সম্প্রতি গ্লোব
বায়োটেক তাদের
প্রস্তাবিত টিকা
পরীক্ষার জন্য
গাজীপুরের বন্যপ্রাণী
সংরক্ষিত এলাকার
সাফারি পার্কে
বানর ধরতে
গিয়ে গণমাধ্যমে
শিরোনাম হয়।
এ অনাকাঙ্ক্ষিত
ঘটনা দেশের
বৈজ্ঞানিক গবেষণা
এবং এ-সংক্রান্ত
নৈতিকতা নিয়ে
দৈন্য তুলে
ধরার পাশাপাশি
যথেষ্ট শঙ্কাও
তৈরি করেছে।
এ কারণে
বাংলাদেশের ওষুধ
খাত নিয়ে
আন্তর্জাতিক মহলে
সন্দেহ তৈরি
করবে, ফলে
ওষুধ রফতানিতে
নেতিবাচক প্রভাব
পড়তে পারে।
গ্লোব বায়োটেক
গত বছর
গণমাধ্যমে জানায়,
তাদের প্রস্তাবিত
টিকা আন্তর্জাতিক
নীতিমালা অনুযায়ী
মানবদেহে পরীক্ষার
জন্য প্রস্তুত।
কিন্তু পরে
দেখা গেল
তারা আন্তর্জাতিক
নীতিমালা অনুসরণ
করেনি। তাই
সম্প্রতি বাংলাদেশ
মেডিকেল রিসার্চ
কাউন্সিল তাদের
আবেদন নাকচ
করে দিয়ে
বানরে টিকা
পরীক্ষার তথ্য
চেয়েছে। সেই
বাধ্যবাধকতা পূরণ
করতে গিয়ে
তারা বৈজ্ঞানিক
নৈতিকতার ন্যূনতম
তোয়াক্কা না
করে জঙ্গলে
বানর ধরার
অভিযানে নামে।
গত ২৯
জুন থেকে
গাজীপুরের বিভিন্ন
জায়গা থেকে
৩০টি বানর
খাঁচায় বন্দি
করে। কিন্তু
শ্রীপুরের বারমী
গ্রামের বানর
ধরতে গিয়ে
তারা স্থানীয়
জনগণের রোষানলে
পড়ার কারণে
বিষয়টি মিডিয়ার
মাধ্যমে দেশ-বিদেশের
মানুষ জেনে
যায়। তা
না হলে
এ গুরুত্বপূর্ণ
বিষয়টি হয়তো
অজানা থেকে
যেত। বিস্ময়কর
হলেও সত্য
যে সরকারের
পরিবেশ, বন
ও জলবায়ু
পরিবর্তন মন্ত্রলালয়
গ্লোবকে ৫৬টি
সাফারি পার্ক
থেকে বানর
ধরার অনুমতি
দিয়ে চরম
দায়িত্বহীনতার নজির
স্থাপন করেছে।
বানরে টিকার
কার্যকারিতা পরীক্ষা অত্যাবশ্যকীয় কেন?
ভ্যাকসিন
যেমন প্রতিষেধক
হিসেবে জীবন
বাঁচাতে পারে,
তেমনিভাবে তা
মানুষের জীবন
নাশও করতে
পারে, যদি
না এটি
নিরাপদ কিনা,
তা নিশ্চিত
করা হয়।
প্রসঙ্গত, ওষুধ
দেয়া হয়
রোগীকে, অন্যদিকে
টিকা দেয়া
হয় সুস্থ
মানুষকে। তাই
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
বিষয় হচ্ছে
এটি মানুষের
জন্য নিরাপদ
কিনা। টিকার
নিরাপত্তা ইস্যুতে
সমস্যা হলে
মিলিয়ন মিলিয়ন
সুস্থ মানুষ
গুরুতর অসুস্থ
হয়ে যেতে
পারে। এ
কারণে টিকা
হচ্ছে নৈতিকভাবে
সবচেয়ে সংবেদনশীল
বায়োলজিকস। মানুষে
প্রয়োগ করার
আগে বিভিন্ন
লেভেলে পরীক্ষা
করে নিশ্চিত
করা হয়
যে এটি
নিরাপদ। টিকার
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বা
সেফটি ইস্যু
এতই সংবেদনশীল
যে অনুমোদিত
টিকার ক্ষেত্রেও
তা পর্যবেক্ষণ
করা হয়,
যাকে ফার্মাকোভিজিলেন্স
বলে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার
কারণে অনুমোদিত
ডেঙ্গুর টিকা
বাজার থেকে
উঠিয়ে নেয়া
হয়। সাম্প্রতিককালে
অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা
এবং জনসন
অ্যান্ড জনসন
টিকার সন্দেহজনক
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে
ব্যাপক আলোচনা
হয়। মাত্র
কয়েকটি সন্দেহজনক
রক্ত জমাট
বাঁধার (thromboembolic
event) ঘটনার
ওপর ভিত্তি
করে টিকাদান
কার্যক্রম বিশ্বব্যাপী
সাময়িকভাবে স্থগিত
করা হয়েছিল।
টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
আছে কিনা,
তা নিরূপণ
করতে প্রি-ক্লিনিক্যাল
পর্যায়ে প্রথমে
ছোট ল্যাব
অ্যানিমেলে (ইঁদুর,
গিনিপিগ) প্রয়োগ
করে এটি
কেমন কার্যকর
এবং সেই
সঙ্গে নিরাপদ
কিনা তা
সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার
মাধ্যমে চুলচেরা
বিশ্লেষণ করা
হয়। এ
পর্যায়ে সফল
হলে উচ্চতর
ল্যাবে প্রতিপালিত
নন-হিউম্যান
প্রাইমেটে (বানর,
শিম্পাঞ্জি) পরীক্ষা
করা আন্তর্জাতিক
নীতিমালার আবশ্যকীয়
অংশ।
বানরে টিকা
পরীক্ষার মতো
উপযুক্ত ল্যাব
কি আছে?
বানর
ও শিম্পাঞ্জির
মানুষের সঙ্গে
জিন এবং
আচরণগত মিল
থাকার কারণে
নৈতিক দৃষ্টিকোণ
থেকে তাদের
ওপর কোনো
গবেষণামূলক ড্রাগ
পরীক্ষা যথাসম্ভব
পরিহার করা
আন্তর্জাতিক নীতিমালার
গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
টিকা যেহেতু
একটি দেশের
৬০-৭০
শতাংশ সুস্থ
মানুষের ওপর
প্রয়োগ করা
হয়, তাই
এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
বানর-শিম্পাঞ্জিতে
পরীক্ষা করা
সব আন্তর্জাতিক
গাইডলাইনে বাধ্যবাধকতা
রয়েছে। বিশ্ব
স্বাস্থ্য সংস্থাসহ
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক
ও ন্যাশনাল
নীতিমালা অনুযায়ী
বানরে প্রি-ক্লিনিক্যাল
স্টাডি পরিচালনা
করতে হবে
বিশেষায়িত ল্যাবে
এবং এটি
হতে হবে
গুড ল্যাবরেটরি
প্র্যাকটিস (জিএলপি)
সার্টিফাইড। টিকা
গবেষণার জন্য
বরাদ্দ ল্যাবের
প্রত্যেকটি এক্সপেরিমেন্ট
এবং প্রসেস
ভ্যালিডেশন নিশ্চিত
করা হয়
জিএলপি নামক
কঠোর রেগুলেটরি
নির্দেশিকার মাধ্যমে।
তাই বানরে
টিকার কার্যকারিতা
এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া-সংক্রান্ত
নৈতিক এবং
বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য
ডাটা তৈরি
করতে অনেক
বছরের অভিজ্ঞতা,
ট্রেইনিং এবং
সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার
ল্যাব ফ্যাসিলিটি
গড়ে তুলতে
হয়। আমাদের
জানামতে, বাংলাদেশে
বানরের ওপর
টিকা পরীক্ষা
চালানোর মতো
সুনির্দিষ্ট ল্যাব
এবং নীতিমালা
এখনো গড়ে
ওঠেনি। এ
অবস্থায় গ্লোবের
তাড়াহুড়ো করে
জঙ্গল থেকে
বানর ধরে
পরীক্ষা প্রচেষ্টা
সম্পূর্ণ অনৈতিক
এবং বৈজ্ঞানিক
দৃষ্টিকোণ থেকে
তাদের অজ্ঞতা
প্রকাশ পেয়েছে।
তাদের বৈজ্ঞানিক
কর্মকাণ্ড টিকা
রিসার্চ নিয়ে
সন্দেহ তৈরি
করেছে।
গ্লোবের প্রস্তাবিত টিকা কি
মানবদেহে পরীক্ষা করার যোগ্যতা অর্জন করেছে?
গত
অক্টোবরে অনলাইনে
প্রকাশিত গ্লোব
টিকার সায়েন্টিফিক
ডাটা মূল্যায়ন
করে আমাদের
এক্সপার্ট টিম।
টিকা আন্তর্জাতিকভাবে
গ্রহণযোগ্য হতে
নিরপেক্ষভাবে যে
পরামর্শ আমরা
দিয়েছিলাম—
১. বঙ্গভ্যাক্সকে
বানরে পরীক্ষা
করতে হবে।
তা না
হলে আন্তর্জাতিকভাবে
গ্রহণযোগ্য হবে
না। ২.
প্রাপ্ত ডাটা
অনুযায়ী তারা
ইঁদুরের ওপর
যে স্টাডি
করেছে তা
বিশ্ব স্বাস্থ্য
সংস্থার (ডব্লিউএইচও)
নীতিমালা অনুসরণ
করে সম্পন্ন
করা হয়নি।
৩. গ্লোব
টিকা তৈরিতে
উপাদান এবং
বিভিন্ন প্রস্তুত
প্রক্রিয়ার প্রণালি
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত
জিএমপি সার্টিফাইড
ফ্যাসিলিটিতে তৈরি
করা হয়েছে
কিনা? ৪.
গ্লোব জিএমপি
গ্রেডের এমআরএনএ
ব্যবহার করেছে
কিনা? ৫.
গ্লোব করোনার
স্পাইক প্রোটিনের
জিনের D614G
মিউটেশনকে কেন্দ্র
করে যে
টিকা ডিজাইন
করে, তার
স্পেসিফিসিটি নিয়ে
মিডিয়ায় প্রতিনিয়ত
অতিরঞ্জন করেছে।
বাস্তবতা হলো,
এ মিউটেশন
রিসেপ্টর বাইন্ডিং
ডোমেইনে বাইরে
অবস্থিত। তাই
তাদের দাবি
বৈজ্ঞানিকভাবে ভিত্তিহীন।
বাংলাদেশ করোনার
তৃতীয় ঢেউয়ের
কশাঘাতে হিমশিম
খাচ্ছে। পুরো
দেশে কার্যত
শাটডাউন রয়েছে।
ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের
তীব্রতার কারণে
দেশ রীতিমতো
নাজুক অবস্থায়
রয়েছে। এমন
অবস্থায় গ্লোবের
অনৈতিক এবং
অবৈজ্ঞানিকভাবে বন
থেকে বন্দি
করা বানরে
টিকা পরীক্ষা
করার প্রচেষ্টা
রীতিমতো অগ্রহণযোগ্য
এবং তাদের
কর্মকাণ্ড সন্দেহ
তৈরি করেছে।
বানরসংক্রান্ত খবরটি আন্তর্জাতিকভাবে
ছড়িয়ে পড়ার
কারণে দেশের
ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি
রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত
হতে পারে
এবং দেশের
বায়োটেক-সংক্রান্ত
রিসার্চ বিশ্ব
লেভেলে অনাস্থা
করবে। বাংলাদেশ
মেডিকেল রিসার্চ
কাউন্সিল ও
ড্রাগ অথরিটি
গ্লোবের টিকার
কার্যক্রম স্থগিত
করে তা
জরুরি ভিত্তিতে
তদন্ত করা
উচিত।
ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন:
নির্বাহী পরিচালক,
বায়োমেডিকেল রিসার্চ
ফাউন্ডেশন, সাবেক
সিনিয়র ম্যানেজার
(R&D), বায়োটেক
ডিভিশন, ইনসেপ্টা
ফার্মাসিউটিক্যাল
সহযোগী
অধ্যাপক, আইইউবি
ড. জুবায়ের রহমান: ইমিউনোলজিস্ট,
মেরিল্যান্ড, ইউএসএ
ড. শামসুল আলম: স্টাফ
সায়েন্টিস্ট (ইমিউনোলজিস্ট),
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট
অব হেলথ,
ইউএসএ
ড. রেজাউল করিম: ম্যানেজার, রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার/ড্রাগ ডেভেলপমেন্ট এবং ইমিউনোলজিস্ট, নেদারল্যান্ডস










