থেকে দেখা’ গ্রন্থে। স্বাধীনতা-পূর্বকালে ঐতিহাসিক ছয় দফার বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে বঙ্গবন্ধুকে সহায়তা করেছিলেন নুরুল ইসলাম। আর তারই ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে নিজের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন দর্শনকে বাস্তবে রূপ দিতে বঙ্গবন্ধু যে পরিকল্পনা কমিশন গঠন করেছিলেন তার সর্বোচ্চ পদেও নিয়োগ দিয়েছিলেন তাকে। অধ্যাপক নুরুল ইসলাম প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে কখনই যুক্ত ছিলেন না, আবার তিনি আমলাতন্ত্রেরও অংশ ছিলেন না। বঙ্গবন্ধুকে সহায়তা করেছেন একজন নিরপেক্ষ পরামর্শক হিসেবে। 

যে প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা আন্দোলনের মাধ্যমে জাতির অদ্বিতীয় ত্রাতা হয়ে ওঠেন তার বর্ণনা করতে গিয়ে অল্প পরিসরের মধ্যেই পাকিস্তানের দুই অংশের অর্থনৈতিক বৈষম্যের একটি নিখুঁত চিত্র নুরুল ইসলাম তার বইয়ে তুলে ধরেছেন। ‘‌ছয় দফা নিছক কেবল পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি ছিল না’—এমন কথা প্রায়ই বলা হয়ে থাকে। কিন্তু কীভাবে ছয় দফার দাবিগুলো নিছক স্বায়ত্তশাসনের দাবির চেয়ে মৌলিকভাবে আলাদা ছিল তা নিয়ে মূলধারায় আলোচনা-পর্যালোচনা কমই দেখা যায়। নুরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘‌ছয় দফা দাবির খসড়া কে লিপিবদ্ধ করেছিলেন, তা আমার প্রত্যক্ষভাবে জানা নেই। তবে বঙ্গবন্ধু নিজেই ছয় দফার মূল সূত্রগুলোর খসড়া তৈরি করেছেন। ছয় দফার বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে অধ্যাপক নুরুল ইসলাম যুক্ত হয়েছিলেন আরো অনেক পর। তার নিজের কথায়, ‘১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধু আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে রেহাই পাওয়ার পর আমি ছয় দফা কর্মসূচির পক্ষে কাজ করতে শুরু করি’। পঞ্চাশের দশক থেকেই পাকিস্তানের দুই অংশের বৈষম্য নিয়ে অধ্যাপক ইসলাম গবেষণা ও বিভিন্ন কমিটি/কমিশনে কাজ করেছিলেন। সম্ভবত তৎকালীন পাকিস্তানের স্টেট ব্যাংকের গভর্নর এম রশিদের কাছ থেকে বঙ্গবন্ধু অধ্যাপক ইসলামের এসব কাজের কথা জানতে পেরেছিলেন। ১৯৬৯-এর শুরুর দিকে এম রশিদ এবং অধ্যাপক ইসলামের বন্ধু একজন অবাঙালি ব্যবসায়ীর ঢাকার বাড়িতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। ওই সাক্ষাতের বর্ণনায় তিনি লিখেছেন, ‘সাক্ষাৎকালে বঙ্গবন্ধু আমাকে বোঝালেন যে তিনি বেশকিছু বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন অনুভব করছেন, যারা তার স্বাধিকারের দাবি ও ছয় দফার প্রতিটি দফাকে জোরালো বিস্তারিতভাবে যুক্তিতর্কের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করবেন এবং এজন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করবেন। তার ধারণা যে আগামী দিনে পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে কঠিন বোঝাপড়া করতে হবে। তিনি আরো বলেন যে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে অর্থনৈতিক নীতিমালা রচনা ও সেসবের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দান করার জন্য তার যে টিম রয়েছে, আমি যেন একজন সদস্য হিসেবে তাতে যোগ দিই। আমি তার আহ্বানে সাধ্যমতো সহযোগিতার আশ্বাস দিই’।

এ সম্পর্ক আরো দৃঢ় হয় ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ছয় দফার আলোকে খসড়া সংবিধান রচনার কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সময়। এর মাঝেই শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। এরপর মুক্তিযুদ্ধ। ২৫ মার্চের পর অধ্যাপক নুরুল ইসলাম ঢাকা থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধ শেষে তিনি বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন তিনি এবং তার সহকর্মীরা অল্প সময়ের মধ্যেই প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। এ দলিলের মুখবন্ধে বঙ্গবন্ধু লিখেছিলেন—‘এ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ভবিষ্যৎ বিকাশের দিকনির্দেশনা এবং উন্নয়ন অগ্রাধিকার চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে স্বল্প সময়ে প্রণয়ন করা হয়েছে। জাতি গঠনে আমাদের সবাইকে একাগ্র চিত্তে ত্যাগ স্বীকার করতে হবে, যেমনটি মুক্তিযুদ্ধে আমরা সাহস ও উদ্দীপনাসহ করেছিলাম’। বঙ্গবন্ধুর সার্বক্ষণিক সমর্থনে অধ্যাপক ইসলাম নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে পরিকল্পনা কমিশন পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ এমন এক কৃতী অর্থনীতিবিদের জন্য শত শত বছর ধরে গর্ব বোধ করবে। আরেকজন নুরুল ইসলাম ফের কবে আসবেন বাংলাদেশে তা বলা মুশকিল। যেমন বুদ্ধিদীপ্ত, তেমনি বাস্তবানুগ। যেমনি তাত্ত্বিক, তেমনি তথ্যনির্ভর। সব অর্থেই অসাধারণ। আমাদের পথপ্রদর্শক। মেন্টর। বিদেশের নামকরা সব অর্থনীতিবিদের কাছেও সমান সম্মানীয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উচ্চারিত অর্থনীতিবিদের নামগুলোর মধ্যে তিনিই ছিলেন সবার প্রথম।

দেশ গড়ার শুরুর দিনগুলোয় অধ্যাপক নুরুল ইসলামের নিরলস পরিশ্রম এবং নীতিনির্ধারণী ভূমিকার কথা বাঙালি জাতি নিশ্চয় শত শত বছর ধরে মনে রাখবে। পূর্ণ বয়সেই তিনি চলে গেলেন। আজীবন জ্ঞানচর্চা করে গেছেন তিনি। ড. আখতার মাহমুদ আমাকে জানিয়েছেন যে মৃত্যুর তিনদিন আগেও তার সঙ্গে অনলাইনে মিটিং করেছেন। শেষ দিকে স্যার অর্থনীতি ছাড়াও ইতিহাসচর্চায় মন দিয়েছিলেন। সমকালীন সমাজ ও রাজনীতি নিয়েও ছিল তার বিরাট আগ্রহ। প্রচুর পড়তেন। যুক্তি ও তথ্য ছাড়া কিছুই বলতেন না, লিখতেন না। এমন একজন শিক্ষাগুরুর বিদায়ে আমার মতো অসংখ্য গুণগ্রাহী অনেকটাই বিমর্ষ ও বাকহারা। স্যারের আত্মার শান্তি কামনা করছি।

ড. আতিউর রহমান: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর