‘বিউটি উইথ ব্রেইন’ বহুল প্রচলিত শব্দবন্ধটি শুনলে আপনার মাথায় কী আসে? আমার মনে পড়ে বছর বছর অনুষ্ঠিত হওয়া মিস ইউনিভার্স, মিস ওয়ার্ল্ড কিংবা মিস বাংলাদেশের কথা। সম্প্রতি শেষ হলো মিস ইউনিভার্সের ৭৪তম আসর। প্রতিবার এক একটি সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা আসে এবং প্রতিবার মাথায় ঘুরপাক খায় কিছু কথা, কিছু প্রশ্ন।
বিশ্বজুড়ে ঝলমলে আলোয় সাজানো যে সৌন্দর্য প্রতিযোগিতাগুলো চলে, সেগুলোকে আমরা দেখি বিনোদন হিসেবে— রঙিন পোশাক, মঞ্চের আলো, ক্যামেরার ঝলক, আর শেষে একটি মুকুট। কিন্তু সেই মুকুটের নিচে লুকিয়ে থাকে হাজারো প্রশ্ন, অগণিত প্রতীকী শেকল। এই প্রতিযোগিতাগুলোকে নারীর মর্যাদা ও প্রতিভার উদযাপন হিসেবে দেখা হলেও আধুনিক সমাজ ও নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে এর ভূমিকা গভীর প্রশ্নের মুখে। আমার মতে, এ প্রতিযোগিতাগুলো নারীর জন্য অবমাননাকর এবং সমাজকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। সাম্প্রতিক মিস ইউনিভার্স প্রতিযোগিতা আবারো সেই পুরনো প্রশ্নগুলোকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে—সুন্দর বলতে আমরা আসলে কী বুঝি? আর কে ঠিক করবে তার মানদণ্ড?
‘বিউটি উইথ ব্রেইন’ কথাটি নিয়ে বরাবরই আমার ভীষণ আপত্তি। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি প্রশংসামূলক, সম্মানসূচক বাক্য হলেও আমাদের উচিত আরো গভীরে ভেবে দেখা। ভাবলেই আমাদের চোখে পড়ত এই শব্দযুগলের মধ্য নারীর গোপন অবমাননা, এক অদৃশ্য তিরস্কার, এক পুরনো মনোভাবের আশ্লেষ। এ শব্দগুচ্ছ আসলে ধরে নেয়—নারী যদি সুন্দর হয়, তবে সে বুদ্ধিমান হওয়ার যোগ্যতা রাখে না; যদি সে বুদ্ধিমতী হয়, তবে তার সুন্দর হওয়ার কথা নয়। যেন দুটি গুণ একসঙ্গে থাকা বিস্ময়ের ব্যাপার। আর সেজন্যই বিশেষভাবে কথাটি ব্যবহার করা হয়। সৌন্দর্য আর বুদ্ধির এ কৃত্রিম দ্বন্দ্ব নারীর ওপর চাপিয়ে দেয়া—যেন নারীকে আলাদা করে দেখাতে হবে আমি সুন্দর হলেও বুদ্ধিমতী।
পুরুষের ক্ষেত্রে কি আমরা কখনো ব্যবহার করি ‘হ্যান্ডসাম উইথ ব্রেইন’? না বললে কেন বলি না? কারণ আমরা ধরে নিই পুরুষ স্বাভাবিকভাবেই বুদ্ধিমান, তার বাহ্যিক রূপ তার সক্ষমতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে? সেই পুরনো পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিই এখানে মাথা তোলে—নারীর সৌন্দর্যই তার পরিচয়ের মুখ্য অঙ্গ; বুদ্ধি যেন দ্বিতীয় শ্রেণীর ব্যাপার, বুদ্ধি থাকাটা যেন উপরি পাওনা। বিশ্বের সৌন্দর্য প্রতিযোগিতাগুলোয় এ বিশেষণাত্মক বাক্যাংশের ব্যবহার বেশি। কারণ প্রতিযোগিতা নিজেই নারীর সৌন্দর্যকে সামনে এনে পরে দাবি করে বুদ্ধিমত্তা। যেন বুদ্ধিমত্তা হলো সৌন্দর্যের পরিপূরক, আর সৌন্দর্যই মুখ্য। অথচ নারী-পুরুষ কারোর ক্ষেত্রেই একটির সঙ্গে অন্যটির দ্বন্দ্ব বা সম্পর্ক নেই।
এটি সমাজের সেই পুরনো বিশ্বাসকে টিকিয়ে রাখে যেখানে নারীর পরিচয় প্রথমত সৌন্দর্যে, দ্বিতীয়ত বুদ্ধিতে। আমরা প্রতিযোগিতাগুলোর প্রক্রিয়ার দিকে তাকালেই তার প্রমাণ পাই। মিস ইউনিভার্স প্রতিযোগিতার ধাপগুলো লক্ষ করা যাক—জাতীয় প্রতিযোগিতা যেখানে সৌন্দর্যই প্রথমে আসে, তারপর বুদ্ধিমত্তার প্রশ্ন। তারপর প্রস্তুতি ও ক্যাম্পিং যেখানে চলে ফটোশুট, দাতব্য কাজ, সাক্ষাৎকার এবং ফ্যাশন শোর মতো নানা কার্যক্রম। এরপর আসে প্রিলিমিনারি প্রতিযোগিতা, সেমিফাইনাল; যেখানে থাকে সুইমস্যুট এবং ইভনিং গাউন রাউন্ড। সবশেষে চূড়ান্ত পর্ব ও বিজয়ী ঘোষণা, এই ধাপে সাধারণত থাকে ইভনিং গাউন রাউন্ড, প্রশ্নোত্তর পর্ব যেখানে প্রতিযোগীদের বুদ্ধিমত্তা এবং সামাজিক বিষয়ে তাদের সচেতনতা যাচাই করার জন্য প্রশ্ন করা হয়। বিচারকদের বিশ্লেষণের পর বিজয়ীর মাথায় ওঠে মুকুট। পুরো প্রক্রিয়াটায় সবশেষে আসে বুদ্ধিমত্তা।
এবার দেখা যাক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের যোগ্যতা—প্রতিযোগীকে কমপক্ষে ১৮ বছর বয়সী হতে হবে। আগের নিয়মানুযায়ী সর্বোচ্চ বয়সের সীমা ছিল ২৭ বা ২৮ বছর এবং অবিবাহিত নারীরাই অংশ নিতে পারতেন। তবে ২০২৩ সালের কিছু নিয়ম সংশোধনের পর থেকে বিবাহিত নারী এবং মা উভয়েই এ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেন, সেই সঙ্গে বাতিল করা হয়েছে সর্বোচ্চ বয়সের সীমা। শারীরিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি, আত্মবিশ্বাস, বুদ্ধিমত্তা, ব্যক্তিত্ব, যোগাযোগের দক্ষতা, উপস্থাপনার কৌশল এবং সামাজিক বিষয়ে তার সচেতনতা মূল্যায়ন করা হয়। সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছিল কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে। অবশ্যই সাধুবাদ জানানোর মতো পদক্ষেপ। আধুনিক সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার সূচনা হয়েছিল ১৮ শতকের শেষদিকে। মূলধারার সৌন্দর্য প্রতিযোগিতাগুলোয় প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের অংশ নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয় ১৯৭০-এর দশক থেকে। এর আগে স্পষ্টভাবেই শুধু শ্বেতাঙ্গ" নারীরা অংশ নিতে পারবে এমন নিয়ম ছিল। তবে এখানেই যে বৈষম্য শেষ হয়েছে তা কি আমরা বলতে পারি? ধরুন গ্রানাডা, নাইজেরিয়া বা আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গ নয়, একজন বাংলাদেশী যার গায়ের রং কালো সে কি সুযোগ পাবে? পরিবর্তনটা অনেকটা ফেয়ার অ্যান্ড লাভলীর গ্লো অ্যান্ড লাভলী হওয়ার মতো।
গায়ের রঙ এবার সরিয়ে রাখা যাক, একজন কম উচ্চতার নারী, একজন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী নারী বা একজন বিশেষ যোগ্যতাসম্পন্ন নারীকে কখনো দেখেন এই প্রতিযোগিতাগুলোয়?
সৌন্দর্য প্রতিযোগিতাগুলোয় নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তুলতে আশ্রয় নিতে হয় ক্রাশ ডায়েট এবং কৃত্রিম সাজসজ্জার। বিচার করা হয়—ত্বক কত নিখুঁত, উচ্চতা কত, গড়ন কত নির্দিষ্ট ছাঁচে ঢেলে সাজানো, হাঁটায় কতটা সাবলিল, ভঙ্গিমা কতটা আবেদনময়ী, যা বার্তা দেয় যে একজন নারী কেবল তখনই ‘সুন্দর’ যখন সে সমাজের চাপিয়ে দেয়া একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে নিজেকে ফেলে। বিচারকদের সামনে যখন সৌন্দর্যদের নম্বর দেয়া হয়, তখন তারা আসলে বিক্রয়ের জন্য প্রস্তুত একটি পণ্যের মতো বিবেচিত হন। এর মাধ্যমে নারী সমাজের চোখে নিছক ভোগের বস্তুতে পরিণত হন।
সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার নানা পর্যায়ের এ বিচার কি নারীর ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধি, সৃজনশীলতা বা শক্তিকে মানতে শেখায়? না, বরং নারীর অস্তিত্বকে সীমাবদ্ধ করে ফেলে বাহ্যিক রূপের নির্দিষ্ট এক পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোয়। নারীর বুদ্ধিমত্তা, প্রতিভা, শিক্ষা বা সামাজিক অবদানকে গৌণ করে তার পোশাক, হাসি, হাঁটাচলা এবং শারীরিক গঠনকেই মুখ্য করে তোলে।
এ প্রতিযোগিতার শিকড়েই আছে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে নারীর অস্তিত্বকে দীর্ঘদিন ধরে দেখা হয়েছে প্রদর্শনযোগ্য বস্তু হিসেবে, আকর্ষণের কেন্দ্র হিসেবে। সেই প্রাচীন মনোভাব আজও নতুন রূপে ফিরে আসে ঝলমলে মঞ্চে—গ্ল্যামারের মোড়কে, ব্র্যান্ডেড স্পনসরের চমকে, আর করতালির গর্জনে।
যখন একটি সমাজ নারীর সৌন্দর্যকে প্রতিযোগিতায় মেপে দেখে, তখন সে আসলে নারীর বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করে। ছোট মেয়েরা বড় হয় এ ধারণা নিয়ে যে সুন্দর না হলে তারা যথেষ্ট নয়। তাদের আত্মপরিচয় হারাতে থাকে সাজগোজের চাপ, ত্বকের রঙ বদলের কৌশল, আকর্ষণীয় হওয়ার দুশ্চিন্তায়। আর সে কারণেই বলিউডের গুণী অভিনয়শিল্পী কাজল থেকে শিল্পা শেঠি গায়ের রঙ ফর্সা করার ট্রিটমেন্ট করায়। শ্রীদেবী থেকে শুরু করে প্রিয়াংকা চোপড়া, অনুষ্কা শর্মা, আয়েশা টাকিয়া, হালের জাহ্নবী কাপুর সার্জারি, ফিলার, বোটক্স এমনকি ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্ট করায়। এই দৌড়ে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশের নায়িকা, মডেল, ইনফ্লুয়েন্সাররাও।
বিশ্বের নামি দামি ব্র্যান্ডের মডেল, ফ্যাশন শোর মডেলরা নিজেদের আবেদনময়ী করে উপস্থাপন করতেই বেছে নেয় ক্রাশ ডায়েটের মতো পথ। আর সেই পথে লুইসেল রামোস, ইলিয়ানা রামোস, আনা ক্যারোলিনা রেস্টন, ইজাবেল কারো’র মতো ঝরে যায় কত প্রাণ। এ ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি করে নারীর সঙ্গে নারীর প্রতি প্রতিদ্বন্দ্বিতা। অথচ নারীর আসল সংগ্রাম তো পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর বিরুদ্ধে।
আজকাল প্রতিটি সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলে। তারা বলে— নারী মুক্তির কথা, স্বাধীনতার কথা। বলে—নারীরা নেতৃত্ব দেবে, সমাজ বদলাবে, পরিবর্তনের শিখা জ্বালাবে। কিন্তু বাস্তবে কী হয়? এই প্রতযোগিতাই ঠিক করে দেয় নারীর দেহের গড়ন, চলন-বলন, হাসির পরিমাপ।
সৌন্দর্য কখনই এক রকম নয়। তার কোনো স্থির সংজ্ঞা নেই, নেই কোনো একমাত্রিক মানদণ্ড। সৌন্দর্য হতে পারে চিন্তায়, আচরণে, বৈচিত্র্যে, অসম্পূর্ণতার মধ্যেও। তবু সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় সৌন্দর্য দাঁড়ায় নির্দিষ্ট উচ্চতা, ওজন, গায়ের রঙ, পোশাক, সাজ, আর প্রশিক্ষিত হাসির মানদণ্ডে। এ প্রতিযোগীরা যেন মানুষ নয়, বরং এক নিখুঁত পুতুল।
শাকিলা জেরিন: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, বণিক বার্তা










