উদ্ভাবন ও ব্যবহারিক প্রয়োগের উপযোগিতায় যেসব প্রযুক্তি এগিয়ে আছে, ব্লকচেইন তাদের মধ্যে অন্যতম। কয়েক বছর ধরেই বিভিন্ন ব্যবসায়িক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এর সফল প্রয়োগের বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছে। বেশকিছু প্রতিষ্ঠান এক্ষেত্রে অনেকটা এগিয়েও গেছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্লকচেইন প্রযুক্তির সফল প্রয়োগের মাধ্যমে নাগরিক পরিষেবা প্রদানের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে বেসরকারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ব্যবসায়িক কার্যকলাপকে আরো উন্নত করার চেষ্টা করছে।
একটি ডিজিটাল পরিকাঠামোয় অংশগ্রহণকারীর বিশ্বাস অর্জন যখন অতিগুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখনই ব্লকচেইনের ভূমিকা বিশেষভাবে অনুভূত হয়। প্রত্যেক ডিজিটাল পরিকাঠামোয় তথ্য বিকৃতির একটি ঝুঁকি থেকে যায়। তাছাড়া লেনদেনসংক্রান্ত বিতর্কের ঝুঁকি থাকে। ব্লকচেইন প্রযুক্তি এ দুটি ঝুঁকি খুব ভালোভাবে সামলাতে পারে। ফলে ব্লকচেইন প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল পরিকাঠামোয় অংশগ্রহণকারীর বিশ্বাস অর্জন করা সহজ হয়।
করোনা অতিমারীর প্রকোপে সারা বিশ্বের অনেক ব্যবসায়িক সংস্থা এক অভূতপূর্ব সংকটের সম্মুখীন হয়েছিল। এসব প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানীয় কর্তারা অনুধাবন করতে পারেন যে তাদের সংস্থাগুলোকে ভবিষ্যতে টিকে থাকতে হলে ডিজিটাল রূপান্তরের আশু প্রয়োজন। এসব প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল রূপান্তরের হার ত্বরান্বিত হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে এই শীর্ষ কর্তারা বুঝতে পারছেন যে তাদের নতুন ডিজিটাল পরিকাঠামোয় ক্রেতা ও অন্যান্য অংশীদারের বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। তাই তারাও ব্লকচেইন প্রযুক্তি গ্রহণের পরিকল্পনা করছেন।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্লকচেইনের অবদান কী পরিমাণ হতে পারে তা বোঝার জন্য সম্প্রতি প্রাইসওয়াটারহাউজকুপার্সের বিশেষজ্ঞরা একটি বিশ্লেষণমূলক পর্যালোচনা করেছেন। বিশ্লেষণের শুরুতে তারা ব্লকচেইন প্রয়োগের ক্ষেত্রগুলোকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করেছেন। এগুলো হলো: (১) মালিকানাসংক্রান্ত তথ্যাবলি বা প্রোভেন্যান্স, (২) আর্থিক লেনদেন, (৩) ব্যক্তি, বস্তু ও সংস্থার প্রামাণ্য নথি বা আইডেন্টিটি, (৪) চুক্তি সম্পাদন ও বিবাদের মীমাংসা এবং (৫) গ্রাহক পরিষেবা ও সন্তুষ্টি। তাদের এই পর্যালোচনা অনুযায়ী আগামী ১০ বছরে ব্লকচেইনের প্রয়োগ বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিতে ১ দশমিক ৭৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার যোগ করবে। ২০৩০ সালের সামগ্রিক উৎপাদন বা গ্লোবাল জিডিপির নিরিখে ব্লকচেইন প্রযুক্তির অবদান হবে প্রায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ। ব্লকচেইন প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে আগামী এক দশকে সারা বিশ্বে প্রায় ৪ দশমিক ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
ব্লকচেইন প্রযুক্তির প্রয়োগজনিত বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির একটা বড় অংশ বিভিন্ন অর্থনৈতিকভাবে উদীয়মান দেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে সংগঠিত হবে। বাংলাদেশের আর্থিক প্রবৃদ্ধির হার কয়েক বছর ধরে যথেষ্ট উচ্চ স্থানে রয়েছে। আগামী দশকেও বাংলাদেশের এই উচ্চ প্রবৃদ্ধির হার বজায় থাকার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। এই বৃদ্ধিতে ব্লকচেইন প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। বস্তুত, ব্লকচেইন প্রযুক্তির সফল প্রয়োগের ফলে আর্থিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হওয়ার সম্ভাবনাও আছে। সুতরাং এ প্রযুক্তিকে এখন থেকেই গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা উচিত।
বাংলাদেশের পক্ষে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচার্য বিষয় হলো ব্লকচেইন প্রযুক্তির প্রয়োগজনিত কর্মসংস্থান। অন্যান্য উদীয়মান দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। কেবল ব্লকচেইন বিশেষজ্ঞ ও প্রোগ্রামারদের চাকরি হবে তাই নয়, ব্লকচেইন প্রযুক্তিনির্ভর পরিকাঠামোর ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। জাতীয় ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের এসব দক্ষ কর্মী তৈরি করার জন্য প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন।
ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহারে কেবল ব্যবসায়িক সংস্থাগুলো লাভবান হবে তা নয়, এ প্রযুক্তির সফল প্রয়োগের মাধ্যমে নাগরিক পরিষেবার প্রভূত উন্নতি হবে। পরিষেবা প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাবের জন্য বিশ্বব্যাপী সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিকদের আস্থা অর্জন করতে এবং তা বজায় রাখতে সমস্যার সম্মুখীন হয়। এর মুখ্য কারণ হলো, বিপুলসংখ্যক মধ্যস্থতাকারী ব্যক্তি বা মিডলম্যান পরিষেবা প্রদানের কার্যকলাপগুলোয় জড়িত হয়ে থাকে। এদের মাধ্যমে পরিষেবা প্রদানের প্রক্রিয়াগুলো কতিপয় ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয় এবং পরিষেবাগুলোর মানের অবনমন ঘটে। ফলে পরিষেবা প্রদানের সামগ্রিক ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাসের অভাব দেখা দেয়। ব্লকচেইন প্রযুক্তি এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক কার্যপ্রণালিগুলো সাফল্যের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে পারে। বাংলাদেশে নাগরিক পরিষেবাগুলোকে এভাবে প্রযুক্তিনির্ভর পরিষেবায় রূপান্তর করতে পারলে সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার মানোন্নয়ন ঘটবে এবং জনগণের বিশ্বাস অর্জন সহজতর হবে।
এছাড়া বর্তমান নিয়ামক সংস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিতে বৃহত্তর স্বচ্ছতার জন্য কার্যাবলি পরিদর্শন, সম্মতি এবং অগ্রগতি নিশ্চিতকরণের উপায় হিসেবে ব্লকচেইন ক্রমে একটি বিচার্য প্রযুক্তি হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান দেশে ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে নাগরিক পরিষেবা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জনস্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদান, ডিজিটালাইজড পরিচয় নির্ধারণমূলক পরিকাঠামো গঠন, আর্থিক সুবিধা বিতরণ, আর্থিক লেনদেন পরিকাঠামো গঠন, মালিকানাসংক্রান্ত তথ্যাবলির সংরক্ষণ, আইনি প্রয়োগগুলো, শুল্ক পরিকাঠামোর উন্নয়ন এবং পিয়ার-টু-পিয়ার বিদ্যুৎ বাণিজ্য।
প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, বাংলাদেশের মতো একটি প্রগতিশীল দেশে কেবল উচ্চতর আর্থিক প্রবৃদ্ধি নয়, জাতীয় সমৃদ্ধির প্রতিও সমান নজর দিতে হবে। নিরবচ্ছিন্ন জাতীয় সমৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন উল্লিখিত নাগরিক পরিষেবাগুলোর উপর্যুপরি উন্নয়ন। এই উন্নয়ন শুধু গুণগত মানের উন্নয়ন নয়, এর মধ্যে পরিষেবার স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং দ্রুততার উন্নয়নও প্রয়োজন। আগামী দশকে ব্লকচেইন প্রযুক্তি সারা বিশ্বে এ ধরনের উন্নয়নে একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্লকচেইন প্রযুক্তিকেও অতিগুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
ব্লকচেইন একটি উদীয়মান প্রযুক্তি, যা ডিজিটাল যুগে বাংলাদেশের নাগরিক পরিষেবা ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। দেশের প্রতিটি নাগরিকের উন্নত ও কার্যকর পরিষেবা বিতরণ কার্যকর করার জন্য এটি একটি কার্যকর ও প্রতিশ্রুতিময় উপকরণ। সঙ্গে সঙ্গে এটাও খেয়াল রাখতে হবে যে ব্লকচেইন প্রযুক্তি সব সমস্যার সমাধান নয়। ব্লকচেইন প্রযুক্তির সফল প্রয়োগের জন্য একগুচ্ছ বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রয়োজন। শুধু তাই নয়, এ পরিকল্পনাগুলোকে নিবন্ধিত সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করাও প্রয়োজন। সার্বিক সমন্বয়ের মাধ্যমে এ লক্ষ্যগুলো অর্জন করা যেতে পারে।
ব্লকচেইন প্রযুক্তি ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জন করতে এবং আগামী দশকে জাতির আরো সমৃদ্ধি ঘটাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে যৌথভাবে এ লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য পরিকল্পনায় অংশ নিতে হবে এবং পরিকল্পনাগুলো সফলভাবে সম্পাদন করতে হবে।
[মতামত ব্যক্তিগত]
অরিজিৎ চক্রবর্ত্তী: পার্টনার, প্রাইসওয়াটারহাউজকুপার্স










