করোনা মহামারীতে বিশ্বে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা করেছিল জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। গত বছরের তুলনায় কৃষি উৎপাদন কিছুটা বাড়লেও সেই শঙ্কা এখনো যায়নি। এর মধ্যে চাহিদা অনুপাতে বৈশ্বিক খাদ্যশস্যের মজুদ কমতে শুরু করছে। তথ্য বলছে, ২০২০-২১ বিপণন মৌসুমে মজুদের পরিমাণ কমে দাঁড়াবে ৬০ কোটি ৯০ লাখ টনে। এমনটি হলে বৈশ্বিক খাদ্যশস্যের মজুদ পাঁচ বছরের সর্বনিম্নে নামার আশঙ্কা ইন্টারন্যাশনাল গ্রেইন কাউন্সিলের (আইজিসি)। এটি পুরো বিশ্বের জন্য যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি বাংলাদেশের জন্যও ব্যাপক দুশ্চিন্তার। কাজেই বিষয়টি যথাযথভাবে আমলে নিয়ে নীতিনির্ধারকদের সময়োচিত পদক্ষেপ কাম্য।
বিশ্বে খাদ্যশস্যের মজুদ কমার খবর এমন সময় মিলছে, যখন দেশে খাদ্যশস্যের সরকারি মজুদও তলানিতে। অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং সংকট মোকাবেলায় সরকারি গুদামে ন্যূনতম ১৫ লাখ টন চাল থাকা অপরিহার্য। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে চালের মজুদ সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ টনে নেমেছে। বিগত ১৩ বছরের মধ্যে যা সর্বনিম্ন। এবার চালের মজুদ এতটা কমে যাওয়ার জন্য মূলত খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ভুল নীতি দায়ী। গত বছর ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও বন্যায় ধানের উৎপাদন কম হয়। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী গত আগস্টে চাল আমদানির অনুমতি দেন। কিন্তু খাদ্য মন্ত্রণালয় আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করতে পাঁচ মাস সময় নিয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে আমদানি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে এল করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা। আমদানি করা চালের বড় একটা অংশ আসার কথা ভারত থেকে। ভারতে করোনা সংক্রমণ বাড়ার কারণে সেখান থেকে চাল আমদানি হোঁচট খায়। ফলে মজুদ কমে আসে রেকর্ড নিম্নে। তার ওপর গত দুই বছর লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে ধান-চাল ক্রয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয় ব্যর্থ হয়। সব মিলিয়ে সৃষ্টি হয় আজকের এ মজুদ সংকট। এ অবস্থা প্রলম্বিত হলে দেশে খাদ্যাভাব দেখা দিতে পারে। আর বৈশ্বিকভাবে যেহেতু মজুদ পরিস্থিতি অবনতিশীল, সেহেতু জরুরি মুহূর্তে আমদানি করেও খাদ্যশস্য মেলার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তাই অবিলম্বে সরকারি মজুদ বাড়িয়ে তোলার বিকল্প নেই।
চলমান মহামারীকে একটি সর্বব্যাপ্ত ও দীর্ঘমেয়াদি সংকট ধরে নিয়ে সব দেশ কাজ করছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে খাদ্য পরিকল্পনায় আগামদর্শী নীতি নিচ্ছে। বাড়িয়ে তুলছে মজুদ। খাদ্যশস্যের অভ্যন্তরীণ মজুদ স্থিতিশীল রাখতে ভারত রফতানি সংকুচিত করেছে। ভিয়েতনামও একই নীতি গ্রহণ করেছে। স্থানীয় চাহিদার আগাম পরিকল্পনা নিয়ে দেশটি চাল রফতানি অনেকটাই সীমিত করেছে। পাকিস্তানও রফতানির ক্ষেত্রে গ্রহণ করেছে রক্ষণশীল নীতি। নেপাল, ভুটান ও শ্রীলংকাও দূরদর্শী নীতি-কৌশল নিয়ে অভ্যন্তরীণ মজুদ বাড়ানোয় সচেষ্ট। আমাদেরও অন্য দেশের অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া জরুরি।
দেশে এখন চলছে সরকারি ধান-চাল সংগ্রহ কর্মসূচি। চলতি বোরো মৌসুম থেকে সরকারের লক্ষ্য অভ্যন্তরীণভাবে সাড়ে ছয় লাখ টন ধান এবং সাড়ে ১১ লাখ টন চাল সংগ্রহ। প্রতি বছরই রুটিনমাফিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, কিন্তু তা অনেক সময় পূরণ হয় না। গত বছর ১৬ দশমিক ৭০ লাখ টন বোরো সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছিল। কিন্তু কেনা হয়েছিল মাত্র ৯ দশমিক ১০ লাখ টন। অন্যদিকে, সাড়ে ৮ লাখ টন আমন ধান ও চালের বিপরীতে কেনা হয়েছে মাত্র ৮৮ হাজার টন। এবার এর ব্যত্যয় আশা করব। ইতিবাচক বিষয় হলো এবার কেজিপ্রতি চাল ও ধানের দর বাড়ানো হয়েছে, যাতে কৃষক ও মিলাররা সরকারকে ধান-চাল দিতে আগ্রহী হন। এখন কৃষক, বিশেষ করে মিলারদের যথাযথ দায়িত্বশীলতাই প্রয়োজন। চুক্তিবদ্ধ সব মিলারকে কথামতো চাল সরবরাহ করতে হবে। চুক্তি অনুযায়ী চাল না দিলে কালো তালিকাভুক্ত করাসহ আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে তাদের বিরুদ্ধে। প্রয়োজনে ট্রেড লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর পদক্ষেপও নেয়া যেতে পারে। গতবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ এবং সরকারি প্রণোদনা ঘোষণা দেয়ার পরও সরকারকে চাল সরবরাহ করেনি তারা। অতীতের দৃষ্টান্ত সামনে রেখে এবার সম্ভাব্য বিকল্প ব্যবস্থাও রাখা চাই।
খবরে প্রকাশ, এরই মধ্যে গম আমদানির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এবার গম আমদানির ক্ষেত্রে ‘স্পেসিফিকেশন’ তথা ‘বিনির্দেশ’ পরিবর্তন করে সাড়ে ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিনির্দেশে প্রোটিনের মাত্রা কমানোর সুযোগে পচা ও পোকায় খাওয়া নিম্নমানের আমদানির আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। মনে রাখা চাই, এখানে খাদ্য মজুদ বাড়ানোর যেমন বিষয় আছে, তেমনি মানসম্পন্ন গম আমদানির বিষয়ও যুক্ত। কাজেই অনিরাপদ ও নিম্নমানের গম যাতে আমদানি করতে না পারে, সেজন্য কঠোর তদারকি বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রায়ই ঘটে। এতে বিভিন্ন এলাকার দরিদ্র মানুষ খাদ্য ও জীবিকার সংকটে পড়ে। তাদের বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি মজুদ থেকে খাদ্যসহায়তা জোগাতে হয় প্রায় সারা বছর। এখন করোনার দ্বিতীয় প্রবাহ চলছে। সামনে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়সহ অনেক প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা আছে। এদিকে বৈশ্বিক পরিস্থিতিও অনুকূল নয়। বৈশ্বিকভাবে খাদ্যশস্যের মজুদ অব্যাহতভাবে কমছে। এ অবস্থায় চাইলেও বহিস্থ উৎস থেকে খাদ্যশস্যের জোগান নিশ্চিত করা সহজ হবে না। এমনটি হলে আপত্কালীন পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন। সুতরাং বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আমলে নিয়ে একটি স্বচ্ছ খাদ্যশস্য সংগ্রহ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে নিরাপদ মজুদ গড়তে ত্বরিত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে প্রত্যাশা।










