ড. সেলিম জাহান নিউইয়র্কে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন কার্যালয় ও দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগের সাবেক পরিচালক। ইউএনডিপিতে যোগদানের আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগ ও কানাডার ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করেন। অতিথি অধ্যাপকের দায়িত্ব পালন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যাল্ড ইউনিভার্সিটিতে। বাংলাদেশের পরিকল্পনা কমিশনের উপদেষ্টা, আইএলও, বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। সম্প্রতি বণিক বার্তার সঙ্গে করোনা-পরবর্তী মানব উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ, শিক্ষা ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম এম মুসা ও রুহিনা ফেরদৌস

করোনা মহামারী পৃথিবীজুড়েই মানব উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ কেমন অবস্থায় আছে?

করোনা-পরবর্তী বাংলাদেশের মানব উন্নয়ন প্রসঙ্গে আমার মনে হয়, সুযোগের যে অসমতা ছিল তা আরো বাড়বে। উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধির যে প্রক্রিয়া, সেখানে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ী, দোকানদার বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ঝরে পড়ছেন। হয়তো তথ্য ও উপাত্তের মধ্যে তারা এখনো আসছেন না। বড় ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা এ জায়গা পূরণ করে নেবেন। সুতরাং আমরা দেখতে পারছি যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সুযোগের ক্ষেত্রে অসমতা বাড়ছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। গত দুই বছরে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেয়া হচ্ছে কিন্তু নগর অঞ্চলের ধনীদের কাছে তথ্যপ্রযুক্তি লভ্য হলেও গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে এটা লভ্য নয়। তাই লেখাপড়া প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে গেলে তারা এ সুযোগ নিতে পারবে না। এতে শিক্ষার সুযোগ ও ফলাফলে এক ধরনের অসমতা দেখা দেবে। শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য। কারণ শিক্ষা প্রযুক্তি আছে মানেই যে শিক্ষকরা তা ব্যবহার করতে পারবেন তা নয়, এজন্য যে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন তা আমাদের দেশে হয়নি। শহরাঞ্চলের শিক্ষকরা শিক্ষা প্রযুক্তির সঙ্গে যতটা পরিচিত, গ্রামাঞ্চলের শিক্ষকরা ততটা নয়। আমি মনে করি, এই যে অসমতা, তা নারী-পুরুষের মধ্যেও দেখা দেবে। কভিডের প্রভাবে নারী উদ্যোক্তারাই প্রথমে ঝরে গেছেন। তার একটা কারণ তারা প্রতিযোগিতায় পারেননি। অন্য কারণটি হচ্ছে, তাদের গৃহস্থালি ও পরিবারের দেখাশোনার চাহিদা এত বড় ছিল যে তারা আর তাদের অর্থনৈতিক কাজে, বিশেষ করে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে অংশ নিতে পারেননি। ঘরের মধ্যেও নারী-পুরুষের অসমতা বাড়বে। আমরা একে শক্তির অসমতা বলতে পারি। শক্তি বলতে পুরুষ ও নারীর মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের শক্তি, কর্মকাণ্ডের শক্তি। এটা গেল অসমতার দিক। আর যদি আমরা সার্বিক দারিদ্র্যের দিকে তাকাই তাহলে দেখি বিভিন্ন গবেষণা তথ্য বলছে যে করোনার কারণে অনেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবে। যে দারিদ্র্য থেকে আমরা বেরিয়ে এসেছিলাম, কভিডের কারণে বহু জনগোষ্ঠী আবার সেই দারিদ্র্যের ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে। আমাদের স্বাস্থ্য খাত এমনিতে নাজুক, তার মধ্যে নানা ধরনের ভঙ্গুরতা রয়েছে। করোনা-পরবর্তী বিভিন্ন ধরনের রোগ দেখা দেবে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর তার একটা প্রভাব পড়বে। করোনার কারণে মানব উন্নয়ন, দারিদ্র্য নিরসন, অসমতা দূরীকরণের ক্ষেত্রে আমরা যে ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করেছিলাম, তার ওপর একটা বিরূপ প্রভাব পড়বে। বহুক্ষেত্রে এবং সরকারি পর্যায়ে দেখা যাবে যে করোনা এবং করোনা উদ্ভূত কারণে সম্পদ ব্যবহার হওয়ার ফলে আমরা পরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষার যে বলয় তৈরি করেছিলাম, সেখানেও বিরূপ প্রভাব পড়বে। এই প্রভাবের ব্যাপ্তি কেমন হবে, কতদিন থাকবে তা নির্ভর করছে আমরা কী ধরনের নীতিমালাগুলো গ্রহণ করব তার ওপর। বর্তমান সময় নীতিমালাগুলো সম্পূর্ণভাবে করোনানির্ভর হবে তা নয়, তবে করোনা-সচেতন হতে হবে। এটা যদি আমরা করতে পারি, তাহলে ন্যূনতম সময়ের মধ্যে প্রভাব থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হব।

আমরা দেখেছি করোনার মধ্যেও একটা গোষ্ঠীর সম্পদ বেড়েছে। ধনীরা আরো ধনী হয়েছে। এটা কি আমাদের সিস্টেমের সমস্যা?

অনেক কারণে এটা হচ্ছে। আমাদের যে অর্থনৈতিক কাঠামো, সেখানে প্রবৃদ্ধির বেশির ভাগটাই সমাজের ওপরের দিকের মানুষ ভোগ করছে। এমনকি সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ থেকেও তারা উপকৃত হয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ২০ কোটি টাকা দেয়া হলে বড় ব্যবসায়ীদের ২০০ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। সরকার হয়তো মনে করছে প্রবৃদ্ধি প্রক্রিয়ায় বড় ব্যবসায়ীরাই হয়তো বৃহৎ ভূমিকা পালন করেন, এটা কিন্তু ঠিক নয়। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ীরাই আমাদের অর্থনীতিকে সামনের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। কৃষি খাত এখনো আমাদের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি প্রক্রিয়ার বিরাট অংশ। কৃষকের হাতে প্রয়োজনীয় বীজ, সার পৌঁছানো জরুরি। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর লোকেরা প্রবৃদ্ধি প্রক্রিয়ার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল না, ফলে তাদের অংশগুলো বৃহৎ পরিবারগুলো বা উদ্যোক্তারা পেয়েছেন। বিশ্বের সব দেশেই কিন্তু এ ধরনের মেরুকরণ হচ্ছে।

উন্নত দেশগুলোয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অধীনে বেকার ভাতা কিংবা চাকরিচ্যুতদের সহায়তা করা হয়েছে। বাংলাদেশে এমনটা চোখে পড়ে না...

উন্নত বিশ্বে এ-জাতীয় নানা ধরনের প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়েছে। যেমন ব্রিটেনে আমি জানি যখন লোকজন বেকার হতে শুরু করল তখন চাকরিচ্যুত মানুষের ৮০ শতাংশ বেতন সরকারের তহবিল থেকে দেয়া হয়েছে। বাকি ২০ শতাংশ মালিকপক্ষ বহন করেছে। এভাবে তারা পুরো প্রক্রিয়া সচল রাখতে পেরেছে, মানুষ একেবারে বেকার বা চাকরিচ্যুত হয়ে যায়নি। বাংলাদেশে যখন করোনা সংক্রমণের মাত্রা বেশি ছিল তখন নীতিমালা, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো স্বল্প, দীর্ঘ ও মধ্যমেয়াদে সম্পূর্ণভাবে করোনা অভিমুখী হওয়া দরকার ছিল। এ সময় বিভিন্ন মেয়াদে লকডাউন চলেছে, কিন্তু যে মানুষটি রিকশা চালান বা দিনমজুর, তাকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মধ্যে আনা দরকার ছিল। তা হয়তো নগদ অর্থ প্রদানও হতে পারে। ভারতে যেমন গুদাম থেকে খাদ্য দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ এ ধরনের উদ্যোগ কম নিয়েছে। বাংলাদেশ বেঁচে গেছে কারণ এখানে করোনার প্রভাব ব্যাপক আকার ধারণ করেনি। এখানে যদি ব্রিটেন বা ইউরোপের কোনো দেশের মতো অবস্থা হতো তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ত এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতো। বাংলাদেশ বর্তমানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অনেক এগিয়ে গেছে। কিন্তু ভবিষ্যতে এ-জাতীয় দুর্যোগ আবার আসতে পারে। তাই ঘাত-প্রতিঘাতসহ আমাদের অর্থনৈতিক ও মানব উন্নয়ন কীভাবে করা যায়, সেজন্য নীতিমালায় এ-বিষয়ক সুনির্দিষ্ট একটা অংশই থাকতে হবে।

করোনার সময় আমরা দেখেছি যে হালনাগাদ তথ্যের অভাবে নগদ সহায়তা বা প্রণোদনা আমরা প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারছি না। এটা কীভাবে তৈরি করা যেতে পারে?

বিভিন্ন দেশ ডাটাবেজ তৈরির কাজটা করেছে, বাংলাদেশের তুলনায় বহুগুণ বেশি লোকসংখ্যার দেশে এটা করা হয়েছে। যেমন ভারত। ব্রাজিলের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের তথ্যও সংগ্রহ করা হয়েছে। এটা করার সবচেয়ে ভালো সময় হচ্ছে যখন কিছুই হচ্ছে না। কিন্তু দেখা যায় যখন কোনো দুর্যোগ আসে তখন আমরা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে বসি। বাংলাদেশে জাতীয় পরিচয়পত্র করা হয়েছে, কিন্তু সবার কাছে নেই। কারণ এখানে এমন সব তথ্য চাওয়া হয়েছে, যা সব মানুষের কাছে নেই। অপচয়ের বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে খুব মাথা ঘামানো হয়, কিন্তু পৃথিবীর সব জায়গায় সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে কিছু অপচয় হয়। এটা কোনো নতুন কথা নয়। কানাডা কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও হয়। আদমশুমারিকে কেন্দ্র করে এ-জাতীয় একটা উপাত্তের ভিত্তি যদি আমরা তৈরি করতে পারি তাহলে মোটামুটি সবাইকে জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়া সম্ভব হবে। আমি শুনেছি জাতীয় পরিচয়পত্র দিতে অনেক সময় লাগে। এটা কেন হবে। এখন তো আমরা তথ্যপ্রযুক্তির আওতায় চলে এসেছি। আমি বলছি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রক্রিয়া সহজ করে ফেলতে। জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির উদ্যোগটি চমৎকার, কিন্তু এটাকে আরো সহজ করতে হবে। আমি বা আপনি যেমন সহজে আমাদের জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করতে পারি, বস্তির একজন মানুষও যেন তার জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করতে পারে, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। এটা মানবাধিকারও।

আমরা দেখি যে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির সময় চোখের আইরিশ ও আঙুলের ছাপ নেয়া হলো, আবার পাসপোর্ট তৈরির সময়ও একই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যেতে হচ্ছে। সময়ক্ষেপণ হচ্ছে অনেক...

এটাকে সহজ করা দরকার, কারণ সরকার একটা, দেশ একটা। আমরা সবাই এ দেশেরই জনগণ। সবার তথ্য যদি একটা জায়গায় থাকে, তাহলে কাজগুলো অনেক সময় হয়ে যায়। জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানের সময় যে তথ্যগুলো সংগ্রহ করা হচ্ছে, তা যদি তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে যে মন্ত্রণালয়ের অধীনে পাসপোর্ট দেয়া হয়, সেখানে পৌঁছে দেয়া যায়, তাহলে যারা পাসপোর্ট করবেন তাদের পুনরায় আঙুলের ছাপ কিংবা আইরিশ দেয়ার প্রয়োজন পড়বে না। জাতীয় পরিচয়পত্রের ক্ষেত্রে যদি সব মন্ত্রণালয়গুলোর একটা সমন্বিত ব্যবস্থা থাকে তাহলে আর এ সমস্যা হয় না। প্রত্যেকটা মন্ত্রণালয় তার ক্ষমতা দেখাতে চায়, নিজ নিজ ব্যবস্থাগুলো শক্তভাবে ধরে রাখে। সত্তরের দশকে দেশের মোট জাতীয় আয় নিয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর একটা সংখ্যা, পরিকল্পনা কমিশনের আরেকটা সংখ্যা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেকটা সংখ্যার কথা। বিশ্বব্যাংক কিংবা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে যারা আসতেন, তারা খুব অবাক হয়ে যেতেন। তাই বলব তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থাটা সমন্বিত হওয়া উচিত। তাছাড়া পাসপোর্ট অফিসগুলোয় আমাদের যারা বয়স্ক নাগরিক রয়েছেন কিংবা যারা অক্ষম, তাদের জন্য একটা আলাদা ব্যবস্থা থাকা উচিত। সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে আমরা যত বেশি নিয়মকানুন করব এবং যত বেশি কঠিন করে তুলব, সেবা প্রদান ততটা কম হবে। সেবা প্রদানের একটা আইনগত দিক আছে, কিন্তু আইন যদি মানুষের মানবিকতা ও মানুষের ঊর্ধ্বে চলে যায় তখন কিন্তু তা মানবকল্যাণমুখী থাকে না।

কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে সরকার বেসরকারি সংস্থাগুলোকে তেমনভাবে কাজে লাগাচ্ছে না। অথচ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে এনজিওগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, বিশেষ করে বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাদের কাজের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি...

বাংলাদেশে সামাজিক সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে। এক্ষেত্রে শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা সুপেয় পানির কথা আমি বলতে পারি। তাছাড়া বেসরকারি সংস্থাগুলো অনেক ধরনের গবেষণা করেছে, তাদের কাছে কিন্তু তথ্য-উপাত্ত কম নেই। তাছাড়া তারা প্রান্তিক ও তৃণমূল জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করে, তাই তাদের ব্যাপ্তি অনেক বেশি। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় অনেক সময় বেসরকারি খাতকে তাদের প্রতিযোগী মনে করে। তা কিন্তু নয়। সরকারি খাত বা সরকারি কার্যক্রমের বিকল্প কেউই হতে পারবে না। বেসরকারি খাত হচ্ছে সরকারের সহযোগী। এটাকে গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা দরকার। সরকারের তত্ত্বাবধানে বেসরকারি খাত কাজ করবে। বেসরকারি খাতকে সরকার যদি প্রতিযোগী ভাবে তাহলে খাতটি দূরে থেকে যাবে। আবার সরকারের পক্ষ থেকে এটাও ভাবা হয় যে বেসরকারি খাতটি বুঝি তাদের সমালোচক। এটা ঠিক যে বেসরকারি খাত অনেক ক্ষেত্রেই সরকারের সমালোচনা করে, এ পর্যায়ে তাদের একটি গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিতে হবে। কারণ তাদেরও মনে রাখতে হবে সরকারকে ডিঙিয়ে বা পাশ কাটিয়ে তারাও কাজ করতে পারবে না। সরকারি ও বেসরকারি খাতকে পরস্পর সহযোগী হয়ে কাজ করতে হবে। তাতে সাধারণ মানুষই বেশি উপকৃত হবে। মনে রাখা দরকার যে উন্নয়ন একটা বড় এবং জটিল কাজ। কোনো একটি পক্ষ দিয়ে এর পরিপূর্ণ সমাধান হবে না। সমন্বিত হয়ে কাজ করার জন্য সরকারের ভূমিকাই প্রধান।

এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তাব জাতিসংঘে অনুমোদন পেয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে। এক্ষেত্রে আমাদের প্রস্তুতিটা কী হওয়া উচিত?

এত দিন পর্যন্ত আমরা স্বল্পোন্নত দেশ ছিলাম, এ হিসাবে কিছু সুযোগ আমরা পেয়েছি। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সুযোগ পেয়েছি, অনুদানের ক্ষেত্রে সুযোগ পেয়েছি। এত দিন দুর্বল দেশ হিসেবে আমরা এ সুযোগ পেয়েছি, উত্তরণ-পরবর্তী এ সুযোগগুলো থাকবে না। হয়তো অনুদানের সুযোগ পাওয়া যাবে না। আমরা যে শিথিল শর্তে বাণিজ্য করতে পেরেছি, তা হয়তো থাকবে না। তখন হয়তো আরো শক্তিশালী দেশের সঙ্গে আমাদের প্রতিযোগিতা করতে হবে। তাই প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থাগুলো এখন শুরু করতে হবে। যাদের সঙ্গে আমরা বাণিজ্য করি তাদের সঙ্গে এখন থেকেই আলাপ-আলোচনার মধ্যে যেতে হবে। যেমন ২০২৬ সালের পরে আমরা কী কী পণ্য রফতানি করব, তার ওপর শুল্ক কাঠামোটা কী হবে তা ঠিক করতে হবে। আমরা কিন্তু একটি প্রতিযোগিতামূলক কাঠামোর মধ্যে চলে যাব। তা মোকাবেলার জন্য ২০২৫ সালে গিয়ে চিন্তা করলে কিন্তু হবে না। এখন থেকেই চিন্তা করতে হবে যে কীভাবে আমরা আমাদের রফতানির মাত্রিকতা বাড়াতে পারি। আমাদের রফতানি বাণিজ্য বিশেষভাবে তৈরি পোশাক শিল্পের চাহিদার ওপর নির্ভরশীল। কোনো কারণে যদি বিশ্বে এর চাহিদা কমে যায় বা ধস নামে তাহলে কিন্তু আমরা রীতিমতো ক্ষতিগ্রস্ত হব। প্রবাসী আয় আমাদের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। কোনো কারণে যদি মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিতে ভাঙন দেখা দেয়, তাহলেও আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব। ১৯৯১ সালে যখন মহাসাগরীয় যুদ্ধ শুরু হয়েছিল তখন আমরা এমনটা দেখেছি। আমাদের যাতে ওই ভঙ্গুরতার মধ্যে পড়তে না হয় তার জন্য আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে। ২০২৬ সাল নাগাদ আমরা যখন এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাব, তার জন্য এখনই চিন্তাভাবনা করা দরকার। নেপালে কিন্তু এ চিন্তাভাবনা এখনই শুরু হয়েছে। তাদের গত মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন এটার ওপরই করা যে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে আমাদের যখন উত্তরণ ঘটবে তখন নীতিমালা কী হওয়া দরকার, কী করে আমরা তা বাস্তবায়ন করব। রাজনৈতিক কূটনীতির দিক দিয়ে বাংলাদেশ অনেক সক্রিয়, কিন্তু অর্থনৈতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে ততটা নয়। আমরা দেখতে পাই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যখন বিদেশে যান, তখন তার সঙ্গে ব্যবসায়িক একটা দল যোগ দেয়। খুব ভালো কথা। এর একটা ইতিবাচক দিক আছে। তবে এটা স্বল্পস্থায়ী একটা ব্যাপার। আমাদের যেসব দূতাবাস আছে, তারা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বা অর্থনৈতিক আলাপের ক্ষেত্রে বিদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কতখানি সক্রিয়—এখানে গুরুত্ব দেয়া দরকার। আমাদের দূতাবাসগুলো শুধু পররাষ্ট্রবিষয়ক কাজকর্ম করবে। তা তো নয়। কারণ আগামীতে কূটনীতিটা হবে কিন্তু অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে। এখানে আমাদের দূতাবাসগুলোর একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, যা তারা এখনই শুরু করতে পারে।

গত দশ বছরে বাংলাদেশে কারিগরি জ্ঞানের অনেক প্রসার হয়েছে, কিন্তু বিভিন্ন সেক্টরের চাহিদা পূরণ করতে বাইরে থেকে দক্ষ লোক নিয়োগ দিতে হচ্ছে। বিভিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও কার্যকর ফল কেন আসছে না? এমনকি তহবিলের অর্থও কাজে লাগাতে পারছি না?

বাজারে শ্রমের চাহিদা নিত্যদিন বদলাচ্ছে। কারিগরি শিক্ষা মানে কাঠ চেরাই করা বা কাঠের কাজ করা কিংবা লোহা-লক্কড়ের কাজ করা—এমনটা মনে করলে হবে। প্রযুক্তি বদলাচ্ছে, দ্রুত বদলাচ্ছে। আমাদের কারিগরি শিক্ষার মধ্যে এ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আমাদের দেখতে হবে যে দেশে ও দেশের বাইরে কী ধরনের চাহিদা রয়েছে। কোন কোন কারিগরি ক্ষেত্রে চাহিদা রয়েছে এবং সেভাবে আমাদের কারিগরি শিক্ষাটাকে বদলাতে হবে। তাছাড়া কমিটি করে দিলেই তো এটার সমাধান হয়ে যাবে না। আমরা যদি মনে করি, আজ থেকে কারিগরি শিক্ষা বদলে ফেলব, এটা কিন্তু হয় না। এজন্য প্রশিক্ষিত শিক্ষকের প্রয়োজন হয়। উপকরণের প্রয়োজন হয়। সব মিলিয়ে পুরো প্রক্রিয়া শুরু করতেই বছর তিনেকের মতো সময় লাগে। সেখান থেকে প্রথম যারা শিক্ষার্থী হিসেবে বের হবে, তাদের পাঁচ বছরের মতো সময় লাগবে। ততদিনে আবার পৃথিবী অনেকখানি বদলে যাবে। কারণ প্রযুক্তি কখনো স্থির থাকে না। তাই এখন থেকে দশ বছর পরে কী জাতীয় কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজন পড়বে তা উপলব্ধি করে পরিকল্পনা করতে হবে। এটার জন্য একটা কমিটি করা দরকার। এটা হয় না বলেই উদ্যোক্তা, চাকরিদাতারা দক্ষ লোক পাচ্ছেন না বলেন। শ্রম চাহিদার বদলগুলো শিক্ষার মধ্যে আসা জরুরি।

আমরা কি সাধারণ শিক্ষাকে অনেক বেশি করে ফেলেছি, এতে কি সম্পদের অপচয় হচ্ছে?

নিশ্চয়ই। আমাদের সাধারণ শিক্ষার ভিতটাও কিন্তু অনেক নড়বড়ে। আমি মনে করি, প্রাথমিক পর্যায় পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষাকে আমরা বাংলা, ইংরেজি ও অংকের মধ্যে আবদ্ধ রাখতে পারি এবং ভিতটা শক্ত করে দিতে পারি; বিজ্ঞান, ভূগোল, ইতিহাস—এগুলো আমরা বাদ রাখি। প্রাথমিকের পরে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান, ভূগোল, ইতিহাস বা অন্য কোনো বিষয় নিয়ে পড়বে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও ইসলামের ইতিহাস, আরবি, ফার্সির মতো কিছু বিভাগ রয়েছে, যেগুলো রাখার যৌক্তিকতা আছে কিনা, সে বিষয়ে আমি প্রশ্ন রাখি। তাছাড়া একজন শিক্ষার্থী যে বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন, দেখা যায় কর্মজীবনে বিষয়বহির্ভূত অন্য পেশায় ঢুকছেন। তাহলে তার পেছনে যে বিনিয়োগ, সেটা কিন্তু অপচয় হলো। তাছাড়া শিক্ষার্থী নিজেও হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়বেন। প্রাথমিক পর্যায়ে মৌলিক শিক্ষার ভিত শক্ত করে দিতে হবে, মাধ্যমিক পর্যায়ে এসে তা বহুধাকরণ করা, যেমন কারিগরি কিংবা বিজ্ঞানশিক্ষায়। আমরা যেটাকে এসটিইএম বলি—বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত—এ বিষয়গুলোয় জোর দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষায় যারা যাবেন, তারা যাতে দেশ, জাতি ও বিষয়কভিত্তিক অবদান রাখতে পারেন। তা না হলে শুধু যেকোনো বিভাগে পাস করে সনদ নিলে তাতে লাভ কী আছে! এটা তো নিশ্চিতভাবে সম্পদের অপচয়।

বেসরকারি খাতে আসা সহযোগিতা দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে এসব খাতে সাহায্য বর্তমানে কমে গেছে। এতে কি সামাজিক সূচকে আমাদের যে অগ্রগতি হয়েছে, তাতে কোনো প্রভাব পড়বে?

প্রভাব তো পড়বেই। কারণ বেসরকারি সংস্থাগুলো যে সাহায্য পেত বা যে উৎস থেকে সাহায্য পেত, সে উৎসগুলো দুর্বল হয়ে গেছে। যে দেশগুলো আগে সাহায্য বাংলাদেশে দিত, এখন তাকে নিজের ক্ষেত্রে সাহায্যটা ব্যবহার করতে হচ্ছে। কারণ সেও তো প্রভাবিত হয়েছে। কাজেই আমাদের ধরে নিতেই হবে যে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে যদি আমাদের উত্তরণ ঘটে, তাহলে এ ধরনের অনুদান ও সাহায্য কমে যাবে। ফলে এখানে যারা বেসরকারি ও তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করছেন, তারা আগের মতো কাজ করতে পারবেন না। এখন এটা থেকে উত্তরণের আমি অন্তত দুটো পথ বলি, বেসরকারি সংস্থাগুলো যে অর্থ পায়, তা ব্যবহারের দক্ষতা বাড়াতে হবে। এসব খাতেও কিন্তু অনেক অপচয় হয়। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে যারা বিত্তবান তাদের দেখা যায় মা-বাবার নামে স্কুল প্রতিষ্ঠা কিংবা মসজিদ তৈরির মধ্যেই নিজেদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখেন। বাংলাদেশে বিত্তবানের সংখ্যা কম নয়, আবার তাদের বিত্তের পরিমাণও কম নয়। যেমন বিভিন্ন সময় চক্ষু চিকিৎসা শিবির করা হয়, আমাদের বিত্তবানরা কিন্তু এ কাজে অংশ নিতে পারেন। প্রচলিত চিন্তাধারা থেকে আমাদের বিত্তবানদের সরে আসতে হবে। শুধু মসজিদ করা বা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাই জনকল্যাণ নয়। একটা ভ্রাম্যমাণ লঞ্চে চোখের চিকিৎসার যাবতীয় ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যারা বিত্তবান তাদের এ বিষয়গুলো চিন্তা করা দরকার।

আমরা দেখছি যারা বিত্তবান তারা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, তাদের ছেলে-মেয়েরাও অন্য দেশে স্থায়ী হচ্ছে।

তারা চলে কেন যাচ্ছে—এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। আমার মনে হয়, মা-বাবা তাদের সন্তানদের মনের মধ্যে দেশ সম্পর্কে একটা গর্বের জায়গা তৈরি করেননি। দেশে তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, নতুন প্রজন্মের যারা বিদেশে চলে যাচ্ছেন, তাদের অনেকেই হয়তো এমনটা মনে করেন। দ্বিতীয়ত, বিশ্বায়নের ফলে আমাদের ছেলেমেয়েরা বাইরের বিষয়গুলো যতটা জানে, দেশ সম্পর্কে তাদের ধারণা অনেক কম। স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ইত্যাদি বিষয়ের কথা তো বাদই দিলাম। মা-বাবা তাদের সন্তানদের পাশ্চাত্যের কাঠামোয় শিক্ষা দিচ্ছেন। যেকোনো ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে গেলেই এটা চোখে পড়বে। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে যে বাংলাদেশে তারা স্বল্পকালের জন্য আছে, পরবর্তী সময়ে দেশের বাইরে যাবে। একটা সময় এ ধরনের প্রবণতা বিত্তবানদের সন্তানদের মধ্যে ছিল। এখন আমলা থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত সব ক্ষেত্রে বিস্তৃত। আমি মনে করি, এটা বড় ধরনের মেধা পাচার—যা মা-বাবা, পরিবার, সমাজ ব্যবস্থা মিলে করছে। ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, চীনে কিন্তু অনেকে বিদেশ থেকে পড়াশোনা করে ফিরে আসছেন। তারা উদ্যোক্তা হচ্ছেন। পাশাপাশি এখানে দেশপ্রেমের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ভারত কিংবা চীনের ছেলেমেয়েরা তাদের দেশ প্রসঙ্গে কোনো ছাড় দেয় না। তাছাড়া সব দেশেই কিন্তু কিছু না কিছু সমস্যা রয়েছে। তবে আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর যদি স্বচ্ছতা বাড়ে, সুশাসন প্রতিষ্ঠা হয়, আইন-শৃঙ্খলার বিষয়গুলো নিয়মমাফিক হয়, তাহলে এ দেশ সম্পর্কেও আস্থা বা শ্রদ্ধা গড়ে উঠবে।