দেশে করোনা পরিস্থিতি অবনতিশীল। প্রতিদিন মৃত্যু ও আক্রান্ত বাড়ছে। এ অবস্থার মধ্যেও আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে নয়দিনের জন্য বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে। শর্তসাপেক্ষে অনুমতিও দেয়া হয়েছে সরাসরি পশুর হাট বসার। সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখিতার প্রেক্ষাপটে গৃহীত সরকারি সিদ্ধান্তের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি। তারা কোরবানির পশুর হাট বন্ধ রেখে প্রয়োজনে ডিজিটাল হাট পরিচালনার ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে কঠোর বিধিনিষেধ আরো ১৪ দিন বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। গত বছর পশুর হাট বসায় সংক্রমণ বেড়ে গিয়েছিল। তা নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ সময় লেগেছিল। কাজেই সংশ্লিষ্ট কমিটি যে পশুর হাট ঘিরে সংক্রমণে অতি উল্লম্ফনের আশঙ্কা করছে, সেটি যথার্থ। তাদের উদ্বেগ আমলে নেয়া জরুরি।
গত দেড় বছরের অধিক সময় থেকে দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব চলছে। এ সময় নানা অভিজ্ঞতা অর্জন হয়েছে আমাদের। অনলাইন পরিকাঠামোর সুবাদে অনেক কাজই ডিজিটাল উপায়ে সম্পাদন করা সম্ভব হচ্ছে। কোরবানির পশুর হাটের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটা সত্য। বিশেষ করে বর্তমান পরিস্থিতিতে ভার্চুয়াল পশুর হাট একটা ভালো বিকল্প ব্যবস্থা হতে পারত। গত বছর থেকেই বেশকিছু উদ্যোক্তা অনলাইনে কোরবানির পশু বিক্রির উদ্যোগ গ্রহণ করছেন। এবার এর পরিসর আরো বেড়েছে। নতুন নতুন উদ্যোক্তা এ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, তথ্য ও যোগাযোগ বিভাগ ও ই-ক্যাবের যৌথ উদ্যোগে একটি ডিজিটাল হাট প্লাটফর্ম গড়ে তোলা হয়েছে। এর আওতায় সারা দেশের ২৪১টি ডিজিটাল হাট যুক্ত করা হয়েছে। তদুপরি আছে জেলাভিত্তিক অ্যাপ, ফেসবুক পাতা ও বিভিন্ন অনলাইন সাইটের মাধ্যমে পশু কেনা-বেচার সুযোগ। সুতরাং সরাসরি হাট ছাড়াই দেশের সর্বত্রই ডিজিটাল উপায়ে সুন্দরভাবে কোরবানির পশু কেনা-বেচা করা সহজেই সম্ভব। দুঃখজনকভাবে এ সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পশুর হাট বসার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে বৈকি।
গত বছরও কভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি বিশেষত ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামসহ উচ্চ সংক্রমণ এলাকায় পশুর হাট না বসানোর সুপারিশ করেছিল। তাদের সুপারিশ আমলে নেয়া হয়নি। তার ফল হয়েছিল বিপর্যয়কর। আকস্মিকভাবে সংক্রমণ অনেক বেড়ে গিয়েছিল। পশুর হাট বসলে এবারও একই আশঙ্কা করছেন তারা। এটা গভীরভাবে বিবেচনায় রাখা দরকার। এবার পশুর হাট বসানোর পক্ষে নয় সংশ্লিষ্ট কমিটি। নিতান্ত প্রয়োজন হলে সীমিত পরিসরে শহর এলাকার বাইরে পশুর হাট বসার অনুমতি দেয়া যেতে পারে বলেছে তারা। এক্ষেত্রে উন্মুক্ত স্থান বেছে নেয়ার তাগিদ দিয়েছে তারা। একই সঙ্গে বয়স্ক ব্যক্তি ও অন্য কোনো আক্রান্ত ব্যক্তির কোরবানির হাটে না যাওয়া, হাটে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য নির্দিষ্টভাবে আলাদা পথ রাখা, বাজারে আসা সবার মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করার পরামর্শ দিয়েছে। তাদের পরামর্শ আমলে নিতে এবং স্বাস্থ্যবিধির কঠোর পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে।
জর্ডান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো কভিড পরিস্থিতিতে কোরবানির পশু বেচা-কেনা পুরোপুরি অনলাইনে রূপান্তর ঘটিয়েছে। ভারতও তা-ই করছে। এমনকি পাকিস্তানেও সরাসরি পশুর হাট নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। অনলাইনে পশু কেনা-বেচার ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে সেখানে। আমাদের দেশেও এ সুযোগ আছে। অনেকেই এখন অনলাইনে কোরবানির পশু কিনছে। অনলাইনে কোরবানির উপযুক্ত পশুর স্থিরচিত্র বা ভিডিও দেখে পশুর দাম, বয়স, ওজন ইত্যাদি সম্পর্কে জানছে। এমএফএসসহ বিদ্যমান লেনদেন ব্যবস্থাগুলোর মাধ্যমে সহজেই পশুর দাম পরিশোধ করছে। ফরমায়েশ অনুসারে ক্রয়কৃত পশু পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে যথাস্থানে। ঝামেলা কম, স্বাস্থ্যঝুঁকিও নেই। সংগত কারণে সরকারও এটি উৎসাহিত করছে। কিন্তু ভার্চুয়াল হাটের ব্যাপারে জনসাধারণের আগ্রহ এখনো খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। মানুষ সরাসরি পশু কিনতেই অভ্যস্ত বেশি। মূলত সনাতনী মানসিকতাই এক্ষেত্রে প্রধান কারণ। এটা হতাশাজনক।
সন্দেহ নেই, গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে কোরবানির পশুর হাটের একটা যোগসূত্র আছে। দেশের চামড়া শিল্পও অনেকটা নির্ভরশীল এর ওপর। পশু কোরবানি কম হলে একদিকে খামারিরাও লোকসানে পড়বেন, তেমনি চামড়া শিল্পেও কাঁচা চামড়ার সংকট দেখা দেবে। এটা নিশ্চয়ই একটা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা। কিন্তু যেভাবে পশুর হাট বসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে, তাতে শেষ পর্যন্ত অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে, জনস্বাস্থ্যও হুমকিতে পড়বে। তাই আগের ভুলের পুনরাবৃত্তি মোটেই কাম্য নয়।
নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে এরই মধ্যে যেসব কার্যক্রম গৃহীত হয়েছে, তার কোনোটাই আমরা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেনি। সুতরাং কোরবানির পশুর হাট ঘিরে সংক্রমণ বাড়ার যে আশঙ্কা আছে, তা অস্বীকারের উপায় নেই। এ অনলাইনভিত্তিক হাটকে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। এখনো সময় আছে অনলাইন বাজার শক্তিশালী করার। এটা আমাদের জন্য বড় সুযোগও বটে। বস্তুত অনলাইনে কোরবানির পশু ক্রয়-বিক্রয়ের হার যত বাড়বে, মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও তত কমবে। কাজেই জাতীয় কারিগরি পরামর্শ কমিটির সুপারিশ মেনে সরকার যথাযথ ব্যবস্থা নেবে বলে প্রত্যাশা।










