ভাইরাস কী? ভাইরাস হলো বাধ্যতামূলক অন্তঃকোষীয় পরজীবী, যা অন্য কোনো জীবিত কোষ ছাড়া বংশবিস্তার করতে এবং বেশিক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে না। ভাইরাসের জেনেটিক ম্যাটেরিয়াল ডিএনএ অথবা আরএনএ দ্বারা তৈরি। পৃথিবীতে যত ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণী আছে, তাদের সবার শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়।

ভাইরাস সম্পর্কে কেন জানা প্রয়োজন? মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, রোগবালাই, বিবর্তন, প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি বিষয়ে জানতে হলে মানুষকে অবশ্যই ভাইরাস সম্পর্কে জানতে হবে। পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য, বায়ো-জিও রাসায়নিক, উপকারী ভাইরাস, নতুন প্যাথোজেন আসার সম্ভাবনা প্রভৃতি বিষয়ে জানতেও ভাইরাস সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। ভাইরাস আমাদের চারপাশে সর্বত্র বিচরণ করে। পুরো গ্রহের এমন কোনো জীবন নেই, যার মধ্যে ভাইরাস নেই। আমরা প্রতিদিন আমাদের খাদ্য ও নিঃশ্বাসের সঙ্গে বিলিয়ন বিলিয়ন ভাইরাস গ্রহণ করে থাকি।

পৃথিবীতে কী পরিমাণ ভাইরাস আছে? পৃথিবীতে কী পরিমাণ ভাইরাস আছে, তা এক কথায় গণনার বাইরে। একটি ছোট ক্যালকুুলেশনের মাধ্যমে পৃথিবীতে কী পরিমাণ ভাইরাস আছে, তার একটি ধারণা পাওয়া যেতে পারে। সমুদ্রের পানিতে ব্যাকটেরিওফাজ নামে যে ভাইরাসটি ব্যাকটেরিয়াকে ইনফেক্ট করে, তা যে পরিমাণ আছে, এটি টোটাল করলে পৃথিবীতে যত পরিমাণ হাতি আছে, তার এক হাজার গুণের সমান হবে। আর এ ভাইরাসগুলোকে যদি লম্বালম্বি করে সংযুক্ত করা হয় তাহলে ১০০ মিলিয়ন আলোকবর্ষের সমান লম্বা হবে। ভাইরাস হলো খুবই ক্ষুদ্র অণুজীব। বলা যায় ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র। এক লিটার সামুদ্রিক পানিতে যে পরিমাণ ভাইরাস আছে, তা পৃথিবীর পুরো জনসংখ্যার চেয়ে বেশি। ছোট একটি আলপিনের মাথায় ৫০০ মিলিয়ন ছোট আকারের ভাইরাস থাকতে পারে। সমুদ্রের মধ্যে যত কণা আছে, তার মধ্যে ৯৪ শতাংশ হলো ভাইরাস।

পৃথিবীতে যত মানুষ আছে, তার প্রায় সবাই কোনো না কোনো ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত। হারপিস নামে মাত্র এক প্রজাতির ভাইরাস দ্বারাই পৃথিবীর ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ মানুষ সংক্রমিত। কিন্তু এসব ভাইরাস আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কার্যকর থাকলে তেমন কোনো ক্ষতি করতে পারে না এবং আমাদের মাঝে তেমন কোনো লক্ষণও প্রকাশ করে না। এক কথায় বললে, আমরা সবাই এসব ভাইরাস নিয়েই বসবাস করি। সঙ্গে নিয়ে চলি পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। পৃথিবীব্যাপী মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর অবাধ চলাচলের মাধ্যমে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে এসব ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় বিজ্ঞানীরা মানুষের অনেক আচরণ, অনেক পারিবারিক বিষয় এবং বিশ্বব্যাপী মানুষের বিস্তৃতি সম্পর্কে জানতে শরীরে অবস্থানরত ভাইরাসের জীবনাদি বিশ্লেষণ করেন।

মানুষের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে বিজ্ঞানীরা নমুনা সংগ্রহ করে নানা ধরনের ভাইরাসের উপস্থিতি পেয়েছেন। এমনকি বিজ্ঞানীরা মানুষের সম্পূর্ণ ডিএনএ বিশ্লেষণ করে ৮ শতাংশের ওপরে জিন পেয়েছেন, যেটা সরাসরি রেট্রো ভাইরাসের জিনোম থেকে মানুষের ডিএনএতে প্রবেশ করেছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে ভাইরাসের এ জিনগুলো কিছু প্রোটিন তৈরি করে, যা মানুষের অনেক ধরনের কাজের সহায়ক।

ভাইরাসের বয়স কত? বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পৃথিবীতে কোনো কোষের জন্মের বিলিয়ন বিলিয়ন বছর আগেই ভাইরাসের জন্ম। বিজ্ঞানীরা এটাও মনে করেন যে সামুদ্রিক পানি থেকে প্রথম রেট্রো ভাইরাসের শুরু এবং তা বিলিয়ন বিলিয়ন বছর ধরে রূপান্তরিত হয়ে আজকের পৃথিবীর প্রাণের সৃষ্টি।

মানুষ সর্বপ্রথম কখন ভাইরাস সম্পর্কে জানতে পারে? ভাইরাস হলো লাতিন শব্দ, যার অর্থ বিষ। ১৭২৮ সালে সর্বপ্রথম বিজ্ঞানীরা ভাইরাস নামে রোগ সৃষ্টিকারী বিষের সন্ধান পান। ১৮০০ শতকের দিকে বিজ্ঞানীরা সর্বপ্রথম তামাকপাতার মধ্যে এক ধরনের ভাইরাস শনাক্ত করতে সক্ষম হন। ১৮৯৮ সালে বিজ্ঞানীরা প্রথম প্রাণীর শরীরে ভাইরাস শনাক্ত করেন। সে বছর তারা গরুর ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ ভাইরাস শনাক্ত করেন। ১৯০১ সালে এসে বিজ্ঞানীরা মানুষের শরীরে ইয়েলো ফিভার ভাইরাস শনাক্ত করতে সক্ষম হন। তার পর থেকে বিজ্ঞানের ক্রমবিকাশে সব ধরনের ভাইরাস এবং ভাইরাস সৃষ্ট রোগবালাই সম্পর্কে মানুষ জানতে এবং বুঝতে থাকে।

এত এত ভাইরাসের মাঝে বাস করেও আমরা অসুস্থ হই না কেন? বেশির ভাগ ভাইরাসই আমাদের শরীরে প্রবেশ করার পর তেমন কোনো ক্ষতি করতে পারে না। অনেক ভাইরাস মানবশরীরের কোষগুলোয় প্রবেশ করতে পারে না। মানবকোষে অনেক ভাইরাস বসার জন্য নির্দিষ্ট রিসেপ্টর থাকে না। অনেক ভাইরাস আছে, যাদেরকে আমাদের কোষ ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি দেয় না। অনেক ভাইরাস আছে, যারা আমাদের কোষে প্রবেশ করার পর কোষ যখন বুঝতে পারে যে ভাইরাসগুলো ক্ষতিকর, তখন তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী কোষ তৈরি করে। ফলে তারা আমাদের তেমন কোনো ক্ষতি করতে পারে না। অনেক ভাইরাস আমরা খাবারের সঙ্গে খাই, পানীয়র সঙ্গে পান করি অথবা নিঃশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করি। আর ভাইরাসগুলো আমাদের কোষে প্রবেশ করতে না পেরে শরীরের বর্জ্যের সঙ্গে বের হয়ে যায়।

সব ভাইরাসই কি ক্ষতিকর? না, সব ভাইরাসই ক্ষতিকর নয়। পৃথিবীতে এমন অনেক ভাইরাস আছে, যেগুলো মানুষের কোনো ক্ষতি তো করেই না; বরং উপকার করে। এখানে ভাইরাসের কিছু উপকারী গুণের কথা আলোচনা করব। কিছু ভাইরাস কিছু উদ্ভিদকে উচ্চ ও নিম্ন তাপমাত্রায় বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। কিছু ভাইরাস অনেক প্রাণীর বংশবিস্তারে, আচরণগত পরিবর্তনে সাহায্য করে। কিছু ভাইরাস জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সাহায্য করে। কিছু ভাইরাস সামুদ্রিক জৈব ধাতব উপকরণ রিসাইকেল করে মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করে তোলে। ভাইরাস মানুষের শরীরে সরাসরি কী ধরনের উপকার করে, তা পর্যাপ্তভাবে জানতে না পারলেও ইঁদুরের শরীরে বিজ্ঞানীরা ভাইরাস প্রয়োগ করে অনেকগুলো সরাসরি উপকারের কথা জানতে পেরেছেন। হয়তো শিগগিরই মানুষের শরীরে ভাইরাস সরাসরি কী ধরনের উপকার করে তা জানতে পারব।

ভাইরাস কখন রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়? আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আমাদেরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। যখন কারো শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে তখন তাকে আক্রমণকারী ভাইরাস শরীরে রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় অথবা কারো শরীরে যদি নতুন ধরনের কোনো ভাইরাস আক্রমণ করে, তখন শরীরে নতুন প্রজাতির ভাইরাসটির বিপক্ষে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করা পর্যন্ত মানুষ অসুস্থ থাকে।

ভাইরাসজনিত পৃথিবীব্যাপী মহামারীগুলো

ফ্লু মহামারী ১৮৮৯-১৮৯০: মূলত এ মহামারীকে এশিয়াটিক ফ্লু বা রাশিয়ান ফ্লু বলা হয়। ১৮৮৯ সালের মে মাসে ইনফ্লুয়েঞ্জা এ ভাইরাসের সাব টাইপ H3N8 দ্বারা প্রথম সংক্রমণ ঘটে। যদিও তখন ধারণা করা হচ্ছিল H2N2 দ্বারা সংক্রমণ ঘটেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোয় দেখা যায়, তা ছিল H3N8। প্রাথমিক সংক্রমণ পৃথিবীর তিন প্রান্ত, তুর্কিস্তানের বুখারা, কানাডার আথাবাস্কা ও গ্রিনল্যান্ডে দেখা গিয়েছিল। উনিশ শতকে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বিশেষত মানুষের শহরমুখী প্রবণতা মহামারীটি দ্রুত ছড়াতে সহায়তা করেছিল। এক মিলিয়নের বেশি লোক মারা গিয়েছিল তখনকার সংক্রমণে।

ফ্লু মহামারী ১৯১৮: এ মহামারী স্প্যানিশ ফ্লু হিসেবে পরিচিত, যদিও এটি স্পেন থেকে ছড়ায়নি। ১৯১৮ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশকে সংক্রমিত করে এ মহামারী। প্রায় ৫০ মিলিয়ন লোক মারা গিয়েছিল তখন। ভাইরাসের সংক্রমণে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয় স্প্যানিশ ফ্লুতে।

এশিয়ান ফ্লু ১৯৫৬-১৯৫৮: ১৯৫৬ সালে এ মহামারী চীন থেকে শুরু হয়ে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল এবং চীন থেকে সিঙ্গাপুর, হংকং ও আমেরিকায় ছড়িয়েছিল। ইনফ্লুয়েঞ্জা এ ভাইরাসের সাবটাইপ H2N2 দ্বারা সংক্রমণটি ঘটে। এ মহামারীতে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে দ্বিমত থাকলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দুই মিলিয়নের মতো লোক মারা গিয়েছিল ভাইরাসটির সংক্রমণে।

ফ্লু মহামারী ১৯৬৮: এ মহামারী ‘হংকং ফ্লু’ হিসেবে পরিচিত। ১৩ জুলাই ১৯৬৮ সালে হংকংয়ে সর্বপ্রথম ইনফ্লুয়েঞ্জা এ ভাইরাসের সাবটাইপ H3N2 দ্বারা এই প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার পর মাত্র ১৭ দিনে সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনামে ছড়িয়ে পড়ে এবং তিন মাসের মধ্যেই ফিলিপাইন, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়েছিল। এক মিলিয়নের মতো লোক মারা গিয়েছিল ভাইরাসটির সংক্রমণে।

এইচআইভি/এইডস মহামারী: ১৯৭৬ সালে কঙ্গোয় প্রথম হিউম্যান ইমিউনোডেফিশিয়েন্সি বা এইচআইভি ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৩৬ মিলিয়নের বেশি লোক মারা গিয়েছে ভাইরাসটির সংক্রমণে। বর্তমান পৃথিবীতে ৩৫ মিলিয়ন মানুষ ভাইরাসটি বহন করে চলেছে নিজেদের শরীরে।

সোয়াইন ফ্লু মহামারী ২০০৯: এ মহামারীও একটি ফ্লু মহামারী, যা জানুয়ারি ২০০৯ থেকে আগস্ট ২০১০ পর্যন্ত প্রায় ১৯ মাস অবধি ছিল। এ মহামারীতে সন্দেহ করা হয় ৭০০ মিলিয়ন থেকে ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল। যদিও ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত করা হয়েছিল ৪ লাখ ৯১ হাজার ৩৮২ জনের এবং মৃত্যু হয়েছিল ১৮ হাজার ৪৪৯ জনের।

কভিড-১৯: নভেল করোনাভাইরাস রোগ ২০১৯। এটি ডিসেম্বর ২০১৯ সালে চীনের উহান শহরে প্রথম শনাক্ত করা হয়, যা এখন বিশ্বব্যাপী মহামারী আকার ধারণ করেছে। এ লেখা লেখার দিন (৭/৬/২০২০) পর্যন্ত এই রোগে পৃথিবীব্যাপী ৭০ লাখ লোকের ওপরে আক্রান্ত হয়েছে এবং চার লাখের ওপরে মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কভিড-১৯ নিয়ে বিস্তারিত পরবর্তী লেখায় লিখব।

উল্লিখিত মহামারীগুলো ছাড়াও যেসব ভাইরাসজনিত রোগ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষকে সংক্রমিত করেছে সেগুলো হলো, চিকুনগুনিয়া, ক্রিমিয়ান-কঙ্গো হেমোরেজিক ফিভার, ইবোলা ভাইরাস ডিজিজ, হেন্ডরা ভাইরাস সংক্রমণ, লাসসা ফিভার, মারবার্গ ভাইরাস ডিজিজ, সার্স করোনাভাইরাস, মার্স করোনাভাইরাস, মাংকিপক্স, নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণ, রিফট ভ্যালি ফিভার, জিকা ভাইরাস ডিজিজ, ইয়েলো ফিভার, স্মলপক্স, ডেঙ্গু ভাইরাস ইত্যাদি।

(তথ্যসূত্র: বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র, ভাইরোলজি বই ও প্রতিষ্ঠিত ভাইরোলজিস্টদের লেকচার)

 

ড. মুহাম্মদ নুরে আলম ছিদ্দিকী: ভাইরাস গবেষক, লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটি, আমেরিকা

Siddiquey27@gmail.com