কভিড-১৯-এর
দ্বিতীয় ঢেউয়ে
বিধ্বস্ত বাংলাদেশ।
দিনের পর
দিন পরিস্থিতি
আরো খারাপের
দিকে যাচ্ছে।
প্রতিদিনের করোনা
রোগীর সংখ্যা
প্রায় ১০
হাজারের কাছাকাছি
গিয়ে পৌঁছেছে
এবং মৃত্যু
১৫০-এর
ওপরে পৌঁছে
গেছে। করোনার
সার্বিক পরিস্থিতি
জনগণের মধ্যে
এক ধরনের
আশঙ্কার জন্ম
দিয়েছে। সরকারের
তরফ থেকে
কঠোর লকডাউন
বাস্তবায়নের প্রায়
সপ্তাহ শেষ
হলেও প্রত্যেক
দিনের শনাক্ত
ও মৃত্যুর
হারে তেমন
কোনো পরিবর্তন
পরিলক্ষিত হচ্ছে
না। এরই
মধ্যে সরকারের
তরফ থেকে
আরো এক
সপ্তাহের লকডাউন
ঘোষণা করা
হয়েছে। আগের
তুলনায় এবারের
লকডাউন অনেক
বেশি কঠোরভাবে
পালিত হচ্ছে—এ
বিষয়ে কোনো
সন্দেহের অবকাশ
নেই। জনগণের
একটি বড়
অংশের মধ্যে
বাড়ির বাইরে
যাওয়ার প্রবণতার
ক্ষেত্রে কিছুটা
ইতিবাচক বিষয়
পরিলক্ষিত হয়েছে।
তবুও অনেক
ক্ষেত্রেই উত্সুক
জনতা কাজ
না থাকলেও
বাইরে বের
হচ্ছে এবং
আইন-শৃঙ্খলা
রক্ষাকারী বাহিনীর
প্রশ্নের মুখোমুখি
হচ্ছে। কোথাও
কোথাও জনগণ
আইন-শৃঙ্খলা
রক্ষাকারী বাহিনীর
শাস্তির মুখে
পড়ছে। এভাবেই
চলেছে গত
সাতদিন।
প্রায় দেড়
বছর ধরে
চলমান নভেল
করোনাভাইরাসের তাণ্ডবের
অভিজ্ঞতার আলোকে
বলা যেতে
পারে যে
বিভিন্ন দেশে
সংক্রমণের হার
যখন চূড়ায়
পৌঁছে যায়,
সেখান থেকে
নামতে কয়েক
সপ্তাহ সময়
লাগে। অনেক
ক্ষেত্রে দুই
থেকে চার
সপ্তাহ কিংবা
কোথাও কোথাও
আরো অনেক
বেশি সময়
লাগছে। সেসব
দেশের অভিজ্ঞতার
আলোকে বলা
যায়, বাংলাদেশের
দ্বিতীয় ঢেউয়ে
করোনা সংক্রমণের
অবস্থা যেখানে
পৌঁছেছে, সে
অবস্থা থেকে
উন্নতির জন্য
কমপক্ষে দুই
থেকে তিন
সপ্তাহ কিংবা
তারও বেশি
সময় লাগতে
পারে যদি
জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে
সরকারের সব
নির্দেশনা মেনে
চলে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের
মতে, এ
সংক্রমণের চেইন
ভাঙতে যথেষ্ট
সময় লাগবে
এবং এ
চেইন ভাঙার
জন্য সবচেয়ে
যেটি বেশি
প্রয়োজন তা
হলো, জনগণের
বাড়িতে থাকা
এবং করোনা
সুরক্ষা বিধি
মেনে চলা।
শহর অঞ্চলে
এবং শহরের
মূল সড়কগুলোয়
আইন-শৃঙ্খলা
রক্ষাকারী বাহিনীর
কড়াকড়ি ভূমিকা
থাকলেও গলিগুলোয়
এবং গ্রামাঞ্চলে
এখন পর্যন্ত
সে রকম
কড়াকড়ি লকডাউন
পালিত হচ্ছে
না। এখানে
অত্যন্ত গুরুত্বের
সঙ্গে উল্লেখ
করা প্রয়োজন
যে করোনার
প্রথম ঢেউয়ে
শহরে আক্রান্ত
রোগীর সংখ্যা
বেশি থাকলেও
দ্বিতীয় ঢেউয়ে
সংক্রমণ গ্রামাঞ্চলে
ছড়িয়ে পড়েছে।
সরকারি হিসাব
মতে, দেশের
বেশির ভাগ
হাসপাতালের রোগীদের
মধ্যে অর্ধেকের
বেশি গ্রামীণ
রোগী। তাছাড়া
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর
মধ্যে ভারতীয়
ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট
ব্যাপক হারে
ছড়িয়ে যাওয়ায়
সংক্রমণের হার
খুব দ্রুতগতিতে
বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এখনই যদি
আমরা সংক্রমণের
হার কমাতে
না পারি,
তবে পরিস্থিতি
নিয়ন্ত্রণের বাইরে
চলে যেতে
পারে। গত
দুই মাস
আগে ভারতের
করোনা পরিস্থিতির
অভিজ্ঞতা থেকে
একথা বলতে
পারি যে
ভারতীয় স্বাস্থ্য
খাত আমাদের
দেশের স্বাস্থ্য
খাতের চেয়ে
অনেক এগিয়ে।
সেখানেও হাসপাতাল
ও ডাক্তারদের
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ
করতে যথেষ্ট
বেগ পেতে
হয়েছে। পরিস্থিতি
মোকাবেলা করার
সময় সরকারকে
নানা ধরনের
সমালোচনার সম্মুখীন
হতে হয়েছে।
অনেক স্থানে
অক্সিজেনের অভাবে
অনেক রোগী
মারা গেছে।
হাসপাতালে পর্যাপ্ত
বেড পাওয়া
যায়নি। মরদেহ
সত্কারের ক্ষেত্রে
অনেক জটিলতার
সৃষ্টি হয়েছে।
ফলে আমরা
সবাই যদি
আমাদের আচরণ
সংযত না
করি তাহলে
পরিস্থিতি আরো
বেশি ভয়াবহ
আকার ধারণ
করতে পারে।
তখন বাংলাদেশে
করোনা পরিস্থিতি
মোকাবেলা করা
সত্যিই কঠিন
একটি কাজ
হবে সরকারের
জন্য।
আমাদের সবার
একটি বিষয়
অনুধাবন করা
প্রয়োজন যে
আমরা যদি
করোনা সুরক্ষা
বিধি মেনে
না চলি,
তাহলে পরিস্থিতি
উন্নতি হবে
না। আমাদের
মনে রাখতে
হবে যে
বাংলাদেশের মতো
দেশের সরকারের
পক্ষে সপ্তাহের
পর সপ্তাহ
কিংবা মাসের
পর মাস
লকডাউন বাস্তবায়ন
করা সম্ভব
নয়। কারণ
লকডাউনের সঙ্গে
ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে
আছে খেটে
খাওয়া জনগোষ্ঠীর
জীবন ও
জীবিকা। জনগণের
এ অংশ
দিন আনে
দিন খায়।
একদিন তাদের
কাজ না
থাকলে পরের
দিন কীভাবে
সংসার চলবে,
সেটিই তাদের
চিন্তার বিষয়
হয়ে দাঁড়ায়।
এ অবস্থায়
সব স্তরের
জনগণকে দায়িত্বশীল
আচরণ করা
অত্যন্ত জরুরি।
আমরা দায়িত্বহীনের
মতো আচরণ
করে শুধু
নিজেদের বা
নিজেদের আত্মীয়-পরিজনদেরই
বিপদে ফেলছি
না, বাংলাদেশের
জনগণকে এবং
সরকারকে বিপদে
ফেলছি। বিষয়টি
যতক্ষণ না
পর্যন্ত সবাই
মিলে অনুধাবন
করতে পারব
ততদিন পর্যন্ত
পরিস্থিতির উন্নতি
হওয়া কঠিন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনার
নেতৃত্বে আওয়ামী
লীগ সরকার
প্রায় দেড়
বছর ধরে
যেভাবে করোনার
বিরুদ্ধে যুদ্ধ
করে চলেছে,
সেটি সত্যিই
প্রশংসার দাবিদার।
করোনা পরিস্থিতির
কারণে যেখানে
পৃথিবীর বড়
বড় দেশ
অর্থনীতির চাকা
সচল রাখতে
এবং জনস্বাস্থ্য
সম্পর্কিত সমস্যা
মোকাবেলা করতে
হিমশিম খাচ্ছে,
সেখানে বাংলাদেশ
সরকার এখন
পর্যন্ত অত্যন্ত
সাফল্যের সঙ্গে
পরিস্থিতি মোকাবেলা
করেছে। শেখ
হাসিনার নেতৃত্বে
সরকার শুধু
অর্থনীতির চাকাই
সচল রাখেনি,
বরং করোনাকালীন
দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে
যথেষ্ট পরিমাণ
সহায়তা দিয়েছে।
করোনার প্রথম
ঢেউয়ের সময়
থেকে শুরু
করে এখন
পর্যন্ত সরকার
উন্মুক্ত বাজার
ব্যবস্থার মাধ্যমে
কম মূল্যে
জনগণের কাছে
নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য
পৌঁছে দিচ্ছে।
গত বছর
ঈদের আগে
দরিদ্র জনগোষ্ঠীর
কাছে সরাসরি
অর্থ পৌঁছে
দিয়েছে। সামাজিক
নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায়
অধিকসংখ্যক জনগণকে
অন্তর্ভুক্ত করে
সহায়তা প্রদান
করছে। এমনকি
গণপরিবহন শ্রমিক
কিংবা দরিদ্র
জনগোষ্ঠীসহ অন্যান্য
জনগোষ্ঠীকে যথেষ্ট
পরিমাণ সহায়তা
দেয়ার চেষ্টা
করেছে সরকার।
বর্তমানে দ্বিতীয়
ঢেউ চলাকালীন
এক কোটির
বেশি পরিবারকে
ঈদের আগে
বিনা মূল্যে
১০ কেজি
চাল প্রদানের
সরকারি সিদ্ধান্তটি
সত্যিই প্রশংসার
দাবি রাখে।
কিন্তু আমাদের
এটিও মনে
রাখতে হবে
যে সরকারের
যে সক্ষমতা,
সেখানে ব্যাপক
সংখ্যার দরিদ্র
জনগোষ্ঠীকে তাদের
চাহিদা অনুযায়ী
সব ধরনের
সহায়তা প্রদান
করা সম্ভব
নয়।
আমরা পৃথিবীর
বিভিন্ন দেশের
অভিজ্ঞতার আলোকে
বলতে পারি
বিভিন্ন দেশের
বড় বড়
শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ ধনী
ব্যক্তিরা এ
অতিমারী চলাকালীন
যেভাবে দরিদ্রদের
এবং সরকারের
পাশে এসে
দাঁড়িয়েছে, সে
রকম উদাহরণ
বাংলাদেশে এখন
পর্যন্ত খুব
বেশি আমরা
দেখতে পাই
না। এমনকি
আমাদের প্রতিবেশী
রাষ্ট্র ভারতে
টাটা শিল্পগোষ্ঠী
থেকে শুরু
করে বড়
বড় শিল্পগোষ্ঠী,
ক্রিকেটার, অভিনেতা
ও ব্যবসায়ীরা
অতিমারীর সময়
যেভাবে জনগণের
পাশে দাঁড়িয়েছে
এবং তাদের
সহায়তা দিচ্ছে,
তা সত্যিই
অনুকরণীয়। সুতরাং
শতাব্দীর সবচেয়ে
কঠিন সময়ে
শুধু সরকারের
ওপর দায়
চাপিয়ে এ
অবস্থা থেকে
উত্তরণ পাওয়া
সম্ভব নয়।
এ সময়
প্রয়োজন সরকারের
পাশাপাশি বেসরকারি
ও ব্যক্তিমালিকানাধীন
উদ্যোগ।
একথা ঠিক
যে বাংলাদেশে
বেশকিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান,
শিল্পগোষ্ঠী এবং
বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের
মতো কিছু
প্রতিষ্ঠান করোনার
প্রথম ঢেউয়ের
সময় থেকেই
দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে
সহায়তা দিয়ে
আসছে। তবে
এটিও ঠিক
যে বাংলাদেশের
একশ্রেণীর জনগণের
হাতে প্রচুর
পরিমাণে অর্থ
রয়েছে, যারা
চাইলেই দরিদ্র
জনগোষ্ঠীর পাশে
দাঁড়াতে পারে।
সরকারি, বেসরকারি,
আধা সরকারিসহ
সব প্রতিষ্ঠান
যদি একসঙ্গে
কাজ না
করে, তবে
এ ধরনের
অতিমারী থেকে
সহসা উত্তরণ
পাওয়া খুব
কঠিন হয়ে
দাঁড়াবে।
আমাদের সবার
উচিত নিজ
নিজ অবস্থান
থেকে সরকারের
এবং দরিদ্র
জনগোষ্ঠীর পাশে
দাঁড়ানো। বর্তমান
পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত
সহায়তা প্রদানের
সঙ্গে সঙ্গে
দারিদ্র্যসীমার নিচে
বাস করা
জনগোষ্ঠীকে লকডাউনের
সময় সহায়তা
দেয়ার জন্য
সরকার প্রাণান্তকর
চেষ্টা চালিয়ে
যাচ্ছে। এখন
পর্যন্ত রোগীদের
বিনা মূল্যে
হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসা
প্রদান করা
হচ্ছে। দেশব্যাপী
এখন পর্যন্ত
পর্যাপ্ত অক্সিজেন
সরবরাহ করা
হয়েছে। যদিও
কিছুু ক্ষেত্রে
সরকারের তরফ
থেকে স্বীকার
করা হয়েছে
যে কিছু
গ্রামীণ অঞ্চলে
অক্সিজেন সরবরাহের
ক্ষেত্রে কিছুটা
সমস্যা রয়েছে।
তবুও সরকার
চেষ্টা করে
যাচ্ছে এসব
সমস্যা যত
দ্রুত সম্ভব
কাটিয়ে উঠে
জনগণকে রক্ষার
জন্য।
কিন্তু পরিস্থিতির
বিবেচনায় আমাদের
মনে রাখা
উচিত যে
অতিমারী চলাকালীন
যখন দেশের
স্বাস্থ্য ব্যবস্থা
কিংবা অর্থনীতি
হুমকির সম্মুখীন,
ঠিক তখন
বেসরকারি উদ্যোগের
পাশাপাশি জনসাধারণের
দায়িত্বশীল আচরণ
একান্ত কাম্য।
জনসাধারণ যদি
সরকারের নির্দেশনা
অনুযায়ী কভিড-১৯
সুরক্ষা বিধি
না মেনে
চলাফেরা করতেই
থাকে, তাহলে
করোনার সংক্রমণের
হার কাঙ্ক্ষিত
পর্যায়ে কখনই
কমানো সম্ভব
নয়। এই
অতিমারী চলাকালীন
জনগণের দায়িত্ব
হচ্ছে সরকারকে
সহায়তা করা।
এ সময়ে
সরকারের দোষ
না ধরে
আসুন আমরা
সবাই মিলে
করোনা সুরক্ষা
বিধি মেনে
চলি, বাসায়
অবস্থান করি
এবং সার্বিকভাবে
করোনা পরিস্থিতি
নিয়ন্ত্রণে আনার
চেষ্টা করি।
আমাদের সবার
মনে রাখা
উচিত বাড়ির
পাশে কোনো
বাড়িতে যদি
আগুন ধরে,
তবে সেই
বাড়িই শুধু
আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত
হয় না।
তার আশেপাশে
যত বাড়ি
আছে, আগুনের
প্রভাব সেসব
বাড়িতেও পড়ে।
অতএব, আমি
যদি ব্যক্তিগতভাবে
নিজে সুরক্ষিত
না থাকি,
তবে আমরা
আমাদের আশপাশের
কাউকে সুরক্ষিত
রাখতে পারব
না এবং
সুরক্ষিত না
রাখতে পারলে
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে
আসবে না।
ফলে এ
অবস্থায় আমাদের
সবার উচিত
দায়িত্বশীল আচরণ
করা এবং
সরকারের সঙ্গে
এক হয়ে
কাজ করে
অতিমারী থেকে
উত্তরণ পাওয়ার
চেষ্টা করা।
ড. প্রণব কুমার পান্ডে: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক










