বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) দুই দশক পূর্তি অনুষ্ঠানে জানানো হয় প্রতি বছরের মতো এবারো সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে অর্থাৎ সুইস ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য চাওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের ৬৭ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অর্থ সম্পর্কে সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের কাছ থেকে তথ্যও পাওয়া গেছে, যা দেশের বিভিন্ন বাহিনী, দুর্নীতি দমন কমিশন ও তদন্তকারী সংস্থাগুলোকে দেয়া হয়েছে। এমন সময়ে এ খবর প্রকাশ হলো যখন সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশীদের জমা অর্থ রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক। এক্ষেত্রে শুধু নামের তালিকা পেলেই হবে না, অবৈধ অর্থ চিহ্নিত করে তা ফেরত আনার ব্যবস্থাও করতে হবে। সর্বাগ্রে যে পদক্ষেপ নিতে হবে তাহলো অবৈধ প্রক্রিয়ায় অর্থ পাচার বন্ধ। একই সঙ্গে নিয়মিত সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশীদের হিসাবের তথ্য পেতে আন্তর্জাতিক কাঠামোয় যোগদান এবং চুক্তিস্বাক্ষর করতে হবে।
বহু বছর ধরে বিশ্বস্ততার সঙ্গে সুইস ব্যাংক আমানতকারীর টাকা রক্ষা করে আসছে। এজন্যই প্রথমত যাদের বিপুল অবৈধ পথে অর্জিত অর্থ আছে, তারা সেই অর্থের নিরাপত্তার জন্য সুইস ব্যাংকে রাখার কথা ভাবেন। অসত্ভাবে অর্থ উপার্জন শুধু বাংলাদেশে হয় এমনটি ভাবার কোনো সুযোগ নেই, বিশ্বের অনেক দেশেই অবৈধভাবে অর্থ উপার্জিত হয়ে থাকে। যাদের অসৎ উপার্জন আছে, তারা খুব একটা দেরি না করে সুইস ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলে অর্থ জমা রেখে দিব্যি রয়ে যান। সুইস ব্যাংক যে শুধু অবৈধভাবে উপার্জিত টাকা রাখার সুযোগ করে দেয় তা কিন্তু নয়, বৈধ টাকাও রাখে বহু মানুষ। এখানে যারা টাকা রাখে, সাধারণের ধারণা তারা যেনতেন ধরনের লোক নন। তাদের অর্থ-বিত্ত বিপুল বলেই তারা এখানে টাকা জমা রাখেন। তবে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে সুইস ব্যাংক নিয়ে যে ধারণা প্রতিষ্ঠিত, তাহলো অবৈধ উপায়ে উপার্জিত অর্থ এ ব্যাংকে রাখা হলে তা খোয়ানোর কোনো ঝুঁকি নেই। মোট কথা, সরকারকে একদিকে অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জনের পথ বন্ধ করতে হবে, পাশাপাশি অর্থ পাচার কঠোরভাবে রুদ্ধ করার ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের অর্থ বিভাগকে আরো সক্রিয় হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
সুইস ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে তথ্য পাওয়ার একটি আন্তর্জাতিক কাঠামো আছে। এর নাম হচ্ছে অটোমেটিক এক্সচেঞ্জ অব ইনফরমেশন (এইওআই)। ২০১৭ সাল থেকে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিনিময়ের এ আন্তর্জাতিক কাঠামো চালু রয়েছে। শুরু হয়েছিল জি২০ এবং ওইসিডিভুক্ত ৩৮টি দেশের হাত ধরে। মূলত এটি করা হয় কর ফাঁকি ধরার উদ্দেশ্যে। কোনো দেশের নাগরিক যদি নিজ দেশে কর ফাঁকি দিয়ে সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা রাখেন, তাহলে সেই তথ্য দিতে বাধ্য করা হয়েছে এ কাঠামোর আওতায়। এর বাইরে তথ্য পাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে একটি পৃথক আইন। ২০১০ সালে পাস করা যুক্তরাষ্ট্রের ‘দ্য ফরেন অ্যাকাউন্ট ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স অ্যাক্ট’-এ বলা আছে, কোনো মার্কিন নাগরিক অন্য দেশের কোনো ব্যাংকে অর্থ রাখতে চাইলে সে তথ্য তাদের দিতে হবে। আর তা না মানলে ওই ব্যাংককে যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করা হবে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র একাধিক সুইস ব্যাংককে বিপুল পরিমাণ অর্থ জরিমানা করলে সুইজারল্যান্ড স্বয়ংক্রিয় তথ্য আদান-প্রদানের একটি আইনি কাঠামোয় অংশগ্রহণ করতে সম্মতি জানিয়েছিল। এ ব্যবস্থায় কর ফাঁকি বা অন্য কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত কোনো ব্যক্তির তথ্য সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চাইলে তা দিতে বাধ্য সুইস ব্যাংকগুলো। আরো ৪২টি দেশ এতে যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় আছে। কিন্তু বাংলাদেশ নিয়মিত তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা করেনি, আন্তর্জাতিক কাঠামোর মধ্যে যুক্ত হওয়ার কার্যকর কোনো পদক্ষেপও নেয়নি, যা দুঃখজনক।
প্রসঙ্গত, এই যে জমার হিসাব বলা হচ্ছে, এটা সরকারি হিসাবে। এর বাইরেও ডামি অ্যাকাউন্ট বা ডামি সংস্থার মাধ্যমে অনৈতিকভাবে বহু বাংলাদেশী সুইস ব্যাংকে টাকা রাখেন। আবার এদের বাইরে প্রবাসী বাংলাদেশীরা বৈধভাবেও সেখানে টাকা রাখেন। সুতরাং এ হিসাব দেখে কালো টাকার পরিমাণ জানা অসম্ভব। বিশ্বের ৮৬টি দেশের নাগরিকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে সেই দেশের সরকারকে জানায় সুইস ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। কোন কোন দেশের নাগরিক ওই ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলেছেন, সে সম্পর্কে তথ্য দেয় সুইজারল্যান্ড ফেডারেল ট্যাক্স অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। এ তালিকায় রয়েছে ভারতও। দেশ থেকে অর্থ পাচারের তথ্য আদান-প্রদান করতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকে সই করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত দেশের সঙ্গে চুক্তি করেছে। কিন্তু সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের মতো ক্রমবর্ধমান পাচারের স্বর্গরাজ্যগুলোর সঙ্গে কোনো চুক্তি নেই। রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয়ে বিভিন্ন দেশে সভা-সেমিনারে অংশগ্রহণ করে একের পর এক সমঝোতা স্মারক সই করা হলেও টাকা পাচার বন্ধ হচ্ছে না, বরং দিন দিন তা বেড়েই চলেছে। এ অবস্থা অবশ্যই দেশের জন্য চিন্তার।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) তথ্য অনুসারে, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে থাকে ৭১ হাজার কোটি টাকা। ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। উল্লেখ্য, এর আগে প্রকাশিত পানামা ও প্যারাডাইস পেপারসে ৮৪ জন বাংলাদেশীর টাকা পাচারের তথ্য উঠে এসেছিল। এর বাইরে সেকেন্ড হোমসহ নানা মাধ্যমে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে প্রচুর অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে। দেশের অর্থনীতির এই যে কালো দিক প্রবলতর হয়ে উঠছে, একে থামাতে না পারলে দেশের অর্থনীতিকে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেয়া যাবে না। ব্যবসায়ী, আমলা, রাজনীতিবিদ যিনিই হোন না কেন, অবৈধ পন্থায় অর্থ আয় করলে তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। সরকার অনিয়ম-দুর্নীতি-ঘুসের বিরুদ্ধে যে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে, এতে আরো গতি আনা দরকার। বিদেশের যেখানেই বিপুল অর্থ পাচার হয়ে থাকুক না কেন, তা পুরোপুরিভাবে ফিরিয়ে আনতে সব ধরনের চেষ্টা সরকার অব্যাহত রাখবে বলে প্রত্যাশা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, একসময় সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলো পাচারকৃত অর্থের ব্যাংকিংয়ের জন্য জনপ্রিয় থাকলেও এখন লুক্সেমবার্গ, কেইম্যান আইল্যান্ড, পানামা, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, বারমুডা ও বাহামার ব্যাংকিং ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছেন ধনীরা। তাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এসব দেশের ব্যাংকগুলো। এমনকি তুরস্কও সম্প্রতি সেকেন্ড হোম প্রকল্প চালু করেছে। বাংলাদেশের অন্তত ২০০ বিত্তবান অর্থ পাচারকারী এ প্রকল্পের মাধ্যমে তুরস্কের নাগরিকত্ব গ্রহণের জন্য আবেদন করেছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়। এছাড়া আরো অনেক দেশ পরোক্ষভাবে পাচারকৃত অর্থকে স্বাগত জানাচ্ছে। সুইজারল্যান্ডে গোপনীয়তা কমতে থাকায় অনেক ধনী এখন অবৈধ টাকা জমা রাখার জন্য অগ্রসর হচ্ছেন এসব দেশের ব্যাংকের প্রতি। অন্য সব ব্যাংকের হিসাব এ মুহূর্তে জানা না গেলেও সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম হয়েছে। যে অর্থ বিদেশে যায়, তার বেশির ভাগই অপ্রদর্শিত বা দুর্নীতির অর্থ। আরেকভাবে যায়, সেটা হচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্য বিশেষ করে আমদানি-রফতানির মাধ্যমে। অনেকে বৈধভাবে অর্জন করার পরও ভবিষ্যতের কথা ভেবে দেশে টাকা রাখতে নিরাপদ বোধ করেন না।
কোনো দেশই চায় না, তার দেশের উপার্জিত অর্থ অন্য দেশে ব্যবহার হোক। মুদ্রা পাচার কখনই বন্ধ হবে না যদি সংশ্লিষ্ট প্রতিটি দেশ এ ব্যাপারে সতর্ক ও সচেতন না হয়। কারণ এটা দ্বিপক্ষীয় কার্যক্রম। যে দেশ থেকে অর্থ পাচার হয় তারা কখনই তা বন্ধ করতে পারবে না, যদি মুদ্রা পাচারের গন্তব্য দেশটিও সতর্ক না হয়। কোনো দেশ যদি পাচারকৃত মুদ্রাকে তাদের দেশে অভ্যর্থনা জানায়, তাহলে কখনই মুদ্রা পাচার বন্ধ হবে না। কিন্তু উদ্দিষ্ট দেশটি যদি পাচারকৃত মুদ্রা তাদের দেশে অভ্যর্থনা না জানায়, তাহলে এ কার্যক্রম এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বিশ্বের বেশির ভাগ দেশই তাদের দেশে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে পাচারকৃত অর্থকে স্বাগত জানায়। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) একটি প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশ থেকে প্রতি বছর নানাভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে এবং ২০৩০ সাল নাগাদ এর পরিমাণ ১৪ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার (১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা) ছাড়িয়ে যেতে পারে। তথ্যটি খুবই উদ্বেগজনক। তাই বিদেশে অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণ জরুরি। পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরত আনার ক্ষেত্রে কৌশলী ভূমিকা পালন করতে হবে।










