চলতি মাসে অর্থমন্ত্রী ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট জাতীয় সংসদে পেশ করেছেন। কভিড-১৯ মহামারীর স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব দেশের এক বছরের বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রস্তুতকৃত এটিই প্রথম বাজেট। অধিকাংশ দেশের সঙ্গে সংগতি রেখে এটিই বিপুল ঘাটতির বাজেট। বাজেটের বিস্তারিত বিষয়গুলো আগেই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। ফলে বাজেট-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে মানুষের আগ্রহ-উদ্দীপনা কিছুটা কম বলে মনে হয় ।

এবার ৬ দশমিক শূন্য ৪ ট্রিলিয়ন টাকা ব্যয়ের এবং ৩ দশমিক ৯২ ট্রিলিয়ন টাকা রাজস্ব আয়ের একটি বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যয় আগের অর্থবছরের তুলনায় ৬ দশমিক ২৮ শতাংশ বেশি এবং প্রস্তাবিত রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ১ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। অর্থমন্ত্রী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের চেয়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১১ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেশি রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন। আগের বছরের তুলনায় পরবর্তী বাজেটের ব্যয় সচারচার ১৫ শতাংশের বেশি নির্ধারণ করা হয়ে আসা হচ্ছিল। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব ও ব্যয় কম হারে বাড়ানোর বিষয়টি ২০২১-২২ অর্থবছরের অর্থনীতির সক্ষমতা সম্পর্কে অর্থমন্ত্রীর প্রত্যাশা ও আগের অর্থবছরগুলোয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে না পারার প্রতিফলন হতে পারে। 

অর্থমন্ত্রী বাজেট প্রস্তাব পড়ে শোনানোর পর পরই সাধারণত যে প্রশ্নটি তাকে করা হয় তা হলো, এ বাজেট বাস্তবসম্মত নাকি উচ্চাকাঙ্ক্ষী? যেহেতু এসব শব্দের একক কোনো সংজ্ঞা নেই, সেহেতু অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক এড়াতে এগুলোর স্পস্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করে নেয়াই ভালো। আলোচনার সুবিধার জন্য মহামারীকালীন অর্থনৈতিক পদক্ষেপ ও বরাদ্দর যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন না টেনে কেবল বাস্তবায়ন সম্ভাবনার দিক থেকে বাজেটের বাস্তবতা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী ধারণার বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। এটি বিভিন্ন দিকে আলোচনা ছড়িয়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে সহায়ক হবে। 

সরকার যদি দেখাতে পারে বাজেট পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়নের বিষয়টি তার সক্ষমতার মধ্যে আছে, তাহলে এটি বাস্তবসম্মত মনে হওয়া যুক্তিসংগত হতে পারে। কোনো বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের সামর্থ্য নির্ভর করে তার সার্বিক প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর। যেহেতু এটি পরিমাপ করা যায় না, সেহেতু বিগত বছরগুলোয় সরকার বাজেট কতটা বাস্তবায়ন করেছে, তার ভিত্তিতেই আমরা বর্তমান সক্ষমতা অনুমান করতে পারি। সরকারের মতো বড় প্রতিষ্ঠান স্বল্প সময়ের মধ্যে নাটকীয়ভাবে সক্ষমতা বাড়াতে পারে না। সক্ষমতা গড়ে তুলতে দীর্ঘ সময় ধরে সঠিক প্রচেষ্টা ও কাজ, বিশেষ করে মানব পুঁজি গঠনে ধারাবাহিক বিনিয়োগ করতে হয়। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে মানব পুঁজিতে সর্বনিম্ন বিনিয়োগ দিয়ে বাংলাদেশের সরকারের সক্ষমতা বাড়বে, এমনটা আশা করা যায় না।


২০০৯ থেকে ২০২০ অর্থবছর পর্যন্ত বাজেটে প্রাক্কলিত ব্যয় ও রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রকৃত হার রেখাচিত্রের মাধ্যমে একটি ভিজুয়াল রিপ্রেজেন্টেশন দেয়া হয়েছে। সংসদে পাস হওয়া বাজেটে রাজস্বের মূল প্রাক্কলনের অনুপাত হিসেবে সরকার আসলে কতটা রাজস্ব আহরণ করতে পেরেছে, ভাঙা রেখাটির মাধ্যমে সেটি প্রকাশ পেয়েছে। আর নিরেট রেখাগুলোয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিবেদনে বর্ণিত এবং বাজেটে বর্ণিত প্রকৃত ব্যয়ের অনুপাত দেখানো হয়েছে। এসব অনুপাতকে রাজস্ব আহরণ ও ব্যয়ের দিক থেকে সরকারে সক্ষমতার নির্দেশক হিসেবে দেখা যেতে পারে। একের কম অনুপাত বার্তা দেয় যে বাজেট পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়নে সরকারের যথেষ্ট সক্ষমতা নেই।

আলোচ্য রেখাচিত্রে দেখা যায়, ২০১৭ অর্থবছরে কিছুটা ঊর্ধ্বমুখি হলেও রাজস্ব অনুপাত ২০১১ সালের ৯৭ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০২০ সালে ৭৫ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে ব্যয় অনুপাত ২০১১ সালে ৯৭ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। তারপর ২০১৫ সালে সেটি ৭৮ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছিল। এর পর থেকে তা ৮০ শতাংশের কাছাকাছি থেকেছে। তথ্য-উপাত্ত বলছে সরকারের বাজেট বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও দক্ষতা ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে ধারাবাহিকভাবে কমেছে। এটি সরকারের উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ বা প্রচেষ্টায় শিথিলতা কিংবা উভয় কারণেই হতে পারে। 

আগামী অর্থবছরে এ অবস্থার খুব একটা উন্নয়ন ঘটবে বলে মনে হয় না। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে লক্ষ্যমাত্রার ৫৮ দশমিক ২ শতাংশ রাজস্ব আহরণ হয়েছে। পুরো বছর এ হারে রাজস্ব আহরণ হলে তা গত অর্থবছরের চেয়ে খুব একটা ভালো হবে না। অন্যদিকে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত সরকার ৪০ শতাংশেরও কম এডিপি বাস্তবায়ন করতে পেরেছে। যদিও অর্থবছরের শেষের দিকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা আছে। অতীত প্রবণতা বলে যে বর্তমান অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ৮০ শতাংশের উপরে হবে না। রেখাচিত্রের রেখাগুলো স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে সরকার রাজস্ব আহরণ বা উন্নয়ন ব্যয় কোনোটাই পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়নে সক্ষমতা দেখাতে পারেনি।

গত কয়েক বছরের প্রকৃত রাজস্ব আহরণ ও সরকারি ব্যয়ের প্রবণতা দেখে মনে হয় যে ২০২১-২২ অর্থবছরেও সরকারের রাজস্ব আহরণ ও ব্যয় উভয়ই গত কয়েক বছরের কাছাকাছি হবে। ফলে উল্লিখিত মানদণ্ডগুলোর ভিত্তিতে উপসংহার টানা যায় যে সাম্প্রতিক বাজেটগুলো বাস্তবসম্মত হয়নি। সম্ভবত অধিকাংশ ভাষ্যকার এ কারণেই বাজেট বাস্তবসম্মত কিনা সে প্রশ্ন তুলছেন।

উচ্চাকাঙ্ক্ষী শব্দটা সাধারণত স্বাভাবিক সক্ষমতার চূড়ান্ত বা তার বাইরে লক্ষ্য স্থির করাকে বোঝায়। আপাতভাবে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবসম্মত নয়। যৌক্তিক কারণেই বাজেটের পুরোপুরি বাস্তবায়ন সরকারের প্রদর্শিত সক্ষমতার বাইরে। কাজেই এটিকে উচ্চাকাঙ্ক্ষী বলা যেতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, বাজেট পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়নে গত দশকগুলোয় সরকারের অব্যাহত ব্যর্থতা— জনমনে এ ধারণা গভীরভাবে প্রোথিত করেছে যে বাজেটগুলো উচ্চাকাঙ্ক্ষী। 

প্রকৃত সক্ষমতা ও বাজেট পরিসংখ্যানের দিক থেকে বাস্তবায়ন সক্ষমতার সংজ্ঞায়ন বেশ যৌক্তিক মনে হতে পারে, তবে এটি বিষয়টিকে হালকা, এমনকি তুচ্ছও করে তুলতে পারে। একটি চমত্কার বাজেট বাস্তবায়নে শুধু রাজস্ব ও ব্যয় লক্ষ্যমাত্রাকে প্রকৃত সক্ষমতায় কমিয়ে আনলেই চলে। এটিই সম্ভবত ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে চেষ্টা করা হয়েছে কিংবা মহামারী তেমনটা করতে বাধ্য করেছে। দীর্ঘ সময় পর প্রথমবারের মতো ব্যয় ও রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা আগের বাজেটের তুলনায় কম নির্ধারণ করা হয়েছে, যেমনটা শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং পরবর্তী বছরে তেমন কোনো প্রচেষ্টা ছাড়াই বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের অধিক দক্ষতা প্রদর্শনের সম্ভাবনা রয়েছে। নিম্ন আকাঙ্ক্ষা বৃহত্তর বাস্তবায়নের বাস্তবতা তৈরি করে।

অনেকেই ৬ ট্রিলিয়ন টাকার প্রস্তাবিত বাজেটের আকার নিয়ে বিস্মিত। নামিক মূল্য অবশ্য প্রকৃত বা আপেক্ষিক মূল্যের ভালো সূচক নয় এবং সেটা আন্তঃপৌনিক বা আন্তঃদেশের তুলনার ক্ষেত্রে অনুপযোগী। প্রতিষ্ঠিত চর্চা হলো, তুলনার ক্ষেত্রে বাজেটের আকার এবং দেশের জিডিপির অনুপাত ব্যবহার করা। বাজেট উপস্থাপনের তথ্য থেকে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটের আকার জিডিপির ১৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ। এটি আগের দুই অর্থবছরের চেয়ে কম। আপাতভাবে মনে হচ্ছে আগামী অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রী তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ করেছেন।

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, রাজস্ব আহরণ ও ব্যয় পরিসংখ্যানগুলো অবশ্যই যথাযথ প্রেক্ষাপটের আলোকে বিশ্লেষণ করতে হবে। বাজেটে দেখানো মোট ব্যয় সব মন্ত্রণালয় ও সরকারি সব অফিস কর্তৃক উপস্থাপিত ব্যয়ের যোগফল, যা তারা পায় এবং খরচ করে। এটি সবারই জানা যে প্রকৃত ব্যয় ব্যাপকভাবে অতিরঞ্জিত। সরকারি অফিসে বেশি দামে পর্দা বা বালিশ কেনার মতো কেলেঙ্কারি এবং একই ধরনের অন্য ঘটনাগুলো জাতীয় দৈনিকের শিরোনাম হয়েছে। যেহেতু কেনাকাটায় এ ধরনের চর্চা প্রায় নিয়মিত, সেহেতু সরকারি ব্যয় লক্ষণীয়ভাবে অতি মূল্যায়িত।

অন্যদিকে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ সরকারি কোষাগারে প্রদর্শিত পরিমাণের চেয়ে বেশি অর্থ সরকারি কর্মচারিদের প্রদান করছে। সংবাদমাধ্যমে প্রবাদতুল্য তিতাস কিংবা পিডিবির অর্থ সংগ্রহকারীদের বিপুল বিত্ত-বৈভব-সম্পদ গড়ে তোলার খবর মেলে। তারা স্পষ্টত এটা করেছে গ্রাহকের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ কম দেখিয়ে এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারে কম অর্থ জমা দিয়ে। এভাবে জনগণের প্রদত্ত অনেক অর্থই প্রদর্শন করা হয় না। অতএব, বাজেটে দেখানো প্রকৃত রাজস্ব দেও অর্থের থেকে অনেক কম। এটি বিশেষভাবে এই অভিযোগের সঙ্গেও সম্পর্কিত যে দেশে কর-জিডিপি অনুপাত বেশ কম। ফলে তুলনামূলকভাবে ছোট বাজেটেও ঘাটতি থেকে যায়। এসব ঘাটতি কমানো যেতে পারে বা উদ্বৃত্তে পরিণত করা যেতে পারে, যদি রাজস্ব কম কমানো ও ব্যয় বেশি দেখানোর দুর্নীতিপ্রবণ চর্চাগুলো রোধ করা যায়। তেমনটি হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর এর প্রভাব হবে বিস্ময়কর।

 

এম এ তসলিম: অর্থনীতির অধ্যাপক, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ