বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি সম্প্রতি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অনিয়ম, অদক্ষতা, দুর্নীতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। বিপিসির তিনটি অর্থবছরের অনিষ্পন্ন নিরীক্ষা (অডিট) আপত্তির কথা উঠে এসেছে বৈঠকে, যাতে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম ধরা পড়ে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে দেশে ধারণক্ষমতার বেশি জ্বালানি তেল আমদানি করায় বাড়তি সময় জাহাজ ফ্লোটিং করে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। এতে বিপিসির ৫০ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। একই অর্থবছরে ব্যাংকে নিজস্ব তহবিল থাকা সত্ত্বেও ঋণ (ওভার ড্রাফট) নিয়ে কেনাকাটা করেছে, যাতে সুদ বাবদ প্রতিষ্ঠানের ২৪৮ কোটি ৯০ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। সংসদীয় কমিটির বৈঠকে যেসব বিষয় বেরিয়ে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাবসংক্রান্ত কমিটি হিসাবের গরমিলের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করলেও বিপিসির কাছ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। আরো অবাক হতে হয় যখন জানা যায়, দুদকের কথাও তারা শোনেনি। প্রশ্ন উঠছে, বিপিসি কি দেশের আইন ও বিধিবিধানের ঊর্ধ্বে? প্রতিষ্ঠানটির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন বহুদিনের। পরিস্থিতি উন্নয়নে বিপিসির উদাসীনতা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত সবাইকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

দেশে জ্বালানি তেল আমদানির একক কর্তৃত্ব বিপিসির। যদিও কয়েক বছর ধরে বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফানের্স অয়েল আমদানি করছে। ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেন ক্রয়-বিক্রয়ের পুরোটাই বিপিসি নিয়ন্ত্রিত। রাষ্ট্রীয় এ প্রতিষ্ঠানটি একচেটিয়া প্রভাব ব্যবহার করে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি করে চলেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তেল চুরি থেকে শুরু করে নানা আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত বিপিসি। একাধিক অডিট প্রতিবেদনে এটি উঠে এলেও কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, এমন খবর মেলে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অডিটসহ যেসব দুর্নীতি ও অনিয়মের খবর গণমাধ্যমে এসেছে তা ‘টিপ অব দ্য আইসবার্গ’। এ কারণে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক অডিট ফার্মকে দিয়ে বিপিসির পূর্ণাঙ্গ অডিট করার সুপারিশ করে আসছে। কিন্তু তাতে কর্ণপাত করা হয়নি। জমতে জমতে বিপিসির অনিয়ম-দুর্নীতি আজ পাহাড়সম হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার কিছু নমুনা সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটি দেখে স্তম্ভিত হয়েছে এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। এ কথা সত্য, বিপিসির অনিয়ম, দুর্নীতিসহ সিস্টেম লস কমিয়ে এনে দক্ষ প্রতিষ্ঠানে রূপ দেয়া গেলে জ্বালানি খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব। বিপিসির আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডিও। বিশ্ববাজারে যখন জ্বালানি তেলের দাম কম ছিল তখন দেশের ভেতরে বেশি দামে বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ লাভ করেছে বিপিসি। ২০১৫-২১ সাল পর্যন্ত সাত বছরে সংস্থাটি জ্বালানি তেল বিক্রি করে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে। এর মধ্যে ১০ হাজার কোটি টাকা সরকারকে দিয়েছে। বাকি ৩৬ হাজার কোটি টাকার হিসাব মিলছে না।

বিপিসির কর্মকর্তারা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে অনিয়মের সুযোগ নেই বলে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করেছেন। নতুন তেল পরিশোধনাগার প্রতিষ্ঠা না করা কিংবা তেল মজুদ রাখার সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা না করার কী যুক্তি থাকতে পারে? জাহাজ থেকে এখনো তেল খালাস করা হয় ম্যানুয়ালি। অন্যদিকে পাইপের মাধ্যমে তেল সরবরাহের উদ্যোগও অজ্ঞাত কারণে থেমে আছে। এতে প্রচুর তেল অপচয় হয়। নিরীক্ষণ কমিটির বৈঠকে কমিটি দুই মাসের মধ্যে নিরীক্ষা অধিদপ্তরে নথিপত্র দিতে বিপিসিকে নির্দেশনা দিয়েছিল, কিন্তু তারা কমিটিকে কোনো নথিপত্র সরবরাহ করেনি। একটি আপত্তিতে হিসাব ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর বলেছে, বিপিসির স্থিতিপত্রে (ব্যালান্স শিট) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পকে দেয়া ঋণের যে পরিমাণ দেখানো হয়েছে, তার সঙ্গে ওই সব প্রতিষ্ঠান বা প্রকল্পের স্থিতিপত্রে দেখানো অংকে ২ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকার গরমিল দেখা গেছে।

বিপিসি চেয়ারম্যানের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, উপরোক্ত সাত বছরের মুনাফার অর্থ থেকে তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে মোট ২০ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয়; সরকারকে লভ্যাংশ ও উদ্বৃত্ত তহবিল প্রদান; জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বকেয়া কর পরিশোধ এবং মূলধনি খাতে বিনিয়োগ। অবশ্য এর কোনোটিকেই নির্ভেজাল ব্যয় বলা যায় না। যেমন—সরকারকে লভ্যাংশ ও উদ্বৃত্ত তহবিল প্রদান; এনবিআরের বকেয়া কর পরিশোধ, এগুলো বিপিসির ব্যয় হলেও সরকারের আয়। মূলধনি খাতে বিনিয়োগও বিপিসির আয় বাড়ানোর সঙ্গে সম্পৃক্ত। একমাত্র উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করা অর্থকেই ব্যয় বলা যায়। যদিও এসব উন্নয়ন প্রকল্প বিপিসির কার্যক্রম উন্নত ও সুষ্ঠু করা এবং ব্যয় কমানোর সহায়ক হওয়ার কথা। কিন্তু সেটি হয়নি। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পেছনে যেসব যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে সেগুলো নিয়েও বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন রয়েছে। তারা বলছেন, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় মূল্যবৃদ্ধি করতে গণশুনানির আয়োজন করা প্রয়োজন। জনস্বার্থে বিপিসির সব তথ্য উন্মুক্ত করতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের তথ্য-উপাত্ত, আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা না থাকলে অন্যান্য খাতেও এর প্রভাব পড়ে। বিপিসি জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান। ফলে তার ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের।

বিপিসি বোধকরি দেশের বৃহত্তম সেক্টর করপোরেশন। আয়-ব্যয়, স্থিতি কিংবা কার্যপরিধি সব বিবেচনায়ই বড়। বিশেষ গুরুত্বপূর্ণও বটে। কিন্তু এর হিসাব-নিকাশের স্বচ্ছতা ও যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা দুঃখজনক। রাষ্ট্রীয় খাতের সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠানটির হিসাব-নিকাশে এ গুরুতর গরমিল কীভাবে হলো, অবিলম্বে তার ফয়সালা হওয়া প্রয়োজন। বিপিসির হিসাব-নিকাশের স্বচ্ছতা ও যথার্থতা নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে এবং আন্তর্জাতিক ঋণদানকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে আগেও আলোচনা হয়েছে। কয়েক বছর আগে একবার আন্তর্জাতিক কোনো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিপিসির প্রতিষ্ঠাকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত আয়-ব্যয় নিরীক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠেছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন উদ্যোগ দেখা যায়নি। ডিপো কর্মকর্তা ও তেল পরিমাপকারীকে টাকা দিয়ে তেলের পরিমাণ খাতা-কলমে সঠিক দেখানো হয়েছে। এভাবেই দিনের পর দিন চুরির উৎসব চালু রয়েছে বলে অভিযোগ আছে। এদিকে বিপিসির হিসাব ও অডিট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি জানিয়ে আসছে অর্থ মন্ত্রণালয়, কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) কার্যালয় ও আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলো। বিদেশী প্রতিষ্ঠান দিয়ে বিপিসির অডিট করানোর জন্য আইএমএফ সরকারকে চাপ দিলেও তা কাজে আসেনি। অর্থ বিভাগ ও জ্বালানি বিভাগও বিপিসিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বারবার তাগিদ দিলেও কোনো লাভ হয়নি, বরং বিপিসি নিজের খেয়ালখুশিমতোই চলছে। বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন হলেও তাতে স্বচ্ছতা নেই। সম্প্রতি লাভ-লোকসানের অস্বচ্ছ হিসাব দেখিয়ে হুট করে ডিজেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে বিপিসি। অথচ আইন অনুসারে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করার কথা, কিন্তু বিপিসি কখনই কমিশনের আওতায় আসেনি। মূলত হিসাবে স্বচ্ছতা নেই বলেই প্রতিষ্ঠানটি জনগণের সামনে শুনানিতে অংশ নিতে ভয় পায়।

বিপিসির সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে জনগণের কাছে জবাবদিহি করা অত্যাবশ্যক। কিন্তু সংসদীয় কমিটির ভাষ্য থেকে যা জানা যাচ্ছে, তা হলো সংস্থাটি জবাবদিহির বিষয়ে তেমন আগ্রহী নয়। নিজেদের আয় করা অর্থ কোথায়—কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে, সে বিষয়ে জনগণকে স্পষ্ট ধারণা দেয়া হয় না। এমনকি সংস্থাটির নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছেও তারা স্বচ্ছ হিসাব দিচ্ছে না, যা কাম্য নয়। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে এসব প্রতিষ্ঠানে যারা কাজ করেন, তারা প্রতিষ্ঠানের মালিক হতে পারেন না। তারা জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে থাকতে পারেন না। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন খাত পরিচালনায় বিভিন্ন সংস্থা বা করপোরেশন করা হয়েছে। এসব করপোরেশনের দায়িত্বে যারা ছিলেন বা আছেন, তাদের কারিগরি জ্ঞানে ঘাটতি রয়েছে। অতিরিক্ত সচিব হলেই করপোরেশনের চেয়ারম্যান হন। যখন করপোরেশনগুলো ঠিকমতো চলছিল না, তখন পুনর্গঠনের নামে কোম্পানি করে দেয়া হলো। যারা করপোরেশন চালাতেন, তারাই হয়ে গেলেন কোম্পানির হর্তাকর্তা। তাদেরই কোম্পানির মালিক বানিয়ে দেয়া হলো। এতে তো জনগণের কোনো লাভ হয়নি। সেবার মানও বাড়েনি, হয়রানিও কমেনি। ফলে ভোক্তারা দুদিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।