চলমান কভিড-১৯ মহামারী সৃষ্ট বিপর্যয় থেকে নিম্ন আয়ের মানুষকে সহায়তায় সরকার দ্বিতীয় দফায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে আরোপিত বিধিনিষেধের ফলে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য পাঁচটি নতুন প্যাকেজের আওতায় এ অর্থ বণ্টন করা হবে। করোনার প্রভাব মোকাবেলায় নির্দিষ্ট বিরতিতে চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা চলছে। এর প্রভাব পড়েছে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের আয়ে। নিয়মিত কাজের সংস্থান না থাকায় ন্যূনতম জীবনধারণ তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে নতুন প্রণোদনা প্যাকেজটি নিঃসন্দেহে সময়োচিত পদক্ষেপ। তবে অর্থনৈতিক ভঙ্গুর জনগোষ্ঠীর কাছে এর সুফল পৌঁছে দিতে প্রণোদনা প্যাকেজের সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

জীবন-জীবিকা বাঁচাতে করোনা মহামারীর শুরু থেকেই সরকার সচেষ্ট। দেশের বড়, মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ী, নিম্ন আয়ের মানুষ, দরিদ্র, এমনকি কর্মহীন মানুষের জন্য আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে অর্থ প্রদানে সদ্দিচ্ছার ঘাটতি দেখা যায়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে তদারকি জোরদার করেছে। তদারকি এখনো থেমে নেই। প্যাকেজ বাস্তবায়ন ও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের শনাক্তে সরকারের সদিচ্ছারও অভাব নেই। কিন্তু এক্ষেত্রে বড় সমস্যা সরকারের হাতে গরিব, কর্মহীন, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পূর্ণাঙ্গ কোনো তালিকা নেই। করোনার কারণে নতুন দরিদ্রের সংখ্যা বেড়েছে, অনেকে কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়ছেন, অর্থ সংকটে ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন অনেকে। নতুন করে দরিদ্র হওয়া বা আয় কমে যাওয়া এসব মানুষ তালিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে। নতুন করে যেসব তালিকা করা হয়েছে, তাতেও অনিয়মের বিষয়টি বিভিন্ন সময় ধরা পড়েছে। ফলে সরকার ঘোষণা দেয়ার পরও নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। আগের দফায় ১০ হাজার ১৭৩ কোটি টাকার সাতটি প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল সরকার। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, সামাজিক সুরক্ষার আওতায় নেয়া এসব প্যাকেজের বড় অংশই অবণ্টিত থেকে গেছে। নতুন ঘোষিত প্যাকেজ বাস্তবায়নে তাই এসব অভিজ্ঞতা বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

কভিডে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী চিহ্নিত করতে মালয়েশিয়াসহ বেশকিছু রাষ্ট্র স্বতন্ত্র একটি নম্বর চালু করে। করোনার কারণে নতুন করে যারা চাকরি হারিয়েছেন বা বেকার হয়েছেন, তারা নিজেরাই সে নম্বরে যোগাযোগ করে চাকরি হারানো বা অর্থ-খাদ্য সংকটের কথা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে কর্তৃপক্ষ। সঠিক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে তাদের আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারও একই প্রক্রিয়ায় ঘোষিত প্যাকেজ বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে—তালিকা তৈরি থেকে শুরু করে সঠিক মানুষের কাছে সাহায্য পৌঁছানো পর্যন্ত তথ্য-প্রমাণাদি সংগ্রহ ও তা যাচাই করতে পারে। নতুন প্যাকেজের আওতায় জেলা প্রশাসকদের অনুকূলে বিশেষ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সেখানে ৩৩৩ নম্বরে ফোন করে ভুক্তভোগীরা এ সুবিধা নিতে পারবেন বলে জানা যাচ্ছে। তবে সাধারণ দরিদ্র মানুষের কাছে এ তথ্য পৌঁছানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে অঞ্চলভিত্তিক প্রচারণা চালাতে হবে। ধর্মীয় প্রতিনিধিদেরও এ কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে অধিক সুফল মিলতে পারে। জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে নিম্ন আয়ের মানুষের তালিকা করার বিষয়টি ভেবে দেখা যেতে পারে। এক্ষেত্রে খবর মিলছে, সেলফোন ব্যবহারকারীদের তথ্য ব্যবহার করে নিম্ন আয় ও দরিদ্র মানুষ চিহ্নিত করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআইয়ের একটি প্রকল্প চলমান। এশিয়ার কয়েকটি দেশে এ মডেল পরিচালিত হচ্ছে বলে খবর মিলছে। এটি সফল হলে সংশ্লিষ্ট তালিকা তৈরি করা কঠিন হবে না। এমন আরো একটি কার্যক্রম হতে পারে পরিপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা মডেল তৈরি করা, যেটি উন্নত দেশগুলোয় রয়েছে। নিম্ন আয় ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী চিহ্নিত করতে এবং তাদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দিতে এনজিওর সহায়তাও নেয়া যেতে পারে।

মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নিম্ন আয় ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে নগদ অর্থ পৌঁছে দেয়া হয়েছে। প্রথম অবস্থায় এটিকে অপচয় ও দুর্নীতি রোধের ভালো একটি কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা হলেও প্রশ্ন উঠছে এমএফএস কোম্পানির সেবা নিয়ে। অনেক কোম্পানি দরিদ্রদের অর্থ সঠিকভাবে পৌঁছে দেয়নি। আবার তালিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে অনেক। সচ্ছল ব্যক্তির মোবাইল নম্বর প্রদান, একই ব্যক্তির একাধিক নম্বর প্রদানের মতো অভিযোগও এসেছে। এক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। এ কথা সত্য, সহায়তা প্রদান একমাত্রিক হলে চলবে না। কারণ কোথাও খাদ্য না থাকলে সেখানে অর্থ অচল। নগদ অর্থ নাকি খাদ্য, সেই তর্কে আমরা জড়াব না। যেখানে সম্ভব সেখানে সেলফোনের মাধ্যমেই টাকা পাঠানো যাবে। আবার যেখানে খাদ্য প্রয়োজন, সেখানে খাদ্যই পাঠাতে হবে। চীন এ প্রক্রিয়াই অনুসরণ করেছে। মানুষের দোরগোড়ায় খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছে। আমাদের পক্ষেও এটি সম্ভব। কারণ আমাদের রয়েছে নির্বাচিত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা। আবার আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাও রয়েছে। উভয় ব্যবস্থার সম্মিলনে দরিদ্র মানুষের তালিকা তৈরি ও তাদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেয়া কঠিন নয়। শুধু প্রয়োজন তদারকি জোরদার এবং তহবিল তছরুপকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি পদক্ষেপ নেয়া। সেলফোনে নগদ অর্থ প্রদানে দূরত্বের শর্ত পূরণ করে আবার ব্যয়ও কমে, এমনকি অর্থ আত্মসাতের সুযোগও কমে। গ্রহীতাও পান খরচের স্বাধীনতা। বাজারে চালের দাম অনেক বেশি, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। তাই ওএমএসের বরাদ্দ আরো বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষত শহরাঞ্চলের দরিদ্রদের জন্য এ কার্যক্রম খুবই তাত্পর্যপূর্ণ। অধিকসংখ্যক মানুষকে এ সুবিধার আওতায় আনা প্রয়োজন। এবার নতুন প্যাকেজে ঋণসহায়তা বিতরণের দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক ও পিকেএসএফকে। এক্ষেত্রে তাদের সুনামও রয়েছে। প্রত্যাশা থাকবে, ঋণ বিতরণসহ পুরো প্রক্রিয়া কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় গতিশীল হবে এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা সহায়তা পাবেন। এক্ষেত্রে আগের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় রেখে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। ইন্দোনেশিয়া ব্যাংকের মাধ্যমে বিনা জামানতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ভোগ ও স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে নিতে অর্থ দিয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠান চলেছে আবার চাকরিরতদের আয়ও কমেনি। এটি ভোগ চাঙ্গা করেছে, যা আবার অর্থনীতিকে সচল রাখছে।

প্রণোদনার মাধ্যমে মানুষের আয়ের পথও বাঁচিয়ে রাখতে হবে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, এমনকি অস্ট্রেলিয়ার মতো শ্রমজীবী মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, রেশনিং ব্যবস্থাকেও ধরে রাখতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম উন্নয়নের জন্য একটি প্রকল্প নিয়েছে সরকার। পুরো বিষয়টিকে সরকার একটি ডিজিটাল ফর্মে নিয়ে আসতে চাইছে। আর তা হলো এমআইএস। এমআইএস করলে কিছুটা সুফল মিলবে। তবে এটিও মনে রাখতে হবে, এমআইএস কিন্তু সব সমস্যা সমাধান করে দেবে না। তার জন্য আমাদের সুনির্দিষ্ট কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এটি পরিচালনার পেছনের মানুষের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। আগের দফায় গ্রামে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বরাদ্দের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বিতরণ করা হয়নি। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর লক্ষ্যে শতভাগ বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধীদের সহায়তার জন্য বরাদ্দ থাকলেও বিতরণ করা হয়েছে কম। লক্ষ করা যাচ্ছে, যেসব প্যাকেজের আওতায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বেশি উপকৃত হতে পারে, সেসব প্যাকেজের বিপুল পরিমাণ অর্থ বিতরণ করা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় প্রণোদনা প্যাকেজের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যবস্থাপনা ও তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন। সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম বা সংশ্লিষ্ট প্যাকেজের কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন ক্ষতিগ্রস্ত ও হতদরিদ্রদের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন। এখানেই নাকি জটিলতা। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে সঠিক তালিকা প্রণয়নে অনেক সময় লাগছে। এক্ষেত্রে কারো উদাসীনতা রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কর্তৃপক্ষের দেখা উচিত সারা বিশ্বেই সামাজিক সুরক্ষায় সরকার কীভাবে অবদান রাখছে। অর্থাৎ সংখ্যার বাইরে গিয়ে প্রণোদনার কার্যকারিতা বিশ্লেষণ প্রয়োজন।