সংবিধানে অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থার কথা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পরও দেশে অসংখ্য গৃহহীন মানুষ রয়েছে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের অন্যতম অঙ্গীকার ছিল দেশের সব মানুষের জন্য মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করা। সে লক্ষ্যে মুজিব বর্ষ সামনে রেখে গৃহহীন ও ভূমিহীন মানুষকে ঘর প্রদানে পদক্ষেপ নেয় সরকার। এরই মধ্যে কয়েক দফায় বিপুলসংখ্যক গৃহহীনকে ঘর হস্তান্তর করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ তথা মুজিব বর্ষ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে গৃহহীন-ভূমিহীন মানুষের জন্য গৃহীত ও বাস্তবায়নাধীন এ কর্মসূচি সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ও মানবিক। সরকার সারা দেশে গৃহহীন ও ভূমিহীন মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে যেভাবে অসহায়ের মুখে হাসি ফুটিয়েছে, তার আনন্দের আমরাও সমান অংশীদার এবং এ উদ্যোগের সাফল্য প্রত্যাশা করছি। নিরাপদ বাসস্থানের সঙ্গে মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। যে পরিবারগুলো গৃহ পেল, তাদের কর্মক্ষম সদস্যদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত, শিশু ও বয়স্কদের শিক্ষার সুব্যবস্থার উদ্যোগও নিতে হবে। এতে উৎপাদন সক্ষমতাও বাড়বে এবং অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বাংলাদেশে নদীভাঙনসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বসতভিটা হারায় মানুষ। আবার শহরে এসে উচ্চমূল্যের ভাড়া বাসায় অনেকেই থাকতে পারে না বলে ফুটপাত ও বস্তিই তাদের ভরসা। আবাসন মানুষের মৌলিক চাহিদার অংশ হলেও নিঃস্ব মানুষ মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়ে যে নিরন্তর সংগ্রাম করছে, সেখানে সরকারের গৃহ ও জমি প্রদানের ব্যবস্থা শুধু সহায়কই নয়, জরুরিও বটে। করোনা দুর্যোগ ফের দারিদ্র্যের হার ঊর্ধ্বমুখী করেছে। দেশে নতুন দরিদ্রের সংখ্যা কত—এ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ যে দরিদ্র হয়ে পড়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। এ জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারের নানা রকম সহায়তামূলক কর্মসূচি চলমান বটে, কিন্তু চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের দামের উল্লম্ফন নেতিবাচক প্রভাবও ফেলেছে। এক্ষেত্রে গৃহহীন-ভূমিহীনদের পর্যায়ক্রমে গৃহ ও ভূমিদানে সরকারের ব্যাপক উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক প্রভাব রাখবে। নিকট অতীতে গৃহদান কর্মসূচি উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, একজন মানুষও যাতে গৃহহীন না থাকে, সেজন্য সারা বাংলাদেশের গৃহহীনদের নিরাপদ বাসস্থান তৈরি করে দেয়া হবে। সরকারপ্রধানের এ অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি যথাযথ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা জরুরি।

সরকার শুধু গ্রামের দরিদ্র্য নয়, স্বল্প আয়ের নাগরিকদের জন্য জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা অনুসারে সাশ্রয়ী মূল্যে নগর আবাসন নিশ্চিত করতে অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের কাজেও হাত দিয়েছে। এমনকি কোনো নাগরিকের যাতে বস্তিতে বসবাস করতে না হয়, সেজন্য সরকার বস্তিবাসীর জন্য ফ্ল্যাটও নির্মাণ করছে। আমরা প্রত্যাশা করি, সরকারের এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ে উপকারভোগীরা এর সুফল পাবেন। দেশের উন্নয়নের অংশ হিসেবেই গৃহহীনের আবাসনের বিষয়টি অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। তবে এসব প্রকল্পে একদিকে যেমন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুর্নীতি রোধ করা চাই, একই সঙ্গে উপকারভোগী বাছাইয়েও যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পের সুফল যেন প্রকৃত অসহায় দরিদ্র মানুষই পায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

পরিকল্পনা বাস্তবায়নের শুরুতে সুফল মিললেও অনেক ভালো উদ্যোগ পরবর্তী সময়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে বাধাগ্রস্ত হয়। সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের অধীনে অনেক ভালো কর্মসূচি নেয়া হলেও ত্রুটিপূর্ণ তালিকাসহ নানা কারণে সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। টেস্ট রিলিফ তথা ‘টিআর’ ও কাজের বিনিময়ে টাকা তথা ‘কাবিটা’ কর্মসূচি নেয়া হয়েছিল গ্রামবাংলার গরিব মানুষের কল্যাণে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, যেসব জনপ্রতিনিধির নামে এ দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নের অর্থ বরাদ্দ করা হতো, তাদের একাংশের সততার সংকট প্রকল্প দুটির স্বচ্ছতা সম্পর্কে বিড়ম্বনা সৃষ্টি করে। প্রধানমন্ত্রী টিআর ও কাবিটা প্রকল্পের বিশেষ বরাদ্দ বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেন এবং এ অর্থ দিয়ে গ্রামের গৃহহীন দরিদ্র মানুষকে ঘর নির্মাণ করে দেয়ার নির্দেশনা দেন। টিআর ও কাবিটার নামে বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থের সিংহভাগ অপচয়ের অভিযোগ থাকায় তার বিপরীতে গৃহহীন দরিদ্র মানুষের জন্য বাসগৃহ তৈরি করে দেয়ার উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। তবে নতুন প্রকল্পের আওতায় গৃহহীনদের যে গৃহ দেয়া হবে তা যেন সিংহভাগ নির্মাণকাজের মতো মানহীন নয়, তা নিশ্চিত করাও জরুরি। আমাদের বিশ্বাস, বিষয়টি নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বাসগৃহগুলো যাতে সত্যিকারভাবে টেকসই হয়, তা তদারকিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হবে। কিন্তু তার পরও বেশ কয়েকটি স্থানে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণ, জমি কেনাসহ প্রভৃতি বিষয়ে দুর্নীতি-অনিয়মের তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। মুজিব বর্ষের বিশেষ প্রকল্প হিসেবে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াসের সদিচ্ছা, সৌন্দর্য ও লক্ষ্য কিছু মানুষের কারণে ব্যর্থ না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। জমির মালিকানা রয়েছে, এমন কেউ চলমান গৃহ প্রদান কার্যক্রমের আওতায় যাতে ঢুকতে না পারে, সেজন্য কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। ঘর নির্মাণ ও বণ্টনের সঙ্গে যুক্ত কর্তাব্যক্তিদের কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রকৃত গৃহহীন ও ভূমিহীনরা ঘর পান, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, দেশে একটি পরিবারও গৃহহীন থাকবে না। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী গৃহহীন-ভূমিহীনদের সংকট দূরীকরণে সরকারের পক্ষ থেকে হতদরিদ্রদের জন্য ঘর নির্মাণের কার্যক্রম পরিচালনা নিঃসন্দেহে সাধুবাদ পাওয়ার দাবি রাখে। এক্ষেত্রে লক্ষ রাখতে হবে, গৃহনির্মাণজনিত সহায়তা যেন প্রকৃত হতদরিদ্ররা পান, কোনোভাবেই যেন এর অপপ্রয়োগ না ঘটে। সরকারের সহায়তায় হতদরিদ্রদের সংকট দূর হবে, ঘরহীন প্রতিটি মানুষ ঘর পাবেন এবং নিজস্ব আবাসস্থলে নিশ্চিন্তে বসবাস করতে পারবেন, এটা নিশ্চিত হোক। আমরা প্রত্যাশা করব, অসহায়দের কল্যাণে সরকারের গৃহীত এই মহতী উদ্যোগ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কারোর অনিয়ম-দুর্নীতি কিংবা স্বেচ্ছাচারিতায় যাতে প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, এজন্য সরকার আরো সজাগ থাকবে। যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে সময়ক্ষেপণ না করে কঠোর, নির্মোহ পদক্ষেপ নিলে ভুক্তভোগীদের কল্যাণের পথ মসৃণ হবে। এখনো যারা গৃহহীন-ভূমিহীন রয়ে গেছেন, তাদের আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় আনার ব্যবস্থা দ্রুততার সঙ্গে একই রকমভাবে সম্পন্ন করা হবে, এটিও আমাদের প্রত্যাশা।