বিশ্ব অর্থনীতি গত দশকে ঋণবিষয়ক এক ধরনের অবিচলিত অভিজ্ঞতা অর্জনের মধ্য দিয়েই গেছে। এর ধারাবাহিকতায় বর্তমানে ঋণের পরিমাণ বৈশ্বিক জিডিপির ২৩০ শতাংশ। তাছাড়া ঋণের বিগত তিনটি আন্দোলিত প্রবাহ বিশ্বজুড়েই মন্দার কারণ হয়ে এসেছিল।

প্রথম ঘটনাটি ঘটে ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে। এক দশক ধরে নিম্ন ঋণ খরচ সরকারগুলোকে ব্যালান্স শিট সম্প্রসারণে বাধ্য করে, সুদের হার বাড়তে শুরু করে এবং ঋণ পরিষেবাকে ক্রমে অস্থিতিশীল করে তোলে। প্রথম আঘাতটি আসে মেক্সিকোর ওপর। ১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে দেশটি আর্জি জানায়, তারা ঋণ পরিশোধে অক্ষম। তবে বিষয়টি এখানেই থেমে থাকেনি। কেননা এ ধরনের কার্যকারণের একটি ডমিনো ইফেক্ট বা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়তে থাকা প্রভাব বিদ্যমান। আর তারই জের ধরে লাতিন আমেরিকার ১৬টি রাষ্ট্রসহ কমপক্ষে ১১টি উন্নয়নশীল দেশ তাদের ঋণ পুনঃতফসিল করতে বাধ্য হয়।

১৯৯০-এর দশকে সুদের হার আবারো কমতে থাকে এবং বৈশ্বিক ঋণ আরো একবার বিশাল তরঙ্গের আকার ধারণ করে। বিপর্যয়ের সূচনা হয় ১৯৯৭ সালে, যখন দ্রুত বর্ধনশীল কিন্তু আর্থিকভাবে দুর্বল পূর্ব এশীয় অর্থনীতিগুলোকে—যার মধ্যে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও থাইল্যান্ড—তীব্র প্রবৃদ্ধি মন্দা এবং বিনিময় হার হ্রাসের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। প্রভাবটি বিশ্বব্যাপীই অনুরণিত হয়েছিল।

তবে এ ধরনের বিপর্যয়ে উদীয়মান অর্থনীতিগুলোই যে শুধু দুর্বল হয়ে পড়ে তা নয়, ২০০৮ সালে আমেরিকার সাব-প্রাইম মর্টগেজ ক্রাইসিস (উচ্চসুদে বন্ধক সংকট) যার প্রমাণ। লোকেরা ‘সাবপ্রাইম’-এর মানে বোঝার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ব্যাংক লেম্যান ব্রাদার্সের পতন ঘটে যায়, যা কিনা ১৯৩০-এর দশকের মহামন্দা-পরবর্তী বড় ধরনের সংকটের বার্তা প্রদান করে।

বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে চতুর্থতম ঋণ তরঙ্গ বিশ্বের প্রধান তিন অর্থনীতিকে সংকুচিত করবে। উদীয়মান যে অর্থনীতিগুলোর জিডিপি অনুপাতে ঋণ রেকর্ড পরিমাণ ১৭০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, তাদের অবস্থা আরো নাজুক হবে। অতীতে সুদের হার কমিয়ে ঋণের প্রবাহে আরো বেশি গতি যোগ করা হয়েছিল। তবে সুদের হার একবার বাড়তে শুরু করলে অনিবার্যভাবেই প্রিমিয়াম বেড়ে যায়, তাই এক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

এ ধরনের সংকটের কার্যকারণ ভালোভাবে বুঝে ওঠা সম্ভব হয় না। তবে মুদ্রা সংকটের রহস্যজনক উৎস এবং এগুলো কীভাবে অন্যান্য অর্থনীতিতে সঞ্চারিত হয়, এর ওপর স্টিফেন মরিস ও হুয়ায় সং সিনের ১৯৯৮ সালের গবেষণাটি তুলে ধরে যে একটি আর্থিক সুনামি মূল কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে গিয়েও ক্ষত তৈরি করতে পারে।

বিশ শতকের খ্যাতনামা ভারতীয় লেখক শিবরাম চক্রবর্তী তার রম্য গল্প ‘ঋণং কৃত্বা’য় বর্ণনা করেছেন কীভাবে অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে আর্থিক সমস্যার উৎসকে সম্পূর্ণ হাওয়া করে দেয়া যায়। গল্পটি ইংরেজিতে অনুবাদ করে আমি আমার “অ্যান ইকোনমিস্ট’স মিসলানি” গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করেছি, যেখানে উপায়ান্তর শিবরাম (গল্পের চরিত্র) তার স্কুলজীবনের বন্ধু হর্ষবর্ধনের কাছ থেকে ৫০০ টাকা ধার নিয়ে শনিবার অর্থ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসে। টাকাটা সে অন্য কোথাও খরচ করে (বাড়িওয়ালাকে বাড়িভাড়া বাবদ পরিশোধ করে)। শনিবার এলে শিবরামের সামনে আর কোনো উপায় থাকে না। হর্ষবর্ধনের দেনা পরিশোধ করতে সে তার স্কুলজীবনের আরেক বন্ধু গোবর্ধনের কাছে গিয়ে সমপরিমাণ অর্থ ধার চায় এবং তাকে আসছে বুধবার অর্থ পরিশোধের কথা দেয়। মূলত গোবর্ধনের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে সে হর্ষবর্ধনকে দিয়ে আসে। এদিকে বুধবার এলে শিবরাম আবার হর্ষবর্ধনের দ্বারস্থ হয়। আগেরবার সময়মতো অর্থ পরিশোধের দোহাই দিয়ে সে পুনরায় তার কাছ থেকে ধার করে।

এভাবে ধার ও দেনা শোধ করার প্রক্রিয়াটিকে সে এক রকম নিয়মে পরিণত করে তোলে। হর্ষবর্ধন আর গোবর্ধনের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে তাদেরই দিতে থাকে। একদিন চলতি পথে একত্রে দুজনের সঙ্গে দেখা হয় শিবরামের। দ্বিধায় পড়ে যায় সে। কয়েক মুহূর্ত চিন্তার পর দ্বিধা কাটিয়ে উঠে সে একটা বুদ্ধি বের করে। সে বলে, ভাই গোবর্ধন, তুমি প্রতি বুধবার হর্ষবর্ধনকে ৫০০ টাকা দেবে। আর হর্ষবর্ধন, তুমি প্রতি শনিবার গোবর্ধনকে ৫০০ টাকা দেবে। হতভম্ব হর্ষবর্ধন যখন প্রশ্ন করে যে সে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। তখন শিবরাম বলে, ‘ব্যাপার এই যে, ব্যাপারটা আমি একেবারে মিটিয়ে ফেলতে চাই। তোমাদের দুজনের মধ্যে আমি আর থাকতে চাই না।’ এভাবে শিবরাম তার স্কুলজীবনের বন্ধুদের আশ্বস্ত করে যে তারা যদি একে অন্যকে দিনক্ষণ অনুযায়ী অর্থটা পরিশোধ করতে থাকে তাহলে তাদের কোনো কিছুর পরিবর্তন হবে না ঠিকই, তবে এতে তার অনেকটা সময় বেঁচে যাবে। এভাবে দেনা পরিশোধের দায় অন্যের কাঁধে চাপিয়ে শিবরাম একসময় কলকাতার ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যায়। 

এ পর্যায়ে বর্তমানের ধেয়ে আসা ঋণ পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য হর্ষবর্ধন ও গোবর্ধন কারা? বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুসারে, সম্প্রসারিত আর্থিক ব্যালান্স শিট আর বিশাল দায়গ্রস্ত জনসংখ্যা নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল যেকোনো দেশই তা হতে পারে।

এমন অনেক দেশ আছে, যারা উল্লেখ্য বিবরণটির সঙ্গে খাপ খায় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ধাবমান চতুর্থ ঋণ তরঙ্গের বিপরীতে বলির পাঁঠা হওয়ার ঝুঁকিতে থেকে যায়। উন্নত অর্থনীতিগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্য এ ঝুঁকিতে পড়ার অন্যতম সুস্পষ্ট প্রার্থী। ২০১৯ সালে দেশটি কোনো রকমভাবে মন্দা এড়াতে সক্ষম হয়েছে—শূন্য সংখ্যা থেকে অপেক্ষাকৃত একটা ধাপ ওপরে অর্জিত প্রবৃদ্ধি নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে তাদের—যা কিনা ১৯৪৫ সালের পর মন্দাহীন সময়ের মধ্যে দেশটির সবচেয়ে দুর্বল প্রবৃদ্ধি। তাছাড়া দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে থাকছে না। ব্রিটেনের রক্ষণশীলরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে ব্যবসায়িক বিনিয়োগের রীতিমতো ‘জোরালো প্রবাহ’ সৃষ্টি করা হবে। যা অসম্ভব, কেননা তারা যদিওবা জোরালো ঢেউ সৃষ্টিতে সফল হয়, সেক্ষেত্রে তা কেবল ঋণের জোরালো প্রবাহই হবে।

অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির মধ্যে ভারত বিশেষভাবে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। ১৯৮০-এর দশকে ভারতের অর্থনীতি মোটামুটি নিরাপদ অবস্থায় ছিল, তাই সে সময়ের ঋণপ্রবাহ দেশটির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারেনি। ১৯৯৭ সালে পূর্ব এশীয় সংকটের সময়ে ভারত অর্থনৈতিকভাবে বিকশিত হতে শুরু করার ফলে প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে কিছুটা মন্দার সম্মুখীন হতে হয়। তবে ২০০৮ সালের আন্দোলিত ঋণপ্রবাহের সময় বৈশ্বিকভাবে দেশটির অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ফলে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদিও সে সময় ভারত অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ছিল এবং বার্ষিক প্রায় ১০ শতাংশ হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের ফলে বছর খানেকের মধ্যেই প্রভাবটি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়।

৩০ বছরের মধ্যে বর্তমানে ভারতের অর্থনীতি সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি; প্রবৃদ্ধি দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে, ৪৫ বছরের মধ্যে বর্তমানে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি, গত ছয় বছরে রফতানি প্রবৃদ্ধি শূন্যের কাছাকাছি এবং গত পাঁচ বছর কৃষি খাতে মাথাপিছু ভোগের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি কমেছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে একটি গভীর মেরুকৃত রাজনৈতিক পরিবেশ। বিনিয়োগকারীদের আস্থা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। এতে অবশ্য অবাক হওয়ার কিছু নেই।

ধেয়ে আসা ঋণ সুনামির বিপরীতে প্রতিরক্ষা দেয়াল তৈরির জন্য এখনো খানিকটা সময় রয়েছে। যদিও ভারতের চলমান রাজনৈতিক সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য সময় লাগবে। তবে ১ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় বাজেট পেশের ক্ষণটি ছিল তাদের জন্য মোক্ষম সুযোগ। রাজস্ব ঘাটতি মধ্যমেয়াদের মধ্যে নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি, তবে অর্থের মাধ্যমে অবকাঠামো ও বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারের এখন সম্প্রসারণমূলক আর্থিক নীতি গ্রহণ করাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সঠিকভাবে পরিচালনার মাধ্যমে যা মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বৃদ্ধি না করে চাহিদা বাড়াতে পারে এবং ধেয়ে আসা ঋণ তরঙ্গ সহ্য করার জন্য অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে।

দেশের নেতৃত্ব পর্যায়ের ব্যক্তিদের অবশ্যই সুযোগটি কাজে লাগাতে হবে। অন্যথায় বিপর্যয়ের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

 

কৌশিক বসু: কর্নেল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও ভারত সরকারের সাবেক প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস